Tuesday, November 12th, 2013

বেসরকারি ফুয়েল সাপ্লাই কোম্পানি গঠনের তৎপরতার বিরুদ্ধে আন্দোলনকারীদের সংবাদ সন্মেলনের লিখিত বক্তব্য

আমরা আজ গভীর উদ্বেগের সাথে জানাচ্ছি যে, অতি সম্প্রতি সরকারের উর্ধ্বতন নীতি নির্ধারক মহল বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি) ও বেসরকারী স্পন্সর সমন্বয়ে Fuel Supply Company (FSC) নামে একটি যৌথ মালিকানাধীন কোম্পানী গঠন করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন। প্রস্তাবিত উক্ত কোম্পানীতে United Enterprises & Company Ltd. নামক ব্যক্তিমালিকানাধীন কোম্পানীর জন্য শেয়ার বরাদ্ধ রাখা হয়েছে ৫১ শতাংশ, বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের জন্য ৩৯ শতাংশ এবং বিপিসির জন্য মাত্র ১০ শতাংশ। অত:পর উক্ত Fuel Supply Company (FSC) কে প্রাথমিক ভাবে ফার্নেস ও ডিজেল এবং পরবর্তী সময়ে সকল জ্বালানী তেল আমদানীর লাইসেন্স প্রদান করা হবে। ফলত: চুড়ান্ত বিচারে দেশের চাহিদার পুরো জ্বালানী তেল আমদানী ও  বিতরণ ব্যবসা ব্যক্তিমালিকানায় হস্তান্তরিত হবে।

আপনারা হয়ত অবগত আছেন যে, ক্রমবর্ধমান বিদ্যুৎ এর চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে সরকারী ও বেসরকারী পর্যায়ে ফার্ণেস অয়েল ও ডিজেল ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র দেশের বিভিন্ন স্থানে স্থাপন করা হয়েছে। এ সকল বিদ্যুৎ কেন্দ্রে নদী পথে, সড়ক পথে ও রেল পথে ফার্ণেস অয়েল ও ডিজেল সরবরাহ দেওয়া হচ্ছে। জ্বালানী তেল সরবরাহ নির্বিঘ্ন রাখার জন্য নিরাপদ জ্বালানী তেল মজুদ করে তোলার লক্ষ্যে বিপিসির আওতাধীন তেল বিপণন কোম্পানী সমূহ ইতোমধ্যে চট্টগ্রাম এর স্ব স্ব প্রধান স্থাপনাসহ বিভিন্ন ডিপোতে স্টোরেজ ট্যাংক নির্মাণ সম্পন্ন করেছে। বিদ্যুৎ কেন্দ্র সমুহে জ্বালানী তেলের সরবরাহ  নিরবচ্ছিন্ন রাখার  নিমিত্তে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের আবেদনের প্রেক্ষিতে এসব কোম্পানীর মধ্যে যমুনা অয়েল কোম্পানী লি: ৬৫ টি কোস্টাল ট্যাংকার ও ২৬টি শ্যালো ড্রাফট ট্যাংকার, মেঘনা পেট্রোলিয়াম লি: ১৩৬টি কোস্টাল ট্যাংকার ও ৩৮টি শ্যালো ড্রাফট ট্যাংকার, পদ্মা অয়েল কোম্পানী লি: ১৫৯ টি কোস্টাল ট্যাংকার ও ৮০টি শ্যালো ড্রাফট  ট্যাংকারের লেটার অফ ইনডেন্ট প্রদান করেছে।

ইতোমধ্যে  যমুনা অয়েল কোম্পানী লি: এ কোস্টাল ট্যাংকার ২টি ও শ্যালো ড্রাফট ট্যাংকার ৪টি, মেঘনা পেট্রোলিয়াম লি: এ কোস্টাল ট্যাংকার ৪টি ও শ্যালো ড্রাফট ট্যাংকার ১১টি, পদ্মা অয়েল কোম্পানী লি: এ কোস্টাল ট্যাংকার ১৫টি ও ১৩টি শ্যালো ড্রাফট ট্যাংকার অর্ন্তভুক্ত হয়েছে। খুব সল্পতম সময়ের মধ্যে তিনটি তেল বিপণন কোম্পানীতে অনেকগুলো কোস্টাল ট্যাংকার ও শ্যালো ড্রাফট ট্যাংকার অর্ন্তভুক্ত হবে এবং বাংলাদেশ রেলওয়ে  পশ্চিমাঞ্চল সম্প্রতি ভারত থেকে অতি দ্রুতগামী ১৬৫ টি ওয়াগন ও ৬টি ইঞ্জিন আমদানী পূর্বক রেলওয়ে ট্যাংক ওয়াগন বহরে যোগ করে। বাংলাদেশ রেলওয়ে পুর্বাঞ্চল ৮৫টি রেলওয়ে ট্যাংক ওয়াগন আমদানী করেছে, যেগুলো সহসা যোগ হবে। ২০১২-১৩ অর্থ বৎসরে বিভিন্ন সরকারী ও বেসরকারী পর্যায়ে নির্মিত বিদ্যুৎ কেন্দ্রে  ১০,৪৪,৪১৫ মেঃ টন ফার্ণেস অয়েল ব্যবহার করেছে। তৎমধ্যে মোট ৯৯.৬৯% ফার্ণেস অয়েল ব্যবহৃত হয়েছে বিদ্যুৎ কেন্দ্রে। বিদ্যুৎ কেন্দ্রের চাহিদা অনুযায়ী তিনটি তেল বিপণন কোম্পানী জ্বালানী তেল সফল ভাবে সরবরাহ করে আসছে।

