Saturday, May 12th, 2018

জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে দায়মুক্তি আইন: অভূতপূর্ব দুর্নীতি, অনিয়ম এবং প্রাণ প্রকৃতি বিনাশী প্রকল্প দিয়ে বাংলাদেশকে বিপদগ্রস্ত করবার পরিপ্রেক্ষিতে জাতীয় কমিটির বক্তব্য

প্রিয় সাংবাদিক বন্ধুগণ,

শুভেচ্ছা নেবেন।

আমরা গভীর উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ্য করছি যে, সরকার জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে ‘ব্যাপক উন্নয়নের’ নামে, জনমত, বিশেষজ্ঞমত ও দেশের স্বার্থ উড়িয়ে দিয়ে এমন সব প্রকল্প গ্রহণ করছে যা দেশকে দীর্ঘমেয়াদে অনিশ্চয়তা, নিরাপত্তাহীনতা, ঋণগ্রস্ততা সর্বোপরি মহাবিপদের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। একই কারণে গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম আবারও বাড়ানো হচ্ছে। সরকার গৃহীত মহাপরিকল্পনা (পিএসএমপি ২০১৬) অনুযায়ী এসব প্রকল্প গ্রহণ করা হচ্ছে। এগুলো নিয়ে কোনোরকম স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার মধ্যে না যাবার জন্য বারবার দায়মুক্তি আইনের মেয়াদ বাড়ানো হচ্ছে। এই আইন এবং সরকার গৃহীত বিভিন্ন প্রকল্প সম্পর্কে আমাদের বক্তব্য উপস্থাপনের জন্যই আমরা আপনাদের আমন্ত্রণ জানিয়েছি।

অপরাধীদের রক্ষায় আবারও দায়মুক্তি আইনের মেয়াদ বৃদ্ধির তোড়জোড়

বিদ্যুৎ খাতে দ্রুত পরিবর্তন আনয়নের নাম করে, বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনসহ জনস্বার্থবিরোধী নানা চুক্তি অথবা অন্য কোনো কার্যক্রম বা গৃহীত কোনো ব্যবস্থা, কিংবা আদেশ-নির্দেশের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে আদালতেকোন ধরনের প্রতিকার পাবার অধিকার হরণ করে ২০১০ সালে দায়মুক্তি আইন করা হয়েছিল। এটি প্রথমে ২ বছরের জন্য করা হয়। পরে ২০১২ সালে এর মেয়াদ আরও ২ বছর বাড়ানো হয়। ২০১৪ সালে এসে এর মেয়াদ ৪ বছরের জন্য বাড়ানো হয় । (সূত্র: ১) ২০১৮ সালের ১১ অক্টোবর এই বিশেষ দায়মুক্তি আইনের মেয়াদ শেষ হবার কথা থাকলেও এটির মেয়াদ আবারও বৃদ্ধি করার তোড়জোড় শুরু হয়েছে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ সম্প্রতি ২০২১ সাল পর্যন্ত এই আইন বহাল থাকা উচিত বলে মত ব্যক্ত করেছেন। (সূত্র:২)

স্বচ্ছ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে, জনস্বার্থ নিশ্চিত করে বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের সিদ্ধান্ত নিলে এবং তা বাস্তবায়ন করলে দায়মুক্তি আইনের কোন প্রয়োজন পড়ে না। সকল তথ্য ও প্রমাণাদি থেকে এটা স্পষ্ট যে, এই ধরণের দায়মুক্তি আইন প্রকৃতপক্ষে বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের নামে দুর্নীতি, অনিয়ম, টাকা পাচারের মত অপরাধ থেকে দায়মুক্তি পাবার জন্যই করা হচ্ছে। এই দুর্নীতি অনিয়মের কারণেই একের পর এক অসম্ভব ব্যয়বহুল ক্ষতিকর প্রকল্প গ্রহণ করা হচ্ছে, গত ৮ বছরে বিদ্যুতের দাম বেড়েছে ৮ বার। রেন্টাল-কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের অতিরিক্ত ব্যয় রাষ্ট্রীয় কোষাগার হতে মেটাতে সরকার চুক্তি মোতাবেক বাধ্য থাকায় গত ৮ বছরে বিপিডিবি’র ঘাড়ে জমেছে ৪৯ হাজার কোটি টাকার লোকসানের বোঝা । (সূত্র: ৩) গত বছর ৪৮ টি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সবচেয়ে লোকসানি প্রতিষ্ঠানের কলঙ্ক জুটেছে বিপিডিবি’র কপালে। (সূত্র: ৪)

