Tuesday, October 18th, 2016

রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র বাতিলের দাবীতে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে জাতীয় কমিটির খোলা চিঠি

ভারতের এনটিপিসির অংশগ্রহণে সুন্দরবনবিনাশী রামপাল কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র বাতিলে উদ্যোগ গ্রহণের দাবি জানিয়ে বাংলাদেশের নাগরিকদের পক্ষ থেকে-

ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে খোলা চিঠি

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী,

আমরা যথাযথ সম্মান ও শুভেচ্ছাসহ বাংলাদেশের সকল স্তরের মানুষের গভীর উদ্বেগ ও আশংকার বার্তা নিয়ে আপনার কাছে এই চিঠি লিখছি। বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের প্রতিরক্ষা প্রাচীর, পৃথিবীর বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন, অতুলনীয় বাস্তুসংস্থান, বিশে^র অসাধারণ সম্পদ সুন্দরবন এখন হুমকির মুখে। এর প্রধান কারণ ভারত বাংলাদেশ যৌথ মালিকানায় নির্মিতব্য ১৩২০ মেগাওয়াটের রামপাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র।

এবিষয়ে গত ২৮ জুলাই বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশ্যে আমরা একটি খোলা চিঠি দিয়েছিলাম। এই প্রকল্পের প্রধান অংশীদার ভারত। ভারত সরকারের প্রধান হিসেবে আপনার কাছে বিষয়টি উপস্থাপনও আমরা জরুরী মনে করছি। এর পেছনে প্রধানত দুটো কারণ। প্রথমত, এই প্রকল্পের মুখ্য ভূমিকা ভারতের রাষ্ট্রীয় বিদ্যুৎ প্রতিষ্ঠান এনটিপিসি, ভারতের রা®ট্রীয় নির্মাণ কোম্পানী ভেল, ভারতের রাষ্ট্রীয় ব্যাংক এক্সিম ব্যাংক এবং খুব সম্ভব ভারতের কয়লা সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান কোল ইন্ডিয়ার। দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশ অংশের সুন্দরবন আক্রান্ত হলে ভারতের দিকের সুন্দরবনও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

দেশি বিদেশি স্বাধীন বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ থেকে আমরা নিশ্চিত যে, এই কেন্দ্র সুন্দরবনের অস্তিত্বের জন্য ভয়াবহ বিপর্যয় সৃষ্টি করবে। এই কেন্দ্র স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেবার পর থেকে বিভিন্ন বনগ্রাসী প্রকল্প নিয়ে সুন্দরবনের ভেতরে ও চারধারে হাজির হয়েছে প্রভাবশালী গোষ্ঠী। এর সম্মিলিত প্রভাবে সুন্দরবনের বিনাশ অনিবার্য হয়ে উঠবে। সুন্দরবনের বিপর্যয় প্রাণ প্রকৃতির যে সর্বনাশ করবে তাতে শেষপর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হবেন সমগ্র মানব সমাজ। সুন্দরবন ও তার ভেতর দিয়ে প্রবাহিত নদীগুলোর সাথে বনজীবী ও মৎসজীবী হিসেবে প্রত্যক্ষভাবে প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ লাখ মানুষের জীবন জীবিকা সম্পর্কিত। এই প্রকল্পের ফলে তাঁদের জীবিকা বিপর্যস্ত হবে। উপকূলীয় অঞ্চলের প্রায় ৪ কোটি মানুষের প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা হিসেবে কাজ করে সুুন্দরবন। তাঁদের জীবনের ওপর মৃত্যুপরোয়ানা লিখে দিচ্ছে এই প্রকল্প। এই সর্বনাশ শুধু বাংলাদেশের সুন্দরবনেই সীমিত থাকবে না। তা ভারতের দিকের সুন্দরবনের ৫০ লাখ মানুষকেও বিপদগ্রস্ত করবে। অতএব ভারত ও বাংলাদেশের কয়েক কোটি মানুষ হবেন এই প্রকল্পের প্রত্যক্ষ শিকার। যেহেতু সুন্দরবন একইসঙ্গে বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পদ, যেহেতু এই বন বিশে^র প্রাণবৈচিত্র ও পরিবেশ ভারসাম্য রক্ষার ক্ষেত্রে অসামান্য বাস্তুসংস্থান সেহেতু বাংলাদেশ ভারতসহ বিভিন্ন দেশের সজাগ মানুষ এবং বিশেষজ্ঞরা সুন্দরবন বিনাশী এই প্রকল্প নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন।

