Thursday, September 12th, 2013

সাগরের গ্যাস ব্লক ইজারার মডেল পিএসসি ২০১২:যে কারণে জাতীয় স্বার্থ বিরোধী

বিদেশী কোম্পানির জন্য বাড়তি সুবিধা দিয়ে গত ৩ সেপ্টেম্বর ২০১৩ অর্থনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত মন্ত্রীসভা কমিটি উৎপাদন অংশীদ্বারিত্ব চুক্তি বা মডেল পিএসসি ২০১২’র সংশোধনী অনুমোদন করেছে।সংশোধিত পিএসসিতে গ্যাসের দাম আগের পিএসসিগুলোর তুলনায় বাড়িয়ে সাড়ে ছয় ডলার করা হয়েছে, প্রতিবছর সেই দাম ২% করে বাড়ানোর সুযোগ রাখা হয়েছে, কস্ট রিকভারি গ্যাসের পরিমাণ ৫৫% থেকে বাড়িয়ে ৭০% করা হয়েছে,উত্তোলিত গ্যাসের অর্ধেক নির্ধারিত মূল্য সীমার চেয়ে বেশি দরে তৃতীয় পক্ষের কাছে বিক্রির অনুমোদন দেয়া হয়েছে, এমনকি ৩৭% করপোরেট কর বিদেশী কোম্পানির বদলে পেট্রোবাংলা কর্তৃক পরিশোধের বিধান রাখা হয়েছে! আর এত সব সুবিধা দেয়ার পেছনে যুক্তি দেয়া হচ্ছে গ্যাস উত্তোলণে বাংলাদেশের অক্ষমতার।বলা হচ্ছে যেহেতু গভীর সমুদ্রের গ্যাস তোলার মতো পুজি ও প্রযুক্তি বাংলাদেশের নাই, তাই বিদেশী কোম্পানিগুলোকে বাড়তি সুবিধা না দিলে তাদের বিনিয়োগ ভারত ও মায়ানমারে চলে যাবে, তাই যে কোন মূল্যে এই ধরণের বিপুল ছাড় দিয়ে হলেও, জাতীয় স্বার্থ বিরোধী চুক্তি করে হলেও তাদেরকে ধরে রাখতে হবে!

বস্তুত শুধু মডেল পিএসসি ২০১২’র এই সংশোধনই নয়, বাংলাদেশের স্থলভাগের ও সাগরের গ্যাস ব্লক বিদেশী কোম্পানির কাছে যতবারই ইজারা দেয়া হয়েছে, ততবারই এই ধরণের যুক্তিই দেয়া হয়েছে।এর আগে মডেল পিএসসি ২০০৮ এর আওতায়  ১৬ জুন, ২০১১ তে মার্কিন বহুজাতিক কনোকো ফিলিপসের কাছে সাগরের ১০ ও ১১ নম্বর ব্লক ইজারা দেওয়ার চুক্তি করা হয়।তার আগে ১৯৯৭ সালে মডেল পিএসসি ১৯৯৭ অনুসারে স্থলভাগের মোট চারটি গ্যাস ব্লক বহুজাতিকের হাতে তুলে দেওয়া হয়:শেল-কেয়ার্নের হাতে ব্লক ৫ ও ১০, টাল্লো ও শেভরন-টেক্সাকোর হাতে ব্লক ৯ ও ইউনিকলের হাতে ব্লক ৭।তারও আগে ১৯৯৩ সালে প্রথম বিডিং রাউন্ডে ছয়টি পিএসসির মাধ্যমে স্থলভাগের আটটি গ্যাস ব্লক বহুজাতিকের কাছে ইজারা দেওয়া হয়:কেয়ার্ন এনার্জি ও হল্যান্ড সি সার্চের কাছে ব্লক ১৫ ও ১৬, অক্সিডেন্টালের কাছে ব্লক ১২, ১৩ ও ১৪,অকল্যান্ড-রেক্সউডের কাছে ব্লক ১৭ ও ১৮ এবং ইউনাইটেড মেরিডিয়ান করপোরেশনের কাছে ব্লক ২২।

মডেল পিএসসি ২০০৮ এর মাধ্যমে কনোকোফিলিপস এর হাতে গ্যাস রপ্তানির সুযোগ রেখে সাগরের দুটি গ্যাস ব্লক তুলে দেয়ার চুক্তির বিরুদ্ধে যে তীব্র আন্দোলন হয় তারই ফলাফলস্বরুপ এবারের মডেল পিএসসি ২০১২তে রপ্তানির প্রসঙ্গটি অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। এই সরাসরি রপ্তানির সুযোগ না রাখার ব্যাপারটিকে দেখিয়েও  বিদেশী কোম্পানিকে এইসব বাড়তি সুবিধা দেয়াকে যৌক্তিকতা দেয়ার চেষ্টা চলছে।কিন্তু আসলেই কি তাই? আসলেই কি জাতীয় স্বার্থের ক্ষতিকরে হলেও বিদেশী কোম্পানিগুলোকে এভাবে বাড়তি ছাড় না দিয়ে বাংলাদেশের কোন উপায় নাই? রপ্তানির বিধান না থাকলেই কি এই মডেল পিএসসি ২০১২ তে এতসব ছাড় জায়েজ হয়ে যায়? দেশের বাজারে অর্ধেক গ্যাস সাড়ে ছয় ডলারে এবং বাকি অর্ধেক গ্যাস তৃতীয় পক্ষের কাছে আরো বাড়তি দামে বিক্রির সুযোগ কি দেশের ভেতরেই রপ্তানিমূল্য হাসিল করা নয়? এই প্রশ্ন মাথায় রেখে আমরা এই লেখায় দেখার চেষ্টা করব বিদেশী কোম্পানির সাথে পিএসসি চুক্তির মূল সমস্যাগুলো কি কি এবং এর বিকল্পই বা কি হতে পারে।

