Sunday, October 6th, 2013

বিদ্যুৎ কেন্দ্র নিয়ে রামপালবাসীদের ভাবনা

বাংলাদেশে সুন্দরবনের কাছে রামপালে কয়লা-ভিত্তিক একটি বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা নিয়ে বিতর্ক এখন রাজনৈতিক অঙ্গনেও ঢুকে পড়েছে।

ভারতের সাথে যৌথ এই প্রকল্প সুন্দরবনের ক্ষতি করবে — এই যুক্তিতে আন্দোলন শুরু করেছেন পরিবেশবাদীরা।

রামপালে প্রস্তাবিত বিদ্যুৎ-কেন্দ্রের জন্য নির্ধারিত স্থান।

এখন বিরোধী দল বিএনপিও এই প্রকল্পের বিরুদ্ধে কট্টর অবস্থান নিয়েছে।কিন্তু যেখানে এই প্রকল্প কাজ চলছে, সেই রামপালের বাসিন্দারা বিষয়টিকে কিভাবে দেখছেন?

রামপালে বহুল আলোচিত কয়লা-ভিত্তিক তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের নির্ধারিত জায়গায় গিয়ে দেখা যায়, সেখানে মাটি ভরাটের কাজ চলছে।

সুন্দরবন থেকে ১৪ কিলোমিটার দূরে পশুর নদীর তীর ঘেঁষে এই প্রকল্পে ১৮৩৪ একর জমির সীমানা চিহ্নিত করা হয়েছে।

বিভিন্ন জায়গায় বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য সংরক্ষিত এলাকা লেখা সাইনবোর্ড চোখে পড়েছে।

তবে এখন প্রথম পর্যায়ে ৪২০ একর এলাকায় মাটি ভরাট করা হচ্ছে। মাটি ভরাট করার জায়গায় প্রবেশের মুখে বড় সাইনবোর্ড টানানো হয়েছে। এই সাইনবোর্ডে প্রকল্পের কিছুটা বর্ণনা দেওয়া আছে।

পশুর নদীতে এ ধরণের বহু ড্রেজার দিয়ে এখন বালি ফেলে ভরাট করা হচ্ছে প্রকল্প এলাকা।

পশুর নদীতে সারি সারি ড্রেজিং মেশিন বসিয়ে পাইপ দিয়ে মাটি তুলে আনা হচ্ছে। অনেক শ্রমিক দিনরাত এই মাটি ভরাটের কাজে ব্যস্ত ।

সেখানে তাদের কয়েকজনের সাথে আমার কথা হয়।

মো. একরামুল হক বলছিলেন, “ছয় মাস ধরে এই মাটি ভরাটের কাজ করা হচ্ছে। প্রথম পর্যায়ে ডিসেম্বরের মধ্যে ৪২০ একর এলাকায় মাটি ভরাটের কাজ শেষ করার টার্গেট রাখা হয়েছে।”

অন্য এলাকা থেকে এখানে এসে মাটি ভরাটের কাজ করছেন মো. শাহাদাত হোসেন।

ছ’মাস আগে তিনি যখন কাজে এসেছিলেন, তখন পশুর নদীর তীর ঘেঁষে এই এলাকায় তিনি দেখেছিলেন, বড় অংশ জুড়ে চিংড়ির ঘের। অনেকখানি জায়গা ছিল পানিতে তলানো। আর কিছুটা সমতল জায়গায় অল্পসংখ্যক ছনের ঘরবাড়ি।

তিনি বলেন, “পশুর নদী থেকে ড্রেজিং মেশিন দিয়ে খনন করে লম্বা পাইপের মাধ্যমে বালি তুলে এনে এলাকটি ভরাট করা হচ্ছে।”

গ্রামবাসীদের নেতিবাচক মনোভাব

প্রকল্পটির পিছনের অংশের সাথে লাগানো ছোট্ট গ্রাম বাঁশের হুল্ল্যা।

সেই গ্রামে গিয়ে স্থানীয়দের সাথে কথা বলে মনে হয়েছে, তাদের প্রায় সকলের মধ্যেই কয়লা-ভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প নিয়ে একটা নেতিবাচক ধারণা তৈরি হয়েছে।

গ্রামটির চিংড়ি চাষী রবিউল শেখ বলছিলেন, তাঁর ১৮ বিঘা জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে বিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রকল্পের জন্য। এই জমি নেয়ার সময় তাঁকে বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের কথা বলা হয়নি। সরকার উন্নয়নমূলক কিছু করবে, এমনটাই প্রথমে জেনেছিলেন। অনেকটা সময় পরে গিয়ে বিদ্যুৎ কেন্দ্রের কথা জানতে পারেন।