অথচ মাত্র কয়েক হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করেই বর্তমান রাষ্ট্রায়ত্ত গ্যাস ভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রের কর্মদক্ষতা বাড়ানো সম্ভব। প্রাকৃতিক গ্যাস অনুসন্ধানে বাপেক্সের জনবল, প্রশিক্ষণ এবং দক্ষতা বাড়ানো সম্ভব। কিন্তু সস্তা বিদ্যুৎ উৎপাদনের পথে হাটতে সরকারের নূন্যতম মনোযোগ নেই।

এলএনজি আমদানি এবং আবারও গ্যাস-বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধি

সংকট জিইয়ে রেখে সমাধানের নাম করে দেশি বিদেশি গোষ্ঠীর স্বার্থে নতুন সংকট সৃষ্টির আরেক নমুনা হচ্ছে এলএনজি আমদানির সিদ্ধান্ত। জাতীয় কমিটি বহু বছর ধরে ধারাবাহিকভাবে বাংলাদেশের স্থল এবং অগভীর সমুদ্র সীমানায় যে আরও অন্তত ৩২ টিসিএফ গ্যাস পাবার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে তা অনুসন্ধান ও উত্তোলনের প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণের দাবি জানিয়ে আসছে। জাতীয় কমিটির পেশ করা ৭ দফার ষষ্ঠ দফায় এ ব্যাপারে নির্দিষ্টভাবে বলা হয়েছে। কিন্তু যে পদক্ষেপ নিলে জনস্বার্থ রক্ষিত হয় সেই গ্যাস অনুসন্ধান এবং উত্তোলনের আয়োজন না করে এখন সংকট সমাধানের নাম করে এলএনজি আমদানির সিদ্ধান্তকে বৈধতা দেয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। এর ফলে বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সার কারখানায় গ্যাসের মূল্য ২০০ শতাংশ এবং শিল্প কারখানা, ক্যাপটিভ পাওয়ার এবং সিএনজির জন্য সরবরাহকৃত গ্যাসের দাম ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি করার প্রস্তাব ইতোমধ্যেই চূড়ান্ত করা হয়েছে । (সূত্র: ৫) এতে করে নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্য, যাতায়াত, বিদ্যুত সহ দৈনন্দিন জীবনযাত্রার খরচ আরেক দফা বাড়বে। সরকারের পক্ষ থেকে সাফ জানিয়ে দেয়া হয়েছে যে, বেশি দামের গ্যাসের বিকল্প হচ্ছে ‘নো গ্যাস’। জনগণকে বেশি দামের গ্যাস ব্যবহার না করতে চাইলে গ্যাস ব্যবহার থেকে বিরত থাকতে বলা হয়েছে । (সূত্র:৬)

আমরা গ্যাস সংকট মোকাবেলায় সরকারের ব্যর্থতা এবং এলএনজি আমদানির মাধ্যমে বাড়তি খরচ সর্বজনের কাঁধে চাপিয়ে দেয়ার এই হীন চেষ্টার তীব্র নিন্দা জানাচ্ছি। সরকারের জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতের মহাপরিকল্পনা অনুসারে এ মাস থেকে দিনপ্রতি যে ২৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস এলএনজির মাধ্যমে জাতীয় গ্যাস গ্রীডে যুক্ত হবে তা আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই কয়েক হাজার ছাড়িয়ে যাবে এবং ২০৪১ সাল নাগাদ এর পরিমাণ দাঁড়াবে দিনপ্রতি ৪ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট। ফলে এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন শুরু হলে ব্যয়বৃদ্ধির চক্র থেকে মুক্তি পাবার কোন উপায় থাকবে না। সেই সাথে বৈশ্বিক বাজারে অস্থিতিশীল দামের এই এলএনজি’র উপর ধারাবাহিক আমদানি নির্ভরশীলতা বৃদ্ধির কারণে বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা হুমকির সম্মুখিন হবে।

