Monday, November 25th, 2013

চীন-ভারতের উদাহরণ : দূষিত সুন্দরবন, লাভবান হবে ভারত

বাগেরহাটের রামপালের পর প্রধানমন্ত্রী আরো সাতটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের উদ্বোধন করেছেন ঢাকায় বসে; ১২ নভেম্বর দশ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা অর্জনের (যদিও ভারত থেকে আমদানি করা ৫০০ মেগাওয়াট ধরে) উত্সবের দিনে। মোদ্দা কথা, বড়পুকুরিয়া কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের পর রামপাল এবং তার ধারাবাহিকতায় নতুন কয়েকশ মেগাওয়াটের আরো সাতটির যাত্রা হলো। কয়লার প্রভাব দীর্ঘমেয়াদি হওয়ায় জনবহুল ও সুন্দরবনসহ স্পর্শকাতর বনাঞ্চলের পাশে বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করা হলে কী ক্ষতি হয়, সে অভিজ্ঞতা আমাদের নেই। তাই কয়লার কালো কতটা, তা জানতে বিশ্বে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রথম সারির দেশ চীন ও ভারতের অভিজ্ঞতা কাজে লাগবে; যা খানিকটা ‘আমাদের তাত্ক্ষণিকতার ঝোঁক বা প্রবণতার’ বিরুদ্ধে সুদূরপ্রসারী চিন্তার খোরাক জোগাতে পারে।
ভারতে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের কারণে প্রতি বছর গড়ে ৮০ হাজার থেকে ১ লাখ ১৫ হাজার মানুষের অকাল মৃত্যু ঘটছে বলে বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে। টাকার অঙ্কে এ ক্ষতির পরিমাণ সাড়ে তিন থেকে সাড়ে ৪ বিলিয়ন ডলার। অকাল মৃত্যুর পাশাপাশি হূদরোগ, ব্রংকাইটিসসহ নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে শিশুসহ অন্যরা। এর মূল কারণ ভারতের ১১১টি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র; যা থেকে প্রতি বছর গড়ে ১২১ গিগাওয়াট বা ১ লাখ ২১ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে ভারতের রাজ্যসহ কেন্দ্রীয় সরকার; যা তাদের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার ৬৬ শতাংশ। এত গণমৃত্যু, দূষণের পর আরো কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে দেশটির সরকার।
আঁতকে ওঠার মতো এ তথ্য-উপাত্ত তুলে ধরেছে ভারতীয় প্রভাবশালী দৈনিক দ্য হিন্দু গত ১১ মার্চ কোল কিলস নামে প্রকাশিত গবেষণা প্রতিবেদনে। ‘Coal Kills : An Assessment of Death and Disease Caused by India’s Drtiest Energy Sourceশিরোনামে ভারতীয় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের উপরে পরিচালিত গবেষণা প্রতিবেদনটি তৈরি করেছে আরবান ইমিশনস ডট ইনফো এবং গ্রিনপিস ইন্ডিয়া নামে দুটি সংস্থা। গবেষণাটি করেছেন সরথ কে গুটিকুণ্ডা ও পূজা জাওহার। মানুষ ও পরিবেশের ওপর কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের নেতিবাচক প্রভাব-সংক্রান্ত এ গবেষণা ভারতের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বলে উল্লেখ করেছে দ্য হিন্দু। ২০১১ সাল থেকে এ গবেষণা শুরু হয়।
