Wednesday, February 24th, 2010

চট্টগ্রাম বন্দরের অদক্ষতা যেভাবে তৈরি ও টিকিয়ে রাখা হয়েছে

আমরা ইদানীং শুনতে পাচ্ছি, প্রথমে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং পরে অন্যদের কাছে যে, চট্টগ্রাম বন্দরের কর্মক্ষমতা বেশিরভাগই এখন অব্যবহৃত আছে, আর মংলার প্রায় পুরোটাই অব্যবহৃত। এখান থেকে সিদ্ধান্ত টানা হচ্ছে, ভারত যদি আমাদের বন্দর ব্যবহার করে তাহলে বাংলাদেশ এ সমস্যা থেকে মুক্ত হবে এবং আরো বাড়তি আয় করতে সক্ষম হবে। কিন্তু ঠিক এর বিপরীত যুক্তি আমরা ক্রমাগত শুনেছি ১৯৯৭ থেকে ২০০২-০৩ পর্যন্ত। তা হলো, প্রয়োজনের তুলনায় চট্টগ্রাম বন্দরের কর্মক্ষমতা খুবই অপ্রতুল, ভবিষ্যৎ ঝুঁকিপূর্ণ। সুতরাং অবিলম্বে একটি মার্কিনি কোম্পানিকে চট্টগ্রাম বন্দরের এলাকা ইজারা দিয়ে বিদেশী কোম্পানির কর্তৃত্বে নতুন কনটেইনার টার্মিনাল না করলে বাংলাদেশসমূহ বিপদে পড়বে।

এই বিষয়ে বিশ্বব্যাংক প্রধানসহ আরো অনেকের সঙ্গে তৎকালীন মার্কিন রাষ্ট্রদূত মেরি অ্যান পিটার্স তার সময়কালে এই প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রাণপণ চেষ্টা করেছেন। পরে এটি সফল হয়নি জনপ্রতিরোধের কারণে। কিন্তু সেই প্রকল্প কী ছিল এবং তার বাস্তবায়নে কীভাবে চেষ্টা করা হয়েছিল তার বিস্তারিত আলোচনা এই বন্দর নিয়ে বর্তমানের নানা পরিকল্পনা, নানা যুক্তির ধরন এবং ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা বোঝার জন্য প্রয়োজন। ক্রমে আমরা সেই বিষয়গুলোতে যাবো।

চট্টগ্রাম বন্দরের ইতিহাস অনেক প্রাচীন। খ্রিস্টপূর্বকাল থেকেই এটি বন্দর হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে।  প্রাচীন ইতিহাস থেকে জানা যায় যে, খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতকে এই বন্দরের নাম ছিল সেতগাং (আরবি শব্দ, মানে নদী বা দরিয়ার ব-দ্বীপ)। এখানে মধ্যপ্রাচ্য ও চীন থেকে জাহাজ আসতো। টলেমির বর্ণনা অনুযায়ী প্রাচ্যের একটি অন্যতম সমৃদ্ধ বন্দর ছিল, যেখানে ইউরোপীয়, তুর্ক ও চীনারা মিলিত হতো। ফা ইয়েন, হিউএন সাং, ইবনে বতুতার বর্ণনাতেও এই বন্দরের গুরুত্ব বোঝা যায়। নবম শতকে ওমান ও ইয়েমেনের নাবিকরা এ বন্দরকে এই অঞ্চলে বাণিজ্যের প্রধান কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করতো। তারা এই বন্দরকে অভিহিত করতো সেমুন্ডা নামে। বহুবছর ধরে তারা এই বন্দরকে ব্যবহার করেছে, এর শ্রীবৃদ্ধি ঘটিয়েছে। ষষ্ঠদশ শতক থেকে পর্তুগিজরা এই বন্দর ব্যবহার শুরু করে। অষ্টাদশ শতক নাগাদ তাদের তাড়িয়ে বৃটিশরা এর দখল নেয়। ১৯১০ সালের দিকে এই বন্দরের সঙ্গে আসাম-বেঙ্গল রেলওয়ে যুক্ত করা হয়।

পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর করাচিই ছিল সেদেশের প্রধান বন্দর। পাকিস্তানের আমদানি পণ্য প্রধানত করাচি দিয়েই প্রবেশ করতো। আর পাকিস্তানের প্রধান রফতানি পণ্য পাট যেত চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে। দ্বিতীয় প্রধান বন্দর হিসেবে চট্টগ্রাম বন্দর বিবেচিত হতো। পাট রফতানি সহজতর করবার জন্য ১৯৫৪ সালে প্রতিষ্ঠা করা হয় মংলা বন্দর। এই দুই বন্দর নিয়েই বাংলাদেশের যাত্রা শুরু।

