Tuesday, March 25th, 2008

ড. এম. তামিমের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ এবং দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি প্রদান প্রসঙ্গে প্রদত্ত স্মারক লিপি

গত ২৫ মার্চ ২০০৮ তারিখে তেল-গ্যাস-খনিজ স¤পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত কেন্দ্রীয় কমিটির সভায় “মাননীয় প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী অধ্যাপক এম. তামিমের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ এবং বিদ্যুৎ, জ্বালানী ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি প্রদান” মর্মে  তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মাননীয় প্রধান উপদেষ্টা বরাবর একটি স্মারক লিপি পাঠানোর সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। প্রধান উপদেষ্টার দপ্তর থেকে স্মারক লিপির প্রাপ্তি স্বীকার করা হয় ০১ এপ্রিল তারিখে। পাঠকের সুবিধার্থে পত্রটির মূল অংশ নিচে হুবহু তুলে দেয়া হলোঃ-

জনাব,

উপযুক্ত বিষয় ও সূত্রে আপনার সদয় অবগতির জন্য জানানো যাচ্ছে যে, অধ্যাপক ড. এম. তামিম বিদ্যুৎ, জ্বালানী ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব গ্রহণের পর নিম্নে বর্ণিত দেশের স্বার্থবিরোধী কার্যক্রম গৃহীত হয়েছে এবং প্রক্রিয়াধীন আছেঃ

১. ৩ বছর ধরে প্রতি মেগাওয়াট শক্তির জন্য গড়ে প্রায় ৪ কোটি টাকা ভাড়ায় কয়েকটি ভাড়াভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে ২৬০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কেনা হবে এবং সেই সাথে প্রতি একক বিদ্যুতের দাম দিতে হবে গড়ে ৫.৬৪ টাকা।

২. বর্তমান সরকারের বিশেষজ্ঞ কমিটি কর্তৃক কয়লানীতি চুড়ান্ত করা হলেও তা বহুজাতিক কোম্পানির স্বার্থে পরিবর্তন করার লক্ষ্যে আবারও কমিটি করা হচ্ছে।

৩. বিদেশী কেম্পানির সাথে ১২, ১৩ ও ১৪ নং ব্লকের চুক্তি কার্যকর না থাকা সত্ত্বেও এ ব্লকগুলি সরকার ঘোষিত নীতি অনুযায়ী বাপেক্সকে না দিয়ে পুনরায় বিদেশী কোম্পানিকে দেয়া হচ্ছে।

৪. আইপিপি’র বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনে দেশী কোম্পানির অংশগ্রহণের সুযোগ রদ করে কৌশলে বিদেশী কোম্পানিকে দেয়া হচ্ছে।

৫. মডেল পিএসসি কয়লানীতির ন্যায় বিশেষজ্ঞ দ্বারা পরীক্ষিত, পর্যালোচিত ও জনগণের নিশ্চিত অনুমোদন না নিয়ে জনগণের মালিকানাধীন সাগরের তেল-গ্যাস সম্পদ জনগণের অজ্ঞাতে ইজারা দেয়ার জরুরী পদক্ষেপ নিচ্ছেন।

উল্লেখ্য, ১৫ আগস্ট ২০০৮ তারিখে ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউটের সভাকক্ষে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবীণ ও বিশেষজ্ঞ শিক্ষকবৃন্দ এক সংবাদ সম্মেলনে উদ্ভুত পরিস্থিতিতে নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় না আসা পর্যন্ত সাগরের তেল-গ্যাস ইজারা কার্যক্রম স্থগিত রাখার জন্য সরকারের প্রতি এক আহ্বান জানান।

তাঁদের এ আহ্বান দেশের সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে অভাবনীয় সাড়া জাগায়। কোন কোন সংবাদপত্রের সম্পাদকীয়তে বলা হয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৬ জন প্রবীণ ও বিশেষজ্ঞ শিক্ষক শনিবার সংবাদ সম্মেলনে যে বক্তব্য তুলে ধরেছেন তাতে জনগণের মনের কথা ফুটে উঠেছে। অথচ জ্বালানী মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ড. তামিম তাঁর প্রতিক্রিয়ায় জানালেন, “বঙ্গোপসাগরের তেল-গ্যাস অনুসন্ধান স্থগিত করার প্রশ্নই আসেনা। কোন কিছু পরিবর্তনও করা হবেনা।” তার এ বক্তব্য পরিস্থিতি যেমন জটিল করেছে, তেমন বর্তমান তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ভাবমূর্তি করেছে সঙ্কটাপন্ন। ফলে জনগণের উদ্বেগ ও উৎকন্ঠা বেড়েছে।

