Saturday, February 15th, 2014

সুন্দরবনধ্বংসী রামপাল বিদ্যুৎ প্রকল্প বাতিলসহ জাতীয় কমিটির ৭ দফা বাস্তবায়নের দাবিতে সাংবাদিক সম্মেলনের মূল বক্তব্য

আপনারা জানেন, গত ২২ জানুয়ারি ২০১৪, নব গঠিত সরকারের প্রকল্প মনিটরিং কমিটির প্রথম সভায় রামপাল ও রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্র সহ মোট ছয়টি প্রকল্পকে অগ্রাধিকার প্রকল্প হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে। পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদ অনুসারে, ইতিমধ্যেই রামপাল বিদ্যুৎ প্রকল্পের মাটি ভরাটের কাজ সম্পন্ন হয়েছে। কয়লাভিত্তিক তাপভিত্তিক এই বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে পরামর্শকের কাজ পেতে ইউরোপ ও আমেরিকার একাধিক প্রতিষ্ঠান এরই মধ্যে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রস্তাবনা যাচাই-বাছাই শেষে শিগগিরই পরামর্শক নিয়োগ দেয়া হবে বলে জানানো হয়েছে। সুন্দরবন ধ্বংসের রামপাল প্রকল্প অবিলম্বে বাতিলের জনদাবী উপেক্ষা করে উল্টো একে ‘অগ্রাধিকার’ প্রকল্প হিসেবে নির্ধারণের মাধ্যমে সরকার দেখিয়ে দিচ্ছে দেশ ও জনস্বার্থের চেয়ে ভারতীয় কোম্পানিসহ দেশি-বিদেশি ভূমি দখলদারদের মুনাফার স্বার্থই  সরকারের কাছে অগ্রাধিকার পাচ্ছে।

আপনারা সবাই অবগত আছেন যে, সুন্দরবনধ্বংসী রামপাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প বাতিল ও বিদ্যুৎ সংকটের সমাধানে জাতীয় কমিটির ৭ দফা বাস্তবায়নের দাবিতে আমরা গত ২৪-২৮ সেপ্টেম্বর ২০১৩ ঢাকা থেকে সুন্দরবন ৪০০ কি.মি লংমার্চ সফলভাবে সম্পন্ন করেছি। লংমার্চ ছাড়াও বহুবার আপনাদের মাধ্যমে এবং বিভিন্ন প্রকাশনার মধ্য দিয়ে, এমনকি সরকারের কাছে লিখিতভাবে ও আনুষ্ঠানিক বৈঠকে, আমরা কেনো এই কেন্দ্র বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থবিরোধী, সুন্দরবন ও মানববিধ্বংসী তা বৈজ্ঞানিক গবেষণালব্ধ তথ্য যুক্তিসহ তুলে ধরেছি। আমরা বলেছি, ভারত-বাংলাদেশ যৌথ প্রকল্পটি অস্বচ্ছ ও অসম। ভারত পক্ষের অত্যুচ্চ মুনাফার সৃষ্টিকারী ও বাংলাদেশের প্রাকৃতিক ও আর্থিক সর্বনাশকারী। আমরা বিস্তারিত তথ্য ও যুক্তি দিয়ে দেখিয়েছি যে, প্রাকৃতিক রক্ষাবর্ম হিসেবে বাংলাদেশের মানুষ ও প্রকৃতিকে যে সুন্দরবন রক্ষা করে, অসাধারণ জীববৈচিত্রের আধার হিসেবে যা প্রকৃতির ভারসাম্য বজায় রাখে সেই সুন্দরবনকে ধ্বংস করবে এই প্রকল্প। ভারতীয় কোম্পানি (এনটিপিসি) নিজদেশের আইন ভঙ্গ করে বাংলাদেশের সর্বনাশ করতে এই প্রকল্পে যুক্ত হয়েছে। তারা শতকরা ১৫ ভাগ ব্যয় বহন করবে কিন্তু কর্তৃত্ব করবে প্রায় শতভাগ। তাদের মুনাফার যোগান দিতে গিয়ে তিনগুণ বা ততোধিক দামে আমাদের বিদ্যুৎ কিনতে হবে।