জাতীয় উদ্যোগ গ্রহণ না করে সৌর বিদ্যুৎ আমদানির পরিকল্পনা

সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রাথমিক জ্বালানির কোন খরচ নেই। প্রযুক্তি উন্নয়নের সাথে সাথে সৌর বিদ্যুতের কমতে থাকা দাম তেল-কয়লা কিংবা পরমাণু বিদ্যুতের মত ভবিষ্যতে বৃদ্ধি পাবার কোন সুযোগ নেই। সোলার সিস্টেমের দাম যখন বেশী ছিল তখনও বাংলাদেশের মানুষ মাত্র ৩ থেকে ৪ ঘন্টা বিদ্যুৎ পেতে ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা খরচ করেছে। কিন্তু গত ৭ বছরে প্রতি ইউনিট সৌর বিদ্যুতের দাম ৭২ শতাংশ কমে গেছে । (সূত্র: ৭) দীর্ঘস্থায়ী ব্যাটারী বাজারে এসেছে। ভারতে এই বিদ্যুৎ এখন সাড়ে ৩ টাকারও কম খরচে উৎপাদিত হচ্ছে। অথচ বাংলাদেশের সরকার এই খাত উন্নয়নে মনোযোগী না হয়ে, প্রতিযোগিতামূলক ব্যবসায়ী পরিবেশ নিশ্চিত করে মানসম্পন্ন প্রযুক্তি মানুষের কাছে পৌঁছে দেবার উদ্যোগ না নিয়ে এই সস্তা সৌর বিদ্যুৎ ভারত থেকে বেশী দামে আমদানি করার পরিকল্পনা করছে। সম্প্রতি ভারত সফরকালে প্রধানমন্ত্রীর জ্বালানি উপদেষ্টা তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী ২ হাজার মেগাওয়াট সৌর বিদ্যুৎ আমদানির কথা জানান। (সূত্র:৮) কয়েক হাজার কিলোমিটার দূরের গুজরাট এবং রাজস্থান থেকে সঞ্চালন লাইন টেনে সকল কারিগরি সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করে এই বিদ্যুৎ বাংলাদেশের গ্রীডে যুক্ত হলে পুরো বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় অতিরিক্ত ব্যয়ের নতুন বোঝা তৈরি হবে।

অথচ বাংলাদেশে কৃষির কোন ক্ষতি না করেই সোলার শেয়ারিং, মিনি গ্রীড, মাইক্রো গ্রীড ব্যবস্থায় সস্তা দামের সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যবস্থা খুব কম সময়েই করা সম্ভব। এজন্য বিভিন্ন গোষ্ঠী এবং ব্যক্তি দ্বারা দখল হয়ে যাওয়া জমি, রেলওয়ের বেদখল হওয়া জমি, বাসা-বাড়ির ছাদ, নদীর ধার প্রভৃতি জায়গার দিকে মনোযোগ দিলেই হবে। কৃষি বনাম সৌর বিদ্যুৎকে মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়ার সরকারী প্রচারণা প্রকৃত পক্ষে উচ্চ মূল্যে সৌর বিদ্যুৎ আমদানির রাস্তাই তৈরী করছে। দেশের ভেতরেও সরকার ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর কাছ থেকে উচ্চমূল্যে সৌরবিদ্যুৎ কেনার চুক্তি করা হচ্ছে। এতে করে সাধারণ মানুষকে গুনতে হবে বিদ্যুতের উচ্চমূল্য।

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং বাংলাদেশের ঝুঁকি

যে কোন প্রকল্প বাস্তবায়নের পূর্বে পরিবেশগত সমীক্ষা (ইআইএ) করে সেই রিপোর্ট প্রকাশ করে সকলের সাথে আলাপআলোচনা করার সাধারণ নিয়মটিও রূপপুর প্রকল্পের ক্ষেত্রে মানা হয় নি। এই প্রকল্পের ইআইএ রিপোর্ট এখনও প্রকাশ করা হয় নি। বৃহত্তর পাবনা এলাকায় পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নিয়ে আলোচনা অনুষ্ঠান, সংবাদ সম্মেলন, সভা-সমিতি করার ব্যাপারে জারি করা হয়েছে আঘোষিত নিষেধাজ্ঞা। জনমানুষের কল্যাণের জন্যই যদি এই বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করা হতে থাকে তবে এই প্রকল্প সম্পর্কে মানুষের প্রশ্ন বা মত প্রকাশ করা নিয়ে সরকার এত ভীত কেন?