এ প্রসঙ্গে উল্লেখ্য যে, অধ্যাপক তামিম সরকারের সিদ্ধান্তের অপেক্ষা না করেই তাঁর স্বীয় বিবেচনায় ঘোষণা দিলেন যে, ইজারা স্থগিত রাখার প্রশ্নই ওঠেনা এবং কোন কিছু পরিবর্তনও করা হবে না। তাঁর এই অবস্থান, বিদেশী তেল-গ্যাস কোম্পানির হয়ে কাজ করার ব্যাপারে জনগণের অভিযোগের আলামত খুঁজে পাওয়া যায়। কোন মন্ত্রী/প্রতিমন্ত্রী সাংবিধানিক বিধান মতে এই মর্মে শপথ গ্রহণ করেন যে, তিনি তাঁর দায়িত্ব পালনে অনুরাগ বা বিরাগের বশবর্তী হবেন না। কিন্তু তাঁর ঐ অবস্থান গ্রহণে পরিষ্কার হয় যে, তিনি অনুরাগের বশে পরিকল্পিত উদ্দেশ্য নিয়ে এই ইজারা সংক্রান্ত পদক্ষেপে তড়িঘড়ি করছেন। ইতোপূর্বেও এ ধরণের জনস্বার্থবিরোধী ও বহুজাতিক কোম্পানির স্বার্থরক্ষার ব্যাপারে তাঁর অবদান সুবিদিত। ২০০১ সালে বিদেশে গ্যাস রপ্তানির বিরুদ্ধে যখন সারা দেশের মানুষ আন্দোলনরত, তখন দেশে পর্যাপ্ত গ্যাস মজুদ রয়েছে, এমন যুক্তিতে সরকারের গ্যাস মজুদ ও ব্যবহার বিষয়ক কমিটির সদস্য হিসেবে তিনি গ্যাস মজুদের ব্যাপারে কমিটির সিদ্ধান্তের সাথে ভিন্ন মত পোষণ করে ইউনোক্যালের স্বার্থ রক্ষায় গ্যাস রপ্তানির পক্ষ নেন। এমনকি তদানীন্তন জ্বালানী প্রতিমন্ত্রী জনাব মোশাররফ হোসেনের সাথে প্রধানমন্ত্রীকে গ্যাস রপ্তানির পক্ষে বলার জন্য তাঁর দফতরে উপস্থিত হন।

এছাড়া ছাতক (পশ্চিম) গ্যাসফিল্ড দুদফা বিস্ফোরণের ক্ষয়-ক্ষতি নিরূপণ কমিটির তিনি সভাপতি ছিলেন। এ কমিটি গ্যাসের ক্ষয়-ক্ষতির পরিমাণ ৩ বিসিএফ দেখিয়ে রিপোর্ট দেয়ায় নাইকোর স্বার্থ রক্ষা করা হয়। নাইকো চুক্তি মতে এ গ্যাসফিল্ডে উত্তোলনযোগ্য গ্যাসের পরিমাণ ছিল ২৬৮ বিসিএফ। পুরো গ্যাসফিল্ডই বিস্ফোরণের কারণে এখন পরিত্যক্ত। সুতরাং ৩ বিসিএফ নয়, পুরো মজুদ ২৬৮ বিসিএফ গ্যাসই ক্ষতি হয়েছে বলে ধরতে হবে। নাইকো চুক্তিতে মজুদ গ্যাসের পরিমাণ কম দেখিয়ে দেশের ক্ষতি করায় সে  চুক্তির কারণে দু-দু’জন সাবেক প্রধানমন্ত্রী এখন দুর্নীতির দায়ে বিচারাধীন। অথচ সেই একই সময়ে বিস্ফোরণে ক্ষতিগ্রস্ত গ্যাসের পরিমাণ কম দেখিয়ে নাইকোকে লাভবান করার অভিযোগে অভিযুক্ত করার পরিবর্তে অধ্যাপক তামিমকে বিদ্যুৎ ও জ্বালানী মন্ত্রণালয়ের শীর্ষে নিয়োগ দেয়ায় দেশের মানুষের সন্দেহ ও উদ্বেগ বৃদ্ধি পায়। বহুজাতিক কোম্পানির স্বার্থে তিনি চূড়ান্ত কয়লা নীতিতে পরিবর্তন চান এবং সাগরের সব কটি তেল-গ্যাস ব্লক জনগণের নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় আসার আগেই দ্রুততম সময়ে তড়িঘড়ি করে ইজারা দিতে চান। কৌশলে দেশী কোম্পানিকে বাদ দিয়ে আইপিপির বিদ্যুৎ কেন্দ্র বিদেশী কোম্পানিকে দিতে চান। ফলে মানুষের সেই সন্দেহ ও উদ্বেগ উৎকন্ঠায় পরিণত হয় এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মনোযোগ আকর্ষণ করে।

অতঃপর জাতীয় কমিটির সভায় উপরের বর্ণনা মতে অধ্যাপক তামিম (ক) দেশের স্বার্থবিরোধী কাজ করেছেন এবং (খ) বিস্ফোরণে ছাতক (পশ্চিম) গ্যাসফিল্ডের গ্যাসের ক্ষয়-ক্ষতির পরিমাণ কম দেখিয়ে নাইকোর স্বার্থ রক্ষা করে দেশের ক্ষতি করেছেন বলে তাঁকে অভিযুক্ত করা হয়েছে।

এই অভিযোগের সূত্রে বিদ্যুৎ, জ্বালানী  ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব থেকে তাকে অব্যাহতি প্রদানের জন্য আপনার নিকট এবং তাঁর বিচারের জন্য দুর্নীতি-দমন কমিশনের নিকট আবেদন করার জন্য জাতীয় কমিটির ঐ সভায় সিদ্ধান্ত গৃহীত হওয়ায় তাকে উক্ত মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি প্রদানের জন্য আপনাকে একান্ত অনুরোধ জানানো হল।

তাছাড়া (১) ভাড়াভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের বিদ্যুৎ মাত্রাতিরিক্ত মূল্যে না কেনার জন্য, (২) আইপিপি’র বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ব্যাপারে দেশী কোম্পানিগুলোকে দরপত্রে  অংশগ্রহণের সুযোগ দেয়ার জন্য, (৩) চূড়ান্ত কয়লা নীতি বিদেশী কোম্পানির স্বার্থে পরিবর্তন না করার জন্য (৪) ১২, ১৩ ও ১৪ নং ব্লক পুনরায় বিদেশী কোম্পানিকে না দিয়ে বাপেক্সকে দেয়ার জন্য; এবং (৫) ফুলবাড়ী কয়লা প্রকল্প বাতিল ও এশিয়া এনার্জিকে বহিষ্কারের জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ জানানো হ’ল।