Saturday, November 17th, 2018

নির্বাচনের আড়ালে জাতীয় স্বার্থবিরোধী তৎপরতা বন্ধ কর

তেল-গ্যাস খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির আহ্বায়ক প্রকৌশলী শেখ মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ এবং সদস্য সচিব অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ আজ এক যুক্ত বিবৃতিতে বলেছেন, বিভিন্ন সংবাদসূত্রে আমরা উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ করছি যে, যখন নির্বাচনী তৎপরতায় সারাদেশের মনোযোগ বাড়ছে তখনও জাতীয় স্বার্থবিরোধী তৎপরতা থেমে নেই। জনমতের প্রবল বিরোধিতা সত্ত্বেও রামপাল প্রকল্পসহ সুন্দরবন বিনাশী বিভিন্ন প্রকল্পের কাজ এখনও এগিয়ে চলছে। পিএসএমপি ২০১৬-র অধীনে প্রাণবিনাশী ব্যয়বহুল আমদানিনির্ভর কয়লা, পারমাণবিক ও এলএনজিসহ বিভিন্ন প্রকল্প বাংলাদেশের জন্য ভয়ংকর বিপদ ও বোঝা তৈরি করছে। বিভিন্ন অপতৎপরতায় চট্টগ্রাম বন্দরও হুমকির মুখে পড়েছে।

চট্টগ্রাম বন্দর
যথাযথ স্বচ্ছতা ছাড়াই একদিকে বন্দর ব্যবহারে ভারতকে অবাধ সুবিধা দেয়া হচ্ছে অন্যদিকে বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র চট্টগ্রাম বন্দরকে হুমকির মুখে ফেলে কর্ণফুলী নদীতে ভাসমান এলএনজি (তরলায়িত প্রাকৃতিক গ্যাস) টার্মিনাল নির্মাণের তোড়জোড় চলছে। সংবাদপত্রে প্রকাশিত খবরে বলা হয়েছে, কোনো রকমের ফিজিবিলিটি স্টাডি বা সমীক্ষা না করেই চট্টগ্রাম বন্দরের মুখে এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের জন্য বিদেশি দুটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি করার প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করেছে জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের অধীন রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেড (আরপিজিসিএল)। এবিষয়ে বন্দর কর্তৃপক্ষ বারবার আপত্তি জানালেও উচ্চ পর্যায় থেকে অনাপত্তিপত্র দেবার জন্য চাপ দেয়া হয়েছে। প্রকাশিত খবরে আরও জানা গেছে যে, ‘প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নির্দেশনা আমলে’ নিয়ে তাদের নতুন করে মতামত পাঠানোর নির্দেশনা দেয়ার পর বন্দর কর্তৃপক্ষ মতামত বদলে দিতে বাধ্য হয়। জানা যায় কর্নফুলী নদীতে ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল হলে চ্যানেলে প্রতিদিন আসা-যাওয়া করা তিন শতাধিক নৌযানই পড়বে হুমকিতে। ঝুঁকিতে থাকবে দেশের অন্যতম প্রধান সার কারখানা কাফকো, সিইউএফএল, বিমানবন্দরসহ এক ডজন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাও।
গ্যাস অনুসন্ধান কার্যক্রমে জাতীয় প্রতিষ্ঠান বাপেক্সকে অকার্যকর করে তুলে কয়েকগুণ বেশি দামে এলএনজি ক্রয় করবার নীতি গ্রহণে বিদেশি কোম্পানি ও তাদের দেশি কমিশনভোগীরা লাভবান হবে ঠিকই কিন্তু এতে দেশের গ্যাসের দামবৃদ্ধি পাবে, অর্থনীতির অন্যান্য খাতও চাপে পড়বে, ভর্তুকি ও ঋণের চাপও বাড়বে। এখন এই এলএনজি টার্মিনালের কারণেই চট্টগ্রাম বন্দরও ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে।

বাপেক্স ও গাজপ্রম
জাতীয় সংস্থাকে অকার্যকর করে কমিশনের লোভে বিদেশি কোম্পানিকে সুবিধা দেবার আরেকটি বড় দৃষ্টান্ত অনেক বেশি খরচে গাজপ্রমকে কাজ দেয়া। এর আগেও গাজপ্রম দেশের মোট ১৫টি কূপ খনন করেছে। এরমধ্যে প্রথম ১০টি কূপ দেশীয় প্রতিষ্ঠান বাপেক্সের তুলনায় প্রায় তিনগুণ বেশি খরচে করলেও সে তুলনায় গ্যাস পাওয়া যায়নি। বাকি ৫টির অবস্থাও ভালো নয়। সম্প্রতি আরও তিনটি গ্যাস কূপ খননের কাজ দেয়া হয়েছে রাশিয়ান কোম্পানি গাজপ্রমকে। বাপেক্সের আবিষ্কার করা ‘শাহবাজপুর’ ও ‘ভোলা নর্থ’ নামের দুটি গ্যাসক্ষেত্রে কূপ তিনটির অবস্থান। জানা গেছে, প্রতিটি কূপ খননে বাপেক্সের খরচ ৮০ কোটি টাকা হারে তিনটিতে ২৪০ কোটি টাকা। অথচ গাজপ্রম নিচ্ছে ১৬০ কোটি হারে ৪৮০ কোটি টাকা। এর আগেও গাজপ্রমকে কাজ দিয়ে বাংলাদেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তারপরও এধরনের তৎপরতা অব্যাহত আছে। দেখা গেছে, যেখানে গ্যাস পাওয়ার সম্ভাবনা বেশি, সেখানে বিদেশি কোম্পানিকে দায়িত্ব দেওয়া হয়; আর যেখানে গ্যাস পাওয়ার সম্ভাবনা কম, সেখানে বাপেক্সকে দিয়ে কূপ খনন করানো হয়। এসব তৎপরতা ও চুক্তির মাধ্যমে একদিকে দেশের জাতীয় সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে অন্যদিকে গ্যাসের দাম বৃদ্ধি করার চাপ তৈরি হচ্ছে।

আমরা অবিলম্বে জাতীয় স্বার্থবিরোধী এসব তৎপরতা বন্ধ করবার দাবি জানাই। দেশ ও জনগণকে ক্ষতিগ্রস্ত করে দেশি-বিদেশি কতিপয় গোষ্ঠীর স্বার্থরক্ষার এসব তৎপরতা বন্ধ করবার দৃঢ় অঙ্গীকার ছাড়া নির্বাচন অর্থবহ হবে বলে আমরা মনে করি না।