 

বিদেশ থেকে আমদানীকৃত ও পরিশোধিত তেল আনলোড করার জন্য বিপণন কোম্পানী গুলোর তিনটি জেটি সারা বছরই  Mother Tanker হতে ক্রুড অয়েল ও পরিশোধিত জ্বালানী তেল আনলোড করার কাজে ব্যস্ত থাকে। ক্রুড অয়েল ও জ্বালানী তেল আনলোড করার জন্য ইস্টার্ন রিফাইনারী লি: সহ তিনটি তেল বিপণন কোম্পানীর মধ্যে আন্ত:কোম্পানী পাইপ লাইন স্থাপন করা হয়েছে। চট্টগ্রাম হতে বিভিন্ন ডিপোতে জ্বালানী তেল বোঝাই তিন কোম্পানীর জেটির ব্যবহার করা হয়।

উপরোল্লেখিত তথ্যাদির আলোকে আমরা দৃঢ়ভাবে বলতে চাই যে, Fuel Supply Company (FSC) গঠনের মাধ্যমে বেসরকারী খাতে জ্বালানী তেল আমদানীর সুযোগ দিলে-

ক) সরকার প্রতি বৎসর কোটি কোটি টাকার রাজস্ব আয় থেকে বঞ্চিত হবে।

খ) সরকারী মালিকানাধীন তিনটি জ্বালানী তেল বিপণন কোম্পানী কর্তৃক ইতোমধ্যে যে শত শত  কোটি টাকা বিনিয়োগ করে স্টোরেজ ট্যাংক নির্মাণ করা হয়েছে, তা সম্পূর্ণ লোকসানের হিসাবে যোগ হবে; ফলত: কোম্পানী গুলোতে আর্থিক বিপর্যয় নেমে আসবে।

গ) যে সকল বেসরকারী প্রতিষ্ঠান কোটি কোটি টাকা মূল্যের তেলবাহী জাহাজ কোম্পানীর সাথে চুক্তিবদ্ধ করেছে এবং যে গুলো চুক্তিবদ্ধ হওয়ার অপেক্ষায় আছে তারা ও প্রচণ্ডভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হবে।

ঘ) বাংলাদেশ রেলওয়ের কর্তৃক আমদানীকৃত ট্যাংকওয়াগন সঠিকভাবে ব্যবহৃত হবে না; ফলত: বাংলাদেশ রেলওয়েও ক্ষতির সম্মুখীন হবে।

ঙ) যেহেতু বর্তমানে প্রাইভেট কোম্পানী সমুহের পতেঙ্গা এলাকার কর্ণফুলী নদীর তীরে জেটি ও পাইপ লাইন স্থাপন করার মত পর্যাপ্ত জায়গা নেই, সেক্ষেত্রে প্রাইভেট খাতে আমদানীকৃত জ্বালানী তেল আনলোড করার পরিবর্তে লোড দেওয়ার জন্য তিন কোম্পানীর জেটি ব্যবহার করতে দিতে হবে। ফরশ্রতিতে সারা দেশে ভবিষ্যতে জ্বালানী তেল সরবরাহ নেটওয়ার্ক সম্পূর্ন রূপে ভেঙ্গে পড়বে।

চ) মুনাফালোভী ব্যবসায়ীরা ভেজালের মাধ্যমে জ্বালানী তেলের গুণগত মান রক্ষা করবে না। ফলত: হাজার হাজার কোটি টাকার যন্ত্রাংশ বিনষ্ট হবে।