প্রচার করা হচ্ছে যে, পারমাণবিক বর্জ্য নাকি রাশিয়া নিয়ে যাবে যেটা কিনা কয়েক হাজার বছর জনমানবশূন্য পরিবেশে নিরাপদে রাখার আয়োজন করতে হয়। অথচ রাশিয়ার আইন অনুসারে অন্য কোন দেশের পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের বর্জ্য সেখানে স্থায়ীভাবে সংরক্ষণ করা অসম্ভব। ঘনবসতিপূর্ণ বাংলাদেশের কোথায় এই পারমাণবিক বর্জ্য স্থায়ীভাবে সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হবে এবং সেই আয়োজনের কত খরচ হবে তা নিয়ে সরকারের কোন পরিকল্পনা না থাকার বিষয়টি এখন সকলের কাছেই স্পষ্ট।

এই ২৪০০ মেগাওয়াট পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ ব্যয় মাত্র ৩ বছরের ব্যবধানে ৩২ হাজার কোটি টাকা থেকে বেড়ে ১ লক্ষ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে (ডব্লিউএনআইএসআর রিপোর্ট, ২০১৭)। আগামী কয়েক বছরে ধারাবাহিকভাবে বাড়তে থাকা খরচ এবং সুদ সমেত ঋণ পরিশোধের খরচ মিলিয়ে এই বিদ্যুৎকেন্দ্র হতে উৎপাদিত বিদ্যুৎ হতে যাচ্ছে সবচেয়ে দামী বিদ্যুৎ। বিদ্যুৎকেন্দ্রের মেয়াদ ফুরিয়ে গেলে ডিকমিশনিং এর জন্যও আছে বিশাল ব্যয়, সেই সাথে আছে ক্রমাগত শুকিয়ে যেতে থাকা পাশ্ববর্তী পদ্মা নদীর পানি ব্যবস্থাপনাগত ঝুঁকি। অর্থাৎ যে কোন সময়ে চেরনোবিল বা ফুকুশিমার মত ভয়াবহ দুর্ঘটনার ঝুঁকির প্রশ্ন বাদ দিলেও শুধুমাত্র অর্থনৈতিক এবং পরিবেশগত দিক বিবেচনায় নিলেও এই বিদ্যুৎকেন্দ্র বাংলাদেশের জন্য ভবিষ্যতের সবচেয়ে ভারী বোঝা হিসেবে আবির্ভূত হতে যাচ্ছে।

সুন্দরবন বিনাশী অপতৎপরতা এবং আমলা-বিশেষজ্ঞ-ব্যবসায়ী যোগসাজস

সরকারের প্রশ্রয়ে বিভিন্ন সময়ে কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, উন্মুক্ত কয়লা খনি, এলএনজি এবং এলপিজি’র পক্ষ অবলম্বন এবং ব্যক্তি কিংবা কোম্পানী স্বার্থে কাজ করে যাওয়া ব্যক্তিবর্গের দৌরাত্ন আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। সুন্দরবন ধ্বংসকারী রামপাল কয়লা ভিত্তিক প্রকল্প এখনও বাতিল করা হয় নি। আইন অনুযায়ী সুন্দরবনের চারপাশে ১০ কিলোমিটার এলাকায় কোন স্থাপনা না করার বিধান থাকলেও বর্তমানে সেখানে পরিবেশ দূষণকারী শিল্প কারখানার সংখ্যা ১৯০ টি। এদের মধ্যে মারাত্নক দূষণকারী কারখানা রয়েছে ২৪ টি। আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফসহ প্রভাবশালী ব্যক্তিরা জমি কিনে তা ভরাট করছেন এবং সেখানে পরিবেশ বিপর্যয়কারী কর্মকান্ড চালাচ্ছেন। সুন্দরবনের আশেপাশে কী করে শিল্পকারখানাগুলো অনুমোদন পেয়ে যাচ্ছে তা জানতে প্রশ্ন করা হলে সম্প্রতি বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ স্পষ্ট জানিয়ে দেন যে- ‘এখানে তাঁদের কিছু করার নেই। (সূত্র:৯) এর অর্থ হলো বাংলাদেশ রক্ষাকারি সুন্দরবন বিনাশ আর বন-জমি গ্রাসে জড়িত ব্যক্তি, কোম্পানী, আমলাদের ঠেকানোরকোনো ইচ্ছা সরকারের নেই।শুধু তাই নয়, কোন প্রকার সমীক্ষা না করে দেশের পরিবেশ আইন লঙ্ঘন করে উপক’ল রক্ষাকারী বন বিনাশ করে মহেশখালি, বরগুনা ও পটুয়াখালীতেও কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের অনুমোদন দিয়েছে সরকার। বড় আকারের দুর্নীতি ছাড়া এ ধরনের চুক্তি হতে পারে না। বরগুণার সমীক্ষাবিহীন প্রকল্প সম্পর্কেও মন্ত্রী বলেছেন, তিনি এবিষয়ে জানতেন না।