কেননা এই সর্বনাশ শুধু বর্তমান সময়ের নয়, মানুষ ও প্রাণ প্রকৃতির এই ক্ষতি চিরস্থায়ী, আগামী বহু প্রজন্ম এর শিকার হবে। উন্নয়ন আমাদের দরকার, বিদ্যুৎ আমাদের দরকার। কিন্তু উন্নয়ন ও বিদ্যুতের নামে প্রাণঘাতী, মানুষ ও প্রকৃতির জন্য সর্বনাশা কতিপয় গোষ্ঠীর লোভের বাণিজ্য প্রকল্প কোনো সুস্থ মানুষ গ্রহণ করতে পারে না। সেজন্য আমরা অবিলম্বে সুন্দরবন বিনাশী রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র বাতিলে আপনার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা প্রত্যাশা করেই এই চিঠি লিখছি।

বাংলাদেশ সরকারের অর্থমন্ত্রী শিকার করেছেন, এই প্রকল্পের কারণে সুন্দরবনের ক্ষতি হবে কিন্তু এই প্রকল্প থেকে পিছিয়ে আসার সুযোগ নেই (১৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৬)। আমরা আশা করি, এর অর্থ এটা নয় যে, ভারত সরকারের চাপেই বাংলাদেশ সরকার এই সর্বনাশা প্রকল্প করতে বাধ্য হচ্ছে। আমরা আশা করি আপনার ইতিবাচক ভূমিকার মধ্য দিয়ে এরকম আশংকা মিথ্যা প্রমাণিত হবে।

ভারতের এনটিপিসি ও বাংলাদেশের পিডিবি যৌথভাবে সুন্দরবনের ১৪ কিমি, এবং বাফার জোন বিবেচনা করলে ইকলজিক্যালি ক্রিটিক্যাল এরিয়ার (ইসিএ) ৪ কিমি-র মধ্যে এই বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি নির্মাণ করতে যাচ্ছে।এছাড়া সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে অবিরাম কয়লাসহ সাজসরঞ্জাম পরিবহণেরও আয়োজন করা হচ্ছে। অথচকয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র  মারাত্মক পরিবেশ দূষণ ঘটায় বলে সাধারণত বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সংরক্ষিত বনভূমি ও বসতির ১৫ থেকে ২৫ কিমি এর মধ্যে কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের অনুমোদন দেয়া হয়না। ভারতের পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় প্রণীত পরিবেশ সমীক্ষা বা ইআইএ গাইড লাইন ম্যানুয়াল ২০১০ অনুযায়ী, কয়লা ভিত্তিক তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ২৫ কিমি এর মধ্যে কোন বাঘ/হাতি সংরক্ষণ অঞ্চল, জৈব বৈচিত্রের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বনাঞ্চল,  জাতীয় উদ্যান, বন্যপ্রাণীর অভয়ারণ্য কিংবা অন্যকোন সংরক্ষিত বনাঞ্চল থাকা অনুমোদন করা হয় না।আপনি নিশ্চয়ই জানেন, ভারতের এই বিধিনিষেধ ও পরিবেশ সচেতনতার কারণে আপনার সরকারের পরিবেশ মন্ত্রণালয় ও গ্রীণ ট্রাইব্যুনাল গত কয়েকবছরে বেশ কয়েকটি বিদ্যুৎ ও খনি প্রকল্প স্থগিত বা বাতিল করেছে। বাংলাদেশে ভারতীয় কোম্পানি যে ভারতের আইন ও বিধিমালা ভঙ্গ করেই এই বিদ্যুৎ কেন্দ্র করছে সে বিষয়েও আমরা এই চিঠির মাধ্যমে আপনার দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী,