নীরব ঘাতক কয়লা পুড়িয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুধু মানুষের অকাল মৃত্যু ডেকে আনছে না; সালফার ডাই-অক্সাইড, কার্বন ডাই-অক্সাইড, কার্বন মনো-অক্সাইডসহ অন্যান্য রাসায়নিক পদার্থের কারণে ভারতের আকাশ-বাতাস দূষণে ভারী হয়ে উঠছে। এসব বিদ্যুৎকেন্দ্রের আশপাশে স্বাভাবিক শ্বাস-প্রশ্বাস নেয়া বিপজ্জনক বলে গবেষণায় উঠে এসেছে। যার সত্যতা পাওয়া যায় ২০১১ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বাতাস দূষিত এমন ১০০ নগরীর তালিকায় ভারতের ২৭টি নগরী স্থান পাওয়ায়। বিশ্বের ১০০টির মধ্যে মারাত্মক দূষিত এমন তালিকার চতুর্থ শীর্ষে রয়েছে ভারতের লুধিয়ানা, সপ্তম থেকে নবম পর্যন্ত কানপুর, দিল্লি ও লখনৌ। অর্থাৎ বাতাস দূষণের শীর্ষ দশে এক ভারতেরই চারটি নগরী। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এ সূচকের মতো ভারতের গবেষণায় ওইসব শহরের নাম রয়েছে। ফলে কয়লা খনি ও কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র দূষণের মূল কাণ্ডারি, তা বুঝতে কারো বাকি থাকে না।
একইভাবে পরিবেশদূষণ কমিয়ে আনতে চীনের বিখ্যাত শহর সাংহাইয়ে কয়লা পোড়ানো বন্ধের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। গত ২৮ অক্টোবর সাংহাই পরিবেশ রক্ষা ব্যুরো ভয়াবহ দূষণ ঠেকাতে আগামী চার বছরের জন্য কয়লা পোড়ানোর ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। এতে সাংহাইয়ে অবস্থিত শিল্প খাতের ৩০০টিসহ ২ হাজার ৮০০ কয়লা চুল্লিকে বিকল্প জ্বালানিতে রূপান্তর করত হবে ২০১৫ সালের মধ্যে। ক্লিন এয়ার অ্যাকশন প্ল্যান কর্মসূচির খবরটি চায়না ডেইলি প্রকাশ করেছে। বর্তমানে চীন বিশ্বের সবচেয়ে কয়লা ব্যবহারকারী এবং গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণকারী দেশ। বায়ুমণ্ডলের সবচেয়ে বড় ঘাতক কার্বন, যার বড় অংশই নির্গত হয় কয়লা থেকে। সম্প্রতি কয়লার ভেতর লুকিয়ে থাকা উপাদানই ফুসফুসের ক্যান্সার ও বায়ুদূষণের প্রধান কারণ বলে উল্লেখ করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা।
মাত্র ৩০ বছরে চীনে অতিমাত্রায় কয়লা পোড়ানোয় দেশটির উত্তরাঞ্চলে মানুষের গড় আয়ু কমেছে ৫ দশমিক ৫ বছর। বেঁচে থাকার সুযোগ কমে আসায় বছরে চীনের ২ দশমিক ৫ বিলিয়ন বছর নষ্ট হচ্ছে। এর আর্থিক মূল্য কতটা তা সহজেই অনুমেয়। প্রসিডিংস অব দ্য ন্যাশনাল একাডেমি অব সায়েন্স অব ইউএসএ পরিচালিত গবেষণাটি গত জুলাইয়ে ন্যাশনাল জিওগ্রাফিকের অনলাইনে প্রকাশ হয়েছে।
কোল কিলস শিরোনামের গবেষণা প্রতিবেদন বলছে, ২০১১-১২ অর্থবছরে ভারতের ১১১টি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে ১২১ গিগাওয়াট বিদ্যুতের জন্য পোড়াতে হয়েছে ৫০ কোটি ৩ লাখ টন কয়লা। বিদ্যুতের পাশাপাশি উৎপাদন হয় ৫ লাখ ৮০ হাজার টন ২ দশমিক ৫ মাইক্রোগ্রামের নিচের ক্ষতিকর পদার্থ। প্রতি বছর ভারতের বাতাসে মিশে যাচ্ছে ২১ লাখ টন সালফার ডাই-অক্সাইড, ২০ লাখ টন নাইট্রোজেন অক্সাইড, ১১ লাখ টন কার্বন মনো-অক্সাইড, ১ লাখ টন ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র জৈব পদার্থ, ৬ লাখ ৬৫ হাজার টন কার্বন ডাই-অক্সাইড। আর এই লাখ লাখ টন বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থের কারণেই ভারতজুড়ে ৮০ হাজার থেকে ১ লাখ ১৫ হাজার মানুষকে অকাল মৃত্যুবরণ করতে হচ্ছে। কিন্তু ভারতবর্ষের লাল-নীল-বেগুনি রঙের শাসকদের কাছে এই অকাল মৃত্যুর মূল্য অনেক কম। তাই তো ভারত সরকার ২০১২-১৭ সাল পর্যন্ত ১২তম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় আরো ৭৬ গিগাওয়াট এবং ১৩তম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় ২০১৭-২২ সাল পর্যন্ত ৯৩ গিগাওয়াট ক্ষমতার কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা করেছে, যার বড় অংশই কয়লাভিত্তিক। এরই মধ্যে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনে বিশ্বে পঞ্চম স্থানে রয়েছে ভারত।
ভারত নিজস্ব কয়লার মজুদ দিয়ে আগামী ১০০ বছরে নিরাপদে চলতে পারবে। কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ধারাবাহিকতায় এবার তারা বাংলাদেশের সঙ্গে যৌথভাবে বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করছে। ভারত-বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ কোম্পানি নামে সুন্দরবনসংলগ্ন বাগেরহাটের রামপালে ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করছে। গত ৫ অক্টোবর প্রকল্প থেকে প্রায় ২০০ কিলোমিটার দূরে কুষ্টিয়ার ভেড়ামারায় বসে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে কেন্দ্রটি উদ্বোধন করা হয়েছে। আমদানি করা কয়লা দিয়ে প্রথম পর্যায়ে ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হবে সেখানে; যদিও বাংলাদেশের রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য লাখ লাখ টন কয়লা আমদানি করতে হবে। আন্তর্জাতিক টেন্ডারের মাধ্যমে হয়তো কয়লা রফতানির অংশীদারিত্ব নেবে ভারত। এতে বাড়বে তাদের কয়লার ব্যবসা। নিজেদের পরিবেশের ক্ষতি না করে এবং মাত্র ১৫ শতাংশ বিনিয়োগে ভারত পাবে ৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ।
রামপাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের কারণে সুন্দরবনের ভয়াবহ ক্ষতি হবে। এমনকি সুন্দরবনকে ধংসের দিকে ঠেলে দেবে এই আশঙ্কায় তেল-গ্যাস-বিদ্যুৎ বন্দর ও খনিজ সম্পদ রক্ষা জাতীয় কমিটি লংমার্চ করেছে। জাতীয় স্বার্থ রক্ষার আন্দোলনে শামিল হয়েছে খুলনা বাগেরহাটের হাজার হাজার স্থানীয় মানুষসহ দেশপ্রেমিক গণতান্ত্রিক শক্তি। যদিও শুরু থেকে সরকার ও তাদের পক্ষের কিছু বিশেষজ্ঞ প্রচার চালাচ্ছে যে, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র সুন্দরবনের কোনো ক্ষতি করবে না। এমনকি পরিবেশদূষণও করবে না।
কয়লার কারণে পরিবেশদূষণ না হলে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ভারত-চীনের পরিবেশ রক্ষা দফতরগুলো কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের কারণে ভয়াবহ পরিবেশদূষণের কথা বলছে কোন যুক্তিতে? নাকি ওইসব দেশে কয়লার দূষণ হলেও বাংলাদেশে হবে না? প্রাসঙ্গিকভাবে প্রধানমন্ত্রী, উপদেষ্টাদের বাইরেও দু-একজন বলছেন, ‘আট বছর ধরে বড়পুকুরিয়া কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চলছে। কিন্তু ওই এলাকায় তো গাছপালা মরেনি? পরিবেশের কোনো ক্ষতি হয়নি?’