আপনারা ইতোমধ্যেই অবগত আছেন যে সম্প্রতি জ্বালানি বিভাগের সচিব নাজিমউদ্দিন চৌধুরী নিয়ম ভেঙ্গে সুন্দরবন থেকে মাত্র ১১.৫ কিলোমিটার দূরে এনার্জিপ্যাক’এর মালিকানাধীন জি গ্যাস প্লান্টকে এলপিজি স্টোরেজ নির্মাণের অনুমোদন দিয়েছেন। এ প্রকল্প অনুমোদনের আগে কোন পরিবেশগত সমীক্ষ করা হয় নি এবং বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) আপত্তিও আমলে নেয়া হয় নি ।’(সূত্র: ১০) ৩ হাজার মেট্রিক টন ধারণ ক্ষমতা সম্পন্ন এই স্টোরেজের কারণে আমদানি কাজে সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে জাহাজ চলাচল বেড়ে যাবে কয়েকগুণ। (সূত্র: ১১) সাম্প্রতিক সময়ে এ ধরণের চলাচলের ফলে সুন্দরবন এলাকায় তেল, সার এবং কয়লাবাহী জাহাজ দুর্ঘটনায় সুন্দরবনের মারাত্নক ক্ষতি সাধিত হলেও সুন্দরবন সুরক্ষায় সরকারের নূন্যতম চেষ্টাও যে নেই তা জ্বালানি সচিবের অপতৎপরতায় স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। জনগণের টাকায় বেতনভোগী এই আমলা যে কোম্পানীর স্বার্থে কাজ করছেন তা এই সচিবের বেসরকারি কোম্পানী সংশ্লিষ্টতা থেকেও বোঝা যায়। নাজিমউদ্দিন চৌধুরী বাংলাদেশে এক্সন মোবিলের ডিস্ট্রিবিউটর কোম্পানী MJL Bangladesh Limited এর বোর্ড অফ ডিরেক্টরস এর চেয়ারম্যান (সূত্র: ১২)। উক্ত কোম্পানীর ম্যানেজিং ডিরেক্টর হচ্ছেন ব্যবসায়ী আজম জে চৌধুরী। আজম জে চৌধুরী একইসাথে Bangladesh Energy Companies Association এর প্রেসিডেন্ট যেটি প্রতিষ্ঠাই করা হয়েছে বেসরকারি খাতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ব্যবসার সাথে জড়িত ব্যবসায়ীদের স্বার্থ রক্ষার্থে । (সূত্র: ১৩) বাংলাদেশ সরকারের জ্বালানি সচিব জনস্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়ে জ্বালানি ব্যবসার স্বার্থ বেশ ভালভাবেই রক্ষা করেছেন! আরও জানা গেছে যে,বিভিন্ন সরকারের জ্বালানি ও বিদ্যুৎ বিষয়ে উপদেষ্টা/কনসালট্যান্ট হিসেবে দায়িত্ব পালনকারি অধ্যাপক ম তামিম উক্ত MJL Bangladesh Limited এর বোর্ড অফ ডিরেক্টরস এর ৮ জন সদস্যের মধ্যে একজন। উনি একই সাথে, জালিয়াতির মাধ্যমে সুন্দরবনের নিকটে অনুমোদন পাওয়া, এনার্জিপ্যাক’এর মালিকানাধীন জি গ্যাস এর ১০ জন বোর্ড অফ ডিরেক্টরস এর মধ্যে অন্যতম। (সূত্র: ১৪)

আমরা মনে করি দেশবিনাশী রামপাল-রূপপুর প্রকল্প সহ গ্যাস এবং বিদ্যুতের দাম বাড়িয়ে দেয়া প্রকল্প এবং আমদানি নির্ভরশীলতা বাড়িয়ে দেয়ার পক্ষে যারা প্রচারণায় লিপ্ত তাদের ব্যবসায়িক সম্পৃক্ততা ও ব্যক্তি স্বার্থসংশ্লিষ্টতার বিষয়ে সার্বিক নজরদারি এবং সতর্কতা জরুরী। সর্বজনের স্বার্থে গণমাধ্যমগুলোকে এসব বিষয়ে আরও সক্রিয় হবার জন্য অনুরোধ জানাচ্ছি।

যাইহোক, সামগ্রিক পরিপ্রেক্ষিতে আমাদের দাবি:

