Wednesday, October 9th, 2013

সুপারক্রিটিক্যাল প্রযুক্তি কি সুন্দরবনকে রক্ষা করতে পারবে?: আঞ্জুমানের জবাবে

সুন্দরবনের সরকারী ভাষ্য অনুযায়ী ১৪কিলোমিটারের (গুগল মানচিত্র অনুযায়ী সর্বনিম্ন দূরত্ব মাত্র দশ কিলোমিটার) মধ্যে সরকার গত ৫ অক্টোবর ২০১৩ রামপাল তাপ বিদ্যুৎ প্রকল্পের ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করেছেন। রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের পরিবেশগত প্রভাব, সুন্দরবনের ভবিষ্যৎ এবং প্রকল্পের লাভালাভ প্রভৃতি বিষয়ে বিভিন্ন মহল থেকে যেসব প্রশ্ন, শঙ্কা উত্থাপিত হয়েছে এবং হচ্ছে সে সবের উপশম ঘটাতে ড.আঞ্জুমান ইসলাম নামের একজন ‘পানিপরিশোধন বিশেষজ্ঞ সম্প্রতি অনলাইন ভিত্তিক সংবাদ মাধ্যম বিডিনিউজ২৪.কম এ একখানা নিবন্ধ প্রকাশ করেছেন।

একজন পরিবেশবিদ এবং সচেতন নাগরিক হিসেবে তিনি বাংলাদেশের জ্বালানী উপদেষ্টা ড. তৌফিক- ই- এলাহির কাছে বিভিন্ন মহল থেকে ওঠা প্রশ্নের উত্তর জানতে চেয়েছেন এবং জনাব তৌফিক- ই – এলাহি তার সাথে দেখা করতে রাজি হয়ে সেসব প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন । এপর্যন্ত আসার পর একটি স্বাভাবিক প্রশ্নের জন্ম হয়। জ্বালানী উপদেষ্টার দেয়া উত্তর আঞ্জুমান ইসলাম কেন নিজের নামে বিডিনিউজ২৪.কম এ দিচ্ছেন? এই লেখার বহু জায়গায় আঞ্জুমান ইসলাম নিজের ব্যক্তিগত মতামতও দিয়েছেন। যেন জ্বালানী মন্ত্রণালয় এবং জ্বালানী উপদেষ্টার মুখপত্রে পরিনত হয়েছেন এই ‘পরিবেশ প্রকৌশলী’। কিন্তু এই কাজে অবর্তীন হয়ে পরিবেশ এবং প্রকৌশল উভয় ক্ষেত্রেই যে সব অজ্ঞতা প্রসূত মন্তব্য তিনি করেছেন, তা রীতিমত বিস্ময়ের উদ্রেক করে। জ্বালানি উপদেষ্টার ব্যক্তিগত মোসাহেবীর ভূমিকায় নামার কারণেই তার তথ্যগুলো সামান্যই বাস্তব ভিত্তিক থাকতে পেরেছে,  প্রায় সম্পূর্ণটাই ভুল বিশ্লেষণ, অসত্য তথ্যে ঠাসা। এক এক করে সেগুলো দেখার চেষ্টা করা যাক।

১. স্কেলহীন মানচিত্রের জালিয়াতি: গুগল কি বলে?

 

 

এই মানচিত্র ইআইএ প্রতিবেদন থেকে নেয়া, এই মানচিত্রের সাথে গুগল মানচিত্রের গুরুতর অসঙ্গতি রয়েছে। বিরল প্রতিভার নিদর্শন এই প্রাগৈতিহাসিক কায়দার মানচিত্রে কোন স্কেল ব্যবহার করা হয়নি। অথচ এই ছবি দেখিয়ে কয়েকটি ঠিকঠাক তথ্যর সাথে যে তথ্য আমাদের গেলাবার চেষ্টা করা হয়েছে:  খুলনা শহর থেকে এই প্রকল্পের দূরত্ব ২৩ কিমি।সুন্দরবন থেকে ১০ কিলোমিটার দূর দিয়ে বাফার জোন চিহ্নিত করা হয়েছে একটি প্রায় বৃত্তাকার কালো রেখা দিয়ে। এই বাফার জোনের বেশ কিছুটা (৪ কিমি) বাইরে প্রকল্প এলাকা। সবুজ চিহ্নিত পুরো জায়গাটি সুন্দরবন, যার মাঝখান দিয়ে পশুর এবং শিবসা নদী প্রবাহিত হচ্ছে। এই পশুর নদীর পাড়েই মংলা বন্দর এবং আরও কিছুদূর গেলে রামপাল বিদ্যুৎ প্রকল্প এলাকা।
প্রকল্পটি সুন্দরবন থেকে দশ কিলোমিটার বাফার জোনের বাইরে কিনা গুগল ম্যাপ থেকে দেখা যাক। প্রযুক্তিগত দিক থেকে গুগল ম্যাপ প্রায় নিখুঁত এবং এ বিষয়ে সর্বজন গ্রহণযোগ্যতা আছে, এতে Mercator Map Projection ব্যবহার করা হয়েছে । মার্কিনীরা সামরিক কাজে কিংবা পেশাদাররা তাদের প্রয়োজনে এই মানচিত্রের সহায়তা নিয়ে থাকেন।

 

 

আরেকটি প্রায় একই ধরনের অ্যাপ্লিকেশন গুগল আর্থ দিয়ে দূরত্ব মাপলে দেখা যায় সুন্দরবন থেকে ১০ কিমি এর যে বাফার জোন সরকারী EIA রিপোর্টে যে বাফার জোন দেখানো হয়েছে তার সাথে মেলেনা। উল্লেখ্য গুগল আর্থের ম্যাপ তৈরি করে নাসার Shuttle Radar Topography Mission(SRTM)। যা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের National Aeronautics and Space Administration (NASA), National Geospatial Intelligence Agency (NGA), National Imagery and Maping Agency (NIMA), US Department of Defence (DoD) এর সহায়তায় এবং তাদেরই প্রয়োজনে তৈরি হয়েছিল।

সুত্রঃ http://www2.jpl.nasa.gov/srtm/SRTM_paper.pdf

Farr et al., 2007, The ShuttleRadar Topography Mission, v. 45, Reviews of Geophysics, doi: 1029/2005RG000183.SRTM

 

 

এটি এতটাই নিখুত যে এতে বড়জোর ১ মিটার দূরত্ব পার্থক্য হতে পারে। তারমানে প্রায় বাফার জোনের লাইনের উপর এই প্রকল্প। সেক্ষেত্রে রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য তৈরি করা EIA রিপোর্টের মানচিত্রে প্রকল্প থেকে সুন্দরবনের দূরত্ব যে ১৪ কিমি এবং প্রকল্প থেকে বেশ দূর দিয়ে যে ১০ কিমি বাফার জোনের চিত্র আঁকা হয়েছে তার সঠিকতার ব্যপারে প্রশ্ন থেকেই যায়।

যাইহোক উনি যে প্রশ্নগুলো সামনে এনে জবাব দিয়েছেন সেগুলো একটু পর্যালোচনা করা যাক।

অভয়ারণ্য বনাম অরণ্য: প্রশ্ন 

স্থান চূড়ান্তকরণ, জমি অধিগ্রহণ, ভারতীয় কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি সম্পাদন ইত্যাদি সম্পন্ন হয়ে যাওয়ার পর র্অথাৎ সব সিদ্ধান্ত নেয়ার পর লোকদেখানো ইআইএ (Environmental Impact Assessment) করার যৌক্তিকতা কী?

