Sunday, September 15th, 2013

রামপালে ১৪৪ ধারা জারির প্রতিবাদে সুন্দরবন রক্ষা জাতীয় কমিটির প্রতিবাদ

গত ০৭ সেপ্টেম্বর ২০১৩ তারিখে রামপালের ফয়লাহাটে সুন্দরবন রক্ষায় জাতীয় কমিটি আয়োজিত জনসভাটি সরকারী বাধা নিষেধের কারণে অনুষ্ঠিত হতে পারেনি। রামপাল ও সন্নিহিত বিভিন্ন স্থান থেকে জনসভায় অংশগ্রহনেচ্ছু হাজার হাজার সাধারণ মানুষ, সারা দেশের পরিবেশ কর্মী ও সমগ্র দেশবাসী এতে ক্ষুব্ধ ও হতাশ হয়েছেন। সমাবেশের আগেরদিন ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের স্থানীয় শাখার পক্ষ থেকে একই স্থানে আরেকটি জনসমাবেশের ঘোষনা প্রদান করা হয়। এটির ফলে তথাকথিত আইনশৃংখলা পরিস্থিতির অবনতির আশংকার অজুহাতে নিষেধাজ্ঞাটি জারি করা হয়। সুন্দরবন রক্ষায় জাতীয় কমিটির মত একটি সম্পূর্ণ অরাজনৈতিক ও পরিবেশ সংরক্ষণবাদী সংগঠনের সম্পূর্ণ অরাজনৈতিক ও শান্তিপূর্ণ একটি সমাবেশ চলমান দেশীয় নষ্ট রাজনীতির একটি ক’টকৌশল প্রয়োগ করে চক্রান্তমূলকভাবে পন্ড করার এই পদক্ষেপ অত্যন্ত দুঃখজনক। অথচ জনসভাটি ছিল  পূর্বঘোষিত, এমনকি এবিষয়ে স্থানীয় জেলা প্রশাসনকে লিখিত চিঠি দিয়েও তা জানানো হয়েছিল। আমরা সরকারের এহেন অপ্রয়োজনীয় বাড়াবাড়ি; গণমানুষের বাকস্বাধীনতা, অগণতান্ত্রিক এবং সুন্দরবন তথা পরিবেশ চেতনা বিরোধী কার্যক্রমের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি।

গত ঈদুল ফিতরের ছুটির মাত্র দুই দিন আগে সরকারের পরিবেশ অধিদপ্তর রামপাল তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্র বিষয়ে তাদের অনাপত্তিমূলক একটি পরিবেশগত ছাড়পত্র প্রদান করেছেন। ঈদের পর পত্রিকান্তরে তথ্যটি জেনে দেশের মানুষ আশাহত, স্তম্ভিত ও ক্ষুব্ধ হয়েছেন। প্রশ্ন হচ্ছে – পরিবেশ অধিদপ্তর এই অনাপত্তিটি কিসের ভিত্তিতে দিলেন ? তারা কি নিজস্ব উদ্যোগে কোন সমীক্ষা করেছেন ? – এ পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্যে তাদের নিজস্ব কোন সমীক্ষার সংবাদ জানা যায়নি। তার মানে হচ্ছে তারা পিডিবি’র ফরমায়েশক্রমে সরকারী গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিইজিআইএস কর্তৃক প্রণীত পরিবেশ সমীক্ষা প্রতিবেদনটিকেই হালাল করেছেন মাত্র। অথচ দেশের সবাই জানেন যে, সিইজিআইএস এর প্রতিবেদনটি একপেশে, মনগড়া, ভুল, বিভ্রান্তিকর তথ্য ও যুক্তির ভিত্তিতে প্রণীত যার প্রধান উদ্দেশ্য ছিল বিদ্যুৎকেন্দ্রটি স্থাপনে সরকারী সিদ্ধান্তকে যেনতেন প্রকারে সহায়তা করা !