আপনি অনুসন্ধান করলে আমাদের সাথে একমত হবেন যে, ব্যক্তিগত স্বার্থ বা কোম্পানি নিযুক্ত কতিপয় ব্যক্তি ছাড়া দেশ ও বিদেশের সকল বিশেষজ্ঞই একবাক্যে সুন্দরবন রক্ষার জন্য এই প্রকল্প বাতিলের দাবি করছেন। এখানে এরকম কয়েকজন বিশেষজ্ঞের মতামতের ভিত্তিতেই সুন্দরবনের জন্য এই প্রকল্প কীভাবে বিপজ্জনক তার দুএকটি দিক আপনার অবগতির জন্য উপস্থাপন করছি।

এই কেন্দ্রের জন্য বছরে সুন্দরবনের আঙিনায় ৪৭ লক্ষ টন কয়লা পোড়ানো হবে এবং প্রতিদিন সুন্দরবনের মুখে থেকে পুরো শরীরের এক মাথা থেকে আরেক মাথা পর্যন্ত প্রায়১৩ হাজার টন কয়লা পরিবহণ করা হবে। ৩০ বছরের এই প্রকল্পে কয়লা উঠানো নামানো ও পরিবহণে সুন্দরবনের কোনো ক্ষতি হবে না এই দাবি একেবারেই অগ্রহণযোগ্য। তাছাড়া এই প্রকল্প প্রতিঘন্টায় ৯ হাজার১৫০ ঘনমিটার পানি নদী থেকে ব্যবহার করবে এবং ৫ হাজার১৫০ ঘনমিটার পানি আবার নদীতে ফেলবে। কোম্পানিএকদিকে দাবি করছে, এই পানি বিশুদ্ধ করে ঠান্ডা করা হবে তারপর নদীতে ফেলা হবে, অন্যদিকে কোম্পানির লিখিত বক্তব্যেআছে এই পানি ফেলার কারণে নদীর পানির তাপমাত্রা ২ ডিগ্রী সেন্টিগ্রেড বৃদ্ধি পাবে৬, যা নদীর প্রাণজগত বিধ্বস্ত করবে। শুধু নদী থেকে পানি উত্তোলন ও ফেরত দেবার ঘটনাই পানির জীবন নষ্ট করতে যথেষ্ট।তাছাড়া প্রতিবছর রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে বিষাক্ত পারদ সুন্দরবনকে বিষাক্ত করবে। ইউনিয়ন অব কনসার্নড সাইনটিস্টদের হিসেব অনুসারে, ১৩২০ মেগাওয়াট কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বছরে ৩৭৪ পাউন্ড বা ১৬৯.৬৪ কেজি পারদ পানি ও বাতাসে মিশ্রিত হতে পারে। শতকরা ৬০ শতাংশ পারদ নিয়ন্ত্রণ করা হলেও প্রায় ৬৮ কেজি পারদ বাতাসে ও পানিতে মিশবে।এটি পানির মধ্য দিয়ে খাদ্য শৃঙ্খলে প্রবেশ করে পুরো বাস্তুসংস্থানকে নষ্ট করবে। বিশেষজ্ঞরা বলেন, খুবই নিয়ন্ত্রণমূলক প্রযুক্তির উপস্থিতি থাকা সত্ত্বেও কয়লার দূষণকারী উপাদান পানি ও বাতাসে চলে যায়।

প্রাণবিজ্ঞানীরা বলেন, রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে ফেলা বিষাক্ত তপ্ত পানিতে পশুর নদীর উষ্ণতা বৃদ্ধির কারণে এই বাস্তুসংস্থানের জুয়োপ্লাংকটনএবং ফাইটোপ্লাংকটন বিধ্বস্ত করে দেবে। এটা একই সাথে মাছ ও পশুর খাদ্যচক্র ধ্বংস করবে। ক্রমান্বয়ে তা সমগ্র বাদাবনের বাস্তুসংস্থান বিপর্যস্ত হবে। বাংলাদেশে বিশেষ বন্যপ্রাণীর উল্লেখযোগ্য অস্তিত্ব থাকার জন্য সুন্দরবনই শেষ ভরসা কেননা শাল এবং পাহাড়ের মিশ্রবন ইতিমধ্যেই বিরান হয়ে গেছে।