উত্তর: এই প্রশ্নের উত্তরে নীতিমালা অনুযায়ী একটি তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনে ক্রনোলজিক্যালি কোন্ স্টেপের পর কোন্ স্টেপনিতে হবে সে সম্বন্ধে একটি তালিকা দিয়েছেন। সেখানে

“১/কি করতে চাই তা নির্ধারণ”

২/“প্রকল্প অর্থাৎ তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের লক্ষে যেসব ধাপ অনুসরন করতে হয়”

তার বক্তব্য অনুযায়ী বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি “অভয়ারণ্য (Sanctuaries) থেকে২৫ কিমি দূরে থাকা (আমাদের৭২ কিমি)।“ সে কারণে ক্ষতিকর হবে না।

এখানে আঞ্জুমান ইসলাম চতুরতার সাথে ‘অভয়ারণ্য’ শব্দটি ব্যবহার করেছেন। শব্দের এই রাজনীতি সকল পাঠকের বোঝার সুবিধার্থে পরিস্কার করা দরকার। সুন্দরবনকে বাঁচাবার আন্দোলন শুধু অভয়ারণ্য রক্ষার আন্দোলন নয়। অভয়ারণ্যের হিসেবে দূরত্ব মোটামুটি ঠিকই আছে, ৭২ কিমি। সেটা প্রকল্প এলাকা থেকে যথেষ্ট দূরেই বটে। কিন্তু সাধারণ মানুষের এই শঙ্কা শুধু অভয়ারণ্য রক্ষার জন্য না। যে কেউ জানেন, কোন বিশেষ এলাকায়,এমনকি কোন অরণ্যেও একাধিক এলাকাকে অভয়ারণ্য ঘোষণা করা হয় সেখানে বিশেষ কিছু প্রাণকে সংরক্ষণ করার জন্য। পরিবেশ আইন কিন্তু কেবল অভয়ারণ্যকেই সংরক্ষণ করার জন্য না। যেমন, পরিবেশ সংরক্ষন আইন ১৯৯৭ অনুযায়ী বেশ কিছু এলাকা যেমন অভয়ারণ্য, জাতীয় উদ্যান, গেম রিজার্ভ, বন্য প্রানির আবাসস্থল, জলাভুমি, ম্যানগ্রোভ, বনাঞ্চল, এলাকা ভিত্তিক জিব – বৈচিত্র্য সর্বোপরি যেকোনো পরিবেশগত স্পর্শকাতর এলাকা এর আওতায় পড়ে। দেখাই যাচ্ছে যে রক্ষা করতে চাওয়া সবগুলো বিষয়ের মাঝে অভয়ারণ্য একটা বিষয় মাত্র,একমাত্র না।

http://www.moef.gov.bd/html/laws/env_law/027-036.pdf

অতএব শব্দ পাল্টে দিয়ে পাঠকের সাথে আঞ্জুমান ইসলাম [অভয়ারণ্য (Sanctuaries) থেকে২৫ কিমিদূরে থাকা (আমাদের৭২ কিমিএই বুলেটটির মাধ্যমে] স্পষ্ট প্রতারনা করেছেন। সুন্দরবণকে রক্ষাকে তিনি খুবই সীমিত করে অভয়ারণ্যে পর্যবসিত করেছেন। শুধু অভয়ারণ্য হিসেবে ঘোষিত অঞ্চলটুকুকে বহু দূরে অবস্থিত দেখিয়ে নয়, বাকি অরণ্যকে ধ্বংসের ঝুঁকিতে ফেলেছেন যা মেনে নেয়া যায় না, কেননা রামপালের কারণে সুন্দরবনের বাকি অংশগুলো বিপদগ্রস্ত হলে এই অভয়ারণ্য গুলো আর ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইটও শেষ পর্যন্ত টিকবে না ।

আগে খুন পরে বিচার: লোক দেখানো ইআইই

দ্বিতীয় শিরোনামের অধীনে “ইকনমিক, এনভায়রনমেন্টাল সামাজিক ইমপ্যাক্ট পর্যালোচনা করে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রনালয়ের ছাড়পত্র গ্রহণ” এই বুলেটটি এক লাইনে শেষ করেছেন তিনি। এখানেও চালাকি। সেটা হল: এই পর্যায়টি দুটি ভাগে সম্পন্ন হবে।

১. ইকনমিক, এনভায়রনমেন্টাল ও সামাজিকইমপ্যাক্ট পর্যালোচনা করা

২.সংশ্লিষ্ট মন্ত্রনালয়ের ছাড়পত্র গ্রহণ

এক্ষেত্রে ইকোনমিক, এনভায়রনমেন্টাল ও সামাজিক ক্ষতিকর প্রভাব না থাকলেই পরিবেশ মন্ত্রণালয় ছাড়পত্র দেবে। কিন্তু যদি ক্ষতিকর প্রভাব থাকে তাহলে ছাড়পত্র দেবে না। ফলে একলাফে এই দুই পর্যায় শেষ হবার উপায় নেই, কিংবা পরের কাজটি আগে করার বৈধতা নেই। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে EIA রিপোর্টেই উল্লেখ করা অনেক অনেক পরিবেশগত ক্ষতিকর প্রভাব থাকা সত্ত্বেও এর পরিবেশগত ছাড়পত্র শেষপর্যন্ত দেয়া হয়েছে। কিন্তু মজা এইখানেই।

ছাড়পত্র পেলেই কেবল যে যে কাজগুলো করার কথা (স্থান চূড়ান্তকরণ, জমি অধিগ্রহণ, ভারতীয় কোম্পানির সঙ্গেচুক্তি সম্পাদন,প্রকল্পের জায়গায় মাটি ভরাট) এগুলো কিন্তু তার আগেই করে ফেলা হয়েছে! মাত্র গত ৬ সেপ্টেম্বর তারিখ পরিবেশ অধিদফতর ছাড়পত্র দিয়েছে। অথচ এই ছাড়পত্র পাবার আগেই পরের কাজগুলো সম্পন্ন হয়েছে, লোকজনকে ভিটেমাটি থেকে, আবাদী জমি থেকে, পুকুর ঘাট থেকে উচ্ছেদ করা হযেছে। ইআইএ-র জন্য তারা অপেক্ষা করার কোন প্রয়োজনই তারা দেখেননি। এরমানে হল নামকাওয়াস্তে একটি EIA রিপোর্ট নিয়ম রক্ষার্থে করা হয়েছে।আসলে ধারাবাহিক কাজের যে তালিকা কিংবা স্বাভাবিক বিবেচনাবোধ থেকেও যা করা উচিত তাকরা হয়নি।  এই কারণেই ইআইএ প্রতিবেদনকে লোক দেখানো বলা হয়েছে, এবং সেই বলাটা খুবই যৌক্তিক।

ভারতীয় আইন নিয়ে জালিয়াতি: প্রশ্ন

যে ভারতীয় কোম্পানি এনটিপিসি ভারতের ওয়াইল্ড লাইফ প্রোটেকশান অ্যাক্ট ১৯৭২ অনুযায়ী কোনো সংরক্ষিত বনাঞ্চলের ১৫ কিমির মধ্যে কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করতে পারে না, সেই এনটিপিসি কেমন করে বাংলাদেশের সুন্দরবনের মতো একটা সংরক্ষিত বনাঞ্চলের ১৪কিমির মধ্যে ১৩২০ মেগাওয়াটের একটা বিশাল কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করার সুযোগপেতে পারে?