বলাই বাহুল্য, স্বাধীনতার পর বিশেষ করে গত দুই দশকে বিশ্ব অর্থনীতির সঙ্গে বাংলাদেশের যোগাযোগ বেড়েছে অনেকগুণ। জিডিপির অনুপাত হিসেবে ভারতের তুলনায় বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের হার বেশি। আমদানি-রফতানি যে হারে বেড়েছে সেই তুলনায় বন্দর দক্ষতা ও কার্যক্রম সম্প্রসারিত হয়নি। দেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের প্রায় পুরোটাই চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে ঘটে। এখন বছরে দুই হাজারেরও বেশি জাহাজ এই বন্দর দিয়ে পণ্য আমদানি-রফতানিতে ব্যবহৃত হয়। এই ক্রমবর্ধমান চাহিদার সঙ্গে মিলিয়ে দ্বিতীয় সমুদ্র বন্দর মংলা বন্দরকে কার্যোপযোগী, সক্রিয় ও সম্ভাবনা অনুযায়ী সম্প্রসারিত করবার উদ্যোগও এখন পর্যন্ত দেখা যায়নি।

গত শতকের আশির দশকে বিশ্বব্যাংক আইএমএফের কাঠামোগত সমন্বয় কর্মসূচি আর স্বৈরশাসন ছিল খুব সঙ্গতিপূর্ণ। কিন্তু নির্বাচিত সরকারের কালে এই ধারাবাহিকতার কোনো পরিবর্তন হয়নি। এরপর ১৯৯০-এর দশকে ব্যক্তি মালিকানা ও বিশেষত বিদেশী বিনিয়োগের মাধ্যমে উন্নয়ন যুক্তির কর্মসূচিতে খনিজ সম্পদ ও বন্দরও যুক্ত হয়। ১৯৯৬-৯৭ সালে বাংলাদেশ উন্নয়ন ফোরাম, অর্থাৎ বিশ্বব্যাংকসহ আন্তর্জাতিক অর্থলগ্নীকারি সংস্থাসমূহের যৌথ ফোরাম, যার সর্বশেষ সভা অনুষ্ঠিত হলো গত ১৫-১৬ ফেব্রুয়ারি ২০১০, এর স্মারকে যেসব খাত বেসরকারি বিদেশী বিনিয়োগের জন্য উন্মুক্ত করবার কথা বলা হয় সেগুলোর মধ্যে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও বণ্টন এবং বন্দরও অন্তর্ভুক্ত হয়।

১৯৯৭ সাল থেকে বিভিন্ন বিদেশী সংস্থা চট্টগ্রাম বন্দরে বিনিয়োগের আগ্রহ প্রকাশ করতে থাকে। একইসঙ্গে দেশে বিভিন্ন সেমিনার, ওয়ার্কশপ, রাষ্ট্রদূত, অর্থনীতিবিদ, বিশ্বব্যাংক এডিবির ভাষ্য সবকিছুর মধ্যে চট্টগ্রাম বন্দরের অদক্ষতা, অকার্যকারিতা, এই বন্দর উন্নয়নে বিদেশী বিনিয়োগের অপরিহার্যতা ইত্যাদি বিষয়ও প্রায় প্রতিদিনের খবর হিসেবে আবির্ভূত হয়। চট্টগ্রাম বন্দরের অদক্ষতা ও দীর্ঘসূত্রতার অভিযোগ সঠিক। কিন্তু কীভাবে এগুলো সৃষ্টি হয়েছে বা কীভাবে এগুলো টিকিয়ে রাখা হয়েছে, কীভাবে চট্টগ্রাম বন্দরের আয় বন্দরের উন্নয়নে ব্যবহার করতে বাধা সৃষ্টি করে মন্ত্রণালয়  তার বন্দরের সক্ষমতা বিকাশে অন্তরায় সৃষ্টি করেছে কিংবা কীভাবে দুর্নীতিবাজদের পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে একটি বৃহৎ নেটওয়ার্ক বন্দরকে ব্যক্তিগত সম্পত্তি হিসেবে চিরস্থায়ী করতে চেষ্টা করেছে সেগুলো এসব আলোচনায় কখনোই আসেনি।

সেই সময়ের একটি হিসাব বিষয়টি বুঝতে সাহায্য করবে। ১৯৯৯ সালে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী গ্যান্টিক্রেনসহ কন্টেইনার হ্যান্ডলিং যন্ত্রপাতির তখন প্রয়োজন ছিল ২৭১টি, কিন্তু ছিল অর্ধেকেরও কম, মাত্র ১২৪টি। জেনারেল কার্গো হ্যান্ডলিং ইকুইপমেন্ট বা যন্ত্রপাতির দরকার ছিল ১৩১টি, বাস্তবে ছিল ৭১টি। চট্টগ্রাম বন্দরের কর্মদক্ষতা বিচার করতে হবে এই বৈরিতার সঙ্গে মিলিয়ে।