প্রাণবৈচিত্র বিশেষজ্ঞরা বলেন, এখানে গুরুত্বের সাথে বিবেচনায় নিতে হবে সুন্দরবনের বাস্তুসংস্থানের নাজুকতা এবং প্রাকৃতিক জৈবসত্তার বিষয়টি। কয়লা বিদ্যুৎ প্লান্টের ভারী রাসায়নিক উপাদান এই জৈবসত্তা এবং বনের পশুর পুনরুৎপাদনমূলক স্বাস্থ্যকে অবশ্যই ক্ষতিগ্রস্ত করবে। পাখি বিশেষজ্ঞরা বলেন, বিশ্বব্যাপী যে ১৩ প্রজাতির পাখির সংরক্ষণ নিয়ে বিশেষ উদ্বেগ আছে তার তিনটির জন্যই সুন্দরবন খুব সহজেই বৃহত্তম ও নিরাপদতম আশ্রয় হবার যোগ্যতা রাখে। কিন্তু এর মধ্য দিয়ে সেই আশ্রয়ের বিনাশ ঘটবে।

প্রকৌশলীরা বলেন, আল্ট্রাসুপার ক্রিটিকাল টেকনোলজি কয়লা পোড়ানোর ক্ষেত্রে দক্ষতা বৃদ্ধি করে, তাতে সাবক্রিটিকাল প্রযুক্তির তুলনায় দূষণ কমে শতকরা ৮ থেকে ১০ ভাগ। অন্যান্য দূষণ প্রতিরোধ প্রযুক্তি যদি ব্যবহার করা হয় তারপরও দূষণ পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করবার কোনো দৃষ্টান্ত পৃথিবীর কোথাও নেই। যেমন, যদি এফজিডি ব্যবহার করা হয় তাহলে তা হয়তো বাতাসে সালফার ডাই অক্সাইড দূষণ কমাতে পারবে কিন্তু ব্যবহৃত পানির মাধ্যমে বিস্তীর্ণ পানি আর্সেনিক, মারকারি, সেলেনিয়াম, বোরোনসহ তরলীকৃত এবং কঠিন দূষিত উপাদানে বিষাক্ত হবে। নিম্ন মাত্রার নাইট্রোজেন অক্সাইড চুল্লী ব্যবহার করলে এর দূষণ বড়জোর শতকরা ৪০ থেকে ৬০ ভাগ কমতে পারে। কিন্তু বাকি পরিমাণই সুন্দরবনের ভয়াবহ পরিণতি সৃষ্টি করবে। কোম্পানির পক্ষ থেকে এফজিডি ও ইএসপি-র ব্যবহারের দাবি করা হয়েছে, কিন্তু এগুলোর সমন্বিত ও দক্ষ ব্যবহারও পারদের দূষণ কমাতে পারে বড়জোর গড়ে শতকরা ৪৮ ভাগ। তাতে সুন্দরবনে পারদ দূষণের ভয়ংকর ঝুঁকি সৃষ্টি হয়। পারদ নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রয়োজনীয় প্রযুক্তির কথা দরপত্রে নেই১০

পরিবেশ বিজ্ঞানীরা বলেন, এছাড়া আরও কিছু ঝুঁকি আছে যা প্রযুক্তি দিয়ে ঠেকানো যায় না। যেমন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, কয়লা পরিবহণ থেকে শব্দ ও পানি দূষণ, ফ্লাই এ্যাশ থেকে দূষণ, বা ছাইএর পুকুর থেকে উপচে পড়ে পানি দূষণ। এছাড়া আছে দুর্ঘটনার আশংকা। গত কয়বছরে সুন্দরবনের ভেতরের নদীতেই অনেকগুলো নৌদুর্ঘটনা হয়েছে, তার সুদূরপ্রসারী ক্ষতিকর প্রভাব পড়েছে সুন্দরবনে। এখনও যে নৌপরিহণ হয় তাতে শব্দসহ নানা বিষাক্ত দ্রব্যের দূষণে বন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সুন্দরবনের শ্যালা নদী গঙ্গানদীর ডলফিন এবং ইরাবতী ডলফিনের জন্য এখনই সংকটাপন্ন বলে ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ সরকার। বাংলাদেশের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এর আগে শ্যালা নদীতে পরিবহণ পথ বন্ধ করবার কথা বলেছিলেন কিন্তু সেটা কার্যকর হয়নি। এরকম পরিপ্রেক্ষিতে রামপাল প্ল্যান্ট সুন্দরবনের জন্য ভয়ংকর হুমকি ছাড়া আর কিছু নয়। উপকূলীয় অঞ্চলের এই স্থানটি নানাভাবে ঝুঁকিপূর্ণ।