জ্বালানী উপদেষ্টার বরাত দিয়ে হোক কিংবা একজন পরিবেশ প্রকৌশলী হিসেবে হোক তিনি যা বর্ণনা করেছেন তা পরিস্কার অসাধুতা। পাঠকের সুবিধার জন্য তার আলচনার এই অংশটি হুবহু তুলে দেয়া হল, সাথে খেয়াল করিয়ে দেই, ভারতে এই বিধানটি ১৫ কিলোমিটারের নয়, ২৫ কিলোমিটারের। এই ধরনের ভাসাভাসা আন্দাজি কথা বলা পরিবেশবিদের পক্ষেই সুন্দরবন ধ্বংসের জিহাদে নামা সম্ভব।

আঞ্জুমানইসলামের উত্তর: এই অভিযোগটি মিথ্যা। ভারতের আইনেও বনাঞ্চলের দশ কিলোমিটারের মধ্যে কোনো স্থাপনা করা নিষিদ্ধ যা কিনা বাংলাদেশের আইনটির মতোই। ভারতের Ministry of Environment and Forest এর ওয়েবসাইটে ২০১১ সালের আগস্ট মাসে এ সংক্রান্ত গাইড লাইনটি প্রকাশের গেজেট নোটিফিকেশন আছে এই লিঙ্কে

http://envfor.nic.in/assets/fc-guidlines-1.pdf

উল্লেখ্য যে এনটিপিসি ইতোমধ্যে মোট ৩১৮৫৫ মেগাওয়াট ক্ষমতার ১৬টি কয়লা ভিত্তিক তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করেছে এবং আরও ৭টি সুপার ক্রিটিক্যাল নির্মাণাধীন রয়েছে।

ভুল প্রশ্নকরে শুরুতেই পাঠককে একটি ভুল জায়গায় ঠেলে দেয়া হয়েছে। সত্যি পশ্চিমা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া এই পরিবেশবিদ শুধু জ্ঞান অর্জনই করেননি, কিছুটা চতুরতাও অর্জন করেছেন।

দেখা যাক ভারতের পরিবেশ এবং বন অধিদপ্তর কি নির্দেশ দিয়েছে যার কারনে NTPC ভারতে এই প্রকল্প করার অনুমতি পায়নি। পরিবেশবাদী হিসেবে আঞ্জুমান ইসলামের অবশ্যই জানা উচিত যে থারমাল পাওয়ার প্লান্টের বিষয়ে ভারতের পরিবেশ ও বন মন্ত্রনালয়ের সুনির্দিষ্ট আইন এবং তার প্রেক্ষিতে আরও সুনির্দিষ্ট করে কিছু গাইডলাইন আছে। যার কারনে NTPC চাইলেই ভারতের যেখানে সেখানে থারমাল পাওয়ার প্ল্যান্ট করতে পারেনা। যেখানে বলা আছে

“Locations of Thermal Power Stations areavoided within 25 km of the outer periphery of the following: metropolitancities; National Park and Wildlife Sanctuaries; Ecologically Sensitive areaslike tropical forest, biosphere reserve, important lake and coastal areas richin coral formation;”

সুত্রঃ [http://envfor.nic.in/sites/default/files/TGM_Thermal%20Power%20Plants_010910_NK.pdf]

আঞ্জুমান কোন মানের পরিবেশবিদ, পাঠকরা আশা করি বুঝতে পেরেছেন। ভারতের মত গূরুত্বপূর্ণ একটি দেশের শিল্পনীতি সম্পর্কে এই রকম অদৃষ্টপূর্ব অজ্ঞতা নিয়ে তিনি দিব্যি বড় গলায় বাকবাকুম করে গেছেন। সাধারণ যে কোন বিষয় যে কেউ নাই জানতে পারেন, কিন্তু পরিবেশিবদ হতে হলে এগুলো জানাটা সাধারণ ন্যূনতম মানদণ্ডে বাধ্যতামূলক।

উল্লেখ্য যে, আঞ্জুমান ১০ কিলিমিটারের সীমা বিষয়ে যে আইনটির উদাহরণ দিয়েছেন, সেটি শিল্প ব্যতীত আর সব ক্ষেত্রের জন্য প্রযোজ্য, যেমন কৃষিকাজ, ঘরবাড়ি নির্মাণ ইত্যাদি। থার্মাল প্লান্টের জন্য যে ভিন্নবিধিমালার কথা আমরা উল্লেখ করেছি, সেটা মেনে চলা হয় কঠোরভাবে। এই কারণেই এনটিপিসি ভারতে রাজীবগান্ধী ন্যাশনাল পার্কের কাছে একটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎপ্রকল্প বাস্তবায়ন করতেপারেনি।

জালিয়াত আর চালিয়াত: যে প্রক্রিয়ায় স্পর্শকতার এলাকা পরিণত হলো আবাসিক ও গ্রাম্য এলাকায় প্রশ্ন:

EIA রিপোর্টে সুন্দরবনকে পরিবেশগত স্পর্শকাতর এলাকার বদলে আবাসিক ও গ্রাম্যএলাকা হিসেবে বিবেচনা করা হল কেন? কেন ক্ষতিকর সালফার ও নাইট্রোজেন গ্যাসের বর্তমান মাত্রা কমিয়ে দেখানো হল এবং বিদ্যুৎ কেন্দ্র চালু হওয়ার পর বাড়তি বিষাক্ত গ্যাসকে প্রতারণার মাধ্যমে নিরাপদ সীমার মধ্যে দাবি করা হল?

আঞ্জুমান ইসলামের উত্তর: “বাংলাদেশ পরিবেশ অধিদপ্তরের সর্বশেষ অর্থাৎ ২০০৫ সালের বিধি-বিধান/ নির্দেশনা অনুযায়ী EIA রিপোর্ট তৈরি করা হয়েছে। এতে শহর/আবাসিক/গ্রাম্য এলাকা ভিত্তিক কোনো Classification নেই। বাংলাদেশ পরিবেশ অধিদপ্তরের বিধি অনুযায়ী সুন্দরবনের বাউন্ডারি সীমানা হতে ১০ কিমি পর্যন্ত ECA (Environmental Critical Area) এলাকা ঘোষিত আছে। এ ১০ কিমি ECA হতে আরও ৪ কিমি দূরত্বে অর্থাৎ ১৪ কিমি দূরে বিদ্যুৎ কেন্দ্রটির অবস্থান বিধায় কোনো বিধি-বিধান লঙ্ঘন করা হয়নি। ১০ কিমি দূরত্বে জায়গাটি সন্দেহাতীত ভাবেই বসবাসযোগ্য ও গ্রাম্য জায়গা হিসেবে বিবেচ্য।”

এখানেও তথ্য বিকৃতি অথবা গোপন করা হয়েছে।

প্রথমতঃ EIA রিপোর্টের ২০৮ পৃষ্ঠায় বলা হয়েছে “Once it was a part of Sundarbans but had been evacuated by the settlers.”অর্থাৎ একসময় এটি সুন্দরবনেরই অংশ ছিল কিন্তু বসতি স্থাপনের কারনে বন উজাড় হয়ে গিয়েছে। এখন উত্তর দেয়ার বেলায় আঞ্জুমান ইসলাম বলছেন ২০০৫ সালের বিধি/বিধান নির্দেশনা অনুযায়ী EIA রিপোর্ট তৈরি করা হয়েছে যাতে শহর/আবাসিক/গ্রাম্যএলাকা ভিত্তিক কোনো Classification নেই, বাফার জোনের ৪ কিমি বাইরে থাকার কারনে জায়গাটি অবশ্যই বসবাস যোগ্য গ্রাম্য জায়গা হিসেবে বিবেচ্য।

