Thursday, March 18th, 2010

প্রাইভেট পোর্ট : এসএসএ’র জন্য আ’লীগ ও বিএনপির দরদ

চট্টগ্রাম বন্দর উন্নয়ন ফোরামের পুস্তিকায় আরও বলা হয়, চুক্তির খসড়া অনুযায়ী, ‘নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয় পতেঙ্গা এলাকায় ব্যক্তিমালিকানাধীন ১৫৮.৮৭ একর জমিসহ বর্তমানে বিভিন্ন কর্তৃপক্ষের মালিকানাধীন আরো ৫২.৭৭ একর জমির মালিকানা এসএসএ (বাঃ) লিঃকে হস্তান্তরের জন্য প্রয়োজনীয় সুপারিশ ও সহযোগিতা প্রদান করবে। তদুপরি ভবিষ্যতে এসএসএ (বাঃ) লিঃ তাদের টার্মিনাল সম্প্রসারণ করতে চাইলে প্রয়োজনের অতিরিক্ত জমির মালিকানা যাতে এসএসএ (বাঃ) লিঃ পেতে পারে তার ব্যবস্থা নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয় নিশ্চিত করবে।’ তাছাড়া, ‘এসএসএ টার্মিনালে যে কোনো জাহাজকে ভিড়তে দেওয়া বা না দেওয়া তাদের এখতিয়ারভুক্ত, কন্টেইনার বা অন্যান্য মালামাল উঠাতে বা নামাতে দেওয়া বা না দেওয়া সম্পূর্ণভাবে এসএসএ (বাঃ) লিঃ-এর ইচ্ছাধীন থাকবে।’ এবং ‘এসএসএ (বাঃ) লিঃ সম্পদের জাতীয়করণ, হুকুম দখল ও সরকারের অন্যান্য হস্তক্ষেপের ব্যাপারে বাধা-নিষেধ থাকবে।’ পরিষ্কারভাবে দেখা যাচ্ছে, প্রকল্পটি উন্নয়নের নামে চিরস্থায়ী দখলের একটি আয়োজন ছিল।

চুক্তির খসড়ায় আরও উল্লেখ ছিল, ‘সরকার এসএসএ (বাঃ) লিঃ প্রকল্পকে স্ট্র্যাটেজিক ইন্ডাস্ট্রি ঘোষণা করবে এবং দেশ ও বিদেশ থেকে ইকু্ইটি ও ঋণের মাধ্যমে মূলধন সংগ্রহ করার ক্ষমতা প্রদান করবে।’ এছাড়াও তাদের জন্য প্রতিশ্রুতি ছিল বিবিধ প্রকার ইনসেনটিভ,  যেমন- ১. কমার্শিয়াল অপারেশন শুরু করার পর থেকে ১৫ বছর পর্যন্ত করপোরেট ইনকাম ট্যাক্স থেকে অব্যাহতি, ২. তাদের আমদানিকৃত সব যন্ত্রপাতি, নির্মাণ সামগ্রী/খুচরা যন্ত্রাংশ ও অন্য সব ধরনের মালামাল বিনা শুল্কে (আমদানি শুল্ক, উন্নয়ন সারচার্জ, ভ্যাট, সাপ্লিমেন্টারি ট্যাক্স, অগ্রিম ইনকাম ট্যাক্স, ইমপোর্ট পারমিট ফি) আমদানী করার সুবিধা, ৩. আমদানিকৃত মালামাল/যন্ত্রপাতির ওপর অন্যকোনো ধরনের স্থানীয় কর থেকে রেয়াত, ৪. পৌরকর, স্টাম্প ডিউটি, রেজিস্ট্রেশন ট্যাক্স, প্রোপার্টি ট্যাক্স ইত্যাদি সব ধরনের কর প্রদান থেকে অব্যাহতি; ৫. প্রকল্পে নিয়োজিত বিদেশীদের বেতন-ভাতা ইত্যাদির ওপর আয়করসহ সব ধরনের কর প্রদান থেকে অব্যাহতিসহ বেতন-ভাতা ও অন্যান্য পাওনাদির অর্ধেক বৈদেশিক মুদ্রায় স্বদেশে প্রেরণের সুবিধা, ৬. বৈদেশিক মুদ্রায় বাংলাদেশ থেকে তহবিল নেওয়ার অবাধ ও অসীম সুবিধা এবং সে উদ্দেশ্যে বাংলাদেশী টাকার কোনো ধরনের বিধিনিষেধ ব্যতিরেকে বৈদেশিক মুদ্রায় রূপান্তরের সুবিধা ইত্যাদি।