বাস্তবে প্রযুক্তি যতোই উন্নত হোক, প্রতিবেশগত সংবেদনশীল বনের জন্য কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র মারাত্মক ক্ষতিকর হবেই। এই হুমকি আরও বৃদ্ধি পায় প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বল ভ’মিকার কারণে।এক্ষেত্রে আমরা কোম্পানি বা তদারককারী প্রতিষ্ঠানের ভ’মিকার রেকর্ড থেকে আরও আশংকিত, ভারতের সেন্টার ফর সায়েন্স এন্ড এনভায়রেনমেন্ট এনটিপিসি সম্পর্কে লাল সংকেত দিয়েছে। আমরা জানি, রাজধানী ঢাকা মহানগরীর চারপাশের নদীতে প্রতিদিন ৯০ হাজার ঘনমিটার দূষিত পানি পড়ছে১১

যে সুন্দরবনের কোনো বিকল্প নেই তা নিয়ে আমরাকোনো পরীক্ষা নিরীক্ষা করতে পারি না।আমরা বরং দাবি করবো এই অতুলনীয় সম্পদকে রক্ষার জন্য বনকে নিজের মতো বাঁচতে দেয়া হোক। রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র বাতিল সহ বৃহত্তর সুন্দরবন এলাকায় দূষণ ও ঝুঁকি সৃষ্টি কারী সকল তৎপরতা বন্ধ করা, নদীপথে ক্ষতিকর দ্রব্যাদি পরিবহণ বন্ধ করা, বাতাস দূষণ বন্ধ করতে নিরাপদ এলাকা পর্যন্ত সবধরনের বাণিজ্যিক তৎপরতা বন্ধ করার দাবি তারই অংশ। রামপাল বিদ্যুৎ প্রকল্প নিজে শুধু ভয়ংকর ঝুঁকি নিয়ে আসছে না এটি আরও বনগ্রাসী প্রকল্পকে আকর্ষণ করছে। তাই এই বিদ্যুৎ প্রকল্প বাতিলের মধ্য দিয়ে সুন্দরবন রক্ষায় ভারত সরকার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

উপকূলীয় অঞ্চল সাধারণত ম্যানগ্রোভ জলাভুমির প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপর টিকে থাকে। এগুলো যদি বিনষ্ট হয় তাহলে তা বড় বিপদ ডেকে আনতে পারে। দৃষ্টান্তস্বরূপ বলা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের  নিউ অরলিন্সের উপকূলীয় অঞ্চল নানারকম বাণিজ্যিক তৎপরতায় ক্ষতিগ্রস্ত হবার কারণে মেক্সিকো উপসাগরমুখি প্রবাহিত মিসিসিপি নদীর গতিশীলতা বিপর্যস্ত হয়। উপকূলীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বিপর্যস্ত হবার কারণে যখন মেক্সিকো উপসাগরে হ্যারিকেন কাটরিনা আঘাত হানে তখন তা ভয়ংকর রূপ নিয়ে নিউ অরলিন্স ও অন্য উপকূলীয এলাকা বিধ্বস্ত করে। বাংলাদেশেও সিডর আইলার সময় আমরা দেখেছি সুন্দরবন কীভাবে অপরাজেয় প্রতিরক্ষা প্রাচীরের মতো মানুষ ও সম্পদ বাঁচিয়েছে। সুন্দরবন না থাকলে যে অরক্ষিত অবস্থা হবে তাতে ভয়াবহ ক্ষতির শিকার হবেন বাংলাদেশ ছাড়িয়ে বিস্তীর্ণ উপকূলীয় এলাকার মানুষ।