EIA রিপোর্টের ২৭৮ পৃষ্ঠায় আছে “The concentration of SO2 in the ambient air near Sundarbans region is found 8 to 10 µg/m 3(field monitoring data, seeTable 6.5). Hence, it is found that the resultant concentration (24 hr average after emission contribution and only during November to February) from the power plant) of SO2 in the ambient air may be maximum 53.4 µg/m 3 (see Table8.3c) which is much below the MOEF’s standard(ECR 1997), 80 µg/m3 for residential and rural area. Therefore, the concentration of emitted SO2 is very insignificant to have any impact on Air quality of Sundarbans. However,daily monitoring of emission rate is recommended for protecting Sundarbans from impact of emitted gas.”

বোঝাই যাচ্ছে EIA রিপোর্ট করা হয়েছে ECR 1997 অনুযায়ী তবু আঞ্জুমান ইসলাম কেন বলছেন এটি ২০০৫ এর বিধান অনুযায়ী করা হয়েছে। সেখানেও জালিয়াতি করে গ্রাম আবাসিক এলাকার মানদণ্ড ব্যবহার করা হয়েছে এবং বলা হয়েছে যে কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্প করা হলেও সেখানে প্রতি মিটারে ৫৩.৪ মাইক্রোগ্রাম সালফার ডাই অক্সাইড উৎপন্ন হবে,যেটা গ্রাম এবং আবাসিক এলাকার চেয়ে অনেক নিচে ।সুন্দরবনে যদি ঢাকা শহরের মানদণ্ডে সালফার ডাই অক্সাইড নিঃসরণ ঘটে, তাহলে সেটা টিকে থাকবে, এটা ভাবাটা হাস্যকর। পাঠক খেয়াল করুন, ওই প্রতিবেদনেই বলা আছে আলোচ্য অঞ্চলে বর্তমানে প্রতি মিটারে মাত্র ৮-১০ মাইক্রোগ্রাম সালফার ডাইঅক্সাইড রয়েছে। এই অতি সামান্য সালফার ডাইঅক্সাইডের স্তর থেকে ৫৩.৪ এর মত ভয়াবহ মাত্রায় পৌঁছানোর প্রক্রিয়ার বিপদকে আড়াল করার জন্যই জালিয়াত ইআইএ রিপোর্টে এটাকে আবাসিক ও গ্রামএলাকা বলা হয়েছে।  আর আঞ্জুমান ইসলাম নামের পরিবেশবিদের যদি সত্যি অজানা থাকে, তাহলে দয়া করে পড়ে নেন Bangladesh Environment ConservationRules, 1997, page 26. [http://www.moef.gov.bd/html/laws/env_law/178-189.pdf]

এখানে স্পষ্ট করে চারটি স্থানের জন্য বন পরিবেশ মন্ত্রণালয় Air Standard দিয়ে দিয়েছেন। সেই চারটি স্থানের মধ্যে একটি হল “Sensitive”। নোটে আরও বলা আছে

“At national level, sensitive area includes monuments, health centre, hospital, archaeological site, educational institution, and government designated areas (if any).”।

পাশাপাশি যেসব কারনে NTPC এই একই প্রকল্প ভারতে করতে পারলনা তার একটিও এটি। কারন প্রকল্প স্থলে তাদের যে স্ট্যান্ডার্ড সে অনুযায়ী SOx, NOx এর পরিমান বজায় রাখা যাবেনা।

[Manual on norms and standards for environment clearance of large construction projects. Ministry of Environment and Forests, Government of India, Page 24. http://envfor.nic.in/divisions/iass/Construction_Manual.pdf]”

তাহলে ব্যপার যা দাঁড়াল তা হল EIAরিপোর্টে ইচ্ছাকৃত ভাবে SO2 এবং NOxএর পরিমান দেখানোর সময় প্রকল্প স্থানকে গ্রাম/ আবাসিক এলাকা হিসেবে দেখানো হয়েছে এবং এই জালিয়াতিকে আড়াল করার জন্যই আঞ্জুমানের চালিয়াতি:সরকারী কোন  নির্দেশনা তো নাই এই এলাকা গুলোকে পৃথক করে দেখাবার।

পুকুর ভরাটের পুকুর চুরি: প্রশ্ন:

বড়পুকুরিয়ার ২৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ছাই যেখানে অব্যবহৃত থেকে ছাই পুকুরভর্তি হচ্ছে, ছাই উড়ে এবং ছাই ধোয়া পানি চুইয়ে মাটির নিচের পানির স্তর দূষিত করছে, সেখানে ১৩২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বছরে সাড়ে ৯ লক্ষ টন ছাইয়ের ব্যাবস্থাপনা কী হবে? সীসা, পারদ, আর্সেনিক ইত্যাদি বিষাক্ত ভারি ধাতুসম্পন্ন ছাই দিয়ে ১৪১৪ একর জমি ভরাট করা হবে কোন বিবেচনায়?

আঞ্জুমান ইসলামের উত্তরঃ এটি একটি অসত্য তথ্য। ১৩২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ছাই দ্বারা ১৪১৪ একরজমি ভরাট করা হবে না।

অথচ EIA রিপোর্ট পৃষ্ঠা ২৬৩ গেলেই দেখতে পাবেন আঞ্জুমান আন্দাজে বক শিকার করছেন, কেননা সেখানে বলা আছে যে, দ্বিতীয় স্তরে বিদুৎ কেন্দ্রের ছাই দিয়েই মাটি ভরাট করা হবে।

8.2.1……. At the initial stage, 420 acre ofland shall be developed for site establishment. The existing low to medium highland within the project area will be changed to high land. The rest of the land shall be developed for 2nd phase of the project by dumping of ash slurry to be generated from the power plant.

যার অর্থ দাড়ায় শুরুতে প্রকল্প চালু করার জন্য ৪২০ একর জায়গা মাটি দিয়ে ভরাট করা হবে অবশিষ্ট জায়গাবিদ্যুৎ কেন্দ্রের বর্জ্য ছাই দ্বারা পরবর্তীতে ভরাট করা হবে।

আরও বলেছেন ইলেক্ট্রো – স্ট্যাটিক প্রিসিপেটরের মাধ্যমে ৯৯.৯৮ ছাই Capture করা হবে। … এছাড়া উৎপাদিত ছাই দ্বারা ইট তৈরি, রাস্তা নির্মাণ ইত্যাদি কাজে ব্যবহার করা যাবে বলে ছাই রাখার জন্য কোনো সমস্যার সৃষ্টি হবে না।… প্রস্তাবিত বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি হবে সুপার-ক্রিটিক্যাল পাওয়ার প্ল্যান্ট এবং অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ও পরিবেশ বান্ধব যন্ত্রপাতির দ্বারা নির্মাণ করা হবে এটি।