আমরা বারবার বলেছি, বিদ্যুৎ উৎপাদনের অনেক বিকল্প আছে, সুন্দরবনের কোন বিকল্প নেই। পৃথিবীর বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন, প্রাণ-বৈচিত্রের অসাধারন আধার এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের মানুষের জন্য সবচাইতে শক্তিশালী প্রাকৃতিক রক্ষা বর্ম সুন্দরবন আছে বলে প্রতিটি প্রাকৃতিক দুর্যোগে বাংলাদেশের লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবন বাঁচে। সুন্দরবন মায়ের মতো নিজে সবাইকে আগলে রাখে। সেই সুন্দরবন আমরা ধ্বংস হতে দিতে পারি না। একদিকে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র করে এই অনবায়নযোগ্য বিশাল আশ্রয় সুন্দরবন হত্যার আয়োজন চলছে, অন্যদিকে এই বিদ্যুৎকেন্দ্র সামনে রেখে দেশের ভূমিদস্যুদের নানারকম প্রকল্প তৈরি করা হচ্ছে। আশার কথা এই যে, লংমার্চ সহ ধারাবাহিক আন্দোলন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে রামপাল বিদ্যুৎ প্রকল্প বাতিল এক জাতীয় দাবিতে পরিণত হয়েছে।

বিশেষজ্ঞমত ও এই জাতীয় জাগরণ উপেক্ষা করে এর আগে গত ৫ অক্টোবর ২৫০ কি.মি দূর থেকে রিমোট কন্ট্রোলের মাধ্যমে বাংলাদেশ ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী যৌথভাবে রামপালে সেই ১৩২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের ভিত্তি ফলক উন্মোচন করেছেন। এই ধারাবাহিকতাতেই নবগঠিত সরকার রামপাল প্রকল্পকে অগ্রাধিকার প্রকল্প হিসেবে নির্ধারণ করল।

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট নিরসনের নামে, দেশী-বিদেশী লুটেরা গোষ্ঠীর স্বার্থরক্ষা করতে গিয়ে, সরকার বারবার দেশের জন্য সর্বনাশা পথ গ্রহণ করছে। সুন্দরবন-কৃষিজমি-শহর ধবংসী রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র, ফুলবাড়ি-বড়পুকুরিয়ার উন্মুক্ত খনির চক্রান্ত অব্যাহত রাখা, বঙ্গোপসাগরের গ্যাস ব্লক একতরফা সুবিধা দিয়ে বিদেশি কোম্পানির কাছে ইজারা, কুইক রেন্টালের নামে ১৪ থেকে ১৭ টাকা কিংবা তারও বেশি দরে বিদ্যুৎ ক্রয়, কোন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তৈরি না করে, প্রয়োজনীয় সমীক্ষা না করে বিদেশি কোম্পানি নির্ভর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের উদ্যোগ ইত্যাদি সবকিছুই জনস্বার্থকে উপেক্ষা করে মুনাফা ও লুটপাটের আয়োজনের অংশ।

সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উন্মুক্ত খননের বদলে কয়লা উত্তোলনের জন্য নতুন প্রযুক্তির জন্য অপক্ষো করার কথা বলেছেন। তিনি এর আগেও বিভিন্ন সময়ে এই ধরনের কথা বলেছেন। এই উপলব্ধির জন্য আমরা প্রধানমন্ত্রীকে সাধুবাদ জানাই। কিন্তু পাশাপাশি আমরা উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ্য করছি যে, ২০০৬ সালের ৫ সেপ্টেম্বর ফুলবাড়ির জনগণের কাছে করা অঙ্গীকার অনুসারে এশিয়া এনার্জিকে বাংলাদেশ থেকে উচ্ছেদ, উন্মুক্ত কয়লা খনি ও রপ্তানি নিষিদ্ধ সহ ফুলবাড়ী চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়নের ব্যবস্থা গ্রহণ করেন নি। তার ফলে সরকারের মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, সাংসদদেরকে বিভিন্ন সময়ে উন্মুক্ত খননের পক্ষে বিভিন্ন বক্তব্য ও পদক্ষেপ নিতে দেখা গেছে। বিভিন্ন লবিস্টদের চক্রান্তমূলক তৎপরতাও অব্যাহত আছে। বাংলাদেশের ফুলবাড়ী কয়লা খনি নিয়ে লন্ডনের শেয়ার বাজারে এশিয়া এনার্জির (জিসিএম) ব্যবসা বন্ধেও সরকারের পক্ষ থেকে কোন পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। একটি লক্ষণীয় বিষয় হলো, ফুলবাড়ী বা বড়পুকুরিয়ার কয়লা খনি ছাড়াও বাংলাদেশের খালাশপীর, দীঘিপাড়া, জামালগঞ্জে কয়লার বিশাল মজুদ রয়েছে। কিন্তু যেহেতু ঐসব এলাকার কয়লা মাটির এমন গভীরে অবস্থিত যে উন্মুক্ত খননের কোন প্রশ্নই আসে না, তাই ঐ সকল কয়লা খনির কয়লার সর্বোত্তম ব্যবহার কী হতে পারে তা নিয়ে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে কোন আলোচনাও দেখা যায় না। আমরা বহুদিন থেকেই বলে আসছি, বাংলাদেশের কয়লা সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহারের সিদ্ধান্ত কোন ব্যক্তি বা বিদেশী কোম্পানির উপর নির্ভর করে নয়, বাংলাদেশের স্বাধীন জাতীয় প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে জাতীয় স্বার্থ বিবেচনায় রেখে নিতে হবে। এক্ষেত্রে নতুন প্রযুক্তির জন্য স্রেফ অপেক্ষা না করে কয়লা উত্তোলণের নতুন নতুন প্রযুক্তি নিয়ে গবেষণা ও সক্ষমতা বিকাশের জন্য জাতীয় প্রতিষ্ঠান গঠন করা জরুরী।

আমরা ক্ষোভ ও উদ্বেগের সাথে লক্ষ্য করছি যে, মার্কিন বহুজাতিক কোম্পানি কনোকো-ফিলিপস, ভারতীয় ওএনজিসি, নরওয়ের স্টেট অয়েল এবং সিঙ্গাপুর ভিত্তিক কৃষ এনার্জির সাথে সংশোধিত মডেল পিএসসি ২০১২ অনুসারে সরকার গভীর ও অগভীর সমুদ্রের বিভিন্ন গ্যাস ব্লকের যে ইজারা চুক্তি করতে যাচ্ছে তাতে জাতীয় স্বার্থ রক্ষিত হবে না। সংশোধিত পিএসসি ২০১২-তে বিদেশি কোম্পানির মুনাফা অতিমাত্রায় বৃদ্ধির স্বার্থে গ্যাসের ক্রয়মূল্য আগের চুক্তির তুলনায় শতকরা ৬০-৭০ ভাগ বৃদ্ধি করা হয়েছে। দ্বিতীয়ত, প্রতিবছর গ্যাসের দাম শতকরা ৫ ভাগ হারে বৃদ্ধির ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। তৃতীয়ত, ব্যয় পরিশোধ পর্বে বিদেশি কোম্পানির অংশীদারিত্ব শতকরা ৫৫ ভাগ থেকে বৃদ্ধি করে শতকরা ৭০ ভাগ করা হয়েছে। চতুর্থত, যথেচ্ছ মূল্যে তৃতীয় পক্ষের কাছে গ্যাস বিক্রয়ের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। এই রকম মডেলে চুক্তি সম্পাদন করলে বঙ্গোপসাগরের গ্যাস সম্পদ যে শুধু বিদেশি কোম্পানির দখলে চলে যাবে তাই নয়, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্পায়নের জন্য গ্যাস সম্পদকে কাজে লাগানোও সম্ভব হবে না। আমদানি করা গ্যাসের চাইতেও বেশি খরচ হবে নিজ দেশের গ্যাস ক্রয়ে। উপরন্তু এই ধরনের চুক্তির কারণে বাংলাদেশের আর্থিক বোঝাও সীমাহীন মাত্রায় বাড়বে।

পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদ অনুসারে, সরকার রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর মেয়াদ ২০২০ সাল পর্যন্ত বর্ধিত করার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে। স্বল্পমেয়াদে বিদ্যুৎ সংকট সমাধানের জন্য রাষ্ট্রীয় বিদ্যুৎ প্লান্ট মেরামত না করে ৮ গুণ বেশি দামে বিদ্যুৎ পাবার জন্য রেন্টাল ও কুইক রেন্টালের ফাঁদে দেশকে ফেলে ইতিমধ্যেই দেশের অর্থনীতির উপর ভয়াবহ বোঝা তৈরী করেছে সরকার। এর খেসারত হিসেবে গত মেয়াদে ছয় বার বিদ্যুৎ এর দাম বাড়ানো হয়েছে, তারপরও হাজার হাজার কোটি টাকার ভর্তুকীর বোঝা কমেনি। কুইক রেন্টালের মেয়াদ এখন ২০২০ সাল পর্যন্ত বর্ধিত করার অর্থ হলো এই বোঝা আরো বাড়ানো এবং আবারো বিদ্যুৎ এর মূল্য বৃদ্ধি।

অতএব জ্বালানী খাতে সরকারি চলতি বিভিন্ন পদক্ষেপ ও পরিকল্পনার অবশ্যম্ভাবী ফলাফল হলো- বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে জনগণের কর্তৃত্ব হ্রাস ও বহুজাতিক কোম্পানির কর্তৃত্ব বৃদ্ধি, নিজেদের গ্যাস বিদেশী কোম্পানির কাছ থেকে বেশি দামে ক্রয়, বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ ও ভর্তুকীর চাপ বৃদ্ধি যার ফলাফল হলো একদিকে সংকট ও অনিশ্চয়তা বহাল থাকা অন্যদিকে বারবার বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধি। প্রকাশিত সংবাদ অনুসারে, আগামী মাসেই ১০-১২ শতাংশ হারে বিদ্যুৎ এর মূল্য বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নেয়া হচ্ছে। দেশি-বিদেশি বিদ্যুৎ ব্যবসায়ীদের স্বার্থে দেশের মানুষ কেন এই বোঝা বহন করবে? কেন সমগ্র অর্থনীতি এই বোঝা বহন করবে?
আমরা বিদ্যুৎ সংকট সমাধানে যথাযথ পথ গ্রহণে সবসময়ই দাবি করে আসছি, জাতীয় কমিটির ৭ দফা দাবিতে তার সমাধানের পথও দেখিয়েছি। জাতীয় কমিটির ৭ দফা দাবী অনুযায়ী রেন্টাল পাওয়ারের চুক্তি বাতিল করে রাষ্ট্রীয় বিদ্যুৎ প্ল্যান্ট চালু, মেরামত ও নবায়ন করা, খনিজসম্পদ রফতানি নিষিদ্ধকরণ আইন প্রণয়ন, পিএসসি প্রক্রিয়া বাতিল করে স্থলভাগে ও সমুদ্রে নতুন নতুন গ্যাস ক্ষেত্র অনুসন্ধানে জাতীয় সংস্থাকে প্রয়োজনীয় সুযোগ, ক্ষমতা ও বরাদ্দ প্রদান, বিদ্যুৎকে গণপণ্য হিসেবে বিবেচনা করে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে দেশীয় মালিকানায় বিদ্যুৎ প্ল্যান্ট স্থাপন, শতভাগ গ্যাস ও কয়লা বাংলাদেশের শিল্পায়ন ও বিদ্যুৎ উৎপাদনের কাজে ব্যবহার ইত্যাদি কাজে অগ্রাধিকার প্রদান করার মধ্যেই বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটের প্রকৃত সমাধান নিহিত।

আমরা তাই সুন্দরবনধ্বংসী রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রসহ দুর্নীতি ও অস্বচ্ছতাযুক্ত জাতীয় স্বার্থবিরোধী চুক্তিসমূহ বাতিল করে জাতীয় কমিটির ৭ দফা বাস্তবায়নের দাবি নিয়ে আবারো আন্দোলনের কর্মসূচি গ্রহণ করছি। আগামী ২৬ ফেব্রুয়ারি বুধবার ঢাকাসহ বিভাগীয় শহরগুলোতে প্রতিবাদ ও দাবি সমাবেশ হবে। আগামী মার্চ মাসে বিভিন্ন পর্বে দেশব্যাপী সাংগঠনিক সফর ও জনসংযোগ। এই সফরের পর মার্চ মাসের শেষে নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।
ধন্যবাদ।

তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটি
মুক্তি ভবন, ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৪