Tuesday, March 29th, 2016

সামগ্রিক নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে সরকার ইউনেস্কোর প্রতিনিধিদলের সফরকে একপেশে করেছে

তেল-গ্যাস খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির আহ্বায়ক প্রকৌশলী শেখ মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ ও সদস্য সচিব অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ আজ এক বিবৃতিতে বলেছেন, সুন্দরবনের বিশ্ব ঐতিহ্য সংরক্ষণের বর্তমান পরিস্থিতি এবং রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র ও পশুর নদী ড্রেজিং এর সম্ভাব্য প্রভাব পর্যবেক্ষণের জন্য গত ২২ মার্চ ইউনেস্কোর ৩ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল বাংলাদেশে আসেন। ২০১৩ সাল থেকে ইউনেস্কো সুন্দরবনের পাশে রামপাল ও ওরিয়ন কয়লা ভিত্তিক তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ, ইআইএ রিপোর্টের ত্রুটি ও অসম্পূর্ণতা, সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে জাহাজ চলাচল এবং অন্যান্য দূষণকারী স্থাপনার ব্যপারে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে একাধিক বার সরকারকে চিঠি দেয় জাতিসংঘের এই প্রতিষ্ঠান। কিন্তু বার বার চিঠি দিয়েও সরকারের ব্যাখ্যা ও জবাবে সন্তুষ্ট না হওয়ার কারণে গত বছর ইউনেস্কার ৩৯ তম অধিবেশনে ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সেন্টার ও আইইউসিএন এর সমন্বয়ে এই রিঅ্যাকটিভ মনিটরিং (Reactive Monitoring) মিশন পরিচালনার সিদ্ধান্ত হয়। সেই সিদ্ধান্তের অংশ হিসেবেই ইউনেস্কোর এই মিশন। উল্লেখ্য যে, কোন বিশ্ব ঐতিহ্যকে বিপদাপন্ন বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা কিংবা বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকা থেকে বাদ দেয়ার প্রক্রিয়া শুরু করার আগে সাধারণত রিঅ্যাকটিভ মনিটরিং করা হয়।

স্বাভাবিক ভাবেই আমরা প্রত্যাশা করেছিলাম যে, সুন্দরবনের পাশে রামপাল ও ওরিয়ন বিদ্যুৎ কেন্দ্র সহ দূষণকারি স্থাপনায় বিষয়ে সরকারের ভূমিকাই যেহেতু প্রধান এবং সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপ ও ব্যাখ্যায় সন্তোষজনক না হওয়ার কারণেই যেহেতু এই রিঅ্যাকটিভ মনিটরিং মিশন, তাই ইউনেস্কো মিশন বাংলাদেশে এসে সরকারী পক্ষ ছাড়াও স্বাধীনভাবে এলাকার মানুষ, বিশেষজ্ঞ এবং রামপাল ও ওরিয়ন বিদ্যুৎ কেন্দ্র বাতিলসহ সুন্দরবনবিনাশী সকল তৎপরতা বন্ধের দাবিতে দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় ব্যক্তি ও সংগঠনগুলোর সাথে মতবিনিময় করবে।

কিন্তু আমরা লক্ষ করলাম গত ২২ থেকে ২৮ মার্চ বাংলাদেশে অবস্থানকালে ইউনেস্কো মিশন পুরোপুরিভাবে সরকার ও কোম্পানির নিয়ন্ত্রণেই ছিলেন যারা নিজেরাই সুন্দরবন বিপর্যয়ের বিভিন্ন ঘটনা ও সুন্দরবনবিনাশী বিভিন্ন প্রকল্পের জন্য অভিযুক্ত। মিশন প্রকল্প এলাকা ও সুন্দরবনের ভেতরের বিভিন্ন দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন কিন্তু সরকার নির্ধারিত ব্যক্তি, দলীয় নেতা কর্মী ছাড়া কোনো এলাকাবাসীর সাথে কথা বলেননি। তাঁরা সরকারের বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তা, রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের কর্মকর্তাদের কথা শুনেছেন, কিন্তু এসব বিপর্যয়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার সংগঠন, বিশেষজ্ঞ বা নাগরিকসমাজের কোন প্রতিনিধির সাথে তাদের কোন মতবিনিময় করতে দেয়া হয়নি।

আমরা জানতে পেরেছি যে, ইউনেস্কো মিশন ২২ মার্চ সচিবালয়ে গিয়ে বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সাথে বৈঠক করেন, ২৩ মার্চ সুন্দরবনের করমজল হয়ে রামপাল প্রকল্প এলাকায় ভারত-বাংলাদেশ মৈত্রী বিদ্যুৎ কোম্পানির কর্মকর্তা, উপজেলা নির্বাহি অফিসার, সরকার দলীয় উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও ইউনিয়ন পরিষদের চেয়াম্যানের সাথে কথা বলেন। ২৪ ও ২৫ মার্চ সুন্দরবনের ভেতরে কয়লা, সার ও তেলের জাহাজ দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শন ও ২৫ মার্চ মংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যানের সাথে ডিনার মিটিং করেন। ২৬ মার্চ যশোর বিমানবন্দর হয়ে ঢাকায় ফিরে আসেন। ২৭ মার্চ বনবিভাগ ও পরিবেশ অধিদপ্তরের বিভিন্ন কর্মকর্তাদের সাথে বৈঠক করেন। ২৮ মার্চ আইউসিএন এর বাংলাদেশ প্রতিনিধি এবং পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়, বিদ্যুৎ বিভাগ, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, বেসামরিক বিমান ও পর্যটন মন্ত্রণালয় ও সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের সচিবদের সাথে বৈঠক করেন। বৈঠকে বিদ্যুৎ বিভাগের পক্ষ থেকে রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের উপরে একটি পাওয়ার পয়েন্ট প্রেজেন্টেশান দেয়া হয়। ২৯ মার্চ ইউনেস্কো মিশন বাংলাদেশ ত্যাগ করেন।

