Saturday, May 12th, 2018

দায়মুক্তি আইন বাতিলসহ জ্বালানি খাতের দুর্নীতি অনিয়ম বন্ধের দাবিতে ১৪ই মে দেশব্যাপী বিক্ষোভ

জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে দায়মুক্তি আইন: অভূতপূর্ব দুর্নীতি, অনিয়ম এবং প্রাণ প্রকৃতি বিনাশী প্রকল্প দিয়ে বাংলাদেশকে বিপদগ্রস্ত করবার পরিপ্রেক্ষিতে জাতীয় কমিটির উদ্যোগে আজ সকাল ১১টায় তোপখানা রোডের বাংলাদেশ শিশু কল্যাণ পরিষদ মিলনায়তনে সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন জাতীয় কমিটির সদস্য সচিব অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ। টিপু বিশ্বাস, রুহিন হোসেন প্রিন্স, অধ্যাপক আবদুস সাত্তার, খালেকুজ্জামান লিপন, প্রকৌশলী মওদুদুর রহমান, আকবর খান, বাচ্চু ভূঁইয়া, নাসিরউদ্দীন নাসু, মহিন উদ্দীন চৌধুরী লিটন প্রমুখ নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন ও সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তর দেন।

সংবাদ সম্মেলনে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলা হয়, বিদ্যুৎ খাতে দ্রুত পরিবর্তন আনয়নের নাম করে, বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনসহ জনস্বার্থবিরোধী নানা চুক্তি অথবা অন্য কোনো কার্যক্রম বা গৃহীত কোনো ব্যবস্থা, কিংবা আদেশ-নির্দেশের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে আদালতে কোন ধরনের প্রতিকার পাবার অধিকার হরণ করে সর্বশেষ ২০১৮ সাল পর্যন্ত দায়মুক্তি আইন আছে। এটির মেয়াদ আবারও বৃদ্ধি করার তোড়জোড় শুরু হয়েছে।

স্বচ্ছ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে, জনস্বার্থ নিশ্চিত করে বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের সিদ্ধান্ত নিলে এবং তা বাস্তবায়ন করলে দায়মুক্তি আইনের কোন প্রয়োজন পড়ে না। দুর্নীতি অনিয়মের কারণেই একের পর এক অসম্ভব ব্যয়বহুল ক্ষতিকর প্রকল্প গ্রহণ করা হচ্ছে, গত ৮ বছরে বিদ্যুতের দাম বেড়েছে ৮ বার। রেন্টাল-কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের অতিরিক্ত ব্যয় রাষ্ট্রীয় কোষাগার হতে মেটাতে সরকার চুক্তি মোতাবেক বাধ্য থাকায় গত ৮ বছরে বিপিডিবি’র ঘাড়ে জমেছে ৪৯ হাজার কোটি টাকার লোকসানের বোঝা ।

লিখিত বক্তব্যে আরো বলা হয়, বাংলাদেশের স্থল এবং অগভীর সমুদ্র সীমানায় যে আরও অন্তত ৩২ টিসিএফ গ্যাস পাবার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে তা অনুসন্ধান ও উত্তোলনের প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ না করে এলএনজি আমদানির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর ফলে বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সার কারখানায় গ্যাসের মূল্য ২০০ শতাংশ এবং শিল্প কারখানা, ক্যাপটিভ পাওয়ার এবং সিএনজির জন্য সরবরাহকৃত গ্যাসের দাম ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি করার প্রস্তাব ইতোমধ্যেই চূড়ান্ত করা হয়েছে । এতে করে নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্য, যাতায়াত, বিদ্যুত সহ দৈনন্দিন জীবনযাত্রার খরচ আরেক দফা বাড়বে।

সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রাথমিক জ্বালানির কোন খরচ নেই। প্রযুক্তি উন্নয়নের সাথে সাথে সৌর বিদ্যুতের কমতে থাকা দাম তেল-কয়লা কিংবা পরমাণু বিদ্যুতের মত ভবিষ্যতে বৃদ্ধি পাবার কোন সুযোগ নেই। সোলার সিস্টেমের দাম যখন বেশী ছিল তখনও বাংলাদেশের মানুষ মাত্র ৩ থেকে ৪ ঘন্টা বিদ্যুৎ পেতে ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা খরচ করেছে। কিন্তু গত ৭ বছরে প্রতি ইউনিট সৌর বিদ্যুতের দাম ৭২ শতাংশ কমে গেছে । দীর্ঘস্থায়ী ব্যাটারী বাজারে এসেছে। ভারতে এই বিদ্যুৎ এখন সাড়ে ৩ টাকারও কম খরচে উৎপাদিত হচ্ছে। অথচ বাংলাদেশের সরকার এই খাত উন্নয়নে মনোযোগী নয়।

