Sunday, May 4th, 2008

ফুলবাড়ী কয়লা প্রকল্প ও খনিজ সম্পদ নিয়ে সা¤প্রতিক তৎপরতা প্রসঙ্গে

[গত ৪ মে ২০০৮ ইং তারিখে ঢাকার মুক্তি ভবনে জাতীয় কমিটি কর্তৃক আহ্বানকৃত সাংবাদিক সম্মেলনে সভাপতিত্ব এবং সূচনা বক্তব্য লিখিত আকারে পেশ করেন কমিটির সভাপতি প্রকৌশলী শেখ মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন কমিটির সদস্য সচিব আনু মুহাম্মদ। সম্মেলনে বিভিন্ন প্রগতিশীল, বাম গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিবৃন্দ এবং বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবিগণ উপস্থিত ছিলেন। উপস্থাপিত প্রবন্ধসমূহ নিচে হুবহু তুলে দেয়া হলোঃ-]

সূচনা পত্র

বারবার তাড়া খাবার পরও হায়েনারা আশা ছাড়েনি। শিকার- বাংলাদেশের অতি সামান্য, যক্ষের ধন গ্যাস-কয়লা-জ্বালানী সম্পদ। এশিয়া এনার্জি চায় কয়লা সেরেফ্ লুণ্ঠন করতে। তাতে হোক লক্ষ দরিদ্র বাংলাদেশীর ভাগ্যে উচ্ছেদ যন্ত্রণা আর জীবিকা নাশ, হোক বিষাক্ত ও প্রাণঘাতি – চিরকালের প্রাণ সিঞ্চনকারী নদী-খাল-বিল। কালো চকচকে কয়লা দিয়ে ভরবো আমাদের জাহাজ, চকচকে সোনা ও ব্যাঙ্ক নোট দিয়ে ভরবো আমাদের ধনাগার। টাটা চায় বাংলাদেশের মুখের শেষ গ্রাসটিও কেড়ে নিতে। গ্যাসের অভাবে বিদ্যুৎ সার কারখানার পূর্ণ উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে না। নতুন সংযোগ নিষিদ্ধ হয়েছে। চারিদিকে আহাজারি আর হাহাকার। ওসব দেখতে চায় না, শুনতে চায় না টাটা। গ্যাস তাকে দিতেই হবে, শুধু তাই নয় পনের বিশ বছরের নিশ্চিত যোগান তাকে দিতে হবে। গ্যাস দিয়ে সার বানিয়ে ভারতে পাচার করবে। ইস্পাতের পাচার হলেও অতি মুনাফা করবে।আরেক নতুন হায়েনার দল ঘোরাফেরা শুরু করেছে, বঙ্গোপসাগরের তেল-গ্যাস পাচারের আশায়।

আমাদের দেশীয় গাদ্দারগোষ্ঠী – মন্ত্রী/উপদেষ্টা, সচিব, আমলা, ভাড়াটে অধ্যাপক-উপদেষ্টা, সাংবাদিক-সংবাদ বেপারী লজ্জা শরমের মাথা খেয়ে উন্নত মস্তকে উদ্ধত বচনে, উল্লাসী ভঙ্গীতে পাচারকে নিয়ামত হিসাবে, বিষকে অমৃত হিসাবে, ধ্বংসকে উন্নয়ন হিসাবে চালানোর-গেলানোর চেষ্টা করে যাচ্ছে। অবশ্য জনগণের আন্দোলনে তাদের সব ষড়যন্ত্র ধূলিসাৎ হবে, স্বপ্নকে পরিণত করবে দুঃস্বপ্নে।

এরা ভাবে জুটুক বিফলতার কালিমা তবু জুটবে সদাপ্রভু সাম্রাজ্যবাদের আশির্বাদ তথা আগের পরের সুবিধাসহ বড় বড় আসনে কয়েকমাস বসা, আর হাতে আসতে পারে কিছু পয়সা।