এসব বিবেচনাতেই বাংলাদেশের মানুষ ছাড়াও ইউনেস্কো, রামসার কর্তৃপক্ষ, ভারতের আইকে গুজরাল নেতৃত্বাধীন দক্ষিণ এশীয় মানবাধিকার সংগঠনসহ বিশ্বের দেড় শতাধিক সংগঠন এই প্রকল্প বাতিলের দাবি জানিয়েছে। নরওয়ে এই প্রকল্পে অর্থসংস্থান বাতিল করেছে। প্রকৃতপক্ষেসুন্দরবন নিয়ে কোনো দরকষাকষি চলে না। সুন্দরবন নিয়ে আমরা সামান্যতম ঝুঁকিও নিতে পারি না কেননা সুন্দরবন কেবলমাত্র একটাই আছে, আর বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য বিকল্প স্থান, প্রযুক্তি এবং ব্যবস্থা খুবই সুলভ এবং তা আমাদের আয়ত্তের মধ্যে। যদি জনমতের প্রতি সম্মান জানিয়ে ভারতের সাথে একটি কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্প ভারত ও শ্রীলঙ্কা সরকার বাতিল করতে পারে১২  তাহলে আরও ভয়াবহ বিপর্যয় ঠেকাতে বাংলাদেশে কেন তা সম্ভব হবে না?

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী,

মুক্তিযুদ্ধে ভারতের ভূমিকা আমরা কখনো বিস্মৃত হইনি। ১৯৭১ সালে ভারতের সরকার ও জনগণের ভূমিকায় বাংলাদেশের মানুষ একটি বড় আশ্রয় পেয়েছিলেন, তার কারণে বাংলাদেশের মানুষের মনে সবসময়ই একটা কৃতজ্ঞতাবোধ আছে। কিন্তু আবার ভারতের শাসকদের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের জনগণের ক্ষোভও আছে বহুবিধ কারণে। ফারাক্কা এর একটি যা সুন্দরবনের জন্য ক্রমেই আরও ক্ষতিকর হয়ে উঠছে, তারপর আরও বাঁধ, তারপর নদী সংযোগ পরিকল্পনা, অবিরাম সীমান্ত হত্যা, কাঁটাতারের সীমান্ত, বাণিজ্যে প্রতিবন্ধকতা, ঋণ দিয়ে বেশি দামে জিনিষপত্র কিনতে বাধ্য করা, ট্রানজিটের নামে পুরো যোগাযোগ ব্যবস্থার ওপর চেপে বসা ইত্যাদি। সর্বশেষ সুন্দরবনবিনাশী রামপাল বিদ্যুৎ প্রকল্প। আগেরগুলো সম্পর্কে মানুষের মধ্যে ক্ষোভ আছে, তারপরও মানুষ আশা নিয়ে থাকে হয়তো এসবের সমাধান একদিন পাওয়া যাবে।

কিন্তু রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের কারণে যখন সুন্দরবনের বিনাশ ঘটবে সেই ভুল সংশোধনের সুযোগ থাকবে না, সুন্দরবনের এই ক্ষতি আর কোনোকিছু দিয়েই পূরণ করা যাবেনা। ফলে তখন মানুষের তীব্র ক্ষোভ চিরস্থায়ী হবে। বন্ধুত্ব নাম দিয়ে তৈরি কোম্পানি হবে বৈরীতা চিরস্থায়ীকরণের মাধ্যম।

আমরা চাই না এরকম একটি পরিস্থিতি তৈরি হোক। সেজন্য আমরা চাই দুইদেশের দীর্ঘমেয়াদী বন্ধুত্বের স্বার্থেই বাংলাদেশ ও ভারতের সরকার দ্রুত এই প্রকল্প থেকে সরে আসবেন। আমরা এখনও আশা করি, সমমর্যাদার ভিত্তিতে দুইদেশের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান নিশ্চিত হবে, বন্ধুত্ব হবে প্রকৃতই পরস্পরের বিকাশমুখি।