এই  প্রকৌশলী কি জানেন ইলেক্ট্রো – স্ট্যাটিক প্রিসিপিটেটর প্রকল্পের ব্যয় কত অসম্ভব পরিমান বাড়িয়ে দেবে এবং এর Efficiency বেশ কিছু জটিল ফ্যাক্টরের (Resistivity, Sulpher Content, Particle Size, Particle Shape, Particle Cohesivity, Temperature, Re-entrinment) উপর নির্ভরশীল। স্বর্ণের দামে বিদ্যুৎ কিনতে গেলেই এগুলো যথযথ পালন করা সম্ভব। তাহলেই কেবল এটি ৯৯.৯৮ ভাগ ছাই সংগ্রহ করতে পারবে। কিন্তু স্বর্ণের দামে বিদ্যুৎ নিশ্চয়ই কেনা যাবে না। ফলে মুখস্থ বলে ফেলা আর বাস্তবে ৯৯ ভাগ ছাই পরিস্কার করার মধ্যে অনেক তফাত। [ACARP Report on Electrostatic Pricipitation of Fly Ash From Australian Bituminous Coals, Australian Coal Research Limited, Issu No 4,January 1998]

কে কিনবে এতো ছাই: ছাই কিনবেগো ছাই…

উৎপন্ন বিষাক্ত ছাইয়ের কি হবে, সেই প্রশ্নে তিনি বলেছেন এই বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে বছরে ১৯ লক্ষ টন ছাই উৎপাদন হবে অথচ বছরে বাংলাদেশের বিভিন্ন শিল্পে ছাইয়ের চাহিদা ২২ লক্ষ টন। এখন তাহলে প্রশ্ন আসে যে পরবর্তী পর্যায়ে যখন এখানে আরও ১৩২০ মেগাওয়াট, মহেশখালীতে ৫২৪০ মেগাওয়াট, আনোয়ারায় ২৬৪০ মেগাওয়াটের বিদ্যুৎ কেন্দ্র বসানো হবে তখন কি সেইসব ছাই জ্বালানী উপদেষ্টা তৌফিক – এ – এলাহি বা আঞ্জুমান ইসলাম তাদের পৈতৃক ভিটায় নিয়ে জমাবেন কিংবা এমন কোন জায়গায় রাখবেন, যেখানে বাকি দেশের পরিবেশের কোন ক্ষতি হবে না? তাদের অনুরোধ করি, দয়া করে তেমন কাজ করবেন না, কারণ আপনার বাড়িও বাংলাদেশের প্রতিবেশ থেকে বিচ্ছিন্ন না। উল্লেখ্য যে, বড়পুকুরিয়ার এই ছাই দিব্যি অবিক্রিত আছে, এই বিষাক্ত বর্জ্য সেখানেই গাদা করে রাখা আছে। কোন ইট কিংবা সিমেন্ট কোম্পানিই তা কেনার আগ্রহ দেখায়নি। অথচ এই মোসাহেবরা সেই মূলো জনগণের সামনে ঝুলিয়ে চলছেন।

সুপারক্রিটিক্যালের দৌড়: কতটা দূষণ কমবে আদৌ?

আঞ্জুমান বলেছেন সুপার ক্রিটিক্যাল পাওয়ার প্ল্যান্ট বসিয়ে CO2, SOx, NOx এর দূষণ কমানো হবে।

CO2 বিকিরনের ক্ষেত্রে চিত্র ৪ আমাদের বলে দেয় তা কতটা সফল হবে। আগের প্রযুক্তির বিদ্যুৎ কেন্দ্র প্রতি কিলোওয়াট/ ঘণ্টায় ১২০০ গ্রাম CO2উৎপন্ন করত, নতুন এই প্রজুক্তি কিলোওয়াট/ ঘণ্টায় প্রায় ১০০০ গ্রাম CO2 উৎপাদনকরবে। সুতরাং পাঠক নিজেই হিসাব করে নিন যে এতে আমাদের কতটা লাভ হবে: কিলোওয়াট প্রতি ঘন্টায় ২০০ গ্রাম কার্বন ডাই অক্সাইড নিঃসরণ কমবে। বাকি ১০০০ গ্রাম কার্বন ডাই অক্সাইড থেকেই যাবে। এমনকি তারা যদি আলট্রাক্রিটিক্যাল প্রযুক্তি ব্যবহার করতেন, তাহলে আরও ২০০ গ্রাম নিঃসরণ কমবে, থেকে যাবে তখনও ৮০০ গ্রাম কার্বন ডাই অক্সাইড!

সহজ সিদ্ধান্তটা পাঠক নিয়ে নিতে পারেন, সুপারটুপার বাদ,আলট্রাক্রিটিক্যাল প্রযুক্তি ব্যবহার করেও সুন্দরবনের পাশে এমন প্রকল্প হতে পারেনা। অথচ আঞ্জুমানের কথা শুনে অনেকেরই ধারণা হয়েছে খোদ সুন্দরবনের মাঝেও এই বিদ্যুৎ প্রকল্প হলে তেমন কোন ক্ষতি হবে না।

আঞ্জুমান কি পড়েছেন আদৌ সরকারী ইআইএ প্রতিবেদন?: প্রশ্ন

বিদ্যুৎ কেন্দ্রের যন্ত্রপাতি, যানবাহন, নির্মাণকাজ, পরিবহণ, ড্রেজিং ইত্যাদি কাজে যে ব্যাপক শব্দদূষণ হবে তা থেকে সুন্দরবন রক্ষা পাবে কী করে?

আঞ্জুমান ইসলামের উত্তর: এই তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের কারণে সুন্দরবনে শব্দদূষণ বাড়ার কোনো কারণই নেই।

অথচ সরকারী EIA রিপোর্টপৃষ্ঠা ২৬৪ এ ঠিক তার বিপরীত কথা বলা আছে।

8.2.6  Impact on ambient noise

Operation of different machineries and equipments for construction activities, running of heavy load traffic for construction materials transportation, and regular traffic movement may generate noise during construction period. The produced noise may have impact on existing acoustic environment of rural category defined in ECR, 1997.

যেখানে EIA রিপোর্টেই স্বীকার করা হয়েছে যে শব্দ দূষণ হবে সেখানে আঞ্জুমান ইসলাম বেশ আত্মবিশ্বাসের সাথে বলছেন শব্দ দূষণ বাড়ার কোন সম্ভাবনা নাই। আরেকটি বিষয় হল নির্মাণ কাজ থেকে শুরু করে বিদ্যুৎ কেন্দ্র চালু হওয়া পর্যন্ত সমস্ত দরকারি সামগ্রিই পশুর নদী দিয়ে পরিবহন করা হবে। চিত্র১ ও ২ এস্পষ্ট দেখানো হয়েছে যে এই নদী সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত। ফলে জাহাজ চলাচলের শব্দ, উচ্চ ঢেউ সবই বনের স্বাভাবিক প্রাকৃতিক পরিবেশ, ডলফিনের আবাস-স্থল বিনষ্ট করবে।এর পাশাপাশি নিয়মিত জাহাজ চলাচলে যাতে বিঘ্ন না ঘটে সেজন্য ড্রেজিং করা হবে। এরফলে পরিবশের ক্ষতির আশংকা EIA রিপোর্টের ২৬৫ পৃষ্ঠায়ই করা হয়েছে। এবং পাঠককে স্মরণ রাখার অনুরোধ করি, এই প্রকল্পকে বৈধতা দেয়ার কথা মাথায় রেখে সম্পাদিত ইইআইএ প্রতিবেদনে সকল ক্ষতিই যথাসম্ভব কমিয়ে দেখাবার চেষ্টা আছে।

দুর্ঘটনা হঠাৎ করেই ঘটে: প্রশ্ন

যেখানে সুন্দরবনের ভিতর দিয়ে নদীপথে সাধারণ র্কাগো স্টিমার পরিবহণেই সুন্দরবন বিপন্ন হচ্ছে এবং এ বিষয়ে তীব্র আপত্তি উঠছে, সেখানে কয়লার মতো দূষণকারী কার্গোভর্তি জাহাজ কোন বিবেচনায় সুন্দরবনের ভিতর দিয়ে বছরে ২৩৬ দিন করে চলাচল করবে? জাহাজের শব্দ, জাহাজ নিঃসৃত তেল, কয়লার গুড়া/টুকরো কয়লা, জাহাজ চলাচল প্রসূত ঢেউ, সার্চলাইটের আলো ইত্যাদি থেকেসুন্দরবন রক্ষা পাবে কী করে?