মূল বক্তব্য

প্রিয় সাংবাদিক বন্ধুগণ,

আমাদের শুভেচ্ছা নিন। এশিয়া এনার্জি ও তার সহযোগীদের সা¤প্রতিক বিভিন্ন তৎপরতা, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকসহ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গোষ্ঠীর ভূমিকা, উত্তরাঞ্চলে ভয়ভীতি ও দুর্নীতি সৃষ্টির নানাদিক, সরকারি উদ্যোগ ও উদ্যোগহীনতার ধরণ ইত্যাদি জাতীয় স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে আমরা আমাদের বক্তব্য উপস্থাপনের জন্য আমরা আপনাদের মুখোমুখি হয়েছি।

আপনারা জানেন, দুই বছর হতে চললো ফুলবাড়ী কয়লা প্রকল্প বাতিলের সরকারি অঙ্গীকার এখনও এই সরকার বাস্তবায়ন করেনি। ইতোমধ্যে গত ৬ এপ্রিল এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক আনুষ্ঠানিকভাবে ফুলবাড়ী কয়লা প্রকল্পে অর্থসংস্থান করবার সব কার্যক্রম স্থগিত করেছে। এর পূর্বে এই ব্যাংক ফুলবাড়ী কয়লা প্রকল্পের বিরুদ্ধে জনগণের গণরায় এবং বিশেষজ্ঞ কমিটির রিপোর্ট অগ্রাহ্য করে এই প্রকল্পে অর্থসংস্থানের প্রস্তুতি নিচ্ছিল। এর মধ্যে ছিল ১০০ মিলিয়ন ডলার প্রকল্পের জন্য এবং এর দ্বিগুণ অর্থাৎ ২০০ মিলিয়ন ডলার “রাজনৈতিক ঝুঁকি নিশ্চয়তা” হিসেবে। এই প্রকল্প যে কতটা গণবিরোধী তা প্রস্তাবিত অর্থসংস্থানের ধরণ থেকেই বোঝা যায়। আবার এই প্রকল্পের বিরুদ্ধে জনগণের প্রবল প্রতিরোধ এবং প্রকল্পের ভয়াবহতা সম্পর্কে দেশী বিদেশী স্বাধীন বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ যে কতটা সঠিক তা এই সিদ্ধান্তে আবারো প্রমাণিত হল। জানা গেছে, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের মধ্যে এখনও এই প্রকল্প নিয়ে দেনদরবার চলছে, যে কারণে তার এখনও পুরো কর্মসূচি বাতিল করেনি।

বিশ্বব্যাংক আইএমএফ এর মতো এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকও বাংলাদেশে তহবিল যোগানদার হিসেবে অনেক ধ্বংসাত্মক প্রকল্পের সঙ্গে জড়িত। ফুলবাড়ী কয়লা প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্যও ব্যাংকের ঢাকা অফিস দেনদরবার করেছে, তাদের লবিস্ট হিসেবে ভূমিকা পালন করেছে। শুধু তারাই নয়, আমরা ব্রিটিশ হাউজ অব কমন্স সূত্রে জানতে পেরেছি যে, ব্রিটিশ সরকার বাংলাদেশে ব্রিটিশ হাইকমিশনারের মাধ্যমে এশিয়া এনার্জি বা গ্লোবাল কোল ম্যানেজমেন্টের পক্ষে এদেশে লবিং ও সরকারের উপর চাপ সৃষ্টিতে এখনও সক্রিয় আছে। আমরা আরও জেনেছি যে রাব ক্যাপিটাল সহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক অর্থলগ্নীকারী প্রতিষ্ঠান, যাদের বিশ্বজুড়ে বিধ্বংসী বিভিন্ন প্রকল্পে অর্থযোগানের কুখ্যাতি আছে, তারাও এখন এশিয়া এনার্জির কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত আছে। তাদের এদেশীয় নানা এজেন্টরাও এ ব্যাপারে সক্রিয় আছে।