অতএব দুইদেশের মানুষের স্বার্থ এবং বিশ্বের এক অসাধারণ প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষা করতে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সাথে যৌথভাবে আপনি এই প্রকল্প বাতিলে দ্রুত উদ্যোগ নেবেন বলে আমরা আশা করি।

ধন্যবাদসহ,

তেল-গ্যাস খনিজসম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির পক্ষে-

প্রকৌশলী শেখ মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ

আহ্বায়ক

অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ

সদস্য সচিব

১৮ অক্টোবর ২০১৬, ঢাকা।

তথ্যসূত্র:

১) ক্ষতি হলেও সরবে না রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র: অর্থমন্ত্রী

ইত্তেফাক, ১৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৬

http://www.ittefaq.com.bd/national/2016/02/15/55597.html

Rampal power plant to be commissioned despite risk to ecology

http://bdnews24.com/bangladesh/2016/02/15/rampal-power-plant-to-be-commissioned-despite-risk-to-ecology

2) “Locations of thermal power stations are avoided within 25 km of the outer periphery of the following:

– metropolitan cities;

– National park and wildlife sanctuaries;

– Ecologically sensitive areas like tropical forest, biosphere reserve, important lake and coastal areas rich in coral formation;”

http://envfor.nic.in/sites/default/files/TGM_Thermal%20Power%20Plants_010910_NK.pdf

3)The need to preserve the Khajuraho temple, famous for its erotic sculptures, as well as nearby tiger and crocodile sanctuaries has prompted a government panel to hold off on clearing a Rs.18,000 crore thermal power plant in Madhya Pradesh.

http://www.livemint.com/Politics/k9O019qiWVwh1r6iyESE0K/Panel-defers-green-clearance-for-NTPCs-Rs18000-crore-plant.html

The National Green Tribunal (NGT) .. .. quashed the environmental clearance for the 3,600-MW thermal power plant proposed by IL&FS Tamil Nadu Power Company Limited in Cuddalore, on the grounds that no proper cumulative impact assessment was done.

http://www.thehindu.com/news/national/tamil-nadu/ngt-quashes-eco-nod-for-cuddalore-power-plant/article6587910.ece

Noting that a thermal power plant near human habitat and on agricultural land was not viable, a Central green panel has refused to give approval to the National Thermal Power Corporation (NTPC) to set up a 1320 MW coal-based project in Madhya Pradesh.

http://www.thehindu.com/news/national/ntpcs-coalbased-project-in-mp-turned-down/article819873.ece

4)রামপাল ইআইএ, পৃষ্ঠা-৩৭৮

http://bifpcl.com/new/wp-content/uploads/2014/06/EIA-Report-Volume-I.pdf

5) রামপাল ইআইএ, পৃষ্ঠা-১১৭

6)“Temperature of discharge water shall never be more than two degree Centigrade (2OC) above river water temperature”- Question To Answer From Rampal Authority

http://energybangla.com/question-to-answer-from-rampal-authority/

7)Cleansing the Air at the Expense of Waterways

http://www.nytimes.com/2009/10/13/us/13water.html?_r=0

8) AN OVERVIEW OF TECHNOLOGIES FOR REDUCTION OF OXIDES OF NITROGEN FROM COMBUSTION FURNACES, page-4

http://www.mpr.com/uploads/news/nox-reduction-coal-fired.pdf

9) https://netl.doe.gov/File%20Library/Research/Coal/ewr/mercury_-FGD-white-paper-Final.pdf

10)State-of-the-art technology for mercury control is sorbent injection in the boiler or in the flue gases followed by capture of the resultant particulates in a baghouse. These technologies are simply missing in the tender document.

http://www.thedailystar.net/frontpage/10-questions-authorities-answers-counter-response-1281937

11)বণিক বার্তা, ২ এপ্রিল, ২০১৬

https://goo.gl/GEzbpc

12)Sri Lanka scraps NTPC’s plan to build coal plant

http://www.thehindu.com/business/sri-lanka-scraps-ntpcs-plan-to-build-coal-plant/article9104518.ece