উত্তর: সমস্ত বিষয়ের গ্যারান্টি দিয়ে দিচ্ছেন এক্ষেত্রে আঞ্জুমান ইসলাম। বলছেন কোন ক্ষতি হবার সম্ভাবনা নেই। যে কোনো বাস্তব বুদ্ধি সম্পন্ন ব্যক্তি অবশ্যই দুর্ঘটনা না ঘটার বিষয়ে বা দুর্ঘটনা না ঘটলেও প্রশ্নে উল্লেখিত ঘটনা সমূহ না ঘটার গ্যারান্টি দেবেন না। কয়লা না হোক জাহাজের তেল চুইয়ে পড়তে পারে, আস্ত জাহাজই দুর্ঘটনায় পড়তে পারে, যা থেকে সমগ্র সুন্দরবন অঞ্চলে তেল কয়লা ছড়িয়ে পড়বে। এমন নয় যে এসব ঘটনা কোথাও ঘটছে না। যেকেউ http://en.wikipedia.org/wiki/List_of_oil_spills লিঙ্কে গেলে দুর্ঘটনার একটি বিশাল তালিকা দেখতে পাবেন। এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল অন্যান্য জায়গায় দুর্ঘটনা ঘটা এক বিষয় আর সুন্দরবনের আশেপাশে অথবা পশুর নদীতে এধরণের দুর্ঘটনা ঘটার ঝুঁকি আমরা নিতে পারি কিনা, সে কারণেই সুন্দরনকে এই ধরনের বিপদজনক সামগ্রী পরিবহনের পথ বানানো যায় না।

সালফার ডাই অক্সাইডের কি হবে: প্রশ্ন

মেগাওয়াট পিছু বছরে ২৫০০ টন কয়লা লাগে। ১২ টন কার্বন, ৪৪ টন কার্বন ডাই অক্সাইডউৎপাদন করে। তাই ১৩২০ মেগাওয়াটের প্ল্যান্ট থেকে বছরে ১৩২০x২৫০০x.৭৫ টন কার্বন ডাই অক্সাইড বের হবে। এই কার্বন ডাই অক্সাইডের কারণে লোকাল বৃষ্টির পানির পিএইচ কতটুকু পাল্টাবেএবং সেটা সুন্দরবনের ক্রাস্টাশিয়ানস ও অন্যান্য মাইক্রোবসের জন্যে নিরাপদ কিনা। সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ গাছ মাটির স্যালিনিটি লেভেল নিয়ন্ত্রণের জন্য ক্রাস্টাশিয়ানসের ওপর নির্ভরশীল।

বেশ ভাল করে এই প্রশ্নে তিনি ১৩২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে কি পরিমান কার্বন, কার্বন ডাইঅক্সাইড উৎপন্ন হবে তার হিসেব দিলেন, কিন্তু এই পরিমান কার্বন ডাই অক্সাইড বাংলাদেশসহ বৈশ্বিক জলবায়ু এবং উষ্ণতা বৃদ্ধিতে কিভাবে অবদান রাখবে সে বিষয়ে পুরা নিশ্চুপ। জলবায়ু পরিবর্তন এবং তাপমাত্রা বৃদ্ধির ভয়াবহ প্রতিক্রিয়ায় বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের মানুষ বছরের পর বছর মানবেতর জীবন যাপন করতে বাধ্য হচ্ছে। একজন পরিবেশবিদ হিসেবে তিনি কিভাবে এই বিষয়টি এড়িয়ে গেলেন সেটি অবাক করার মত। আর কার্বন ডাইঅক্সাইড স্থানীয় বৃষ্টির Ph কতটুকু পাল্টে দিবে তা নিয়ে একটি নাতিদীর্ঘ ব্যাখ্যা এই প্রশ্নের উত্তরে আছে। প্রশ্নটিই বিভ্রান্তিকর, কারণ কার্বন ডাই অক্সাইডের কারণে পিএইচ মূলত বাড়বে না, বাড়বে সালফার ও নাইট্রোজেনের অক্সাইড গুলোর কারণে। (পাঠক অবশ্য আগেও এই লেখায় খেয়াল করেছেন হিংটিং ছট মার্কাসুরে বৈজ্ঞানিক পরিভাষা ব্যবহার করে মানুষকে ধোঁকা দেয়ার প্রবণতা তার আছে।)। এখন দেখা যাক কি পরিমান সালফার কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে নিঃসরিত হয়।

চিত্র৫: বিভিন্নধরনের বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে SOx উৎপাদনের পরিমান।

দেখা যাচ্ছে কয়লা থেকে গতানুগতিক প্রজুক্তিতে প্রতি কিলোওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে গেলে ৪ থেকে ৫ গ্রাম SOx উৎপন্ন হয়। বিভিন্ন গবেষণা থেকে দেখা যায় অতি উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করে সালফার ডাইঅক্সাইডের নিঃসরণ অনেক কমানো যায়। যা উপরের চিত্রেও দেখা যাচ্ছে, যে জাপানের আলট্রাসুপার ক্রিটিক্যাল কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র গুলোতে প্রতি কিলোওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনে ০.০৬ থেকে ০.০৮ গ্রাম সালফার ডাই অক্সাইড নিঃসরিত হয়। [সুত্রঃ Emission From Coal Fired Power Generation,IEA High Efficiency, Low Emission Coal Technology Road Map, Energy Technology Policy Division, International Energy Agency] যা সুপার ক্রিটিক্যাল কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্রের সালফার নিঃসরণের চেয়েও অনেক কম। কিন্তু সেই ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহারেরঅ র্থনৈতিক সামর্থ্য বাংলাদেশের আছে কিনা এবং তা থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ আদৌ সাধারণ মানুষ কিংবা শিল্প উদ্যোক্তারা কিনে পোষাতে পারবেন কিনা ভেবে দেখার বিষয়। কিন্তু সুন্দরবনের কাছে আলট্রাসুপার ক্রিটিক্যাল পদ্ধতিতে উৎপন্ন সালফারের পরিমানও ধ্বংস্বাত্মক, সেখানে তারা সুপার ক্রিটিক্যাল প্রযুক্তি ব্যবহারের ঘোষনা দিচ্ছেন। 

লোনা পানির আগ্রাসন: প্রশ্ন

রামপাল প্ল্যান্টে পালভারাইজড কোল ব্যবহার করা হলে একদিক দিয়ে ছাই উৎপাদন কমবে, কিন্তু পানির ব্যবহার বাড়বে। এই মিঠা পানি পশুর নদী থেকে সংগ্রহ করা হলে নদীর উজানে লবণাক্ততা কতদূর পর্যন্ত বৃদ্ধি পাবে এবং পরিবেশের ওপর তার প্রভাব কী হবে?

EIA রিপোর্টের বরাত দিয়ে তিনি বলেছেন প্রতি ঘণ্টায় পানির কার্যকর ব্যবহার মাত্র ৪০০০ মি। এতে তেমন কোনক্ষতি হওয়া বা লবনাক্ততা বৃদ্ধি পাওয়ার আশংকা অমূলক।

আমাদের বক্তব্য হল কয়লাভিত্তিক বিদুৎ প্রকল্পের ফলে সুন্দরবনের লবনাক্ততা বাড়বে এ বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই, সেটা বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির মত জটিল এবং সামান্য দূরবর্তী বিষয় বাদ দিয়েও প্রত্যক্ষ কিছু কারণেও ঘটবে। এই প্রকল্পে প্রতিদিন ব্যবহার করা হবে দিনে (গ্রস) ২০১৬০ কিউসেক এবং কার্যকর ব্যবহার (এই পানি নাই হয়ে যাবে যন্ত্রপাতি ঠাণ্ডা সহ আরও কিছু প্রয়োজনে) ৯৬০ কিউসেক পানি। ছোট খাট একটা নদীর স্রোতের সমান পানি। এই পানি যদি ভূগর্ভের মিষ্টি পানি টেনে করা হয়, দ্রুতই মিষ্টি পানির স্তরে শূন্যতা দেখা দেবে, সেই শূন্যতা পূরণ করবে সমুদ্রের লোনা পানি। অর্থাৎ ভূগর্ভে পানির স্তরে লোনা পানির আগ্রাসন বাড়বে।অন্যদিকে যদি এই পানি পশুর নদী থেকে তোলা হয় এবং তা শোধন করে মিষ্টি পানি বানিয়ে প্রকল্পে ব্যবহার করা হয়, সেক্ষেত্রে খরচ বাড়বে বহুগুন। এই রকম একটি জালিয়াত প্রকল্প যে খরচ বাঁচাবার জন্য নলকূপ দিযে মিঠা পানিই সংগ্রহ করবে। কিন্তু পশুর নদীর উজানে আরও বিপুল হারে পানি প্রত্যাহার হচ্ছে, তাতে আরও যা ঘটবে তা হলো পশুর নদীতে যে পানি শূন্যতা তৈরি হবে, তাতেও সমুদ্রের পানি নদী পথে সরাসরি আরও বেশি উজানে উঠতে থাকবে।

রিবেশবিদের ভূগোলজ্ঞান: ‘সুন্দরবনের পূর্বদিকে সামান্য অংশে’: প্রশ্ন১১

ছাই কীভাবে ডাম্প করা হবে এবং সম্ভাব্য সুন্দরবন বাউন্ডলোকাল উইন্ডে হাত থেকে কীভাবে রক্ষা করা হবে?

আঞ্জুমান ইসলামের উত্তর: “…তার উপর সুন্দরবনের অবস্থান বিদ্যুৎ কেন্দ্র হতে দক্ষিণপশ্চিম দিকে, বছরে ৯ মাস দক্ষিণ দিক হতে উত্তর দিকে বায়ু প্রবাহিত হয়। অর্থাৎ সুন্দরবন হতে বিদ্যুৎ কেন্দ্রের দিকে প্রবাহিত হয় বলে সুন্দরবনের কোনো ক্ষতির আশংকা নেই। শীতকালে (৩ মাস) বাতাস উত্তর দিক হতে দক্ষিণপূর্ব দিকে অর্থাৎ সুন্দরবনের পূর্বদিকে সামান্য অংশে প্রবাহিত হয় বলে সুন্দরবনের ক্ষতির আশংকা নেই বললেই চলে।

 

ছাই, ESP(Electrostatic Precipitator), ছাইয়ের ব্যবহার নিয়ে তিনি যা বলেছেন তা আমাদের আলোচনার ৪ নং প্রশ্নে ব্যাখ্যা করা হয়েছে আগেই। তবে বাতাসের দিক বর্ণনা করার সময় রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র এলাকাকে তিনি বাতাস এবং বাতাসের কারনে ক্ষতিকর প্রভাব মুক্ত এলাকা হিসেবে ঘোষণা করেছেন। পাঠকের সুবিধার জন্য আরেকটি ছবি দিয়ে বিষয়টি পরিস্কার করা যাক।

 

 

 

আগেই কয়েকটি প্রশ্নে ব্যাখ্যা করা হয়েছে যে উড়ন্ত ছাই,ডাম্প করা ছাই আসলে পরিবেশে ছড়াবে। উপরের ছবির বাতাসের গতিদিক খুব ভাল করে লক্ষ করলে দেখা যায় যে বছরের দুই সময়েই বাতাস সমগ্র বাংলাদেশ জুড়ে প্রবাহিত হয়। ফলে মার্চ থেকে অক্টোবর মাসে এই বিদ্যুৎ কেন্দ্রের বিষাক্ত ছাই দক্ষিন থেক উত্তর দিকে প্রবাহিত হয়ে বড় একটি অঞ্চলকে বিষাক্ত করে তুলবে, সাধারণ মানুষ শ্বাসকষ্ট, ফুসফুসের বিভিন্ন রোগ সহ ক্যান্সারে অক্রান্ত হবে আবার নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি মাসে এই বিষাক্ত ছাই উড়ে গিয়ে পড়বে সুন্দরবনে। আনজুমান কোথা থেকে সুন্দরবনের পূর্বদিকে সামান্য অংশে প্রবাহিত হবে ভরসা পেলেন, সেটা আমরা জানি না,মোসাহেবি পরিবেশবিদ্যা জানে হয়তো। ফলে ওইসময় সুন্দরবন সম্পূর্ণ বিষক্রিয়ায় অক্রান্ত হবে।

শীতকালে বায়ুপ্রবাহ এই বিষাক্ত ছাইকে নিয়ে আসবে দক্ষিণ-পশ্চিমে, একেবারে সুন্দরবনেই। এবং শীতকালে শিশিরপাতের সাথে, এবং শীতকালের নৈমত্তিক বৃষ্টির সাথে তা নেমে আসবে অরণ্যের ভেতরই।

 

আবরো দুর্ঘটনা: প্রশ্ন১২

কয়লা পরিবহন রুটে সম্ভাব্য দুর্ঘটনা ঘটলে পরিবেশের ওপর কীপ্রভাব পড়বে সেটা তিন সিনারিওতে নিরূপণ করা।

এই প্রশ্নের ক্ষেত্রেও চুক্তি সাক্ষর এবং স্পিলেজ মডেলিং জাতীয় সমাধান তিনি দিয়ে দিয়েছেন। আদৌ চুক্তি সাক্ষর করে কয়লা পরিবহন রুটে দুর্ঘটনা ঠেকানো যাবেনা। কারন দুর্ঘটনা হল দুর্ঘটনা। আগেই বলেছি সুন্দরবন এলাকায় এধরণের দুর্ঘটনার ঝুকি আমরা নিতে পারি কিনা তা যথেষ্ট ভেবে দেখার বিষয়। তবে স্পিলেজ মডেলিং এর আগেও পৃথিবীর বহু দেশে হয়েছে, তাতে করে দুর্ঘটনা বা ক্ষয়ক্ষতি এড়ানো যায়নি এবং তার ফলে আগের গুলো বাদ দিলেও অতি সাম্প্রতিক কালে নিউজিল্যান্ডের বে অফ প্লেনটি, আলাস্কা, মেক্সিকো উপসাগর এর বাস্তুসংস্থান পুরোপুরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে গেছে। কিন্তু এর কোনটিই সুন্দরবনের মত এত স্পর্শকাতর এবং পরস্পর ঘনিষ্ঠ সন্নিহিত নয়।

[Sims G. K., O’Loughlin E.J. (1989).”Degradation of pyridines in the environment”. CRC CriticalReviews in Environmental Control 19 (4): 309–340.]