আমরা এই সাংবাদিক সম্মেলনের মাধ্যমে ব্রিটিশ সরকার, এডিবিসহ বিভিন্ন অর্থলগ্নীকারী প্রতিষ্ঠানকে স্পষ্টভাবে জানাতে চাই বাংলাদেশের সম্পদের মালিক বাংলাদেশের জনগণ। মানুষ, মাটি, পানি ধ্বংস করে উত্তরবঙ্গকে বিরাণ বানিয়ে লক্ষ লক্ষ মানুষকে পথে বসিয়ে এদেশের সম্পদ লুণ্ঠনের প্রকল্প কোনভাবেই বাংলাদেশের জনগণ মেনে নেবে না। আপনারা এ প্রকল্পের পক্ষে লবিং করা বন্ধ করুন না হলে জনগণ আপনাদেরও বিচারের সম্মুখীন করবে। সরকারের প্রতি আমাদের আহ্বান, উন্নয়নের নামে ধ্বংসের প্রকল্প নিয়ে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন দুষ্ট মহলের তৎপরতার বন্ধে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করুন।

দেশে ও বিদেশে বিভ্রান্তি ও গ্রহণযোগ্যতা সৃষ্টির জন্য জরুরী অবস্থা কালীন সময়ে এশিয়া এনার্জি হাতে গোনা কয়েকজন সাংবাদিক, কনসালট্যান্ট ও সাবেক আমলাকে নিয়ে উত্তরবঙ্গ জুড়ে ধ্বংসের প্রকল্পকে “উন্নয়ন প্রকল্প” হিসেবে প্রচারের জন্য কতিপয় ভুঁইফোড় সংগঠনের জন্ম দিয়েছে। বিজ্ঞাপন দিয়ে সংবাদপত্র কিনতে চেষ্টা করেছে, অর্থ, উপঢৌকন, লোভ, অর্থাৎ দুর্নীতি ছড়িয়ে দালাল তৈরির চেষ্টা করেছে। এছাড়া তারা এলাকায় সংঘাত ও সহিংসতা সৃষ্টিরও পায়তারা করছে। জরুরী অবস্থা জারীর পর তাদের ওয়েবসাইটে প্রদত্ত বক্তব্যে এশিয়া এনার্জি জানিয়েছিল, বাংলাদেশে এখন জরুরী অবস্থা। এখন এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করা যাবে বলে আশা করা যায়। তাদের এবং তাদের দেশীয় সহযোগীদের ধারণা ছিল, এই জরুরী অবস্থার মধ্যে যখন জনগণের কথা বলার বা নড়াচড়ার উপায় থাকবে না তখনই তারা এই প্রকল্প বাস্তবায়ন শুরু করতে সক্ষম হবে।

তাদের ধারণা ভুল প্রমাণিত হয়েছে। একদিকে ফুলবাড়ী অঞ্চলের নেতা নুরুজ্জামানকে প্রকাশ্য দিবালোকে নির্মম অত্যাচার করে মিথ্যা মামলায় থানায় পাঠানো, নতুন নতুন মিথ্যা মামলা ও অপপ্রচার চালানো অন্যদিকে টাকার বান্ডিল দিয়ে সাংবাদিক কেনা, দালাল তৈরি, মিথ্যাচার আর ধ্বংসের প্রকল্পের উপর মিথ্যার চিনি-গুড় মাখিয়ে মানুষের সামনে উপস্থাপন সবকিছুই ব্যর্থ হয়েছে। কারণ সরব হতে না পারলেও ছয় থানাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষ বারবার এসব অপচেষ্টা প্রত্যাখ্যান করে প্রমাণ করেছেন জরুরী অবস্থা বা লোভ বা ভয় কোনটাই তাদের টলাতে পারবে না। জাতীয় স্বার্থ, অঞ্চলের মানুষের জীবন জীবিকার স্বার্থ এবং পানি, মাটি ও কৃষির বর্তমান ও ভবিষ্যৎ বিবেচনায় অঞ্চলের মানুষ এই বিনাশী প্রকল্প প্রত্যাখ্যান করেছেন জীবন দিয়ে। এখনও অনেকে পঙ্গু হয়ে আছেন সম্পদ ও জীবন রক্ষার সংগ্রামে। এই লড়াইতে জীবন দান আর প্রতিরোধের দৃঢ়তা লুণ্ঠনকারী আর দখলদারদের সামনে এক রক্তাক্ত গণপ্রাচীর তৈরি করেছে, তাকে ভেদ করবার সাধ্য কারও নাই। এই আন্দোলনের শক্তি এখন বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলের মানুষকেও সাহস যোগাচ্ছে সম্পদের উপর জনগণের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে।