পিএসসি: কস্ট রিকভারির ফাদ

যে কোন প্রডাকশন শেয়ারিং কন্ট্রাক্ট বা উৎপাদন অংশীদারিত্ব চুক্তির মতোই পিএসসি ২০১২ তে’ও বিদেশী কোম্পানির বিনোয়িগকৃত অর্থ কস্ট রিকভারি গ্যাসের মাধ্যমে উঠিয়ে নেয়ার সুযোগ থাকছে।সংশোধিত মডেল পিএসসি ২০১২ অনুসারে প্রতিবছর মোট উৎপাদিত গ্যাসের সর্বোচ্চ ৭০% কস্ট রিকভারি হিসেবে কোম্পানির ভাগে পড়বে যা এর আগের পিএসসি গুলোতে ছিল ৫৫% । বাকি গ্যাস প্রফিট গ্যাস বা লাভের গ্যাস হিসেবে কোম্পানি ও পেট্রোবাংলার মাঝে ভাগাভাগি হবে। এ হিসেবে গ্যাস উত্তোলণ পর্যায়কে দুই ভাগে ভাগ করা যায়: ১) কস্ট রিকভারি পর্যায় ২) প্রফিট গ্যাস পর্যায়।  কোম্পানির বিনিয়োগকৃত অর্থ বা খরচ যতদিন পর্যন্ত উঠে না আসে ততদিন পর্যন্ত গ্যাস উত্তোলণ কষ্ট রিকভারি পর্যায়ে থাকে। এ পর্যায়ে মোট উত্তোলিত গ্যাসের ৭০% কোম্পানির ভাগে যাবে। বাকি ৩০% নির্দিষ্ট চুক্তি অনুসারে লাভের গ্যাস হিসেবে পেট্রোবাংলা ও কোম্পানির ভাগে পড়বে।  এভাবে প্রতিবছর ৭০% করে গ্যাস নিয়ে কয়েক বছর পর কোম্পানির খরচ পুরোপুরি উঠে আসলে তখন গ্যাস উৎপাদন প্রফিট গ্যাস পর্যায়ে প্রবেশ করবে। এ পর্যায়ে উত্তোলিত গ্যাসের পুরোটাই প্রফিট গ্যাস হিসেবে কোম্পানি ও পেট্রোবাংলার মধ্যে নির্দিষ্ট চুক্তি অনুসারে ভাগাভাগি হবে।

বলা হয়, সরকার নিজে গ্যাস উত্তোলণ করতে গেলেও তো খরচ হতো, ফলে সেই খরচ বিদেশী কোম্পানিকে দিয়ে করানো হলে ও কস্ট রিকভারি গ্যাসের মাধ্যমে পরিশোধ করলে এবং সেই সাথে ঝুকি নেয়ার পুরস্কার হিসেবে লাভের গ্যাসের একটা অংশ বিদেশী কোম্পানিকে দেয়া হলে নাকি কোন ক্ষতি নেই। বাস্তবে  বাংলাদেশসহ সারা দুনিয়ার বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায়, বিদেশী কোম্পানি বিভিন্ন ভাবে খরচ ও বিনিয়োগ বাড়িয়ে দেখায় যেন কস্ট রিকভারি পর্যায় দীর্ঘায়িত করে বেশির ভাগ গ্যাস খরচের গ্যাস হিসেবে দেখানো যায়। গ্যাস উত্তোলণের কারিগরী ও অন্যান্য সিদ্ধান্ত মূলত কোম্পানির এক্তিয়ারে থাকার কারণে এবং এসব বিষয়ে নিরীক্ষার দ্বায়িত্বে থাকা দেশীয় প্রতিষ্ঠান, মন্ত্রণালয় ও ব্যাক্তিবর্গকে কিনে ফেলার মাধ্যমে বিদেশী কোম্পানি খুব সহজেই খরচ বাড়িয়ে দেখিয়ে বাড়তি গ্যাস নিজের ভাগে নিয়ে নেয়। কস্ট রিকভারির মাধ্যমে তেল-গ্যাস লুন্ঠনের এই কৌশলটি দেশে ও বিদেশী বহুল আলোচিত সমালোচিত হলেও পিএসসি’র পক্ষে থাকা মন্ত্রণালয়, পেট্রোবাংলা, কোম্পানির দালাল বিশেষজ্ঞ ও কর্পোরেট মিডিয়া বরাবরই কস্ট রিকভারি’র বিষয়টিকে আড়াল করে শুধু লাভের গ্যাসের কত অংশ পেট্রোবাংলা পাবে সেটা দিয়ে জনগণকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করে। যেমন: মডেল পিএসসি ২০১২ এবং আন্তর্জাতিক বিডিং নোটিশের কোথাও উত্তোলিত গ্যাসের ন্যূনতম কতভাগ বাংলাদেশ পাবে তা উল্ল্যেখ না থাকলেও মিডিয়ার সামনে উপস্থাতি পাওয়ার পয়েন্ট প্রেজেন্টেশানে বলা হয়েছে অগভীর সমুদ্র থেকে উত্তোলিত গ্যাসের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ লাভের গ্যাসের ৫৫% থেকে ৮০% পাবে এবং গভীর সমুদ্রের ক্ষেত্রে পাবে ৫০% থেকে ৭৫%। বরাবরই এ বিষয়টি গণমাধ্যমে এমন ভাবে হাজির করা হয় যেন বাংলাদেশ মোট গ্যাসেরই ৫০% থেকে ৮০% বাংলাদেশ পাবে!  পিএসসি ২০০৮ এর আওতায় কনোকোফিলিপসকে সাগরের দুইটি ব্লক ইজারা দেয়ার ক্ষেত্রেও একই রকম বিভ্রান্তি তৈরী করা হয়েছিলো। সে সময় ২১ জুন ২০১১ তারিখে ডেইলিস্টারের সংবাদ শিরোনাম ছিল: Govt share up to 80pc! সংবাদটিতে দাবী করা হয়েছিলো: “If recoverable oil or gas is found in the deep sea blocks in the Bay of Bengal awarded to US company ConocoPhillips, the minimum share of Petrobangla will be 55 percent and maximum 80 percent”

http://www.thedailystar.net/newDesign/news-details.php?nid=190898

কাজেই এই ধরণের বিভ্রান্তি এড়ানোর জন্য কয়েকটি বিষয় খেয়াল রাখা জরুরী:

প্রথমত, কস্ট রিকভারির পর প্রফিট গ্যাসের ৫৫% থেকে ৮০% মালিকানা পেট্রোবাংলার হলেও সম্পূর্ণ গ্যাসের কত ভাগ মালিকানা পেট্রোবাংলা পেল তা হিসেব করতে গেলে কস্ট রিকভারি পর্যায়ে কত পরিমাণ গ্যাস পেট্রোবাংলা পেল সে হিসাবও করতে হবে। কস্ট রিকভারি পর্যায়ে ৭০% গ্যাস কস্ট রিকভারি গ্যাস হিসেবে কোম্পানির ভাগে গেলে এবং বাকি ৩০% গ্যাস সমান অনুপাতে ভাগাভাগি হলে কস্ট রিকভারি পর্যায়ে কোম্পানির ভাগে পড়বে ৭০% +১৫% = ৮৫% গ্যাস এবং পেট্রোবাংলার ভাগে পড়বে ১৫% গ্যাস। এই কস্টরিকভারি পর্যায়ের গ্যাস এবং কস্ট রিকভারি পর্যায়ের পর প্রফিট গ্যাস পর্যায়ের প্রাপ্য গ্যাস এই দুই এর যোগ ফলের মাধমে নির্ধারিত হবে পেট্রোবাংলা মোট গ্যাসের কতটুকু পেল। কাজেই কস্ট রিকভারি পর্যায়ের পর প্রফিট গ্যাস পর্যায়ে ৮০% ভাগ গ্যাস পেট্রোবাংলা পাওয়ার মানে এই না যে পেট্রোবাংলা মোট গ্যাসের ৮০% পেল।

দ্বিতীয়ত, বাস্তবে বিদেশী কোম্পানিগুলো নানান ভাবে বাড়তি খরচ দেখিয়ে কস্ট রিকভারি পর্যায় দীর্ঘায়িত করে ফলে হয় আদৌ প্রফিট পর্যায়ে পৌছানো যায় না বা পৌছালেও ততদিনে সিংহভাগ গ্যাস উত্তোলিত হওয়া শেষ; ফলে বাংলাদেশের ভাগে কার্যত মোট উত্তোলিত গ্যাসের ২০-৩০ শতাংশের বেশী গ্যাস জুটে না। বাংলাদেশের স্থলভাগে এবং অগভীর সমুদ্রে এই ভাবে বাড়তি খরচ দেখিয়ে কস্ট রিকভারি পর্যায় দীর্ঘায়িত করার বিভিন্ন নজির আছে যেমন:

ক)মাগুরছড়ায় অক্সিডেন্টাল ১৯৯৫ সালে সিসমিক সার্ভে এবং তিনটি কুপ খননের জন্য প্রথমে ১ কোটি ৮৮ লক্ষ ডলারের হিসেব দিলেও ১৯৯৭ সাল নাগাদ ৪ বার সংশোধনের মাধ্যমে তা ৪ কোটি ৯১ লক্ষ ৪০ হাজার ডলারে পরিণত হয়। এবং এই খরচের হিসাব কুপ খননের খরচের হিসাব ছাড়াই!

খ)অগভীর সমুদ্রের সাঙ্গু গ্যাস ক্ষেত্রে কেয়ার্নের কস্ট রিকভারির হিসাবটা দেখা যাক। বিডিং এর সময় কেয়ার্ন প্রকল্প ব্যায় দেখিয়েছিলো ১০.৮১ মিলিয়ন ডলার কিন্তু একের পর এক সংশোধনী বাজেট আসতে থাকে, তৃতীয় সংশোধনী বাজেটে ব্যায় ১৮ গুণ বেড়ে গিয়ে দাড়ায় ১৮৮ মিলিয়ন ডলার, চতুর্থ সংশোধনী বাজেটে ২৬৪ মিলিয়ন ডলার এবং সব শেষে ৬৬০ মিলিয়ন ডলার। ফলে এই গ্যাস ক্ষেত্রটি থেকে বাংলাদেশ শেষ পর্যন্ত মাত্র ২০% গ্যাস পায়। পেটোবাংলার এপ্রিল ২০১১ তারিখের এমআইএস  রিপোর্ট থেকে দেখা যায়, ঐ বছরের এপ্রিলে মোট ১৩.৮৩৪ এমএমসিএম গ্যাসের মধ্যে কেয়ার্নের ভাগে পড়ে ১১.০৭৫ এমএমসিএম গ্যাস অর্থাত বাংলাদেশের ভাগে মাত্র ২.৭৫৯ এমএমসিএম যা মোট গ্যাসের মাত্র ১৯.৯৪%।

একই রিপোর্ট অনুসারে টাল্লোর বাঙ্গুরা গ্যাস ক্ষেত্রটিতে এপ্রিল ২০১১ তারিখে মোট উৎপাদন হয় ৮৩.৪৮৪ মিলিয়ন কিউবিক মিটার যার মধ্যে টাল্লোর কষ্ট রিকভারি ও প্রফিট গ্যাসের ভাগ ছিলো ৫৫.৪৭৭ মিলিয়ন কিউবিক মিটার। সুতরাং পেট্রোবাংলার প্রফিট গ্যাস হলো ২৮.০০৭ মিলিয়ন কিউবিক মিটার যা মোট গ্যাসের মাত্র ৩৩.৫৪% ।

কস্ট রিকভারির নামে এরকম লুটপাট হয় বলেই পেট্রোবাংলা যক্ষের ধনের মতো বহুজাতিক কোম্পানির কস্ট রিকভারির হিসাব আগলে বসে থাকে , মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক (সিএজি) কার্যালয় ২০০৯ সাল থেকে চেষ্টা করেও আজ পর্যন্ত পেট্রোবাংলার কাছে থাকা বিদেশী তেল-গ্যাস কোম্পানির(আইওসি) কস্ট রিকভারির হিসাব-নিকাশ অডিট করার সুযোগ পায়নি।  পেট্রোবাংলা এবং জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় পিএসসি চুক্তি অনুযায়ী এ ধরণের অডিট করার কোন সুযোগ নেই বলে জানিয়ে দিয়েছে, ২০১১ এর ২ নভেম্বর এক চিঠিতে মন্ত্রণালয় বলে দিয়েছে:

“The issue of examining accounts of IOCs is controlled as per the contract signed between the government and IOCs. So, the ministry is of the opinion that there is no scope for the audit department to examine the accounts of IOCs who are carrying out activities under the PSC.”

ফলে এ বিষয়ে সন্দেহ আরো ঘনিভূতি হয় যা সিএজি’র কমার্শিয়াল অডিট ডিরেক্টরেট এর ২৭ আগষ্ট ২০১২’তে লেখা এক চিঠিতে যার স্বীকৃতি মেলে:

“Considering the whole aspects, it is essential to audit the wasteful expenditures of IOCs in the name of cost recovery,”

সূত্র: IOCs’ balance sheets kept under wraps,ডেইলি সান,১ ডিসেম্বর ২০১২

http://www.daily-sun.com/details_yes_01-12-2012_IOCs%E2%80%99-balance-sheets-kept-under-wraps_335_1_1_1_0.html

গ্যাস রপ্তানির ঝুকি:

এর আগে মডেল পিএসসি ২০০৮ এ এলএনজি’তে রুপান্তরিত করে গ্যাস রপ্তানির বিধান থাকার বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ ও সমালোচনায় হওয়ায় মডেল পিএসসি ২০১২ তে গ্যাস রপ্তানির কথা সরাসরি বলা হয়নি। কিন্তু রপ্তানি করা যাবেই না বা ‘দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা অনুযায়ীই গ্যাস উৎপাদন করতে হবে’- এরকম কোন কথাও আবার কোথাও বলা হয় নি । বলা হয়েছে, উত্তোলিত গ্যাসের অর্ধেক অংশের প্রথম দাবীদার পেট্রোবাংলা, পেট্রোবাংলা কিনতে না পারলে কোম্পানি তা দেশের ভেতরে তৃতীয় পক্ষের কাছে বিক্রি করতে পারবে আর বাকি অর্ধেক গ্যাস বিদেশী কোম্পানি সরাসরি বেশি দামে(সাড়ে ছয় ডলারের চেয়ে বেশি)দেশের ভেতরের অন্য কোন কোম্পানির কাছে বিক্রি করতে পারবে।  কিন্তু এক সাথে অনেকগুলো গ্যাস ক্ষেত্র থেকে উত্তোলিত গ্যাস যদি দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদাকে ছাড়িয়ে যায় কিংবা দেশের ভেতরের তৃতীয় পক্ষ যদি কোম্পানির বেধে দেয়া দামে কিনতে সক্ষম না হয় সে ক্ষেত্রে কি হবে সে বিষয়ে কোন কথা এই পিএসসিতে বলা নেই।  লক্ষণীয় বিষয় হলো, আর্টিক্যাল ১৫.৪ এ প্রতি বছর কোন গ্যাস ক্ষেত্র থেকে মোট মজুদের ৭.৫% বা পেট্রোবাংলার সম্মতিক্রমে তার চেয়েও বেশি হারে  হারে গ্যাস উত্তোলণের সুযোগ রাখা আছে।  কাজেই ‘সর্বদা অভ্যন্তরীণ চাহিদার সাথে তাল রেখে গ্যাস উত্তোলণ করতে হবে’- এরকম কোন ধারা মডেল পিএসসিতে না থাকার ফলে এক সাথে যদি সাগরের একাধিক ব্লকে গ্যাস পাওয়া যায় এবং সেইসব ক্ষেত্র থেকে কোম্পানি যদি মোট মজুদের ৭.৫% হারে গ্যাস তুলতে থাকতে থাকে তখন অভ্যন্তরীণ চাহিদা ছাপিয়ে গিয়ে রপ্তানি’র ‘বাস্তবতা’ তৈরীর আশংকাটি কিন্তু রয়েই যায়।  বিশেষ করে, আমরা এর আগে দেখেছি, পিএসসি চুক্তিতে পেট্রোবাংলাকে পাশ কাটিয়ে প্রথমেই তৃতীয় পক্ষের কাছে গ্যাস বিক্রির সুযোগ না থাকা স্বত্ত্বেও বহুজাতিক কোম্পানি কেয়ার্ন (পরে সান্তোস) এর স্বার্থে তৃতীয় পক্ষের কাছে সরাসরি গ্যাস বিক্রির অনুমোদন দেয়া হয়েছে।

নিজেদের গ্যাস বেশি দামে কেনা:

পিএসসি চুক্তি অনুযায়ী বিদেশী কোম্পানির ভাগে যে কস্ট রিকভারি এবং প্রফিট গ্যাস যায় তা আবার আমাদেরকে উৎপাদন খরচের চেয়ে অনেক বেশি দামে কিনে নিতে হয়। স্থলভাগের ক্ষেত্রে আমরা দেখেছি, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বাপেক্সের কাছ থেকে যেখানে প্রতি হাজার ঘনফুট গ্যাস ২৫ দরে পাওয়া যায়, সেই গ্যাস বিদেশী কোম্পানির কাছ থেকে চুক্তি ভেদে ১৯০ থেকে ২৫০ টাকায় কিনতে হয়। অগভীর সমুদ্রের আগের পিএসসি চুক্তি অনুসারে কেয়ার্ন এনার্জির কাছ থেকে প্রতি হাজার ঘনফুট গ্যাস কেনার কথা ২.৯ ডলারে কিন্তু পিএসসি ২০১২ অনুসারে,গভীর সমুদ্রের গ্যাসের দাম হবে ৬.৫ ডলার বা ৫২০ টাকা(১ ডলার=৮০ টাকা ধরে) অর্থাৎ নিজেদের গ্যাস আগের চেয়ে এখন আমাদের প্রায় তিনগুন দামে কিনতে হবে বিদেশী কোম্পানির মুনাফার যোগান নিশ্চিত করার জন্য।

পিএসসি ও দুর্ঘটনার ঝুকি:

আগের  মডেল পিএসসি ২০০৮ এর আর্টিক্যাল ১০.২৭ এ কোম্পানির ‘অদক্ষতা, অযত্ন ও অবহেলা’র কারণে দুর্ঘটনা ঘটলে ‘উপযুক্ত’ ক্ষতিপূরণের বিধানের কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু পরে জানা গেছে কনোকোফিলিপসকে ১০ ও ১১ নং ব্লক ইজারা দেয়ার চুক্তি করার সময় চুক্তি থেকে ‘অদক্ষতা’র অংশটি বাদ দেয়া হয়। বোধ হয় সেই ‘শিক্ষা’ মাথায় রেখেই নতুন মডেল পিএসসি ২০১২তে বহুজাতিকের স্বার্থ রক্ষার্থে ‘অদক্ষতা’ শব্দটি বাদ দিয়ে শুধু অযত্ন ও অবহেলার কারণে দুর্ঘটানার ক্ষতিপূরণের কথা বলা হয়েছে । যদিও কোন আইন লংঘন করে কি ক্ষতি করলে কি হারে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে সে বিষয়ে কিছুই বলা নেই শুধু আর্টক্যাল ১০.৪ এ আন্তর্জাতিক পেট্রোলিয়াম ইন্ডাষ্ট্রির নিয়ম কানুন মেনে চলার আর্জি রাখা হয়েছে, আশা করা হয়েছে বহুজাতিক গুলো ‘প্রকৃত workmanlike manner’ এ কাজ করবে! বলাই বাহুল্য, ‘অযত্ন’, ‘অবহেলা’ ইত্যাদি “অদক্ষতা”র তুলনায় যথেষ্ট বায়বীয় বিষয়; দুর্ঘটনা ঘটলে যা প্রমাণ করা মুশকিল। একটা প্রশ্ন তো এসেই যায়, প্রযুক্তিগত দক্ষতার দোহাই দিয়ে বহুজাতিক কোম্পানিগুলোকে ডেকে আনা হলেও ‘অদক্ষতা’র কারণে দুর্ঘটনার ক্ষতিপূরণের শর্তটিতে তাদের এত ভয় কিসের!

বাংলাদেশ সহ সারা দুনিয়ার তেল-গ্যাস উত্তোলণের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় দক্ষতার বাজারে বড় বড় সাইনবোর্ড ওয়ালা কোম্পানি গুলো যত বড় বড় দুর্ঘটনা ঘটিয়েছে সেই তুলনায় জাতীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর হাতে দুর্ঘটনা ঘটেছে খুবই সামান্য। বিপি, এক্সন, শেভরন, শেল ইত্যাদি বেসরকারি বহুজাতিক কোম্পানি বিদেশের মাটি ও পানিতে তেল-গ্যাস উত্তোলণ করতে গিয়ে যত দুর্ঘটনা, অয়েল-স্পিল কিংবা ব্লো-আউট ঘটিয়েছে সেই তুলনায় আমাদের বাপেক্স, মালয়েশিয়ার পেট্রোনাস কিংবা ভেনিজুয়েলার পিডিভিএসএ ইত্যাদি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের হাতে নিজেদের দেশে দুর্ঘটনা নেই বললেই চলে। এর কারণ দক্ষতা নয়, দক্ষতার প্রয়োগে। দক্ষতা যেহেতু স্থির, আকাশ থেকে নাযিল হওয়া কোন বিষয় নয়, নিয়মিত যত্ন সহকারে অর্জন-লালন-প্রয়োগ করবার বিষয়, তাই দেখা যায় জাতীয় প্রতিষ্ঠানগুলো যতটা দ্বায়িত্বের সাথে দক্ষতার প্রয়োগ ঘটায়, বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো মুনাফা সর্বোচ্চকরণের পেছনে ছুটতে গিয়ে নানান ঝুকিবহুল কারিগরী  সিদ্ধান্তের বেলায় মুনাফাকেই প্রাধান্য দেয় ফলে নানান দুর্ঘটনার ঘটিয়ে মূল্যবান সম্পদ বিনষ্ট করে।

বিপি পরিচালিত মাকান্দো কুপে সাম্প্রতিক দুর্ঘটনাটি থেকেও এই বাস্তবতাই বেরিয়ে এসেছে। মেক্সিকো উপসাগরে গভীর সমুদ্রের ব্লকে বিপি’র এই তেল কুপে স্মরণকালের ভয়াবহ দুর্ঘটনার কারণ সম্পর্কে  বলা যায়, মূলত বিপি এবং তার সহযোগী কোম্পানিগুলোর কূপের ডিজাইন,  কনস্ট্রাকশন, সিমেন্টিং, পরীক্ষা-নিরীক্ষা-পর্যবেক্ষণ ইত্যাদি কারিগরী বিষয়ে কতগুলো ভয়ংকর সিদ্ধান্তের কারণেই এই দুর্ঘটনাটি ঘটেছে। আর এই ঝুকিপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো নেয়া হয়েছে সময় ও অর্থ বাচিয়ে মুনাফা সর্বোচ্চ করণের জন্য। এই দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে গঠিত জাতীয় কমিশন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার কাছে রিপোর্টে বলেছে এ বিষয়ে বলেছে :”উদ্দেশ্য মূলক হোক বা না হোক, বিপি, হ্যালিবার্টন আর ট্রান্সওসানের নেয়া যেসব সিদ্ধান্ত মাকান্দো ব্লোআউটের ঝুকি বাড়িয়ে দিয়েছে, পরিস্কার বোঝা যায় ঐ সিদ্ধান্তগুলো তাদের যথেষ্ট সময় (এবং অর্থ )বাচিয়েছে।”

(সূত্র: Report to the President of USA, National Commission on the BP Deepwater Horizon Oil Spill and Offshore Drilling, January 2011)

যুক্তরাষ্ট্রের মতো শক্তিশালী রাষ্ট্রের জাতীয় সম্পদ নিয়ে বহুজাতিক বিপি এই ধরণের ছিনিমিনি খেলতে পারলে, বাংলাদেশের মতো রাষ্ট্রে বহুজাতিক তোষণ কারি নিয়ন্ত্রন কর্তৃপক্ষ পেট্রোবাংলার তদারকি যে বহুজাতিকেরা থোরাই কেয়ার করবে তা বাংলাদেশে বহুজাতিক অক্সিডেন্টাল ও নাইকোর মাগুরছড়া ও টেংরাটিলায় বিষ্ফোরণ ঘটানো, এবং কোন ক্ষতিপূরণ না দিয়েই কেটে পড়ার ইতিহাস থেকে সহজেই অনুমেয়। তারওপর বাংলাদেশে তেল-গ্যাস উত্তোলণের কারিগরি ও নিরাপত্তাগত দিকগুলো নিয়ে কোন সুনির্দিষ্ট বিধি বিধানও নেই যে তার মাধ্যমে বহুজাতিককে বাধ্যকরা হবে যথাযথ নিয়ম মেনে তেল-গ্যাস উত্তোলণে। অবশ্য শাসকেরা যে জাতীয় সম্পদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা মোটেই চিন্তিত নয় তা মডেল পিএসসি থেকে ”অদক্ষতা” শব্দটি বাদ দেয়ার ঘটনা থেকেও স্পষ্ট।

 কিন্তু আমাদের কি সক্ষমতা আছে?

কস্ট রিকভারি’র নামে বেশির ভাগ গ্যাস বিদেশী কোম্পানির মালিকানায় যাওয়া, নিজেদের গ্যাস বিদেশী কোম্পানির কাছ থেকে বেশী দামে কেনা, কোম্পানির মুনাফার স্বার্থে গ্যাস রপ্তানি হয়ে যাওয়ার আশংকা, বহুজাতিকের মুনাফা সর্বোচ্চকরণের খেসারত দিতে গিয়ে মাগুরছড়া ও টেংরাটিলার মতো দুর্ঘটনার ঝুকি স্বত্ত্বেও এই ভাবে বিদেশী কোম্পানির সাথে পিএসসি চুক্তির যৌক্তিকতা দেখাতে গিয়ে বারবার বলা হয় -বাংলাদেশের যেহেতু সমুদ্রে গ্যাস উত্তোলণের সক্ষমতা নেই তাই এ ধরণের চুক্তি করা ছাড়া আমাদের কোন উপায় নেই, ফলে গ্যাস উত্তোলণ করতে চাইলে পিএসসি চুক্তির কোন বিকল্প নেই। এমনকি তেল-গ্যাস উত্তোলণে জাতীয় সক্ষমতা অর্জনের প্রচেষ্টাকে উড়োজাহাজ তৈরীর প্রচেষ্টার সাথে তুলনা করেও বলা হয়েছে: “সমুদ্রে অনুসন্ধানের টাকা, প্রযুক্তি, লোকবল কোনটাই তাদের নেই এবং সেটা করতে যাওয়া বাংলাদেশের পক্ষে উড়োজাহাজ তৈরির চেষ্টা করার মতো হঠকারিতা হবে; যাতে বিনা কারণে অজস্র টাকা ও সময় ব্যায় হবে।“