কী ছিল সিইজিআইএস এর সেই প্রতিবেদনে ? প্রথমতঃ এই প্রকল্পটির জন্য স্থান নির্বাচন, ও জমি অধিগ্রহন হয়েছে ২০১০ সালে, ভারতের সাথে চুক্তি স্বাক্ষর হয়েছে ২০১২, ইতোমধ্যে এমনকি মাটি ভরাটের কাজ শুরু হয়েছে। কিন্তু এর পরিবেশগত প্রভাব প্রতিবেদন প্রকাশ করা হল ২০১৩ সনে।   অর্থাৎ কাজ শুরুর তিন বছর পর পরিবেশ-প্রভাব নিরুপন ! অথচ প্রচলিত নিয়মে প্রকল্পটির যৌক্তিকতা ও আর্থিক ব্যয় সঠিকভাবে প্রাক্কলনের প্রয়োজনে সবকিছুর আগে পরিবেশগত সমীক্ষা সম্পন্ন করা বাধ্যতামূলক। আসলে সঠিক পরিবেশগত প্রভাব নিরিক্ষণ নয়, ছাড়পত্র পাওয়ার একটি শর্তপূরণের জন্যই সিইজিআইএস প্রতিবেদনাট তৈরী করেছিল।  এই প্রতিবেদনেই বলা হয়েছে: প্রকল্পটি সুন্দরবনের বাফার জোনের ০৪ কিলোমিটারের মধ্যে অবস্থিত ও এটি এক সময় সুন্দরবনেরই অংশ ছিল। বাংলাদেশ ও ভারত – উভয় দেশেরই  বিদ্যমান আইন অনুযায়ী এ ধরণের বনের ১৫ কিমি এর মধ্যে কয়লাভিত্তিক তাপ বিদ্যুৎ স্থাপন নিষিদ্ধ; ভারতে এধরণের প্রকল্প করা হয় অনুর্বর ও পতিত জমিতে আর রামপালের এই স্থানটির ৯৫%  সম্পূর্ণ উর্বর, ধান-মাছ-পশুপাখীতে পরিপূর্ণ। এর ফলে বাড়তি নৌ চলাচল; তেল, কয়লার গুড়া ও গাদ  নিঃসরণ; শব্দ-আলো-তাপ দূষণ, পশুর নদীর পাড় ভাঙ্গা; পানির পরিমান হ্রাস ও দূষণ ইত্যাদি বনের ইকোসিস্টেম, বাঘ, হরিণ, ডলফিন, ম্যানগ্রোভ বন বিনষ্ট করবে। প্রকল্পের যন্ত্রপাতি, যানবাহন, জেনারেটর, বার্জ প্রভৃতি থেকে তেল পোড়ানোজনিত  বিপুল কার্বন ও নাইট্রোজেন গ্যাস নিঃসরণ; নির্মান ও যানবাহন ব্যবহার জনিত শব্দ দূষণ ইত্যাদি ঘটবে। ফলে নদীর  নাব্যতা, লবনাক্ততা, পলি প্রবাহ, জোয়ারভাটা, মৎস সম্পদ, অন্যান্য জলীয় সম্পদ, জীববৈচিত্রের অর্থাৎ সুন্দরবনের সার্বিক পরিবেশের বিশাল ক্ষতি হবে। পরবর্তীতে এ’টির সম্প্রসারণ করে দ্বিগুণ ক্ষমতাসম্পন্ন করা হবে, ফলে এই ক্ষতিও হবে দ্বিগুণ। কেন্দ্র তৈরী ও বিদ্যুৎ উৎপাদনের এই মহাযজ্ঞ চলবে দীর্ঘ ২৫ বছর ! পিডিবির পক্ষ থেকে দাবী করা হয়েছে: এই প্ল¬্যান্ট এর গ্যাস নিঃসরণ হবে বেশ কম কারণ এতে একটি ‘সুপার ক্রিটিক্যাল সর্বাধুনিক প্রযুক্তি’র ব্যবহার করা হবে। কিন্তু সেই ‘কম নিঃসরণ’ এর পরিমানটি কত ? সিইজিআইএস প্রতিবেদনই বলেছে এর পরিমান হবে (মাত্র) শতকরা ১০-১২ ভাগ! অথচ আমরা জানি, সুন্দরবনের মত একটি স্পর্শকাতর বনের জন্য কোন নিঃসরণই গ্রহনযোগ্য নয়। এই প্রতিবেদন দেশের জনগন, পরিবেশকর্মী, বিজ্ঞানী, স্থানীয় মানুষ সকলেই একযোগে প্রত্যাখ্যান করেছেন ! কিছুদিন পূর্বে পিডিবি আয়োজিত গণশুনানীতে সকলের বক্তব্য জেনে বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয়ের সচিব মহোদয় চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে সকলের অংশগ্রহনে আবার একটি সভা আয়োজনের সিদ্ধান্ত প্রদান করেছিলেন! সুন্দরবন রক্ষায় জাতীয় কমিটি থেকে দুই পক্ষের বিজ্ঞানীদের উক্ত সভায় যুক্ত করার প্রস্তাব রাখা হয়েছিল। আমরা এখনো তার অপেক্ষায় রয়েছি। অথচ পরিবেশ অধিদপ্তর সেই ত্র“টিপূর্ণ প্রতিবেদনকে ভিত্তি করেই তাদের অনাপত্তি ছাড়পত্র প্রদান করলেন ! বিষয়টি সত্যি লজ্জাস্কর ও অন্যায়!