সহজেই বোধগম্য যে, বিদেশি কোম্পানি এসব ইনসেনটিভ বা কর শুল্ক রেয়াত পেলে চট্টগ্রাম বন্দরের তুলনায় অনেক বেশি সুবিধাজনক অবস্থানে প্রতিষ্ঠিত হতো যাতে ক্রমাগত কোণঠাসা হতো চট্টগ্রাম বন্দর। কেননা, রাষ্ট্রীয় বন্দরকে তাদের নিজস্ব সুবিধাদি নির্মাণের জন্য ‘আমদানিকৃত মালামালসহ সব ধরনের কার্গো হ্যান্ডলিং যন্ত্রপাতি টাগ/ড্রেজারসহ বন্দরের জাহাজ, খুচরা যন্ত্রাংশ ইত্যাদির জন্য সরকার নির্ধারিত হারে আমদানি শুল্ক, ভ্যাট, সাপ্লিমেন্টারি ট্যাক্স, ইত্যাদি’ ইত্যাদি নিয়মিত পরিশোধ করতে হয়।

এরকম একটি প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য উচ্চপর্যায়ের আমলা ও কতিপয় ‘বিশেষজ্ঞের’ মধ্যে লক্ষ্যণীয় সক্রিয়তা অব্যাহত থাকে। ৫ নভেম্বর ১৯৯৮ সালে গঠিত বিশেষজ্ঞ কমিটির রিপোর্ট সম্পর্কে নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ের সচিব এম সাইফুল ইসলাম, প্রধানমন্ত্রীর কাছে এক সারসংক্ষেপ প্রেরণ করেন ১৫ এপ্রিল ১৯৯৯। এতে বলা হয়, ‘কমিটির সুপারিশমালা হতে দেখা যায় যে, পতেংগায় বেসরকারি খাতে কন্টেইনার টার্মিনাল নির্মাণ করা হলে কর্ণফুলী নদীর মোহনার পলি জমে চট্টগ্রাম বন্দর চ্যানেলের নাব্যতা হ্রাস পাওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই এবং জাহাজ চলাচলেও কোনো বিঘ্নের সৃষ্টি হবে না। কমিটির সুপারিশ অত্র মন্ত্রণালয় গ্রহণযোগ্য বলে মনে করে।…কমিটির উপরোক্ত সুপারিশমালার প্রেক্ষিতে এসএসএ বাংলাদেশ লিঃ কর্তৃক চট্টগ্রামস্থ পতেংগার কন্টেইনার টার্মিনাল নির্মাণের পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণ করা যেতে পারে।’

কিন্তু বিশেষজ্ঞ কমিটির এই রিপোর্ট সম্পর্কে প্রশ্ন উত্থাপন করে, ২২ জুন ২০০০ তারিখে, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের তৎকালীন চেয়ারম্যান কমোডর গোলাম রববানী নৌ-পরিবহনমন্ত্রী বরাবর প্রেরিত এক চিঠিতে লেখেন, যেহেতু ‘কর্ণফুলী নদীর মোহনায় এসএসএ বাংলাদেশ লিঃ কর্তৃক বন্দর নির্মাণ করা হলে বিদ্যমান চট্টগ্রাম বন্দরের নৌপথে ও নৌচলাচলের ওপর বিরূপ প্রতিক্রিয়া হবে কিনা তা নির্ধারণের জন্য চট্টগ্রাম বন্দরের সদস্য (প্রকৌশল ও উন্নয়ন ও সদস্যসহ (অপারেশন) বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক হোসেন আলী সমন্বয়ে গঠিত কমিটি হালনাগাদ ডাটা দিয়ে Mathematical Mode/Physical Hydraulic Study বা Simulation Study-এর মাধ্যমে যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া হবে তা সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ না করে প্রতিবেদন দিয়েছেন’ সেহেতু ‘বিদ্যমান বন্দরের নৌপথ ও নৌচলাচলের ওপর যে প্রতিক্রিয়া হবে সে সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়ার লক্ষ্যে স্বাধীন আন্তর্জাতিক খ্যাতি সম্পন্ন প্রতিষ্ঠান দিয়ে বা ন্যূনপক্ষে বাংলাদেশ সরকারের পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধিনস্থ ফরিদপুরের নদী গবেষণা ইন্সটিটিউট থেকে Mathematical Model/Physical Hydraulic Study এবং Simulation study-এর ব্যবস্থা করা’ আবশ্যক।

তিনি আরো বলেন, যদি ‘কর্ণফুলী নদীর মোহনায় বন্দর নির্মাণের ফলে বিদ্যমান বন্দরের নৌ পথে ও নৌ চলাচলে কোনোরূপ ক্ষতি হবে না মর্মে নিশ্চিত হওয়া যায় তা হলে চবক অধ্যাদেশ ১৯৭৬ (১৯৯৫ সালে সংশোধিত)-এর ১৭ ও ১৮ ধারায় বিধানাবলীর আলোকে শর্তাবলী নির্ধারণ করত বর্তমান বিশ্বে যে ধারায় BOT (Build Operate & Transfer)-এর ভিত্তিতে বন্দর নির্মিত হচ্ছে সেইভাবে বন্দর নির্মাণের লক্ষ্যে উন্মুক্ত আন্তর্জাতিক দরপত্র আহবান করে Best offer বেছে নিয়ে অত্র কর্তৃপক্ষ নিজেই বিদ্যমান আইনের মধ্যে থেকেই বন্দর নির্মাণ করতে আগ্রহী।’