১. অনিয়ম, দুর্নীতি বন্ধ করতে সরকারকে অবশ্যই দায়মুক্তি আইন থেকে সরে আসতে হবে। এ পর্যন্ত হওয়া সকল অনিয়ম এবং লুটপাটের সঠিক তদন্ত করে দোষীদের শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। সেই সাথে সুলভে এবং দ্রুততম সময়ে বিদ্যুৎ পেতে বর্তমান বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর কর্মদক্ষতা বৃদ্ধি, জনবল নিয়োগ, দক্ষতা, প্রশিক্ষণ এবং গবেষণায় বরাদ্দ বৃদ্ধি করতে হবে। ।

২. এলএনজি আমদানি নির্ভরতা বন্ধ করে স্থল ও সমুদ্রে গ্যাস অনুসন্ধানে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে হবে, জাতীয় সক্ষমতা বাড়াতে হবে। গ্যাস সংযোগে দুর্নীতি বন্ধ করতে হবে। দুর্নীতিবাজদের লোভের বোঝা মেটাতে গ্যাসবিদ্যুতের দাম বাড়ানো চলবে না।

৩. সুন্দরবন বিনাশী সকল প্রকল্প এবং শিল্পকারখানা অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে। বিভিন্ন গোষ্ঠীর অপতৎপরতায় ইতিমধ্যে সুন্দরবনের যে ক্ষতি হয়েছে তা নিরূপণ করতে স্বাধীন বিশেষজদের নিয়ে কমিটি গঠন করতে হবে, জনসম্মুখে প্রকাশিত রিপোর্টের সুপারিশের ভিত্তিতে সুন্দরবন সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

৪. রামপাল- রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্র সহ পিএসএমপি-২০১৬’তে বর্ণিত ব্যয়বহুল, আমদানি ও ঋণনির্ভর, প্রাণপ্রকৃতি বিনাশী বিদ্যুৎকেন্দ্র মুখি পরিকল্পনা বাতিল করে সুলভ, টেকসই এবং পরিবেশবান্ধব বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য জাতীয় কমিটির বিকল্প জ্বালানি প্রস্তাবনা বাস্তবায়ন করার প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।

এসব দাবিতে আগামি ১৪ মে সারাদেশে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালনের জন্য আমরা সবার প্রতি আহবান জানাচ্ছি। মেজুন মাসে জনসংযোগ, প্রচার, বিভিন্ন অঞ্চলে সভা সমাবেশ অনুষ্ঠিত হবে। জুলাই মাসে বিভিন্ন বিভাগীয় সদরে বিভাগীয় সমাবেশ অনুষ্ঠিত হবে। সরকারের ভূমিকা অপরিবর্তিত থাকলে জুলাই মাসের শেষে পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।

ধন্যবাদ।

তথ্যসূত্র:

১) সমকাল, ২৬ আগস্ট, ২০১৪, “বিদ্যুৎ-জ্বালানি খাতে ‘দায়মুক্তি’ আইনের মেয়াদ বাড়ল”

২) এনটিভি অনলাইন, ৬ মে, ২০১৮, “এবার মহেশখালীতে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র”

৩) শেয়ার বিজ, ৯ জানুয়ারি, ২০১৮, “পুঞ্জীভূত লোকসান ৪৯ হাজার কোটি টাকা”

৪) প্রথম আলো, ৫ জুন, ২০১৭, “লোকসানের শীর্ষে বিপিডিবি, ভর্তুকিতে পানি উন্নয়ন বোর্ড”

৫) যুগান্তর, ১৮ মাচ, ২০১৮, “আবাসিকে বাড়ছে না গ্যাসের দাম”

৬) প্রথম আলো, ৯ মাচ, ২০১৮, “গ্যাসের দাম বাড়বে, তেল এখন নয়”

৭) IRENA Report, 2017

৮) ঢাকা ট্রিবিউন, ১৮ এপ্রিল, ২০১৮, ‘Bangladesh plans to buy 2,000MW solar power from India’

৯) প্রথম আলো, ২৯ এপ্রিল, ২০১৮, “রামপালসহ সব কারখানা পুরোদমে চালুর আগেই সুন্দরবনের ক্ষতি শুরু”

১০) প্রথম আলো, ৪ এপ্রিল, ২০১৮, “সচিবের সিদ্ধান্তে নতুন ঝুঁকিতে সুন্দরবন”

১১) http://energypac.com/g-gas-lpg-operations-launch/

১২) http://www.mjlbl.com/board-directors

১৩) https://summitpowerinternational.com/sites/default/files/pdf/SummitPowerLtd_AnnualReport_2009.pdf

১৪) http://www.ggaslpg.com/board-of-directors/