Monday, December 17th, 2012

নানা ইস্যুর ডামাডোলে চাপা পড়ে যাচ্ছে গ্যাস পাচারের খবর

কয়েকদিন আগে গ্যাস ব্লক বিডিং রাউন্ড ২০১২’র আওতায় অগভীর সমুদ্রে নয়টি এবং গভীর সমুদ্রের তিনটি, মোট ১২টি ব্লক ইজারা দেয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করল সরকার। দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি, জামায়াত-শিবিরের তান্ডব, যুদ্ধাপরাধের বিচার, বিজয়ের মাস, এরকম অনেক ইস্যুর আড়ালে চাপা পড়ে গেছে এই খবরটি। এতসব ঘটনার ফাঁকে সরকারের গ্যাস ব্লক ইজারা দেয়ার সিদ্ধান্তে নেমে পড়ার পেছনের কারণ কি? নতুন বিডিংয়ে দেশের স্বার্থ ঠিকঠাক রক্ষা হচ্ছে তো? সচেতন সমাজও এই প্রশ্নটি তোলার সময়-সুযোগ পাননি।

গ্যাসব্লক বিদেশি কোম্পানির কাছে ইজারা দেয়া হয় উৎপাদন বন্টন চুক্তি বা প্রোডাকশন শেয়ারিং কনট্রাক্টের (পিএসসি) মাধ্যমে। এবারের বিডিংয়ের জন্য সরকার পিএসসি ২০১২ প্রণয়ন করেছে। এই পিএসসি বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, কিছু ক্ষেত্রে আগের চেয়ে বেশি সুযোগ সুবিধা পেতে যাচ্ছে বিদেশি কোম্পানিগুলো। ঘোষিত ১২টি ব্লক থেকে অনেক বেশি দামে গ্যাস কিনতে হবে আমাদের। অথচ এর বিপরীতে কোনো প্রাপ্তি নেই। বর্তমানে প্রতি হাজার ঘনফুট গ্যাস ২.৯ ডলারে বিদেশি কোম্পানির কাছ থেকে কিনছে পেট্রোবাংলা। অথচ নতুন নিয়মে এখন অগভীর সমুদ্র থেকে প্রাপ্ত গ্যাস প্রতি হাজার ঘনফুট ৪.১৫৭ ডলার এবং গভীর সমুদ্রের গ্যাস ৪.৫৭৩ ডলারে কিনবে পেট্রোবাংলা। অর্থাৎ দ্বিগুণ দামে বিদেশি কোম্পানির কাছ থেকে গ্যাস কিনতে হবে পেট্রোবাংলাকে।

অন্যদিকে ২০০৮ সালের পিএসসি অনুসারে বিদেশি কোম্পানিগুলো তেল গ্যাস অনুসন্ধানে যে পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ করে সেটা মোট গ্যাসের ৫৫ ভাগের বিনিময়ে কস্ট রিকভারি হিসেবে সমন্বয়ের সুযোগ পেত। বাকি গ্যাস ভাগাভাগি হতো বাংলাদেশ ও বিদেশি কোম্পানির মধ্যে। নতুন পিএসসিতেও সেই ধারাই বিদ্যমান আছে। ফলে বাংলাদেশ কখনোই মোট গ্যাসের ২০ শতাংশের বেশি গ্যাসের দাবি করতে পারবে না। অথচ গ্যাস কিনতে হবে দ্বিগুণ দামে।

চিন্তা করে দেখেন, কাতারের মতো মধ্যপ্রাচ্যের দেশ, যাদের আমরা গালি দেই মধ্যযুগীয় বলে তারাও এক্ষেত্রে অনেক উন্নত। কাতারে আপনি তেল উত্তোলন করেন আর বিড়ির দোকান দেন, বিদেশি হলেই আপনার ব্যবসায় ৫১ ভাগ মালিকানা সরকারের। আর আমরা ফুলবাড়িতে কয়লাখনি করতে গিয়ে ৯৪ ভাগ দিয়ে দেই বিদেশি কোম্পানিকে। আরেকটা বিষয়, সরকার প্রায়ই দাম বাড়াতে গিয়ে বলে আমাদের দেশে গ্যাস, তেল, বিদ্যুতের দাম সবচেয়ে কম। এটা একটা ডাহা মিথ্যা কথা। মধ্যপ্রাচ্যে তেলের দাম অনেক কম। কোথাও কোথাও পানির দাম তুলনামূলক বেশি। আমার দেশে গ্যাস উৎপাদন হবে, আমাদের গ্যাস, আর আমরা সুবিধাটা পাব না? আমাদের তা কেন বেশি দামে কিনতে হবে?

পিএসসিতে দেশের স্বার্থবিরোধী আরো অনেক কিছু আছে। কিন্তু আমি রপ্তানীর বিষয়টাতে জোর দিচ্ছি। এবারের বিডিংয়ে রপ্তানীর কোনো বিধানই রাখা হয়নি বলে সরকার জোর প্রচারণা চালালেও এর মধ্যে বিরাট ফাঁকি রয়েছে। নতুন পিএসসিতে রপ্তানী শব্দটি কোথাও নেই। অর্থাৎ কোথাও বলা হয়নি রপ্তানী নিষিদ্ধ। ফলে যে কোনো অজুহাতে সরকার যে কোনো সময় রপ্তানীর সিদ্ধান্ত নিতে পারে। এতে কোনো বাধা থাকছে না।

