Tuesday, October 8th, 2013

রামপাল বিদ্যুৎ প্রকল্পের ভিত্তিফলক উন্মোচন প্রসঙ্গে জাতীয় কমিটির বক্তব্য ও ভবিষ্যৎ কর্মসূচি ঘোষণা

আপনারা সবাই অবগত আছেন যে, সুন্দরবনধ্বংসী রামপাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প বাতিল ও বিদ্যুৎ সংকটের সমাধানে জাতীয় কমিটির ৭ দফা বাস্তবায়নের দাবিতে আমরা গত ২৪-২৮ সেপ্টেম্বর ২০১৩ ঢাকা থেকে সুন্দরবন ৪০০ কিমি লংমার্চ সফলভাবে সম্পন্ন করেছি। এই লংমার্চের আগে বহুবার আপনাদের মাধ্যমে এবং বিভিন্ন প্রকাশনার মধ্য দিয়ে, এমনকি সরকারের কাছে লিখিতভাবে ও আনুষ্ঠানিক বৈঠকে, আমরা কেনো এই কেন্দ্র বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থবিরোধী, সুন্দরবন ও মানববিধ্বংসী, তা বৈজ্ঞানিক গবেষণালব্ধ তথ্য যুক্তিসহ তুলে ধরেছি। আমরা বারবার বলেছি, বিদ্যুৎ উৎপাদনের অনেক বিকল্প আছে, সুন্দরবনের কোন বিকল্প নেই। পৃথিবীর বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন, প্রাণ-বৈচিত্রের অসাধারন আধার এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের মানুষের জন্য সবচাইতে শক্তিশালী প্রাকৃতিক রক্ষা বর্ম সুন্দরবন আছে বলে প্রতিটি প্রাকৃতিক দুর্যোগে বাংলাদেশের লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবন বাঁচে। সুন্দরবন মায়ের মতো নিজে সবাইকে আগলে রাখে। সেই সুন্দরবন আমরা ধ্বংস হতে দিতে পারি না। একদিকে রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র করে এই অনবায়নযোগ্য বিশাল আশ্রয় হত্যার আয়োজন চলছে, অন্যদিকে এই বিদ্যুৎ কেন্দ্র সামনে রেখে ভ’মিদস্যুদের নানারকম প্রকল্প তৈরি করা হচ্ছে। লংমার্চের মধ্য দিয়ে এই যাত্রাপথে এবং সারাদেশের অসংখ্য মানুষের সমর্থন পেয়ে এই প্রকল্পবাতিলসহ ৭ দফা দাবি এখন জাতীয় দাবিতে পরিণত হয়েছে। অসংখ্য মানুষের সমর্থন নিয়ে বৃহত্তর সুন্দরবনের দিগরাজে অনুষ্ঠিত সমাপনী সমাবেশে সুন্দরবন ঘোষণার মাধ্যমে গণরায় তৈরি হয়েছে। এই লংমার্চ কর্মসূচিতে স্বাগতিক জেলা, অঞ্চল, সাংবাদিকবন্ধু সহ যারা সহযোগিতা করেছেন তাঁদের আমরা ধন্যবাদ জানাই। আশা করি জাতীয় স্বার্থের আন্দোলনে আপনাদের সকলের সহযোগিতা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাবে।

বিশেষজ্ঞমত ও এই জাতীয় জাগরণ উপেক্ষা করে গত ৫ অক্টোবর, নির্ধারিত তারিখের ১৭ দিন আগে, ২৫০ কিমি দূর থেকে রিমোট কন্ট্রোলের মাধ্যমে বাংলাদেশ ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী যৌথভাবে রামপালে সেই ১৩২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের ভিত্তি ফলক উন্মোচন করেছেন। বলাবাহুল্য, এসব ‘চালাকি’ সরকারের শক্তির নিদর্শন নয়, বরং তাদের নৈতিক পরাজয়ের লক্ষণ। এটা প্রমাণ করে যে, বৈজ্ঞানিক তথ্য যুক্তির সামনে দাঁড়ানোর কোন তথ্য যুক্তি সরকারের নেই; গণরায়ের সামনে দাঁড়ানোর নৈতিক সাহস তাদের নেই। সেজন্যই এই ফলক বাংলাদেশ সরকারের জাতীয় স্বার্থ বিরোধী সুন্দরবন ধ্বংসের তৎপরতার একটি চিহ্ন হয়ে থাকবে। ‘উন্নয়ন’ নামের এই ধ্বংসের প্রকল্পকে বাংলাদেশ ও ভারতের বন্ধুত্বের নির্দশন হিসেবে আখ্যায়িত করলেও এটি কার্যত ভারতের সাথে বৈরীতা বৃদ্ধির একটি প্রকল্প। সরকার এই প্রকল্প নিয়ে অগ্রসর হবার মাধ্যমে ভারতের সাথে বন্ধুত্বের পথ আরও সংকুচিত করেছেন। ভারতের আগ্রাসী নীতি এবং দুইদেশের কতিপয় গোষ্ঠীর মুনাফা আগ্রাসী তৎপরতার কাছে সরকার আতœসমর্পণ করেছেন। সুন্দরবনকে ধ্বংস করার এই প্রকল্প কাজের আনুষ্ঠানিক ফলক উন্মোচনের দিন তাই বাংলাদেশ ভারতের সম্পর্কেরও একটি কলঙ্ক হয়ে থাকবে।

