Sunday, June 26th, 2016

কলকাতার দুই সমাবেশে বক্তারা:দুই বাংলার সুন্দরবন বাঁচাতে দুই দেশের মানুষকে ঐক্যবদ্ধভাবে রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র বাতিলের লড়াইএ শামিল হতে হবে

গত ২২ ও ২৩ জুন কলকাতায় পৃথক দুটো সমাবেশে সুন্দরবনবিনাশী রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র বাতিল করে সুন্দরবন রক্ষায় বাংলাদেশ ও ভারতের জনগণের ঐক্যবদ্ধ ভূমিকা গ্রহণের পক্ষে ঐকমত্য প্রকাশ করে বেশ কয়েকটি কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়।

২২ জুন ‘সাইন্স ফর অল’ সহ তরুণদের বেশ কয়েকটি সংগঠনের উদ্যোগে মহাবোধী সোসাইটির হলরুমে ‘রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র: পরিবেশ ও বাস্তুতন্ত্র’ শীর্ষক আলোচনা সভা ও সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। শুরুতে বাংলাদেশের ব্রাত্য আমিন পরিচালিত ‘লং লিভ সুন্দরবন’ তথ্যচিত্র প্রদর্শিত হয়। তরুণ শিক্ষার্থী, নাট্যকর্মী, বিজ্ঞান আন্দোলন কর্মী, রাজনৈতিক কর্মী ছাড়াও শিক্ষক, বিজ্ঞানী, পরিবেশবিদরা উপস্থিত ছিলেন। হলভর্তি শ্রোতাদের এই সভায় প্রধান বক্তা ছিলেন জাতীয় কমিটির সদস্য সচিব অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ। আরও বক্তব্য রাখেন স্বপন আচার্য, শুভাশীষ মুখোপাধ্যায়, অরিজিৎ চট্টোপাধ্যায়, শ্বাশ্বতী দে প্রমুখ। সভাস্থলে অনেকগুলো ফেস্টুন লাগানো ছিল। এগুলোতে লেখা ছিল: ‘আমরা বলি সর্বজন, তোমরা বলো উন্নয়ন, আমরা বলি সুন্দরবন’, ‘মানুষই একমাত্র প্রাণী যারা লোভের বশবর্তী হয়ে প্রকৃতি ধ্বংসের আত্মঘাতী কাজ করে’, ‘ভীষণ গরম পড়ছে বলে প্রকৃতির ওপর রাগ করো, তোমরা যে সব জঙ্গল কেটে সাফ করো তার বেলা?’, ‘আমাদের সবার সুন্দরবন ধ্বংস হতে দেবো না’, ‘সুন্দরবন ধ্বংস করে বিদ্যুৎ কেন্দ্র চাই না’ ইত্যাদি। সভায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে বিভিন্ন তরুণ লেখক শিল্পী পরিবেশবিধ্বংসী তৎপরতাকে জনগণের অস্তিত্বের জন্য হুমকি হিসাবে বর্ণনা করে রামপাল প্রকল্প বাতিলে নানা উদ্যোগের কথা জানান। পরমাণু বিজ্ঞানী ডক্টর শুভাশীষ মুখোপাধ্যায় বলেন, ‘বিজ্ঞানের কথা বলে ধ্বংস ও দখলকে উন্নয়ন হিসেবে হাজির করা হয়, এই চিন্তার আধিপত্য দূর করতে বিজ্ঞানকে কর্পোরেট পুঁজির শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করতে হবে।’ আনু মুহাম্মদ তাঁর বক্তব্যে বলেন, ‘তাজমহল সপ্তাশ্চর্যের একটি। তার একটু দূষণ হলে আমরা সবাই পীড়িত বোধ করি। কোন নির্বোধও বলবে না, তাজমহল ধ্বংস করে কোন বিদ্যুৎ কেন্দ্র করা হোক। সেই তাজমহলও মানুষের পক্ষে আরেকটি বানানো সম্ভব। কিন্তু সুন্দরবন আরেকটি কেউ বানাতে পারবে না। এটি দুই বাংলার অসাধারণ সম্পদ, দুই বাংলার মানুষকে ঐক্যবদ্ধভাবেই তা বাঁচাতে হবে।’

পরদিন ২৩ জুন ফাইন আর্টস একাডেমী মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হয় ‘কনসার্নড সিটিজেনস মিটিং টু সেভ সুন্দরবন’ শীর্ষক মতবিনিময় সভা। ন্যাশনাল এ্যালায়েন্স ফর পিপলস মুভমেন্টস, ফিস ওয়ার্কার্স ইউনিয়ন সহ বেশ কয়েকটি পরিবেশবাদী সংগঠনের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এই মতবিনিময় সভায় প্রধান আলোচক ছিলেন আনু মুহাম্মদ। হলভর্তি সভায় আরও বক্তব্য রাখেন বিজ্ঞান মোর্চার সমন্বয়ক সৌম্য দত্ত, বিজ্ঞান লেখক প্রদীপ দত্ত, পরিবেশ আন্দোলনের নেতা সৌরেন বোস, দিলীপ হালদার। সৌম্য দত্ত বলেন, ‘ভারতের কোম্পানি এনটিপিসি এই সর্বনাশা প্রকল্প হাতে নিয়েছে, ভারতীয় আরেক কোম্পানি এই কেন্দ্র নির্মাণ করতে যাচ্ছে, ভারতীয় এক্সিম ব্যাংক এই বিষাক্ত প্রকল্পে অর্থযোগান দিচ্ছে, ভারতীয় কোম্পানি কয়লা যোগান দিতে যাচ্ছে। অতএব ভারতের নাগরিক হিসেবে আমাদের দায়িত্ব বিশ্ব সম্পদ সুন্দরবনের ধ্বংস ঠেকাতে সোচ্চার হওয়া, সক্রিয় হওয়া। এই প্রকল্প বাতিল না হলে আরও বিপজ্জনক প্রকল্প দুইদেশকে মহাবিপদের দিকে নিয়ে যাবে।’ আনু মুহাম্মদ বলেন, ‘যা মানুষের জীবন বিপন্ন করে তাকে কোনোভাবেই বলা যায় না। দুই দেশের সরকার এই সর্বনাশা প্রকল্প করতে গিয়ে কোন নিয়ম, স্বচ্ছতা এবং যৌক্তিকতা মানছে না। তারা নৈতিকভাবে পরাজিত। এই প্রকল্প একটি মানববিধ্বংসী প্রকল্প। এটি আর্থিকভাবে অযৌক্তিক, পরিবেশগতভাবে বিধ্বংসী, রাজনৈতিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ, দুইদেশের সম্পর্কের জন্য বিষবৎ ক্ষতিকর। দুই বাংলার জন্যই সুন্দরবন অস্তিত্বের প্রশ্ন। সেজন্য রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র বাতিল করা এবং সুন্দরবনকে আরও জীবন্ত করা দুইদেশের মানুষেরই দায়িত্ব।’

দুই সভাতেই দীর্ঘক্ষণ ধরে প্রশ্নোত্তর হয় এবং আগামী দিনগুলোতে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করবার জন্য বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।