এই গ্রামের নারীরাও প্রকল্প সম্পর্কে নেতিবাচক মনোভাব পোষণ করেন।

গৃহিনী শ্যামলী বলছিলেন, “এখানে বিদ্যুৎ কেন্দ্র হলে খুব খারাপ হবে। শুনেছি পরিবেশ নষ্ট হবে। পশুর নদীর পানি নীল হয়ে যাবে। গাছগাছালি মারা যাবে। সাগর শুকিয়ে যাবে। তাই শুনেছি। সবাই তাই বলছে।”

“এখানে বিদ্যুৎ কেন্দ্র হলে খুব খারাপ হবে। শুনেছি, পরিবেশ নষ্ট হবে। পশুর নদীর পানি নীল হয়ে যাবে। গাছগাছালি মারা যাবে। সাগর শুকিয়ে যাবে। তাই শুনেছি। সবাই তাই বলছে।”-গৃহবধূ শ্যামলী

স্থানীয় একজন কলেজ শিক্ষক স্বপ্না হালদার বলছিলেন, “আমি পরিবেশবিদ নই। কিন্তু আমি নিজে যেটুকু বুঝি, বিদ্যুৎ কেন্দ্রটা যেহেতু কয়লা-ভিত্তিক হবে, তার ধোঁয়া পরিবেশের ওপর নিশ্চয়ই খারাপ প্রভাব ফেলবে।”

পাশের গ্রামের কৃষক মো. ইয়াসিন আলী জানান, কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎ নির্মাণের ক্ষতির বিষয়গুলো এখন মানুষের মুখে মুখে। এভাবেই তাঁরা বিষয়গুলো জানতে পারছেন।

বাগেরহাটের রামপাল উপজেলার দুর্গম এলাকায় এই প্রকল্পে ১৩২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের টার্গেট রেখে দু’টি কেন্দ্র নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ প্রতিটি বিদ্যুৎ কেন্দ্র হবে ৬৬০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন।

সেনাবাহিনী পরিচালিত বাংলাদেশ ডিজেল প্ল্যান্ট লিমিটেড এবং পানি উন্নয়ন বোর্ড যৌথভাবে মাটি ভরাটের কাজ করছে নির্ধারিত জায়গায়।

আন্দোলনের সূচনা জমি রক্ষায়

প্রকল্পের জন্য প্রায় ২২শ পরিবারকে জমি ছেড়ে দিতে হয়েছে বলে স্থানীয়ভাবে বলা হচ্ছে।

“কার্বন বা অন্যান্য বিষয়ে উদ্বেগের যে কথা বলা হচ্ছে, তা সঠিক নয়। সুন্দরবন বা এই এলাকার পরিবেশের কোন ক্ষতি হবেনা। সে ব্যবস্থা রাখা হচ্ছে।”

-মনোয়ার ইসলাম, বিদ্যুৎ সচিব

এই জমি অধিগ্রহণের ক্ষেত্রে নানান অনিয়ম এবং অনেকে এখনো জমির টাকা না পাওয়ার অভিযোগও তুলেছেন। যদিও সরকার এসব অভিযোগ নাকচ করেছে।

২০১০ সালে যখন জমি অধিগ্রহণ করা হয়, তখন স্থানীয়রা আন্দোলন শুরু করেছিলেন জমি রক্ষার জন্য। তাঁদের তিনটি রিট মামলা এখনো হাইকোর্টে রয়েছে।

এই আন্দোলনের সাথে সম্পৃক্ত পারভেজ হোসেন জানিয়েছেন, আন্দোলন শুরুর অনেকটা সময় পর তারা পরিবেশ নিয়ে আন্দোলনকারীদের সাথে যোগাযোগ করেন এবং তখন উঠে আসে সুন্দরবন ইস্যু।

পরে তাদের পক্ষে দুজন বিশেষজ্ঞ গবেষণা প্রতিবেদনও তৈরি করে দিয়েছেন। স্থানীয়রা তাদের আন্দোলনের একটি সাংগঠনিক ভিত্তিও দিয়েছেন কৃষিজমি রক্ষা সংগ্রাম কমিটির ব্যানারে।

এই কমিটির সভাপতি সুশান্ত কুমার দাশের বক্তব্য হচ্ছে, এখন সুন্দরবন রক্ষার বিষয়টিই স্থানীয়দের কাছে বড় ইস্যু হয়ে উঠেছে।

তিনি বলেন, “পরিবেশের ক্ষতি হবে, এটা আমরা প্রথমে বুঝতে পারিনি। শুরুতে আমরা জমি রক্ষার আন্দোলন করেছিলাম। তারপর কেঁচো খুড়তে সাপ বেরিয়ে আসে। এই সুন্দরবন এই এলাকাকে ঘূর্ণিঝড়সহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে রক্ষা করে। সেই সুন্দরবন পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যাবে।”