এই প্রসঙ্গে বলা দরকার যে, এই প্রকল্পের ভিত্তিফলক উন্মোচন করে ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং ভারতের আইন ভঙ্গ করেছেন, কেননা ভারতের আইন অনুযায়ী সুন্দরবন তো নয়ই, এর এক দশমাংশ বনের পাশেও এধরনের কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র অনুমোদন করা হয় না। ভারতের প্রধানমন্ত্রী ও সফররত বিদ্যুৎ মন্ত্রী বলেছেন, বাংলাদেশের সুন্দরবনের ক্ষতি হবে না। তাই যদি হয় তাহলে কেন ভারতে এর থেকে ছোট বনের পাশে বিদ্যুৎ কেন্দ্র বাতিল হয়? কেন অনিয়ম, অস্বচ্ছতা, প্রতারণা এবং লুকোচুরি? তাছাড়া সুন্দরবন এমনিতেই যতটুকু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তাতে তাঁদেরও দায়িত্ব আছে, কেননা এর অন্যতম কারণ ভারতের ফারাক্কা বাঁধ।

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও বলেছেন সুন্দরবনের কোন ক্ষতি হবে না। তিনি বড়পুকুরিয়ার দৃষ্টান্ত টেনেছেন। তাঁর এই তথ্য মোটেই ঠিক নয় যে, বড়পুকুরিয়ায় কোন ক্ষতি হয়নি। ইতিমধ্যে সেখানে ভ’গর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যাওয়ায় খাবার পানির সংকট হয়েছে ও কৃষি জমি ক্ষতি হয়েছে। নদী ও খালবিলের পানিরও সমস্যা হচ্ছে, ছাই ব্যবস্থাপনায় সংকট দেখা দিয়েছে। দ্বিতীয়ত, বড়পুকুরিয়ার বিদ্যুৎ কেন্দ্র রামপালের প্রস্তাবিত কেন্দ্রের ১০ ভাগের ১ ভাগ। সর্বোপরি বড়পুকুরিয়ায সুন্দরবন নেই। প্রশ্ন হলো, ‘সুন্দরবনের ক্ষতি হবে না’ এব্যাপারে তাঁরা যদি এতটা নিশ্চিতই থাকেন তাহলে ক্ষতির সুনিদিষ্ট কারণ নিয়ে বৈজ্ঞানিক তথ্য বিশ্লেষণ যুক্তি এড়িয়ে, ঘোষিত তারিখ পাল্টিয়ে, ২৫০ কিমি দূর থেকে রিমোর্ট কন্টোলের মাধ্যমে ভিত্তি ফলক উন্মোচনের তাড়াহুড়া কেন? স্বচ্ছতা ও সংলাপের আমরা যে আহবান রেখেছি তা গ্রহণ করতে সরকারের ভয় কীসের?

দেশি বিদেশি বিশেজ্ঞদের মতামত, সারা দেশের মানুষের দাবি ও আকুতিকে অগ্রাহ্য করে, যেভাবে দুই দেশের প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশকে অরক্ষিত করবার এই প্রকল্পের ভিত্তি ফলক স্থাপন করলেন তার প্রতিবাদের জন্য হরতালই ছিল উপযুক্ত জবাব। রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে, দিনের পর দিন লংমার্চে যারা অংশগ্রহণ করেছেন, অসংখ্য মানুষ যারা এই আন্দোলনে একাতœ হয়েছেন, তাঁদের ক্ষোভ ও ধিক্কার প্রকাশে সেটাই উপযুক্ত ছিলো। আমরা জানি, সারা দেশের মানুষ জনস্বার্থবিরোধী হরতালে বিপর্যস্ত থাকলেও, নিজেদের সামষ্টিক স্বার্থে, সুন্দরবন রক্ষায় ঐক্যবদ্ধভাবে ঠিকই হরতাল পালন করবেন। কিন্তু তাৎক্ষণিক প্রতিবাদ ও বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করলেও আমরা ঈদ ও পূজার প্রাক্কালে জনগণের সমস্যার কথা বিবেচনা করে হরতালের কর্মসূচি দেই নি। কিন্তু আজকের এই সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে আমরা স্পষ্টভাবে জানাতে চাই যে, বাংলাদেশের রক্ষাবাঁধ সুন্দরবনের ধ্বংস হয় এরকম প্রকল্প বাংলাদেশের মানুষ কোনভাবেই হতে দেবে না, প্রয়োজন অনুযায়ী আমাদের কর্মসূচিও তাই অব্যাহত থাকবে।