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের এই অবস্থান অর্থাৎ বিশেষজ্ঞ কমিটির রিপোর্টের অস্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা এবং অসুবিধা যদি নাই হয় তাহলে নিজেরাই টার্মিনাল নির্মাণে আগ্রহ প্রকাশ মার্কিনী কোম্পানিকে ইজারা দেওয়ার বিরুদ্ধে খুব জোরদার একটি ক্ষেত্র তৈরি করে। ইতোমধ্যে এই সর্বনাশা ‘উন্নয়ন প্রকল্প’ নিয়ে আপত্তি ওঠে নানাদিক থেকে। আপত্তি ক্রমে প্রতিবাদ ও প্রতিরোধে রূপ নেয়। বিরোধীদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল বন্দরের ২২টি শ্রমিক সংগঠন, চট্টগ্রাম বন্দর উন্নয়ন ফোরাম, চট্টগ্রামের মেয়র এবং তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটি। বিরোধিতার যুক্তি ও অবস্থান অবশ্য সবার ক্ষেত্রে এক ছিল না।

আওয়ামী লীগ সরকার তার আমলের শেষ পর্যায়ে এ উদ্যোগ থেকে পিছিয়ে আসে। প্রবল জনমতের চাপে ৮ জুলাই ২০০১ সরকার পোর্ট নির্মাণ চুক্তি প্রক্রিয়া বন্ধ করে দেয়। কিন্তু লবিস্টরা তাদের হাল ছাড়েনি। একই সময়ে অর্থাৎ নির্বাচন ও পরবর্তী সরকার আগমনের মুখে মার্কিন রাষ্ট্রদূত মেরী এ্যান পিটার্স ‘পরবর্তী সরকারের প্রথম ১০০ দিনে বা হানিমুন পিরিয়ডে’ বাস্তবায়নের জন্য পাঁচদফা ‘প্রস্তাব’ হাজির করেন। এগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল- গ্যাস রফতানি, বন্দর নিয়ে মার্কিন কোম্পানির ইচ্ছাপূরণ, বিদ্যুৎ ও টেলিকমিউনিকেশনে মার্কিন বিনিয়োগ সম্প্রসারণ ইত্যাদি। পাঁচদফার প্রথমটিই ছিল এসএসএ’র সঙ্গে ‘৪৫০ মিলিয়ন ডলারের চুক্তি অবিলম্বে দ্রুত বাস্তবায়নের’ দাবি।

সেই অনুযায়ীই যেন, নতুন চারদলীয় জোট সরকার আমলে, আমলাতন্ত্রে নতুন গোছগাছ শুরু হয়। সরকার গঠনের কয়েকদিনের মধ্যে অর্থমন্ত্রী সাইফুর রহমান গ্যাস রফতানির পক্ষে বলতে গিয়ে বলেন, ‘মাটির নিচে গ্যাস পচিয়ে লাভ কী? পাট, চা, চামড়া যদি রফতানি করা যায় তাহলে গ্যাস রফতানি করা যাবে না কেন?’ বন্দর এলাকা প্রাইভেট টার্মিনাল নামে বিদেশী কোম্পানির কাছে ইজারা দেওয়ার ব্যাপারেও নতুন তৎপরতা শুরু হয়। সরকার গঠনের কয়েক মাসের মধ্যে ২০ ফেব্রুয়ারী ২০০২, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ আগের সরকারে ১৪ মে ১৯৯৮ গঠিত সচিব কমিটি পুনর্গঠন করে ৬ জন সচিবকে নিয়ে একটি কমিটি গঠন করে। এই কমিটির কার্যপরিধি নির্দিষ্ট করে বলা হয় ‘সরকার ও ব্যবহারকারীদের স্বার্থ সংরক্ষণ এবং প্রকল্পটির দ্রুত বাস্তবায়ন’। কমিটির রিপোর্টে বলা হয়, ‘…বাংলাদেশের মতো একটি দরিদ্র দেশে বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণের লক্ষ্যে সিদ্ধান্ত গ্রহণে দীর্ঘসূত্রতা দেশের জন্য ক্ষতিকারক বলে বিবেচিত হয়।’

উল্লেখ্য, ‘দেশের স্বার্থে’ প্রণীত বিদেশী বিনিয়োগের নামে এই চুক্তিনামার দলিলে উল্লেখ করা হয়, ‘ভূমি মন্ত্রণালয় এসএসএস (বাঃ) লিঃ কর্তৃক চিহ্নিত জমি ৯৯ বছর এবং তৎপরবর্তীতে আরো ৯৯ বৎসরের জন্য এসএসএ (বাঃ) লিঃকে লীজ/বরাদ্দ প্রদান করবে।’ অর্থাৎ ১৯৮ বছরের জন্য সার্বভৌম ক্ষমতায় এমন এক কোম্পানির হাতে কর্ণফুলির মোহনা ইজারা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয় যার পরিচয় নিয়েই বড় প্রশ্ন আছে।