ছ) জ্বালানী তেলের বিতরণ ব্যবসা ব্যক্তিখাতে গেলে কোন অবস্থাতেই সারা দেশে একই মূল্যে জ্বালানী তেল পাওয়া যাবে না। অসাধু ব্যবসায়ীরা কৃত্রিম সংকট সৃষ্টির মাধ্যমে জ্বালানী তেলের মূল্য বৃদ্ধি ঘটিয়ে জনগণের ভোগান্তি ঘটাবে।

জ) সর্বোপরি জ্বালানী তেলের আমদানী ও বিতরণ বেসরকারী খাতে গেলে ব্যবসায়ীদের হতে সরকার জিম্মি হয়ে পড়বে এবং জাতীয় নিরাপত্তাও হুমকীর সম্মুখীন হবে।

আমরা মনে করি, বর্তমানে সরকারী মালিকানাধীন ও বিপিসি পরিচালিত  তিনটি তেল বিপণন কোম্পানীর সারা দশব্যাপী  জ্বালানী তেল মওজুদ ও সরবরাহের যে অবকাঠামো বিদ্যমান আছে এবং পিউবো যেভাবে জ্বালানী তেলের  চাহিদা বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনকে প্রদান করে এবং বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন সে পরিমাণ জ্বালানী তেল আমাদানী করে যে ভাবে তা বিতরণ করে তাতে  বিদ্যুৎ কেন্দ্র সমুহ কোন রকম সমস্যায় পড়বে না । ফলত: প্রস্তাবিত নতুন কোম্পানী গঠনের কোন প্রয়োজনীয়তা জাতীয় স্বার্থে প্রয়োজন নেই।

 

 

সর্বোপরি  সম্পূর্ণ সরকারী  ব্যবস্থাপনায় বর্তমানে বিদ্যমান জ্বালানী তেল সরবরাহ  ব্যবস্থার পরিবর্তে  প্রাইভেট কোম্পানী গঠনের মাধ্যমে জ্বালানী তেল আমদানী ও সরবরাহ  জনগণ  বা দেশের স্বার্থ রক্ষা করবে না বরং তা করা হলে ইতোপূর্বে বিভিন্ন সরকার কর্তৃক জাতীয়করণকৃত শিল্প কারখানার ভাগ্য বরণ করবে সরকারী মালিকানাধীন লাভজনক জ্বালানী তেল কোম্পানী সমূহ। ফলশ্র“তিতে  প্রাইভেট কোম্পানীর উদ্যেক্তাগণের খেয়ালখুশির কাছে জনগণের স্বার্থ  জিম্মি  হয়ে পড়বে। তাই আমরা সঙ্গত কারণেই এ উদ্যোগকে জাতীয় স্বার্থের  পরিপন্থী একটি আমলাতান্ত্রিক ষড়যন্ত্র বলে মনে করি।

উপরোক্ত অবস্থার প্রেক্ষিতে আমাদের সুস্পষ্ট বক্তব্য হল-কোন অবস্থাতেই বেসরকারীখাতে ফার্ণেস অয়েল ও ডিজেল আমাদানীর জন্য যৌথ মূলধনী কোম্পানী গঠনের উদ্যোগ তেল সেক্টরের শ্রমিক-কর্মচারী-কর্মকর্তারা মেনে নেবে না। দেশ ও জনগণের বৃহত্তর স্বার্থে বেসরকারীভাবে ফার্ণেস অয়েল ও ডিজেল আমাদানীর জন্য নতুন করে কোম্পানী গঠনের চেষ্ঠা পরিহার করার প্রয়োজনীয় উদ্যোগ আশু গ্রহণ করার জন্য আমরা বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন এর আওতাধীন সকল প্রতিষ্ঠানের সর্বস্তরের শ্রমিক-কর্মচার-কর্মকর্তাদের পক্ষ থেকে আপনাদের মাধ্যমে সরকারের প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানাচ্ছি। এরপরেও যদি সরকার তার এ সিদ্ধান্ত পরিবর্তন না করে, জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থী এ উদ্যোগের বিরুদ্ধে তেল সেক্টরের শ্রমিক-কর্মচারী-কর্মকর্তারা  অতীতের মত  দুর্বার  আন্দোলন গড়ে তুলতে বাধ্য হবে।

[নোট: এটি গত ০৯/১১/২০১৩ তারিখে চট্ট্রগ্রাম প্রেসক্লাবে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম অফিসার্স ফেডারেশন ও বাংলাদেশ অয়েল এ্যান্ড গ্যাস ওয়ার্কার্স ফেডারেশন আয়োজিত যৌথ সংবাদ সন্মেলনের লিখিত বক্তব্য।]