সুন্দরবনের এই বিদ্যুৎ প্ল্যান্ট বিষয়ে দুটি সঠিক বৈজ্ঞানিক সমীক্ষা প্রতিবেদন রয়েছে:

(ক). বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. আব্দুস সাত্তার এর নেতৃত্বে চার সদস্যের এক বিজ্ঞানী দল ছয় মাস ধরে সরেজমিনে পরিদর্শন করে ২০১১ সনে দেয়া প্রতিবেদন প্রদান করেছেন। তাতে মোট ২৩টি অকাট্য ও তথ্য ভিত্তিক যুক্তি দিয়ে তিনি পরিস্কার বলেছেন: সুন্দরবনের সার্বিক পরিবেশ ও জীববৈচিত্রের উপর এই তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ক্ষতিকর প্রভাব পড়বে, সুন্দরবন ধ্বংস হবে, এলাকার পরিবেশগত সংকট সৃষ্টি হবে।

(খ). খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিভাগের অধ্যাপক আবদুল্লাহ হারুন চৌধুরী তার একবছর মেয়াদী এক গবেষণার মাধ্যমে দেখিয়েছেন: জৈবিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিবেশ – এই তিন ভাগে মোট ২২টি বিষয়ের উপর এই তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রভাব পড়বে। তার মতে মারাতœকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হবে: জীব বসতি, গাছপালা, বন্য প্রাণী, বন ধ্বংস; মাছ চাষ, কৃষি, পশু পাখী, কীট-পতঙ্গ ও সম্পদ নষ্ট; ভূমি হারানো-বিধবা মহিলাদের জীবন-জীবিকার সমাপ্তি, স্থানীয় গরীব মানুষের বসতি উচ্ছেদ; মাটি-পানি-শব্দ দূষণ ও স্বাস্থ্য দূর্গতি; ক্ষতিকর পর্যটন ও যানজট ইত্যাদি। এই প্রতিবেদনমতে বিদ্যুৎকেন্দ্রটির নেতিবাচক সরাসরি প্রভাব ৮১% ভাগ। এর ফলে কিছু তথাকথিত সামাজিক উন্নয়ন ঘটলেও তাতে সুন্দরবনের জন্য ইতিবাচক কিছুই নেই এবং উক্ত বনের জন্য এই কেন্দ্রটির ক্ষতিকর প্রভাব হবে ১০০% ভাগ।