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের মাস্টার প্ল্যান কমিটির রিপোর্ট ১৯৯৭ সাল থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত কন্টেইনার গমনাগমনের একটি সম্ভাব্য হিসাব করা হয়েছিল। তাদের হিসাব অনুযায়ী ১৯৯৭ সালে এটি ছিল ২,৫৯,০৫১ টিইইউএস; ২০০৮ সাল নাগাদ এর পরিমাণ হবার কথা ছিল ৬,৩৩,৮৮৩ টিইইউএস; বিশ্বব্যাংক একই সময়ের জন্য প্রক্ষেপণ হিসাব করেছিল ৯,৭৮,০৯৬ টিইইউএস। ওয়েবসাইটে প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, যন্ত্রপাতি ও বরাদ্দের অনেক ঘাটতি থাকলেও বাস্তবে ২০০৮ সালে এই বন্দর দিয়ে যে পরিমাণ আনা-নেয়া করা হয়েছে তার পরিমাণ ঐ দুই লক্ষ্যমাত্রার চাইতেই বেশি অর্থাৎ ১০,৬৯,৯৯৯ টিইইউএস। বিশ্বব্যাংকের প্রক্ষেপণ অনুযায়ী এই পরিমাণ কাজ করবার কথা ছিল ২০০৯-১০ সালে। উপরন্তু এই সময়কালে চট্টগ্রাম বন্দর কখনোই লোকসান দেয়নি। ১৯৯৬-৯৭ সাল থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত বন্দরের আয় বেড়েছে তিনগুণেরও বেশি। ১৯৯৬-৯৭ সালে মোট মুনাফা ছিল ১১০ কোটি টাকা, ২০০৮ সালে তা প্রায় ৫০০ কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে।

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ ও চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের প্রাক্তন চেয়ারম্যান মাহমুদ-উল-ইসলাম ২০০০ সালে লিখেছিলেন, ‘চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ ভবিষ্যৎ বর্ধিত কন্টেইনার হ্যান্ডলিং মোকাবিলার জন্য বন্দরের নিজস্ব অর্থায়নে ৭০২ কোটি টাকা ব্যয়ে নিউমুরিং কন্টেইনার টার্মিনাল নির্মাণ প্রকল্প ১৯৯৫ সালে এবং ৩০৫ কোটি টাকা ব্যয়ে ১৪২টি যন্ত্রপাতি ক্রয়ের প্রস্তাব ১৯৯৬ সালে সরকারের নিকট প্রেরণ করেন।’ কিন্তু এসব উন্নয়ন প্রকল্প নিয়ে সরকার কিংবা আন্তর্জাতিক সংস্থা কারো উৎসাহ ছিল না। প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও সুবিধার অভাবে বন্দরের জট ও জটিলতা বাড়তে থাকে।  এই ফাঁকেই বন্দরের বিশাল অবকাঠামোর ওপর কর্তৃত্ব বিস্তারের জন্য নানামুখী তৎপরতা শুরু হয়।

১৯৯৭ সালের ৩ মার্চ ব্রিটিশ কনসোর্টিয়াম চট্টগ্রাম বন্দর এলাকায় ‘প্রাইভেট পোর্ট’ নির্মাণের প্রস্তাব জমা দেয়। একইবছর ২৯ ডিসেম্বর প্রস্তাব জমা দেয় মার্কিন এসএসএ কোম্পানি। ১৯৯৮ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি একইধরনের প্রস্তাব জমা দেয় অস্ট্রেলিয়ার পিএনও পোর্ট। ১৯৯৯ সালের ৪ জানুয়ারি লন্ডনের পোর্ট ভেঞ্চার এবং ১৮ জানুয়ারি সিঙ্গাপুর পোর্ট জমা দেয় তাদের প্রস্তাব। এই সবগুলো প্রস্তাবের সঙ্গেই দেশের ভেতর নানা লবিস্ট গোষ্ঠী সক্রিয় হয়ে ওঠে। অচল হয়ে থাকে চট্টগ্রাম বন্দরের নিজস্ব প্রস্তাব আর দ্রুত বিদেশি কোম্পানিগুলোর মধ্যে সবাইকে ছাড়িয়ে সামনে আসে মার্কিনি এসএসএ কোম্পানি। টেন্ডার ছাড়াই তাদের সঙ্গে চুক্তির কার্যক্রম শুরু করে সরকার।