তিনি আরও বলেন, “লোকালয় এবং বনাঞ্চলের ২৫ কিলোমিটারের মধ্যে কয়লা ভিত্তিক তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্র করা যাবে না। এমন আইন ভারতে আছে। সে কারণে ভারতের কর্ণাটক, হরিয়ানা এবং মধ্য প্রদেশে এই বিদ্যুৎ কেন্দ্র করতে পারেনি। সেই ভারত এবং বাংলাদেশ সরকার কিভাবে সুন্দরবনের কাছে বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করছে।”

সরকারের বক্তব্য

বালি দিয়ে ভরাটের পর বিশালাকায় প্রকল্প এলাকার কিছুটা অংশ দেখতে এখন এরকম।

এমন বক্তব্যকে সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে না। তবে ভারত প্রশ্নে ব্যাখ্যা তুলে ধরার চেষ্টা রয়েছে সরকারের দিক থেকে।

বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয়ের সচিব মনোয়ার ইসলাম দাবি করেছেন, দুই দেশের যৌথ মালিকানায় এই প্রকল্প হলেও বিদ্যুৎ বাংলাদেশেই ব্যবহার হবে।

তিনি বলেন, “ভারতের সবক’টি অঙ্গ রাজ্যে কয়লা-ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র আছে। ফলে ভারত তাদের দেশে করতে পারেনি। একথা ঠিক নয়। এছাড়া যৌথভাবে এটি নির্মাণ হলেও এর বিদ্যুৎ বাংলাদেশেই ব্যবহার হবে।”

পরিবেশগত দিকে বা সুন্দরবনের ক্ষতির অভিযোগের ক্ষেত্রেও সরকার বলতে চাইছে, পুরো বিষয়টিকে ঘিরে এক ধরনের বিভ্রান্তি ছড়ানো হচ্ছে।

এদিকে, ভারতের রাষ্ট্রায়ত্ত্ব বিদ্যুৎ সংস্থা এনটিপিসি এবং বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড বা পিডিবি যৌথভাবে একটি কোম্পানিও গঠন করেছে।

বাংলাদেশ-ভারত ফ্রেন্ডশিপ পাওয়ার কোম্পানি নামের এই প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান করা হয়েছে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ সচিব মনোয়ার ইসলামকে।

তাঁর বক্তব্য হচ্ছে, প্রথম সারির প্রতিষ্ঠানকে দিয়ে গবেষণা করিয়ে পূর্ণাঙ্গ গবেষণা প্রতিবেদনের ভিত্তিতেই রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্প নেয়া হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, “কার্বন বা অন্যান্য বিষয়ে উদ্বেগের যে কথা বলা হচ্ছে, তা সঠিক নয়। সুন্দরবন বা এই এলাকার পরিবেশের কোন ক্ষতি হবেনা। সে ব্যবস্থা রাখা হচ্ছে।”

বিতর্ক এখন রাজনীতির মাঠে

বামপন্থী দলগুলো এবং একই মতাদর্শের ব্যক্তিদের একটি ফোরামের মাধ্যমে তেল গ্যাস ইস্যুতে আন্দোলন করে আসছেন, তেল, গ্যাস, বিদ্যুৎ, খনিজ সম্পদ এবং বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির ব্যানারে এই ফোরাম কিছুদিন আগে ঢাকা থেকে রামপাল পর্যন্ত লংমার্চ করে।

এর অন্যতম একজন নেতা অধ্যাপক আনু মোহাম্মদ বলছিলেন, সুন্দরবনের ক্ষতির আশঙ্কার জায়গায় সরকারের বক্তব্যে তারা ভরসা পাচ্ছেন না।

রামপালে বিদ্যুৎ-কেন্দ্র নির্মাণের এই ইস্যু এখন রাজনৈতিক অঙ্গনেও বিতর্কের সৃষ্টি করেছে।

বিরোধীদলীয় নেত্রী খালেদা জিয়া ক’দিন আগে খুলনায় জনসভায় রামপালে সুন্দরবনের কাছে এই বিদ্যুৎ-কেন্দ্র নির্মাণের বিরুদ্ধে বক্তব্য তুলে ধরেছেন।

বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী মো. এনামুল হক বলছেন, আন্দোলনকারীরা বিকল্প কোন জায়গা বা কোন প্রস্তাব দিতে পারেন নি।

অধ্যাপক আনু মোহাম্মদ মনে করেন, রামপাল বাদ দিয়ে অন্য জায়গা বাছাই করতে হবে। এমন বক্তব্য তারা নিশ্চিতভাবে সরকারকে জানিয়েছিলেন।

তবে আন্দোলন বা ভিন্নমত, সবকিছু উপেক্ষা করেই রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করা হয়েছে।

এই বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের পক্ষে শক্ত অবস্থান নিয়ে সরকার এগুচ্ছে।

সূত্র: http://www.bbc.co.uk/bengali/news/2013/10/131006_qk_rampal_power_plant_investigation.shtml