Wednesday, February 20th, 2008

বাংলাদেশের সমুদ্রসীমায় তেল-গ্যাস আহরণের জন্য আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে দরপত্র আহ্বান প্রসঙ্গে

[অনির্বাচিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার কর্তৃক বাংলাদেশের সমুদ্রসীমায় তেল-গ্যাস আহরণের জন্য ২৮টি ব্লকে ভাগ করা এবং আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে এই মর্মে দরপত্র আহ্বানের প্রেক্ষিতে জাতীয় কমিটির পক্ষ থেকে কমিটির আহ্বায়ক প্রকৌশলী শেখ মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ ও সদস্য সচিব অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ সংবাদপত্রে প্রকাশার্থে নিম্নোক্ত বিবৃতিটি প্রদান করেন ২০ ফেব্রুয়ারি, ২০০৮ তারিখে।]

গত ১৫ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের সমুদ্রসীমায় তেল-গ্যাস আহরণের জন্য ২৮টি ব্লকে বর্তমান অনির্বাচিত সরকার দরপত্র আহ্বান করেছে। জনগণের পক্ষ থেকে জাতীয় কমিটি সরকারের এই পদক্ষেপের তীব্র নিন্দা জানাচ্ছে। ইতোপূর্বে ৫ ফেব্র“য়ারি সরকার মডেল উৎপাদন বণ্টন চুক্তি অনুমোদন করেছে। তাৎক্ষণিকভাবে জনগণ এই অসাংবিধানিক অগণতান্ত্রিক কার্যক্রমের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছে। কিন্তু জনগণের প্রতিবাদী চিৎকার উপেক্ষা করে সরকারের কাফেলা জনস্বার্থের সর্বনাশ করে বহুজাতিক কোম্পানির মুনাফার সেবার লক্ষ্যে অবিচল যাত্রা অব্যাহত রেখেছে, যে যাত্রার পরবর্তী মনজিলগুলি হচ্ছে এ বছর ৭ মে দরপত্র গ্রহণ করা ও অক্টোবর মাসেই চুক্তিপত্র সেরে ফেলা। কিসের গরজে আসন্ন নির্বাচিত সরকারের কাছে বর্তমান অনির্বাচিত সরকারের অঙ্গীকারাবদ্ধ ক্ষমতা হস্তান্তরের মাত্র ২ মাস আগে সরকার সম্পদ হস্তান্তর করার কাজে তড়িঘড়ি করছে, তা নিয়ে জনগণ গভীরভাবে সন্দিহান। জনগণ দেখেছে ইতিপূর্বে জনগণের নির্বাচিত কিন্তু ধনিক শ্রেণীর স্বার্থরক্ষাকারী সরকারগুলি কিভাবে জনগণের হাজার হাজার কোটি টাকার সম্পদ জনগণের কাছে গোপন রেখে অসম চুক্তির মাধ্যমে সাম্রাজ্যবাদী বহুজাতিক কোম্পানির লুণ্ঠনের জন্য সমর্পিত করেছে। নির্বাচিত সরকার থাকলে জনগণ আন্দোলন করে সরকারকে এ ধরণের অবৈধ, অন্যায্য ও জনস্বার্থবিরোধী কার্যক্রম থেকে বিরত রাখতে পারে। বর্তমানে জনগণের স্বার্থের বিরুদ্ধে অনির্বাচিত সরকার অবস্থান গ্রহণ করলে জনগণ সহজে এর প্রতিকার করতে পারছে না।

ইতোপূর্বে জনগণ আন্দোলন করে, ২০০২ সালে মার্চ মাসে লংমার্চ করে বহুমূল্যবান অথচ সীমিত গ্যাস সম্পদ বিবিয়ানা হতে ভারতে পাচার থেকে বাঁচিয়েছে, ২০০৬ এর ২৬ আগস্ট রক্তক্ষয়ী আন্দোলন করে এশিয়া এনার্জির কয়লা পাচারের ষড়যন্ত্র প্রতিহত করে ফুলবাড়ীর কয়লা আপাতত বাঁচিয়েছে। কিন্তু বর্তমান সরকারের আমলে স্থলভাগের ১৬ টিসিএফ গ্যাস সম্পদের তুলনায় সমুদ্রবক্ষে ৮ গুণ সম্পদ (কমপক্ষে ১২০ টিসিএফ) খোয়ানো থেকে বাঁচাবে কীভাবে, জনগণ তাই নিয়ে উদ্বিগ্ন ও শঙ্কিত।

সরকার চায়, বর্তমান জ্বালানী সঙ্কটের মোচন করতে সকল ক্ষেত্রের সকল ধরনের জ্বালানী সম্পদ দ্রুত উত্তোলন করতে জরুরী পদক্ষেপ নেওয়া। জনগণও তাই চায়। কিন্তু সরকারের চাওয়া ও জনগণের চাওয়ার মধ্যে ফারাক হচ্ছে জনগণ তেল-গ্যাস, খনিজ সম্পদের উপর সম্পূর্ণ কর্তৃত্ব অক্ষুন্ন ও অব্যাহত রাখতে চায়। সম্পদের সম্পূর্ণ অংশ দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের কাজে লাগাতে চায়।

সংবিধান অনুযায়ী তেল-গ্যাস, কয়লা তথা সকল প্রাকৃতিক সম্পদের মালিক জনগণ। অতএব সংবিধান অনুযায়ী তেল-গ্যাস, কয়লা উৎপাদন চুক্তিতে জনগণের সম্মতি ও অনুমোদন অপরিহার্য। ইতোপূর্বে স্থলভাগে অসম উৎপাদন বণ্টন চুক্তির মাধ্যমে জনগণ হাজার হাজার কোটি টাকার গ্যাস সম্পদ হারিয়েছে ও তৎসূত্রে তার কয়েকগুণ মূল্যের অর্থনৈতিক উন্নয়ন থেকে বঞ্চিত হয়েছে। বহুজাতিক কোম্পানিগুলি মহানন্দে তাদের অসম চুক্তির মাধ্যমে অর্জিত ৮০% গ্যাস সরকারকে বৈদেশিক মুদ্রায় বিক্রয় করে মুনাফার পাহাড় গড়েছে। জনগণের আশঙ্কা সাগরবক্ষের সম্পদের বেলায় একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হতে চলেছে। একই ধনিক শ্রেণীর স্বার্থরক্ষাকারী অনির্বাচিত সরকার জনগণের সম্মতি বা অনুমোদনের তোয়াক্কা না করে সাগরবক্ষের সম্পদ উজাড় করার মিশনে নেমেছন। নির্বাচিত সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন করা সম্ভব ছিল Ñ জনগণের ন্যায্য দাবী আন্দোলন করে তাদের কাছে আদায় করা যেত, কিন্তু বর্তমান জরুরী আইনের অধীনে প্রতিবাদী জনগণের ওষ্ঠে লাগানো হয়েছে ডগ-টেপ, জনগণের প্রতিবাদী মিছিলকারীর পায়ে বাঁধা আছে ডান্ডাবেড়ী। তবে জনগণের হৃদয়ের ক্ষোভ উচ্চমাত্রায় কমপ্রেসড অবস্থায় আছে, যে কোন সময় বিষ্ফোরণ ঘটতে পারে।