এখানে খেয়াল দরকার, আমরা যারা তেল-গ্যাস-কয়লা অনুসন্ধান ও উত্তোলণে জাতীয় সক্ষমতা অর্জনের কথা বলছি, তারা কিন্তু এর জন্য প্রয়োজনীয় রিগ, সেমিসাবমারজিবল রিগ, সাপোর্ট ভ্যাসেল ইত্যাদি বাংলাদেশে তৈরির কথা বলছি না, বলছি এগুলো ভাড়া করে/কিনে তেল-গ্যাস ক্ষেত্র অনুসন্ধান ও উত্তোলনে ব্যাবহারের কথা। তাহলে উড়োজাহাজ তৈরীর উদাহরণটা আসছে কেন? তুলনা করতে গেলে তো উড়োজাহাজ চালনা করার উদাহরণটা দেয়া দরকার। উড়োজাহাজ চালানার মতো জটিল কাজও তো বাংলাদেশের পাইলটদের শিখতে হয়েছে তাহলে সেমিসাবমারজিবল রিগ কিংবা সাপোর্ট ভ্যাসেল ভাড়া করে এনে সেগুলো কন্ট্রাক্টরের মাধ্যমে পরিচালনা করাটা অসম্ভব কিংবা হঠকারিতা হতে যাবে কেন? বহুজাতিক কোম্পানিগুলো কি তেল-গ্যাস উত্তোলণে ব্যাবহ্রত সেমিসাবমারজিবল রিগ, সাপোর্ট ভ্যাসেল ইত্যাদি নিজেরা বানায় বা নিজেরা চালায় ? প্রশ্নের উত্তরের জন্য আমরা প্রথমে তেল-গ্যাস উত্তোলণ বা হাইড্রোকার্বন এক্সপ্লোরেশানের টেক্সট বই এ কি আছে দেখব, তারপর কার্যক্ষেত্রে কোম্পানিগুলো কিভাবে কাজ করে সেই উদাহরণেরও খোজ করব।

এ কাজের জন্য আমাদের হাতে আছে  Frank Jahn,Mark Cook and Mark Graham রচিত Hydrocarbon Exploration & Production (2nd edition, 2008) বইটি। দেখা যাচ্ছে, তেল-গ্যাস উত্তোলণের ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরণের চুক্তি হতে পারে, যেমন:

) ট্যাক্স এবং রয়্যালিটি ভিত্তিক চুক্তি: এ পদ্ধতিতে কোম্পানি উৎপাদিত তেল-গ্যাসের নির্দিষ্ট একটা অংশ  র‌য়্যালিটি আকারে সরকারকে প্রদান করে এবং উৎপাদিত তেল-গ্যাস বিক্রয় করে প্রাপ্য লাভের উপর সরকারকে ট্যাক্স পরিশোধ করে।

২) উৎপাদন অংশীদারি চুক্তি বা পিএসসি: এ পদ্ধতিতে কোম্পানি কষ্ট রিকভারি হিসেবে বিনিয়োগের খরচ তুলে নেয় এবং বাকি লাভের গ্যাস চুক্তির শর্ত অনুযায়ী কোম্পানি এবং সরকারের মধ্যে ভাগাভাগি হয়।

৩) সার্ভিস এগ্রিমেন্টস: এ পদ্ধতিতে নির্দিষ্ট পারিশ্রমিকের বিনিময়ে বিভিন্ন কোম্পানির সেবা, প্রযুক্তি ভাড়া নিয়ে রাষ্ট্রীয় মালিকানাতেই তেল-গ্যাস উত্তোলণ করা হয়।

ফলে পিএসসি চুক্তির বদলে রাষ্ট্রীয় মালিকানায় রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে গ্যাস উত্তোলণের ক্ষেত্রে প্রয়োজন অনুসারে সার্ভিস এগ্রিমেন্টস এর মাধ্যমে প্রযুক্তি ভাড়া করে এনে তেল-গ্যাস উত্তোলণ করার যে প্রস্তাব আমরা সরকারের কাছে তুলে ধরি সেটা অলীক কোন প্রস্তাবনা নয়।

আরেকটা বিষয় হলো এমনকি পিএসসি চুক্তির মাধ্যমে যেসব কোম্পানি তেল-গ্যাস উত্তোলণের কাজ পায় তারা কিন্তু নিজেরা সব কাজ করে না, সার্ভিস এগ্রিমেন্টের মাধ্যমে বিভিন্ন কোম্পানিকে দিয়ে বিভিন্ন কাজ করিয়ে নেয়। এই কন্ট্রাক্ট আবার বিভিন্ন রকম হতে পারে যেমন:

ক)লাম্প সাম কন্ট্রাক্ট: নির্দিষ্ট অর্থের বিনিময়ে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নির্দিষ্ট একটি বা একাধিক কাজ করার চুক্তি।

খ)বিলস অব কোয়ান্টিটিস কন্ট্রাক্ট: এ পদ্ধতিতে পুরো কাজকে কয়েকটি ভাগে ভাগ করা হয় এবং  প্রতিটি ভাগের বিস্তারিত লিপিবদ্ধ থাকে। একাজ করার জন্য প্রয়োজনীয় শ্রম ও যন্ত্রপাতির ভাড়া চুক্তির মাধ্যমে নির্ধারিত করা হয়।

গ)শিডিউল অব রেইটস কন্ট্রাক্ট: এ পদ্ধতিতে শ্রমের মূল্য সুনির্দিষ্ট করা হয় কিন্তু যন্ত্রপাতির খরচ ও শ্রম ঘন্টা নির্দিষ্ট করা থাকে না।

ঘ)কষ্ট প্লাস প্রফিট কন্ট্রাক্ট: এ পদ্ধতিতে সাবকন্ট্রাক্টরের সমস্ত খরচ পরিশোধ করা হয়, সেই সাথে মোট লাভের একটা অংশও সাব কন্ট্রাক্টরকে দেয়া হয়।