বড়পুকুরিয়া আর রামপাল একসঙ্গে গুলিয়ে ফেলার সুযোগ নেই। অবস্থান-আকার-পরিবেশ-সক্ষমতায় দুটির মধ্যে যোজন যোজন দূরত্ব। দুটিকে মিলিয়ে এক করে দেখা হবে পরিবেশের জন্য মারাত্মক ভুল। যেমন ৬০ বছরের অসুস্থ ব্যক্তিকে যে সেবা-শুশ্রূষা বা ওষুধ-পথ্য দেয়া যায়, সেই একই পদ্ধতি সাত বছরের শিশুর জন্য প্রযোজ্য নয়। উভয় রোগীর জন্য একই ব্যবস্থা নিলে তা বিপদ ডেকে আনতে পারে। ঠিক তেমনি রামপালের গুরুত্ব সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য ঘিরে। সবাই জানেন, জোয়ার-ভাটার লোনা ও মিঠা পানির ওপর নির্ভরশীল এ ম্যানগ্রোভ বন অত্যন্ত সংবেদনশীল। শত শত বছর ধরে ঝড়-ঝঞ্ঝার বিরুদ্ধে শক্ত হাতে মানুষকে রক্ষা করলেও সুন্দরবন নিজে অত্যন্ত স্পর্শকাতর। সেজন্যই পরিবেশগত দিক দিয়ে দিনাজপুরের বড়পুকুরিয়ার সঙ্গে রামপালের মিল অনেক কম।
অন্যদিকে কাগজপত্রে ২৫০ মেগাওয়াট ক্ষমতার হলেও বড়পুকুরিয়ায় প্রকৃত বিদ্যুৎ উৎপাদন হয় অর্ধেকেরও কম। অথচ রামপালের ক্ষমতা ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট, মানে বড়পুকুরিয়ার চেয়ে ১০ গুণের বেশি। দৈনিক কয়লাও পুড়বে ১০ গুণ বেশি, গড়ে প্রতিদিন ১৩ হাজার টন কয়লা। আর বড়পুকুরিয়া খনির কয়লা তুলে সেখানেই ব্যবহার হচ্ছে, এতে পরিবহনজনিত দূষণ এবং ক্ষতির পরিমাণ সঙ্গত কারণে কম। কিন্তু রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের কয়লা আসবে সুন্দরবনের ভেতরের চ্যানেল দিয়ে। লাখ লাখ টন কয়লার মজুদ ও লোড-আনলোডের জন্য ডিপো তৈরি হবে সুন্দরবনের আকরাম পয়েন্টে। বড় জাহাজ থেকে কয়লা নামানোর পর ১৩-১৪ টনের ছোট জাহাজে তা নিয়ে যাওয়া হবে বিদ্যুৎকেন্দ্রে। এতে দিন-রাতে কয়লা লোড-আনলোড আর পরিবহনে ক্ষতিগ্রস্ত হবে সুন্দরবনের ভেতরে জালের মতো ছড়িয়ে থাকা অসংখ্য খাল-নালার পানি। নীরব নিস্তব্ধ বনের ভেতরে অতিরিক্ত পর্যটকসহ বনজীবী মানুষের চলাচল যেখানে স্পর্শকাতর হিসেবে ধরা হয়, সেখানে কয়লাবাহী জাহাজ চললে পরিস্থিতি কতটা মারাত্মক হবে— এটা উপলব্ধি করা খুব কি কঠিন?
সরকারিভাবেই পরবর্তীতে রামপালে আরো ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াটের বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের কথা বলা হয়েছে। সরকারের দেখানো পথে এখনই বেসরকারি উদ্যোক্তারা ছুটছেন রামপালে। বিদ্যুৎকেন্দ্র ছাড়াও কলকারখানার জন্য অনেক সাইনবোর্ড টানিয়ে জায়গা কেনা ও দখল শুরু হয়ে গেছে। ফলে সুন্দরবনের ১৪ কিলোমিটার দূরের রামপাল ধীরে ধীরে গ্রাস করবে এ বনকে। হয়তো একদিন কাগজে বড় বড় বিজ্ঞাপন দেখা যাবে— ‘পদ্মা সেতু পেরিয়ে মাত্র ২ ঘণ্টার পথ— চলে আসুন বনভিত্তিক শহর সুন্দরবন সিটিতে। যেখানে ঘরে বসেই উপভোগ করবেন ম্যানগ্রোভ চিড়িয়াখানার সৌন্দর্য— চিত্রা হরিণ আর রয়েল বেঙ্গল টাইগারের একঘাটে জল খাওয়ার দৃশ্য।’
বলা হচ্ছে, সর্বশেষ প্রযুক্তি ব্যবহার করে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের দূষণ নিয়ন্ত্রণ করা হবে। ঘরের ভেতর বুড়িগঙ্গা নদী দূষণ আর দখলে শ্বাস-প্রশ্বাস বন্ধ হয়ে মৃতপ্রায়। একই অবস্থা তুরাগ-বালু-শীতলক্ষ্যার। প্রধানমন্ত্রী-পরিবেশ-নৌমন্ত্রীসহ সবার নাকের ডগায় বুড়িগঙ্গাসহ এসব নদীর মৃত্যু ঠেকানো যাচ্ছে না। সেখানে প্রায় ৪০০ কিলোমিটার দূরের সুন্দরবনের জল-স্থলসহ পরিবেশ রক্ষা যথাযথভাবে হবে? যথেষ্ট নজরদারি থাকবে এটা কি বিশ্বাস করা যায়? অন্তত অভিজ্ঞতা থেকে দেশের মানুষ জানে— এটা হবে না।