 

কয়লার ব্যবহার কত: কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে এই তথ্য শেখানো হয়!


আঞ্জুমান ইসলামের সম্পূর্ণ লিখাটির জবাব দিতে গিয়ে বহুবার ভ্রান্ত, অসত্য তথ্যের জবাব দিতে হয়েছে। এই শেষ অংশটিতেও তাই। চূড়ান্ত মূল্যায়ন তিনি শুরু করেছেন আর একটি অসত্য তথ্য দিয়ে। তা হল সারা বিশ্বের ৬০শতাংশের বেশী বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয় কয়লা দ্বারা। এধরণের মিথ্যাচারের উদ্দেশ্য মুলত রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ব্যপারে মানুষকে ফ্যান্টাসিতে আবদ্ধ রাখা। দেখা যাক নিচের ছবি গুলো, উল্লেখ্য এটা আঞ্জুমানে আওয়ামী পাঠশালার তথ্য নয়, এটা আঞ্জুমানে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (ইএএ)-র ওয়েবসাইট থেকে নেয়া।

 

 

 

পাঠক খেয়াল করুন, কয়লার নতুন নতুন উৎস আবিষ্কৃত হলেও কয়লার ব্যবহার ২০১০ থেকে ২০১১ সালের মাঝে খুবই উল্লেখযোগ্য হারে শতকরা তিন ভাগ কমেছে। কারণ ‘সভ্য’ দুনিয়ায় কয়লা সম্পর্কে সচেতনতা ক্রমাগত বৃদ্ধি পেয়েছে। তারা বিকল্প জ্বালানি উৎস খুঁজে বের করছেন, তা নিয়ে গবেষণা করছেন এবং তাকে যথাসম্ভব বাস্তব বিদুৎ উৎপাদনের কাজে ব্যবহারও করছেন। ২০১২ সালে কয়লার ব্যবহার মাত্র দশমিক তিন ভাগ বেড়েছে, কারণ আরও ক্ষতিকর ও বিপদজনক পারমানবিক বিদ্যুৎ বিষয়ে আতঙ্ক। কিন্তু এই ভগ্নাংশ পরিমান বৃদ্ধিও অস্থায়ী, অধিকাংশ অগ্রসর দেশই নবায়নযোগ্য শক্তির ওপরই বেশি বেশি গুরুত্বারোপ করছে। এটা সামনে কমার গতি আরও অব্যাহত থাকবে। যে দেশটিতেই পরিবেশবিদ আঞ্জুমান ইসলাম পড়াশোনা করেছেন বলে জানা গেছে, সেই মার্কিনযুক্তরাষ্ট্রে ৯৭ সালে বিদ্যুৎ উৎপাদনে কয়লা ছিল ৫২.৮  ভাগ, এখন তা উল্লেখযোগ্য হারে কমে হয়েছে ৪৫ ভাগ। এই রকম রাষ্ট্রীয় গূরুত্বপূর্ণ বিষয়ে যারা কথা বলতে চান, তাদের আরেকটু খোঁজখবর রাখায় অভ্যস্ত হতে হবে। না তিনি যানেন ভারতের পরিবেশে আইন, না জানেন দুনিয়ার কয়লা বিদ্যুতের হার, অথচ সব বিষয়েই তিনি অকাতরে পণ্ডিতি করে বেড়ান।

 

যাই হোক, তিন বছর আগে ৪৩% ই ছিল সাম্প্রতিক ইতিহাসে বিদ্যুৎ উৎপাদনে কয়লার সর্বোচ্চ ব্যবহার। এর পর থেকে সারা পৃথিবীতে কয়লা এবং পারমানবিক শক্তি থেকে বিদ্যুতের উৎপাদন ক্রমান্বয়ে কমেছে। আর বেড়েছে নবায়নযোগ্য বিভিন্ন শক্তির ব্যবহার। এভাবে পুরো লিখাটি জুড়ে রামপাল কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্রের সপক্ষে যতগুলো তথ্য এবং যুক্তি তিনি হাজির করেছেন তার বেশিরভাগই ভুল এবং অসত্য এবং ভিত্তিহীন। কৌতূহলী পাঠক মাত্রেই রেফারেন্স বরাবর দেখে নিতে পারেন।

 

একথা নিশ্চিতভাবেই বলা যায় যে সরকার রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র নিয়ে কয়েক বছর ধরেই অসত্য এবং ভিত্তিহীন তথ্য ছড়িয়ে জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করার চেষ্টা করছে। বাস্তবে এই বিদ্যুৎ কেন্দ্র হলে আগামি ৫ বছরের মধ্যে সুন্দরবন বলে কিছু আর খুঁজে পাওয়া যাবে না।

 

পরিশেষে পাঠককে আবারও আমরা স্মরণ করিয়ে দিতে চাই, ভারতে যে ধরনের পরিবেশ আইন আছে, সেগুলো অনুযায়ী এই প্রকল্প সেদেশে নির্মিত হতে পারতো না। এখন বাংলাদেশের সরকার ভারতের বিধিমালা মানতে বাধ্য না, এটা কি পরিবেশ প্রকৌশল সম্মত যুক্তি হওয়া উচিত, নাকি আমাদের সম্মিলিত চেষ্টা থাকা উচিত যে আমাদের পরিবেশ আইনকে অন্তত ভারতের মানদণ্ডে নিয়ে যাওয়া, যেটাও অগ্রসর দেশগুলো থেকে অনেক অনেক পিছিয়ে? অর্থনীতি আমার বিষয় নয়, কিন্তু লাভালাভের বেলায় যে পঞ্চাশ পঞ্চাশ বাটোয়ারা দেখানো হয়েছে, সেখানে কি আমাদের বিপুল জমি, সুন্দরবনের সম্ভাব্য ঝুঁকি ইত্যাদিকে বাংলাদেশের বিনিয়োগ হিসেবে দেখানো হয়েছে? কমিশনের, বাটোয়ারার হিসেবে প্রধান্যে থাকলে এই সবের মূল্য ধরা হবে না, কিন্তু জাতীয় অর্থনীতিকে বিবেচনায় রাখলে এগুলোও বিশাল বিনিয়োগ এবং এই প্রকল্পে সেগুলো গোণা হয়নি।

 

কিন্তু অর্থনীতির হিসাব নিকাশ শুধু না, আমাদের জাতীয় জীবনে গূরুতরতম বিপর্যয়ের আশঙ্কা সৃষ্টিকারী এই প্রকল্পকে রুখে দাঁড়াতে না পারলে আমাদের প্রজন্মটি ভবিষ্যতের কাছে দায়বদ্ধ থাকবে।