আরো বলা হয়, যে কোন প্রকল্প বাস্তবায়নের পূর্বে পরিবেশগত সমীক্ষা (ইআইএ) করে সেই রিপোর্ট প্রকাশ করে সকলের সাথে আলাপ-আলোচনা করার সাধারণ নিয়মটিও রূপপুর প্রকল্পের ক্ষেত্রে মানা হয় নি। এই প্রকল্পের ইআইএ রিপোর্ট এখনও প্রকাশ করা হয়নি। বৃহত্তর পাবনা এলাকায় পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নিয়ে আলোচনা অনুষ্ঠান, সংবাদ সম্মেলন, সভা-সমিতি করার ব্যাপারে জারি করা হয়েছে আঘোষিত নিষেধাজ্ঞা।

এই ২৪০০ মেগাওয়াট পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ ব্যয় মাত্র ৩ বছরের ব্যবধানে ৩২ হাজার কোটি টাকা থেকে বেড়ে ১ লক্ষ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। এই বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ হতে যাচ্ছে সবচেয়ে দামী বিদ্যুৎ।

সরকারের প্রশ্রয়ে বিভিন্ন সময়ে কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, উন্মুক্ত কয়লা খনি, এলএনজি এবং এলপিজি’র পক্ষ অবলম্বন এবং ব্যক্তি কিংবা কোম্পানী স্বার্থে কাজ করে যাওয়া ব্যক্তিবর্গের দৌরাত্ব আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। সুন্দরবন ধ্বংসকারী রামপাল কয়লা ভিত্তিক প্রকল্প এখনও বাতিল করা হয়নি। আইন অনুযায়ী সুন্দরবনের চারপাশে ১০ কিলোমিটার এলাকায় কোন স্থাপনা না করার বিধান থাকলেও বর্তমানে সেখানে পরিবেশ দূষণকারী শিল্প কারখানার সংখ্যা ১৯০ টি। এদের মধ্যে মারাত্বক দূষণকারী কারখানা রয়েছে ২৪ টি।

সংবাদ সম্মেলনে অনিয়ম দুর্নীতি বন্ধ করতে দায়মুক্তি আইন বাতিল করে সেই সাথে সুলভে এবং দ্রুততম সময়ে বিদ্যুৎ পেতে বর্তমান বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর কর্মদক্ষতা বৃদ্ধি, জনবল নিয়োগ, দক্ষতা, প্রশিক্ষণ এবং গবেষণায় বরাদ্দ বৃদ্ধি, এলএনজি আমদানি নির্ভরতা বন্ধ করে স্থল ও সমুদ্রে গ্যাস অনুসন্ধানে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ, গ্যাস-বিদ্যুতের দাম না বাড়ানো, সুন্দরবন বিনাশী সকল প্রকল্প এবং শিল্পকারখানা অবিলম্বে বন্ধসহ বিভিন্ন গোষ্ঠীর অপতৎপরতায় ইতিমধ্যে সুন্দরবনের যে ক্ষতি হয়েছে তা নিরূপণ করতে স্বাধীন বিশেষজ্ঞদের নিয়ে কমিটি গঠন ও সুন্দরবন সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ’, রামপাল-রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্র সহ পিএসএমপি-২০১৬’তে বর্ণিত ব্যয়বহুল, আমদানি ও ঋণনির্ভর, প্রাণপ্রকৃতি বিনাশী বিদ্যুৎকেন্দ্র মুখি পরিকল্পনা বাতিল করে সুলভ, টেকসই এবং পরিবেশবান্ধব বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য জাতীয় কমিটির বিকল্প জ্বালানি প্রস্তাবনা বাস্তবায়ন করার প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ এর দাবি জানানো হয়। এসব দাবিতে আগামি ১৪ মে সারাদেশে বিক্ষোভ কর্মসূচি। মে-জুন মাসে জনসংযোগ, প্রচার, বিভিন্ন অঞ্চলে সভা সমাবেশ’, জুলাই মাসে বিভিন্ন বিভাগীয় সদরে বিভাগীয় সমাবেশ এবং জুলাই মাসের শেষে পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণা।