Thursday, October 25th, 2012

উন্মুক্ত কয়লাখনি: বিষয়টি হবে জাতীয় দুর্ভাগ্য

গত ২২ অক্টোবর একাধিক পত্রিকায় লিড নিউজ ছিল, ‘উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলনের সুপারিশ।’ খবরে বলা হয়, অবশেষে উন্মুক্ত খননের সুপারিশ করেছে সরকার গঠিত কয়লা উত্তোলন পরামর্শক কমিটি। কমিটি শর্তসাপেক্ষে বড়পুকুরিয়া ও ফুলবাড়ীতে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লাখনি উন্নয়নের সুপারিশ চূড়ান্ত করেছে। (২২.১০.১২ বণিক বার্তা) এ প্রসঙ্গে সাংবাদিকদের কাছে ব্যক্ত করা আমার প্রতিক্রিয়ায় বলেছি, বাংলাদেশে কোনো অবস্থায় উন্মুক্ত কয়লাখনি সম্ভব নয়, এ সত্য কারোই আজ আর অজানা নয়। জনগণেরও তাতে সমর্থন নেই। প্রাণ দিয়ে তারা তা প্রমাণ করেছে। পরামর্শক কমিটি তা ভালো করেই জানে। দুর্ভাগ্যের বিষয়, এর পরও এমন সুপারিশ! এ প্রেক্ষাপটেই আজকের এ নিবন্ধ।

এ দেশের একজন বিবেকবান মানুষ হিসেবে ফুলবাড়ীতে প্রস্তাবিত উন্মুক্ত কয়লাখনি এলাকার বিপন্ন মানুষের পাশে দাঁড়ানোর উদ্দেশ্যে ২০০৬ সালের ২৬ আগস্ট ফুলবাড়ীতে উপস্থিত হই। তার আগে ২০০৫ সালের ২৪ ডিসেম্বর ফুলবাড়ী রক্ষা কমিটির আমন্ত্রণে তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির আহ্বায়ক প্রকৌশলী শেখ মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ সাহেবের সঙ্গে প্রথম সেখানে যাই, সেখানকার মানুষের অবস্থা নিজের চোখে দেখা এবং তাদের কথা নিজের কানে শোনার জন্য। ফিরে এসে লিখেছিলাম ‘ফুলবাড়ীকে বাঁচাতে হবে।’ তাতে বলেছিলাম, ‘উন্মুক্ত পদ্ধতিতে ফুলবাড়ী কয়লাখনি খনন এবং কয়লা রফতানি জাতির জন্য একটি ভয়ঙ্কর রকমের আত্মঘাতী কাজ। এত বড় আত্মঘাতী কাজ মেনে নেয়া যায় না। এ আত্মঘাতী কাজকে যে করেই হোক থামাতে হবে। সরকারকে থামাতে হবে। এশিয়া এনার্জি করপোরেশনকে থামাতে হবে। ফুলবাড়ীকে বাঁচাতে হবে। দেশের জ্বালানি সম্পদ বাঁচাতে হবে।’ সেদিন কি বুঝেছিলাম এ আত্মঘাতী কাজের ভয়াবহতা কত মারাত্মক! এশিয়া এনার্জির অফিসের নিরাপত্তার অজুহাতে সবার অলক্ষ্যে পুলিশ-বিডিআর-র্যাব দিয়ে প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছে ফুলবাড়ীতে এক বিরাট হত্যাকাণ্ডের! একে হত্যাকাণ্ড না বলে এশিয়া এনার্জির উদ্দেশ্যে উত্সর্গকৃত হত্যাযজ্ঞ বলাই শ্রেয়। বিনিময়ে সরকার এশিয়া এনার্জির কাছ থেকে পুরস্কার হিসেবে ধন্যবাদ পায়। ঘটনায় তখনকার জ্বালানি উপদেষ্টা ক্ষুণ্ন হন, বিদেশী বিনিয়োগ বিঘ্ন হতে পারে সেই আশঙ্কায়।
২০০৬ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি জাতীয় প্রেস ক্লাবে সাপ্তাহিক ২০০০ আয়োজিত ‘প্রসঙ্গ: ফুলবাড়ী কয়লা প্রকল্প’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে উপস্থাপিত মূল প্রবন্ধটি একটি গল্প দিয়ে শেষ করেছিলাম। গল্পটি: আদিকালে কোনো এক রাজার অতিথি হয়ে এলেন আরেক রাজা। তোপ দেগে অভ্যর্থনা জানানোর কথা। রাজ অতিথি এলেন। তোপ দাগা হলো না। রাজা ক্ষুব্ধ হলেন। সেনাপতিকে ডাকা হলো। তিনি নিবেদন করলেন, ‘হুজুর! তোপ দাগতে না পারার কারণ ২১টি। তন্মধ্যে প্রথম কারণটি বারুদ ভেজা ছিল।’ রাজাকে অন্য কারণগুলো আর বলার প্রয়োজন হয়নি। যেহেতু দেশের মানুষ উন্মুক্ত খনি চায় না, দেশের কয়লা ও গ্যাস বিদেশে রফতানি করতেও চায় না, বিদেশীদের কাছে বেচে দিতে চায় না, কারণ যেটুকু গ্যাস বা কয়লা আছে, তা আমাদের চাহিদার তুলনায় খুবই সামান্য; সেহেতু আমরা টাটা বা এশিয়া এনার্জিকে গ্যাস অথবা কয়লা কোনোভাবেই দিতে নারাজ। এই ‘না দেয়া’র আরও অনেক কারণ আছে। আদিকালের রাজার মতো আমাদের রাজাকেও এই না দেয়ার কারণ বোঝানোর জন্য অন্য সব কারণ আর বলার প্রয়োজন নেই বলে আমি সেদিন মনে করেছিলাম।

অথচ ফুলবাড়ীর মানুষ এসব কারণ বোঝানোর জন্যই মাসের পর মাস দোকানপাট, বাড়িঘরে কালো পতাকা প্রদর্শন করেন। সপ্তাহে এক দিন করে মিছিল করেন। সেখানকার নারীরা ঝাঁটা মিছিল করেন। ফুলবাড়ী কয়লাখনি উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রস্তাব মূল্যায়নকারী সরকারি বিশেষজ্ঞ কমিটির সামনে ফুলবাড়ী শহরে হাজির হয়ে ফুলবাড়ীর হাজার হাজার মানুষ ২০০৬ সালের ২৬ জানুয়ারি ওই প্রস্তাবের প্রতিবাদ জানিয়ে আসেন। তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটি ফুলবাড়ীতে উন্মুক্ত খনি উন্নয়ন কর্মকাণ্ড বন্ধ করার দাবিতে তিন দিনের রোডমার্চশেষে ২৫ মার্চ বিকালে ফুলবাড়ীতে গণসমাবেশ করে। হাজার হাজার মানুষের সে সমাবেশ থেকে ধ্বনিত হয়, ‘ফুলবাড়ী ঘোষণা: কয়লা খনি হবে না। এশিয়া এনার্জির আস্তানা ফুলবাড়ীতে হবে না।’ তা ছাড়া জাতীয় আদিবাসী পরিষদ ২৯ এপ্রিল ফুলবাড়ীতে আদিবাসী কৃষক সমাবেশ করে। সে সমাবেশ থেকে ফুলবাড়ী প্রস্তাবিত খনি প্রকল্প এলাকার ৬৭টি আদিবাসী গ্রাম উচ্ছেদ বন্ধ ও উন্মুক্ত খনি না করার দাবি জানানো হয়। ওই দাবি আদায়ের লক্ষ্যে ১ জুন তেল-গ্যাস রক্ষা কমিটির সঙ্গে যৌথভাবে দেশব্যাপী তারা মানববন্ধন করে এবং ওই দিন বিকালে শহীদ মিনারে আদিবাসী সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। ২৪ জুন এশিয়া এনার্জির উচ্ছেদ তালিকাভুক্ত ৬৭টি আদিবাসী গ্রামের আদিবাসীদের ফুলবাড়ীতে সমাবেশ হয়। ওই সমাবেশ থেকে ১২ জুলাই উচ্ছেদের প্রতিবাদ ও উন্মুক্ত খনি না করার দাবিতে এশিয়া এনার্জির অফিস ঘেরাও কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। পরে এ কর্মসূচি তেল-গ্যাস রক্ষা কমিটির ২৬ আগস্ট কর্মসূচির সঙ্গে সম্পৃক্ত করা হয়। তেল-গ্যাস রক্ষা কমিটি সর্বশেষ সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে ২৩ আগস্ট সরকার ও দেশবাসীকে ফুলবাড়ীতে এশিয়া এনার্জির অফিস ঘেরাও কর্মসূচি অবহিত করে। তার আগে ১১ আগস্ট ফুলবাড়ীর স্থানীয় তেল-গ্যাস রক্ষা কমিটি স্মারকলিপি দিয়ে এ ঘেরাও কর্মসূচি জেলা প্রশাসককে অবহিত করে। তারও আগে পোস্টার এবং লিফলেটের মাধ্যমে তাদের এ কর্মসূচি দেশব্যাপী ব্যাপক প্রচার করা হয়। তার পরও সরকার বা এশিয়া এনার্জি কেউই বুঝতে চায়নি— ফুলবাড়ীতে উন্মুক্ত কয়লাখনি হবে না, ফুলবাড়ীর মানুষ উন্মুক্ত কয়লা খনি চায় না। তার প্রমাণ পাওয়া যায় এশিয়া এনার্জির বিবৃতি ও জ্বালানি উপদেষ্টার বক্তব্যে। ফলে ২৬ আগস্ট ফুলবাড়ীর হত্যাকাণ্ডে সেখানকার মানুষকে প্রাণ দিতে হয়। তারও দীর্ঘ অর্ধযুগ পর সরকারের পরামর্শক কমিটি উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলনের সুপারিশ করেছে। এ অবস্থাকে জাতীয় দুর্ভাগ্য ভিন্ন কিছু বলা চলে না।

২৬ আগস্ট উন্মুক্ত খনি উন্নয়ন প্রকল্প বাতিলের দাবিতে ফুলবাড়ীতে এশিয়া এনার্জির অফিস ঘেরাও কর্মসূচি পালনের পর যে হত্যাকাণ্ড ঘটেছে, সে সম্পর্কে এশিয়া এনার্জির বক্তব্য ছিল ‘… এশিয়া এনার্জি ফুলবাড়ীতে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে এবং ফুলবাড়ী ও সংলগ্ন উপজেলাগুলোতে কোম্পানীর প্রতি পূর্ণ সমর্থন রয়েছে…’ (২৮.০৮.০৬ যায়যায়দিন)। কোম্পানির অন্য এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ব্রায়ান মুনি বলেন, ‘ফুলবাড়ী থেকে এশিয়া এনার্জি প্রত্যাহারের প্রশ্নই আসে না। তারা সফলভাবেই কয়লা উত্তোলনের কাজ শেষ করবে।’ (২৮.০৮.০৬ প্রথম আলো)। জ্বালানি উপদেষ্টা বলেন ‘…খনি এলাকায় এশিয়া এনার্জির কাজকর্ম বন্ধ থাকলেও ঘেরাও কর্মসূচি পালন করা হয়েছে’ (২৮.০৮.০৬ যায়যায়দিন)। জ্বালানি উপদেষ্টার এ কথা যে বিভ্রান্তিকর তা বোঝাযায় তাদের বক্তব্যে যাদের পক্ষে তিনি সাফাই গেয়েছিলেন। জেলা প্রশাসক এশিয়া এনার্জিকে তাদের কার্যক্রম স্থগিত রাখার নির্দেশ দেন। কিন্তু জেলা প্রশাসকের সে নির্দেশ উপেক্ষা করে এশিয়া এনার্জি তার কার্যক্রম ২৫ আগস্ট পর্যন্ত ফুলবাড়ীতে অব্যাহত রাখে। দেখা গেছে, অফিস সম্প্র্রসারণ, খনি বাস্তবায়িত হলে কীভাবে পানি সরবরাহ করা হবে তার মডেল এবং যারা উচ্ছেদ হবেন, তারা যেসব বাড়ি পাবেন, সে রকম চার ধরনের বাড়ির মডেল তৈরির কাজে তারা নিয়োজিত ছিল। ফুলবাড়ীতে উন্মুক্ত কয়লাখনি হবে কি না, হলে তার প্রতিবাদে ফুলবাড়ীবাসীর অব্যাহত আন্দোলনকে উপেক্ষা করে এশিয়া এনার্জির কর্মতত্পরতা যদি অব্যাহত থাকে, তাহলে সে আন্দোলনের গতি-প্রকৃতি কি হতে পারে, তদনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা বা না করার দায়-দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় হিসেবে জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের ওপরই বর্তায়। কিন্তু জ্বালানি উপদেষ্টা বলেন, ‘ঘটনার দায়-দায়িত্ব জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের নয়, এ জন্য মন্ত্রণালয় কোনো তদন্তও করবে না’ (২৮.০৮.০৬ যায়যায়দিন)। যদিও তিনি এশিয়া এনার্জির সঙ্গে সরকারের চুক্তিটি জাতীয় স্বার্থবিরোধী বলে আগেই অভিহিত করেন (২৯.০৮.০৬ প্রথম আলো), তবু এ চুক্তি বাতিলের জন্য তিনি উদ্যোগ গ্রহণে অপারগ। কারণ তিনি বিনিয়োগ বোর্ডের চেয়ারম্যান, চুক্তিটি বিদেশী বিনিয়োগসমৃদ্ধ। বিনিয়োগ বোর্ডের চেয়ারম্যান কেন জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী বা কর্তাব্যক্তি হলেন, তা কি জ্বালানি খাতের স্বার্থ সংরক্ষণের জন্য? নিশ্চয়ই না। বিনিয়োগ বোর্ডের চেয়ারম্যান জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর পদে অধিষ্ঠিত হয়ে দেশের স্বার্থ প্রাধান্য না দিয়ে বিনিয়োগের অজুহাত দেখিয়ে বিচার-বিশ্লেষণ ছাড়াই বিদেশীদের স্বার্থ রক্ষায় নিজেকে নিয়োজিত রাখার সুযোগ পান। দেশের স্বার্থবিরোধী হলেও সে সুযোগ নানাভাবে কাজে লাগান তিনি। এতে এশিয়া এনার্জির প্রতি তার অনুরাগের বহিঃপ্রকাশ ঘটে।

জনগণের কল্যাণে দেশের যে উন্নয়ন, তাতে আর্থিক বিনিয়োগ দরকার। রাষ্ট্রের সে বিনিয়োগ সক্ষমতা নেই। তাই বিদেশী বিনিয়োগ দরকার। এমন ধারণা স্বতঃসিদ্ধ হিসেবে ধরে নিয়ে সরকার জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাত উন্নয়নে বিনিয়োগ কৌশল বিনির্মাণে যে নীতি গ্রহণ করেছে, সে নীতিতে বিনিয়োগকারীর জন্য পর্যাপ্ত মুনাফা লাভের নিশ্চয়তা রয়েছে। সেই অজুহাতে বিনিয়োগকারীর স্বার্থ রক্ষায় মন্ত্রণালয় ও মন্ত্রণালয়ের ক্ষমতাপ্রাপ্ত ব্যক্তি বা ব্যক্তিবিশেষের তত্পরতায় জনস্বার্থ কীভাবে তছনছ হয়, তার প্রমাণ হিসেবে ফুলবাড়ী হত্যাকাণ্ড বাঙালি জাতির ইতিহাসে আর এক করুণ অধ্যায় হয়ে রয়েছে। এমন তত্পরতা এরশাদ সরকারের আমলে মানুষ দেখেছে কাফকোর ক্ষেত্রে। জোট সরকারের আমলে দেখল নাইকো, টাটা ও এশিয়া এনার্জির ক্ষেত্রে। এশিয়া এনার্জির স্বার্থ রক্ষায় কয়লানীতি প্রণয়নে জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের নগ্ন তত্পরতা দেখেছে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে। এমন তত্পরতা বর্তমান মহাজোট সরকারের আমলেও অব্যাহত।

বর্তমান প্রধানমন্ত্রী কয়লা উত্তোলন পদ্ধতি নির্ধারণের ব্যাপারে নূরুদ্দিন মাহমুদ কামালকে সভাপতি করে ওই পরামর্শক কমিটি গঠন করার প্রস্তাব করায় সে কমিটি গঠন করা হলেও নূরুদ্দিন মাহমুদ কামালকে সভাপতি করা হয়নি। এ কমিটি বড়পুকুরিয়া কয়লাখনির উত্তরাংশে বিদেশী কোম্পানির মাধ্যমে সরাসরি উন্মুক্ত পদ্ধতিতে একটি কয়লা খনি করার সুপারিশ করেছে। এ খনি সফল হলে ফুলবাড়ীতেও উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা তোলা হবে বলে সুপারিশে বলা হয়েছে। তা ছাড়া এশিয়া এনার্জি পরিচালিত সমীক্ষা প্রতিবেদন অনুযায়ী বিদেশী কোম্পানি দিয়ে কয়লা তোলার পক্ষে কমিটির সদস্যদের শক্ত অবস্থান রয়েছে। কমিটির সভাপতি একজন খনি বিশেষজ্ঞ। তিনি নিশ্চিত জানেন, পরিবেশগত কারণে বাংলাদেশে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লাখনি সম্ভব নয়। এ উন্মুক্ত খনির বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা আন্দোলনে তত্কালীন বিরোধীদলীয় মহাজোট নেত্রী শেখ হাসিনার সমর্থন ছিল। আন্দোলনের মুখে উন্মুক্ত খনি না করার অঙ্গীকারসহ ফুলবাড়ীর জনগণের সঙ্গে সরকারের সম্পাদিত ছয় দফা চুক্তি বাস্তবায়নের পক্ষে তিনি শক্ত অবস্থান নেন। গত ১৪ জানুয়ারি প্রকৌশলীদের সম্মেলনে আজকের প্রধানমন্ত্রী ফুলবাড়ী কয়লাখনিকে ইঙ্গিত করে যে অভিব্যক্তি প্রকাশ করেন, তাতে তার আগের অবস্থানেরই বহিঃপ্রকাশ ঘটে। এশিয়া এনার্জির দাখিলকৃত উন্মুক্ত পদ্ধতিতে ফুলবাড়ী কয়লাখনি উন্নয়ন পরিকল্পপনা প্রস্তাব ২০০৬ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর সরকারের কাছে পেশকৃত বিশেষজ্ঞ কমিটির মূল্যায়ন প্রতিবেদনে নাকচ করা হয়। ওই সুপারিশে এসব বিষয় মোটেও গুরুত্ব পায়নি। উন্মুক্ত খনির বিরুদ্ধে যেসব যুক্তি ও তথ্য-প্রমাণ রয়েছে, এ সুপারিশের ক্ষেত্রে কমিটি তা বিবেচনায় নেয়নি। এই যদি অবস্থা হয়, তাহলে সরকারের কাজ সঠিক এবং জনস্বার্থসম্মত হয় কীভাবে?

সরকার বদলের সঙ্গে সঙ্গে অনেক কিছু বদলে যায়। শুধু বদলায় না জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের তত্পরতা ও ভূমিকা। তার প্রকাশ ঘটে বিভিন্ন সরকারের আমলে বা প্রেক্ষাপটে মন্ত্রণালয়ের শীর্ষে থাকা কিছু ব্যক্তির ভূমিকা ও তত্পরতায় যাদের নাম প্রকাশ থেকে বিরত থাকলাম। কোনো কোনো ক্ষেত্রে সরকারের বিরুদ্ধে তাদের অবস্থান ও ভূমিকা স্পষ্ট হতে দেখা যায়। সরকার জনগণের দাবি মেনে নিয়ে জনগণের সঙ্গে আপস করলেও তারা জনগণের মুখোমুখি হন। তারা যে একে অপরের সম্পূরক ও পরিপূরক তার প্রমাণ দেন। জহির রায়হানের ‘হাজার বছর ধরে’ উপন্যাসের মতো বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে একই ঘটনা ধারাবাহিকভাবে ঘটেই চলে, বদলায় না; সরকার বা পাত্রপাত্রীর বদল হয় মাত্র।

লেখক: জ্বালানি বিশেষজ্ঞ
অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, তড়িৎ ও ইলেক্ট্রনিক কৌশল বিভাগ ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি
dean.scgu@yahoo.com

লেখাটি ২৫ অক্টোবর ২০১২ তারিখে বণিক বার্তায় প্রকাশিত।