প্রকৃতপক্ষে বাংলাদেশের কোন সরকারই সুন্দরবন ধ্বংস করে রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র করতে পারবে না, কেননা সুন্দরবন রক্ষায় এখন জাতীয় জাগরণ তৈরী হয়েছে। ভারতের কোন সরকার সুন্দরবন ধ্বংসের প্রকল্প গায়ের জোরে বাংলাদেশের উপর চাপাতে পারবে না, কেননা ভারতের সজাগ মানুষেরাও আমাদের এই আন্দোলনে যোগ দিচ্ছেন। সেখানে এই ধ্বংসাতœক প্রকল্প বাতিলের দাবিতে ইতিমধ্যে এনটিপিসিকে স্মারকলিপি দেয়া হয়েছে, স্বাক্ষর সংগ্রহ চলছে, কলকাতা থেকে সুন্দরবন অভিমুখে লংমার্চেরও প্রস্তুতি চলছে। বিশ্বের অন্যান্য প্রান্তের সজাগ মানুষেরাও সুন্দরবন ধ্বংসের বিরুদ্ধে সোচ্চার হচ্ছেন। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের বিজ্ঞানী, লেখক, শিল্পী, রাজনৈতিক কর্মীরা উদ্বেগ নিয়ে যোগাযোগ করছেন। কেননা এটি শুধু বাংলাদেশের নয়, বিশ্বেরও সম্পদ।

আমাদের ধারাবাহিক কর্মসূচির অংশ হিসেবে আগামী ৯ অক্টোবর এই প্রকল্প বাতিলের দাবিতে দেশব্যাপী আবারো বিক্ষোভ কর্মসূচি পালিত হবে। ঢাকায় জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে বেলা ৪টায় কেন্দ্রীয় কর্মসূচি। দেশবাসীর পক্ষ থেকে সরকারের কাছে দাবি জানাই মেয়াদকাল সমাপ্ত হবার আগেই রামপাল বিদ্যুৎ প্রকল্প বাতিল সহ সুন্দরবনধবংসী সব তৎপরতা বন্ধ করে ভিত্তিফলক উন্মোচনের কলঙ্ক মোচন করুন। আর সরকার যদি এই প্রকল্প অব্যাহতই রাখে, যদি যুক্তি তথ্য আর বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী ভ’মিকা পালন না করে, তাহলে জনগণের শক্তির ওপর ভর করেই আমরা প্রয়োজন অনুযায়ী কর্মসূচি নেবো। তখন যে ধরনের সরকারই থাকুক, জ্বালানী মন্ত্রণালয় ঘেরাও, সমাজের সকল পর্যায়ের মানুষদের নিয়ে দেশব্যাপী হরতাল, অবরোধ, গণঅবস্থান সহ বিভিন্ন কর্মসূচি দেওয়া ছাড়া আমাদের কোন উপায় থাকবে না। সেই অনুযায়ী এরপর প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে রামপালে বিদ্যুৎ কেন্দ্রের কোন কর্মসূচি নেয়া হলেও হরতালের ঘোষণা দিতে আমরা বাধ্য হব।

দেশবাসীকে ঈদ ও পূজার শুভেচ্ছা জানানোর সাথে সাথে আহবান জানাই ঈদের জামাতে ও পূজার মন্ডপে সুন্দরবন রক্ষার দাবি উচ্চারণ করুন। ঘরে ঘরে আনন্দ উৎসবের মধ্যে সুন্দরবন রক্ষাসহ জাতীয় স্বার্থের পক্ষে জনমত তৈরি করুন। বিজ্ঞানী, শিল্পী, লেখক, সাংবাদিক, পেশাজীবী, শ্রমিক কৃষক নারীপুরুষ সবার প্রতি আমাদের আহবান নিজ নিজ জায়গা থেকে আপনারা প্রকৃত মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় সুন্দরবনসহ জাতীয় স্বার্থের পক্ষে নিজ নিজ ভ’মিকা পালন করুন। আমরা স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, কারখানা, অফিস আদালতসহ ঘরে ঘরে আমাদের অস্তিত্বের অংশ সুন্দরবন রক্ষার পক্ষে জনপ্রতিরোধ তৈরি করেই সুন্দরবনকে লোভের বলি হওয়া থেকে রক্ষা করবো। এই কাজে আমরা সকল পর্যায়ের মানুষের সক্রিয় অংশগ্রহণ কামনা করি।

ধন্যবাদ।

তেল-গ্যাস খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটি
মুক্তিভবন, ৮ অক্টোবর, ২০১৩।