স্থানীয় জনগণের প্রতিনিধি হিসেবে যাদেরকে ইউনেস্কো মিশনের সামনে উপস্থাপন করা হয়েছে, তারা সরাসরি শাসক দলের বুলি শেখানো নেতা-কর্মী। মতবিনিময়ের জন্য দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় জনগণকে নিয়ে আন্দোলনরত রামপাল ভূমি রক্ষা কমিটির কাউকে আহবান জানানো হয়নি। জাতীয় কমিটির খুলনা ও বাগেরহাটের নেতৃবৃন্দের সাথেও কোন ধরণের যোগাযোগ করা হয়নি। রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র ও তেল দুর্ঘটনার প্রভাব নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে গবেষণারত স্বাধীন গবেষক বিশেষজ্ঞদের মতামত জানতে চাওয়া হয়নি। নিরপেক্ষ বিশেষজ্ঞ হিসেবে যাদেরকে মিশনের সাথে জুড়ে দেয়া হয়েছে তারা সরকারের আজ্ঞাবহ বা সুবিধাভোগী কিছু ব্যক্তি। যেমন: সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে এর আগে তদন্ত দলে অন্তর্ভুক্ত থেকে ‘তেল দুর্ঘটনার ফলে সুন্দরবনের কোন ক্ষতি হবে না’ জাতীয় কথা বলা ব্যক্তি, সরকারি বিভিন্ন প্রকল্পে কনসালটেন্ট হিসেবে কাজ করা লোককে বিশেষজ্ঞ হিসেবে দেখানো হয়েছে। এমনকি বিভিন্ন জাতীয় ও স্থানীয় গণমাধ্যমের কর্মীরাও বারবার চেষ্টা করা স্বত্ত্বেও ইউনেস্কো মিশনের সাথে দেখা করতে এবং মতবিনিময় করতে ব্যর্থ হয়েছেন বলে জানিয়েছেন।

রামপাল ও ওরিয়ন বিদ্যুৎ কেন্দ্র সহ সার্বিক ভাবে সুন্দরবন বিধ্বংসী প্রকল্পগুলোর এমন কতগুলো দিক রয়েছে, যেগুলো সম্পর্কে পরিস্কার ধারণা পেতে হলে শুধু সরেজমিনে প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন করাই যথেষ্ট নয়। প্রকৃত সমস্যা উপলবদ্ধি করতে হলে এ বিষয়ে যারা দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা করছেন, তথ্য-প্রমাণ-যুক্তি সহ লেখালেখি ও আন্দোলন করছেন, তাদের মতামত ও সরকারি অপপ্রচারের যুক্তি খন্ডন গুলো শোনা ছিল ভীষণ জরুরি। এ হিসেবে ইউনেস্কো মিশনের এই সফরের সার্বিক কর্মসূচি সরকার যেভাবে নিয়ন্ত্রণ করেছে, যেভাবে ইউনেস্কোর প্রতিনিধি দলের সদস্যগণ সরকারের বিভিন্ন কর্মকর্তা ও সরকার ঘনিষ্ঠ ব্যাক্তি ও বিশেষজ্ঞদের দ্বারা পরিবেষ্টিত হয়ে থেকেছেন, যেভাবে সাজিয়ে গুছিয়ে শুধু মাত্র রামপাল প্রকল্পের সপক্ষের বক্তব্যই তাদেরকে বারবার শোনানো হয়েছে, তা থেকে বুঝতে অসুবিধা হয় না- “সুন্দরবনের বিশ্ব ঐতিহ্য সংরক্ষণের বর্তমান পরিস্থিতি এবং রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র ও পশুর নদী ড্রেজিং এর সম্ভাব্য প্রভাব পর্যবেক্ষণ”- এই ঘোষিত উদ্দেশ্য পূরণে ইউনেস্কো মিশন মোটেই স্বাধীন ভাবে কাজ করতে পারেনি।

আমরা ইউনেস্কো মিশনকে নিয়ন্ত্রণে রেখে প্রকৃত পরিস্থিতি আড়াল করার সরকারি তৎপরতার তীব্র নিন্দা জানাই। আমরা আশা করি, জাতিসংঘের সংস্থা হিসেবে, ইউনিস্কো মিশন সরকার, কোম্পানি বা কোন বিশেষ দেশ বা মহলের প্রভাবে বিভ্রান্ত হবে না। আমরা আশা করি, মিশন বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনে তেল কয়লা জাহাজ ডুবির ফলে রামপাল ও ওরিয়ন বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে সার্বিক মতামত প্রদান করার ক্ষেত্রে ইতোমধ্যেই জাতীয় কমিটি সহ বিভিন্ন নিরপেক্ষ ব্যাক্তি-গবেষক-সংস্থার পক্ষ থেকে রামপাল ও ওরিয়ন বিদ্যুৎ কেন্দ্রের সম্ভাব্য ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে যেসব গবেষণা রিপোর্ট-সমালোচনা-বিশ্লেষণ উপস্থাপন করা হয়েছে সেগুলো গুরত্ব সহকারে খতিয়ে দেখবে। একটি স্বাধীন প্রতিষ্ঠান হিসেবে ইউনেস্কো যেন বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন, কয়েক কোটি মানুষের প্রাকৃতিক সুরক্ষা প্রাচীর, জীব-বৈচিত্রে অনন্য সুন্দরবন রক্ষায় যথাযথ ভূমিকা পালন করে, বাংলাদেশের জনগণের পক্ষ থেকে আমরা তাই আশা করি।