তাছাড়াও (গ). এই বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের ফলে বাংলাদেশের বিদ্যমান পরিবেশ নীতি ও আইন, পরিবহন নীতি, জ্বালানী নীতি, মোটরযান অর্ডিন্যান্স, জলসীমা আইন, মৎস আইন, শিল্পনীতি, পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, জীববৈচিত্র সংরক্ষণ আইন, জলাশয় সংরক্ষণ আইন, বন আইন, পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা আইন, জাতিসঙ্ঘ ঘোষিত রামসার কনভেনশন ও জলবায়ু পরিবর্তন বিরোধী ঘোষনার মূল নীতিমালা লঙ্ঘিত হবে। যেসব নীতি বা আইন ভঙ্গ করে এই প্রকল্প রামপালে তৈরী হচ্ছে, ভারতেও তা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ রয়েছে এবং একাধিকবার চেষ্টার পরও একই প্রকল্প ভারতের কোন স্থানে স্থাপনের অনুমতি পায়নি। এক্ষেত্রে ভারত একটি ‘ডাবল স্ট্যান্ডার্ড’ নীতি গ্রহন করেছে যা সর্বাংশে নিন্দনীয়।

সুন্দরবনের মত বিরল গাছ-লতা-পাতা-প্রাণী-পাখী-কীট-পতঙ্গ-মাছ-ডলফিন-রয়েল বেঙ্গল টাইগার-চিত্রা হরিণ-বানর সহ সমৃদ্ধ জীব-বৈচিত্রের আধার; সম্পদশালী, সৌন্দর্যময়, প্রাকৃতিক দূর্যোগে উপকুল তথা বাংলাদেশের রক্ষাবর্ম এই বন আজ তার দীর্ঘ জীবনে সবচেয়ে মারাতœক বিপদের সম্মূখীন হয়েছে। কারণ তার গর্বে গর্বিত  বাংলাদেশ ও ভারত নামক নামক দুটি রাষ্ট্রের সরকারী উদ্যোগেই বনের অস্তিত্ববিনাশী এই তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্রটি স্থাপনের জন্য মরিয়া প্রচেষ্টা চলছে। আমর্ওা বিদ্যুৎ কেন্দ্র চাই, কিন্তু কোনক্রমেই সুন্দরবনের ক্ষতি করে নয় ! সুন্দরবন ধ্বংস করে কোন বিদ্যুৎ আমাদের প্রয়োজন নেই।

অতএব আজকের এই সমাবেশের দাবীঃ
(১). রামপাল তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্র বিষয়ে সিইজিআইএস এর ত্র“টিপূর্ণ সমীক্ষার ভিত্তিতে প্রণীত পরিবেশ অধিদপ্তরের অনাপত্তি ছাড়পত্র অবিলম্বে বাতিল করতে হবে।

(২). একটি  নির্মোহ-নিরপেক্ষ বিষয়সংশি¬ষ্ট সরকারী-বেসরকারী বিশেষজ্ঞ, বিজ্ঞানী ও পরিবেশকর্মীদের যুক্ত করে একটি কমিটির মাধ্যমে নতুন রামপাল তাপ বিদ্যুৎ প্রকল্পের পরিবেশগত সমীক্ষা প্রতিবেদন তৈরী করতে হবে।

(৩). প্রস্তাবিত রামপাল তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্পটির কাজ অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে ও এটিকে সুন্দরবনের পাশ থেকে সম্পূর্ণ নিরাপদ দূরত্বে সরিয়ে নিতে হবে।

———-সুন্দরবন রক্ষায় জাতীয় কমিটি
(ঢাকাস্থ জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে প্রতিবাদী নাগরিক সমাবেশ, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০১৩)