আর কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের কারণে বড়পুকুরিয়ার পরিবেশের ক্ষতি হয়নি, খালি চোখে দেখে যারা সিদ্ধান্ত টানতে চান, তারা জেনে-বুঝেই মিথ্যাচার করছেন। যেমন— দেখলে বোঝার উপায় আছে কি ঢাকার বাতাস মারাত্মক মাত্রায় দূষিত? মহানগরীর দূষিত বাতাসে প্রতিবার শ্বাস নিয়ে সুস্থ মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়ছে, বিকারগ্রস্ত হয়ে বড় হয়ে উঠছে শিশুরা। কিন্তু সাদা চোখে দেখলে কি তা মনে হয়? দিনে দিনে মহীরুহ আকার ধারণকারী এ ভয়ঙ্কর শত্রুকে কি কেউ উপলব্ধিতে আনতে পারছে? পারছে না। তাই সবকিছু ঠিক আছে মনে হলেই সব ঠিক থাকবে, তা নয়। দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব সম্পর্কে জানতে হলে বড়পুকুরিয়ার পরিবেশ নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে হবে। কিন্তু সেই কাজ না করেই ঢালাও সার্টিফিকেট দেয়া কতটা যৌক্তিক বা সমীচীন!
বলা হচ্ছে, পশুর নদীর পানি নিয়ে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের কুলিং যন্ত্র চলবে। সাধারণত কুলিংয়ের জন্য দরকার হয় মিঠা পানি। পশুরের পানি জোয়ার-ভাটার কারণে অনেক বেশি লবণাক্ত। সেই পানি দিয়ে কুলিং মেশিন চালাতে গেলে অনেক বেশি পয়সা খরচ করতে হবে। কারণ এতে মরিচা পড়ে পানির পাইপগুলো দ্রুত নষ্ট হয়ে যাবে। তাই এখন পশুরের পানি ব্যবহার করার কথা বলা হলেও শেষ পর্যন্ত মাটির নিচ থেকে তা তুলতে হবে। যার প্রভাব পড়বে ওই এলাকার কৃষিকাজের ওপর।
কয়লার দূষণ কমাতে চুল্লির আকার অনেক উঁচু করার কথা বলা হয়েছে। উঁচু চুল্লি হলেই যে দূষণ কম হবে তাও সঠিক নয়। কারণ সৃষ্ট কার্বন, কার্বন ডাই-অক্সাইড, সালফার ডাই-অক্সাইডসহ ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র পদার্থ ছড়িয়ে পড়বে বাতাসে; যা গ্রিনহাউস গ্যাস হিসেবে বায়ুমণ্ডলের ক্ষতিসাধন করবে। ফলে চুল্লি যতই উপরে দেয়া হোক না কেন, তা রামপালসহ পুরো সুন্দরবনের ক্ষতি করবে। বছরের পর বছর চলতে থাকলে একদিন সুন্দরবন তার নিজস্বতা হারিয়ে ফেলবে। বিলুপ্ত হবে বনের শত শত প্রজাতির মাছ-পাখি-প্রাণী। চিরতরে হারিয়ে যাবে সুন্দরবনের বিশেষ বৈশিষ্ট্যের জীববৈচিত্র্য। কয়লার ধোঁয়া আর বিষে ধীরে ধীরে নষ্ট হয়ে যাবে বিশ্বের সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ বন প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অপার ভূমি বিশ্বঐতিহ্য সুন্দরবন। চাইলে ১ লাখ ৪৪ হাজার বর্গকিলোমিটারের এ দেশে অন্য কোথাও কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করা যাবে। কিন্তু সুন্দরবনের বিকল্প নেই। সুন্দরবন একটাই, একে রক্ষায় তাই বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। নজর দিতে হবে স্থায়ী ও দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের দিকে। বাংলাদেশের মতো জনবহুল দেশের উন্নয়ন এগিয়ে নিতে এখন চাই সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা। ‘ভাবিয়া করিও কাজ, করিয়া ভাবিও না’ এ প্রবাদ বাক্যের কার্যকারিতা সর্বদা ও সর্বত্র রয়েছে।

Source:  http://www.bonikbarta.com/sub-editorial/2013/11/25/23364