অতি মাত্রায় গ্যাস উত্তোলিত হলে গ্যাস রপ্তানীর দরজা খুলে যাবে। এখন দেশের স্থলভাগে গ্যাস যেভাবে পাওয়া যাচ্ছে তা চাহিদা থেকে খুব বেশি দূরে না। গ্যাসের বর্তমান চাহিদা দৈনিক ২.৫ বিলিয়ন ঘনফুট। এর বিপরীতে উৎপাদন হচ্ছে ২.০৬ বিলিয়নের মতো। পাশাপাশি নতুন করে গ্যাস উত্তোলন প্রক্রিয়াও চলছে। কনোকো ফিলিপসের হাতে থাকা বঙ্গোপসাগরের ১০ ও ১১ নম্বর ব্লক থেকে গ্যাস উত্তোলন শুরু হলেই চাহিদার চেয়ে উৎপাদন বেশি হয়ে যাবে। এর সঙ্গে যদি নতুন এসব ব্লকে গ্যাস ওঠা শুরু করে তাহলে রপ্তানী ছাড়া আর কোনো উপায় থাকবে না। এবারের বিডিংয়ে রাখা ব্লকগুলোর অবস্থান আমাদের গ্যাস মজুদের ক্ষেত্রে খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশ ভূখণ্ডে মূলত দুটি বেসিনে তেল-গ্যাসের সন্ধান পাওয়া গেছে। এর একটি সুরমা বেসিন, অন্যটি বেঙ্গল বেসিন। প্রচারণা চালানো হচ্ছে, সুরমা বেসিনে গ্যাসব্লকের সংখ্যা কম, কিন্তু মজুত বেশি। বেঙ্গল বেসিনে ব্লকের সংখ্যা বেশি, কিন্তু প্রতিটিতে মজুত কম। কোনো কোনোটিতে মজুত এত কম যে তা বাণিজ্যিক ভিত্তিতে উত্তোলনযোগ্য নয়। সমুদ্রবক্ষের ব্লকগুলো বেঙ্গল বেসিনের অন্তর্ভুক্ত। এই প্রচারের মাধ্যমে বিদেশি কোম্পানিগুলোকে সরকারের কাছ থেকে বেশি লাভ পাইয়ে দেয়ার সুযোগ করে দেয়া হচ্ছে।

অথচ বাস্তবতা হচ্ছে, বাংলাদেশের সমুদ্রসীমার পূর্ব প্রান্তের যে ১২টি ব্লকের জন্য দরপ্রস্তাব চাওয়া হয়েছে, তার পাশেই মিয়ানমারের সমুদ্রসীমায় গ্যাসের বিশাল মজুত আবিষ্কৃত হয়েছে। তারা পেয়েছে দুটি ব্লকে ৬ ট্রিলিয়ন ঘনফুট (টিসিএফ)। পশ্চিমে ভারত পেয়েছে ১৫ টিসিএফের মতো। বাংলাদেশেও ওই এলাকায় বিপুল গ্যাস পাবার সম্ভাবনা তাই খুবই জোরালো। সেই বিবেচনাকে সামনে টেনে না এনে প্রচার চালানো হচ্ছে সমুদ্রে গ্যাসের মজুদ কম! যাতে বিদেশি বহুজাতিকদের অনেক ছাড় দিয়ে হলেও দেশে আনা যায়। এসব প্রচারণার পেছনে রপ্তানী চক্র সক্রিয় তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

এসব থেকে স্পষ্ট যে, এই বিডিং রাউন্ড ২০১২ দিয়ে সরকার আসলে গ্যাস রপ্তানীর রাস্তাই উন্মুক্ত করছে। তারা সবচেয়ে সম্ভাবনাময় ক্ষেত্রগুলোকে সাধারণ ক্ষেত্র বলে চালিয়ে দিয়ে সেখানে উত্তোলন কাজে নেমে পড়ছে। ফলে এগুলো থেকে গ্যাস উত্তোলন হলে হলে রপ্তানি ছাড়া উপায় থাকবে না। রপ্তানীর কোনো বিধান নেই বলাটা স্পষ্টতই প্রতারণা। আর এটা করা হচ্ছে এমন একটা সময়ে যখন মানুষের চোখ অন্যদিকে। মানুষ অন্যসব ইস্যু নিয়ে ব্যস্ত। সরকারের এই কাজ কি অপরাধের পর্যায়ে পড়ে না?

গ্যাস এখন সারা বিশ্বের জন্য মূল্যবান সম্পদ। দিনে দিনে এর চাহিদা ও মূল্য বাড়ছে আরো বাড়বে। আমাদের পরিকল্পনা হওয়া উচিত ছিল প্রয়োজন মেটানো। নইলে নিজেদের গ্যাস যদি এখনই আমরা বিক্রি করে দেই বা খুইয়ে ফেলি আগামীতে চড়া দামে এই গ্যাস কিনতে গিয়েই আবার আমরা নিঃস্ব হয়ে যাব। কিন্তু এখন সরকার যেভাবে বিডিং করছে এবং বহুজাতিক কোম্পানির হাতে ব্লকগুলো তুলে দিচ্ছে এটা আসলে জাতির সঙ্গে প্রতারণা। তারা বিদেশিদের প্রয়োজনে গ্যাস তুলছে এবং পানির দরে গ্যাস পাচারের ব্যবস্থা করছে। মুদ্রা পাচারের জন্য এখন অনেকের বিচার হচ্ছে। এই জ্বালানি পাচারকারীদেরও বিচারের মুখোমুখি করা দরকার। তারও আগে দরকার এই পাচার রুখে দেয়া। জাতীয় সম্পদ নিয়ে বিদেশী প্রভুদের তল্পিবাহক এই সরকারের কূটচাল সম্পর্কে জনগণকে অবগত করা এখন খুবই জরুরী।