বাস্তবেও সত্তর/আশির দশকের সময় থেকেই কোম্পানিগুলো তাদের নিজেদের অনেক কাজ বিভিন্ন কন্ট্রাক্টর/সাব কন্ট্রাক্টর কোম্পানির কাছে আউটসোর্সিং করতে শুরু করেছে। টেকনোলজি ডেভেলাপ করার বদলে টেকনোলজি বিভিন্ন সার্ভিস কোম্পানি যেমন Schlumberger, Halliburton, Baker Hughes, Oceaneering, Transocean ইত্যাদির কাছ থেকে সুবিধা মতো ভাড়া করে তেল-গ্যাস উত্তোলণের কাজটি চালাচ্ছে। উদাহরণস্বরুপ বিপি’র কথা বলা যায়। বিপি মেক্সিকো উপসাগরের যে মাকান্দো কুপে দুর্ঘটনায় ঘটিয়েছে, সে কুপে কাজ করছিলো মূলত ট্রান্সওশান, হেলিবার্টন, স্লামবার্গার ইত্যাদি কোম্পানির যন্ত্রপাতি ও সার্ভিস ভাড়া নিয়ে। ডিপ ওয়াটার হরাইজন নামের সেমিসাবমারজিবল রিগটি বিপি ভাড়া নিয়েছে ট্রান্সওশানের কাছ থেকে, এই রিগটি থেকে ড্রিলিং এর কাজটি ট্রান্সওশানের কর্মীরাই করছিলো, কুপ সিমেন্টিং এর কাজটি করছিলো হেলিবার্টন এবং সিমেন্টিং এর পর তার কার্যকারিতা পরীক্ষার জন্য ভাড়া করা হয়েছিলো স্লামবার্গার কোম্পানিটিকে; বিপির কাজ ছিলো কেবল এদের কাজ ঠিক ঠাক মতো হচ্ছে কিনা সেটা তদারকি করা।(সূত্র: Report to the President of USA, National Commission on the BP Deepwater Horizon Oil Spill and Offshore Drilling, January 2011) আমাদের ১৬ নং ব্লকে তৃতীয় পক্ষের কাছে গ্যাস বিক্রির অনুমোদন পাওয়া অষ্ট্রেলিয়া ভিত্তিক বহুজাতিক সান্তোস ও নিজস্ব রিগ দিয়ে খনন কাজ করছে না, তারা নেদারল্যান্ডের কোম্পানি সি-ড্রিল এর কাছ থেকে Offshore Resolute নামের একটি রিগ ভাড়া করে এনেই অনুসন্ধান ও উত্তোলণের কাজটি করেছে।(সূত্র: বিডিনিউজ২৪ডটকম, ১৯ সেপ্টম্বর ২০১১ http://bdnews24.com/details.php?id=206430&cid=4) প্রযুক্তির অভাবের কথা বলে যে কনোকোফিলিপস এর হাতে সাগরের ১০ ও ১১ নং ব্লক তুলে দেয়া হলো সে কনোকোফিলিপসও কিন্তু রিগ ভাড়া করে কাজ করে। বর্তমানে মোট ১৮ টি জায়াগায় তারা গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলন কাজ পরিচালনা(অপারেটর হিসেবে)  করছে যার ১২টিতেই কাজ করছে China Oilfield Services Ltd, ENSCO, Essar Oilfields Services Ltd, Maersk Drilling, Nabors Offshore, Rowan, Seawell, Transocean Ltd.  ইত্যাদি বিভিন্ন সাবকন্ট্রাক্টর কোম্পানির রিগ ভাড়া করে এবং এই রিগগুলো পরিচালনা করে কূপ খননের কাজও করছে এই কোম্পানিগুলোই।(সূত্র: http://www.rigzone.com)  বাংলাদেশের ১০ ও ১১ নং ব্লকে ২ডি সিসমিক সার্ভেও কনোকোফিলিপস করিয়েছে চাইনিজ কন্ট্রাক্টর বিজিপি কে দিয়ে, কূপ খনন করাবে এমনি আরেক কোম্পানির রিগ ভাড়া করে। (সূত্র: দ্য ইনডিপেনডেন্ট, ২৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১২ http://www.theindependentbd.com/index.php?option=com_content&view=article&id=96965:conoco-phillips-seismic-study-in-bay-of-bengal-next-month&catid=132:backpage&Itemid=122)

কাজেই বাপেক্সের পক্ষে স্থলভাগে গ্যাস উত্তোলণের দক্ষতাকে ব্যাবহার করে, প্রয়োজনেয় সার্ভিস এগ্রিমেন্টের মাধ্যমে রিগ ও যন্ত্রপাতি ভাড়া করে, গভীর সমুদ্রে গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলণ বিষয়ে যথাযথ ট্রেনিং এর মাধ্যমে এই ধরণের তদারকির কাজ করাটা অসম্ভব কোন বিষয় নয়।

বিনিয়োগের পুজি ও ঝুকি প্রসঙ্গে:

সরকারের এবং কোম্পানির ভাড়াটে বিশেষজ্ঞদের আরেকটি যুক্তি হলো, তেল-গ্যাস উত্তোলণের কাজে “বিপুল অর্থ” প্রয়োজন এবং এক্ষেত্রে তেল-গ্যাস না পাওয়া গেলেই পুরো অর্থই নষ্ট হওয়ার ঝুকি থাকে, উৎপাদন অংশীদারি চুক্তিতে যেহেতু এই ঝুকিটা বিদেশী কোম্পানিই বহন করে তাই বাংলাদেশের মতো ‘দরিদ্র’ দেশের পক্ষে বিদেশী কোম্পানিকে তার খরচের জন্য কস্ট রিকভারি গ্যাস এবং ঝুকির পুরস্কার হিসেবে প্রফিট গ্যাস দিয়ে হলেও এ ধরণের চুক্তি করা লাভজনক!

এটা আরেকটা বিশাল প্রতারণা! কারণ গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলণের কাজে একবারেই সমস্ত অর্থ ব্যায় করে না কোম্পানিগুলো। প্রথমে সিসমিক সার্ভে করে দেখে এখানে গ্যাস পাওয়ার সম্ভাবনা কতটুকু। এই সার্ভেতে পজিটিভ রেসাল্ট পাওয়া গেলেই কেবল ড্রিলিং করে অনুসন্ধান কুপ খনন করে। এখন দেখা যাক, সিসমিক সার্ভের খরচ কতটুকু। এই যে কনোকোফিলিপস বঙ্গোপসাগরে 2D সিসমিক সার্ভে করলো এর জন্য তার কত খরচ হয়েছে? উত্তর: The ConocoPhillips has committed to conduct 2D seismic survey covering 1200 line kilometres (LKM) during its initial five years of exploration period with an investment commitment of $ 2.496 million offering bank guarantee of the same amount.(সূত্র: http://www.thefinancialexpress-bd.com/more.php?date=2011-01-01&news_id=121513)
অর্থাৎ কনোকোফিলিপস এর প্রাথমিক ঝুকির পরিমাণ মাত্র ২.৪৯৬ মিলিয়ন ডলার বা ২০ কোটি টাকা! মাত্র ২০ কোটি টাকার ঝুকি এড়ানোর কথা বলে, নিজেদের গ্যাস বিদেশী কোম্পানির হাতে তুলে দিয়ে হাজার হাজার কোটি টাকার নিশ্চিত ক্ষতির ব্যাবস্থা করে শাসকেরা। কত বড় প্রতারণা!

তর্কের খাতিরে যদি ধরেও নেই এভাবে ধাপে ধাপে অর্থ ব্যায় করাটাও ভীষণ ঝুকিপূর্ণ একটা কাজ তাহলেও কিন্তু প্রশ্ন আসে- কনোকোফিলিপস এর মতো বহুজাতিক কোম্পানিগুলো কেন “বিপুল অর্থ” ব্যায় করে এই বিশাল ঝুকিপূর্ণ কাজে আগ্রহী হয়? ‘কন্যা দায়গ্রস্থ’ পিতাকে উদ্ধার করার অনুরুপ গ্যাস দায়গ্রস্থ(!) বাংলাদেশকে উদ্ধার করতে নাকি নিশ্চিত মুনাফার গন্ধ পেয়েই? বিষয়টা বোঝার জন্য কথিত ঝুকির সাথে সাথে বিপুল প্রাপ্তি ও লাভালাভের বিষয়টিও খেয়াল করা দরকার। স্থলভাগের বিবিয়ানা ক্ষেত্রের জন্য শেভরণ খরচ দেখিয়েছে প্রায় ২৭০ মিলিয়ন ডলার বা ১,৮৯০ কোটি টাকা এবং প্রতিহাজার ঘনফুট গ্যাস গড়ে ২১০ টাকায়(বাপেক্স ২৫ টাকায় বিক্রি করে) বিক্রি করে কস্টরিকভারি ও প্রফিট বাবদ বাংলাদেশের কাছ থেকে আদায় করেছে অগাষ্ট ২০১২ পর্যন্ত ১০ হাজার ১০১ কোটি টাকা। (সূত্র: এমআইএস রিপোর্ট পেট্রোবাংলা আগষ্ট ২০১২ http://www.petrobangla.org.bd/MIS%20Report_Aug%2712.pdf ) বিবিয়ানার গ্যাস এখনও অর্ধেক এরও বেশি বাকি। ফলে শেভরণের লাভ আরো বাড়বে। তাহলে বাপেক্স বা পেট্রোবাংলা কেন সেই লাভজনক কাজটি করবে না? বাপেক্সের তো খরচ আরো কম। বিবিয়ানার মতো প্রায় একই ধরণের একটি গ্যাস ক্ষেত্র সুনেত্র থেকে গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলণের জন্য বাপেক্সের বাজেট ধরা হয়েছে ২৮৯ কোটি টাকা। অর্থাৎ বহুজাতিক কোম্পানির চেয়ে ৬ গুণেরও কম টাকায় বাপেক্স প্রায় একই পরিমাণ গ্যাস উত্তোলণ করে এবং আট-দশ গুণ কম দামে আমাদেরকে গ্যাস সরবরাহ করে।

প্রযুক্তির কথা আমরা আগেই বলেছি। এবার আসা যাক “বিপুল অর্থ” প্রসঙ্গে। মডেল পিএসসি ২০১২ এর আওতায় সাম্প্রতিক বিডিং এ অগভীর সমুদ্রের ৭ নম্বর ব্লকে অনুসন্ধানের জন্য কনোকোফিলিপস ৪ কোটি ডলার বা ৩২০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করবে, ভারতীয় ওএনজিসি ৪ নম্বর ব্লকে ৫ কোটি ৮০ লাখ ডলার বা ৪৬৪ কোটি টাকা এবং ৯ নম্বর ব্লকে ৮ কোটি ৫০ লাখ ডলার বা ৬৮০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করবে। (সূত্র:  বণিক বার্তা, ২৯ মে ২০১৩) এর আগে মডেল পিএসসি ২০০৮ এর আওতায় কনোকোফিলিপস সাগরের ১০ ও ১১ নম্বর ব্লক থেকে গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলণের জন্য সর্বমোট ১১০.৬৬ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করার কথা বলেছে যার ২.৪৯৬ মিলিয়ন ডলার বা ২০ কোটি টাকা(১ ডলার=৮০ টাকা হিসেবে) খরচহচ্ছে প্রথম ৫ বছরে ১২০০ লাইন কি.মি দ্বিমাত্রিক ভূকম্পন জরিপ করতে, এরপর দুই বছর ধরে ৫০০ বর্গ কিমি এলাকায় ত্রিমাত্রিক ভূকম্পন জরিপ করতে এবং একটি অনুসন্ধান কুপ খনন করতে খরচ করবে ৫৮.১৬৬৫ মিলিয়ন ডলার এবং এরপর আরো দুই বছর ধরে বিনিয়োগ করবে মোট ৫০ মিলিয়ন ডলার।(সূত্র: দ্য ফাইনান্সিয়াল এক্সপ্রেস, ১ জানুয়ারি,২০১১) তাহলে মোট ৯ বছরে ১১০.৬৬ মিলিয়ন বা ১১ কোটি ডলার বা ৮৮০ কোটি টাকা বিনিয়োগ কি বাংলাদেশের জন্য অসম্ভব কোন ব্যাপার? আর এই টাকা তো আর একবারে বিনিয়োগ করতে হবে না, কাজেই বছরে গড়ে ১০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ তো বাংলাদেশের জন্য তেমন কোন সমস্যা হওয়ার কথা না। অবশ্য বাংলাদেশকে তার অবকাঠামো ডেভেলাপ করে গভীর সমুদ্রের প্রয়োজনীয় করে তোলার জন্য ১১ কোটি ডলারের বাইরেও আরো কিছু অর্থ বিনিয়োগ করতে হবে বাপেক্সের প্রকৌশলীদের ট্রেনিং, দক্ষতা বৃদ্ধি ইত্যাদি বাবদ।যদিও এই বিনিয়োগটা কেবল একটি/দুটি গ্যাস ব্লকের জন্য না, সাগরের অবশিষ্ট গ্যাস ব্লক এমনকি প্রয়োজনে ভবিষ্যতে বিদেশী গ্যাস ক্ষেত্রে বাণিজ্যিক ভাবে কাজ করার সক্ষমতা অর্জনেরও কাজে লাগবে। এর জন্য কয়েক হাজার কোটি টাকাও যদি বিনিয়োগ করতে হয়, তাহলেও সেটা প্রায় ২ লক্ষ কোটি টাকার বাজেটের দেশে, দৈনিক হাজার কোটি টাকা লেনেদেনের শেয়ার বাজারের দেশের জন্য অসম্ভব কিছু না।

কিন্তু শাসক শ্রেণীর সেদিকে কোন নজর নেই, জাতীয় সক্ষমতা বলে কোন কিছু তাদের অভিধানে নেই। তাদের উন্নয়ণ দর্শণ হলো বাজার উদারীকরণ, বেসরকারীকরণ, প্রবৃদ্ধি, বিদেশী বিনিয়োগ ইত্যাদির দোহাই পেড়ে জনগণের স্বার্থকে জবাই করে গুটিকয়েকের জন্য সোনার ডিম সংগ্রহ করা। ফলে সময় থাকতে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের দক্ষতা/সামর্থ্য বাড়ানোর কোন পদক্ষেপ না নিয়ে ভয়াবহ সংকট তৈরী করা হয় এবং পরে সেই সংকটের অযুহাতে বিদেশী কোম্পানির হাতে রাষ্ট্রীয় সম্পদ তুলে দেয়া হয়। এখন নীতি বা কৌশল যাই বলি না কেন ধান্দাটা যখন পরিস্কার, তখন পুজি, প্রযুক্তি ও দক্ষতা না থাকার অযুহাত দিয়ে আর বিদেশী কোম্পানির হাতে গ্যাস ব্লক তুলে দেয়া মেনে নেয়া যাবে না বরং শাসকদেরকে বাধ্য করতে হবে যেন দ্রুত রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বাপেক্সের সামর্থ্য বাড়িয়ে বাপেক্সের মাধ্যমে গ্যাসের শতভাগ জাতীয় মালিকানা বজায় রেখেই প্রয়োজনে বিভিন্ন সার্ভিস এগ্রিমেন্টের মাধ্যমে গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলণ করা হয়।