সম্প্রতি আমরা জানতে পেরেছি, সামরিক বাহিনীর কতিপয় সদস্য সামরিক পোষাক পরে খনি অঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় সামরিক বাহিনীর গাড়ী নিয়ে যাচ্ছেন এবং মানুষজনকে ক্ষতিপূরণের বিনিময়ে তারা গ্রাম ছাড়তে রাজী আছেন কিনা জিজ্ঞাসা করছেন। সরকার যদি সত্যিই যথাযথভাবে এই প্রকল্প বিষয়ে জনগণের মত জানতে চান তাহলে এবিষয়ে জরীপ তারা করতেই পারেন। সে কাজে আমরাও পূর্ণ সহযোগিতা দান করতে প্রস্তুত। কিন্তু সামরিক পোষাক পরে অস্ত্র হাতে নিয়ে কোন ব্যক্তি যদি জনমত যাচাই করতে চান তাহলে তা ভয় দেখিয়ে বলপূর্বক সম্মতি আদায়ের চেষ্টার পর্যায়ে পড়ে। আমরা এ ধরনের তৎপরতার তীব্র নিন্দা জানাই এবং অবিলম্বে এসব তৎপরতা বন্ধের দাবী জানাই। জনগণের পক্ষ থেকে সামরিক বাহিনীর উদ্দেশ্যে আমাদের বক্তব্য, জনগণ সামরিক বাহিনীকে দেশরক্ষার অতন্দ্র প্রহরী সার্বভৌমত্বের প্রতীক ও নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠান হিসেবেই জানে। সামরিক বাহিনীকে কোন স্বার্থবাদী মহল যদি জনগণের বিরুদ্ধে ব্যবহার করে, কেউ যদি দেশের নিরাপত্তা জননিরাপত্তা Ñ দেশের বর্তমান ও ভবিষ্যতের বিরুদ্ধে ব্যবহার করে, কেউ যদি মাটি, পানি, মানুষ, কৃষি ধ্বংস করে কোন বিদেশী কোম্পানির মুনাফা অর্জনের জন্য সম্পদ দখল ও লুণ্ঠনে সামরিক বাহিনীকে ব্যবহার করে জনগণ তা কোনভাবেই মেনে নেবে না। আমরা আশা করি সামরিক বাহিনীও এভাবে তাদের প্রতিষ্ঠানকে ব্যবহৃত হতে দেবেন না।

আমরা সবাই জানি, জ্বালানী মন্ত্রণালয়ের ভূমিকা হল দেশের সম্পদ দেশের স্বার্থে ব্যবহারের উদ্যোগ নেয়া। কিন্তু সেখানে কিছু ব্যক্তি বরাবর দেশের স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়ে বিভিন্ন বিদেশী কোম্পানির পক্ষে নিয়োজিত থাকায় মন্ত্রণালয়ের ভূমিকা দাঁড়িয়েছে বিপরীত। এই মন্ত্রণালয়ের সা¤প্রতিক তৎপরতায় আমরা আরও বেশী উদ্বিগ্ন। কারণ এই মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে–

(ক) স্বচ্ছতার সঙ্গে ইতোপূর্বে যে কয়লা নীতি প্রণীত হয়েছে তাকে জনগণের স্বার্থে আরও উন্নীত না করে এশিয়া এনার্জির স্বার্থ রক্ষার্থে তার সংশোধন করবার নানা অপচেষ্টা করা হচ্ছে।

(খ) জ্বালানী মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে নিয়োজিত প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী বারবার ফুলবাড়ী কয়লা প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রতি ইঙ্গিত দিয়ে উস্কানিমূলক বক্তব্য রাখছেন। এশিয়া এনার্জির অর্থায়নে সৃষ্ট সংগঠনগুলোর মাধ্যমে জনমত বিভ্রান্ত করবার চেষ্টা করছেন।

(গ) তিতাস গ্যাস ফিল্ড থেকে প্রতিদিন ৫০ থেকে ৮০ লক্ষ ঘনফুট গ্যাস নষ্ট হচ্ছে, একাধিক গ্যাস ক্ষেত্র পড়ে আছে যেখানে সরকারি বৈরীতার কারণে বাপেক্স অনুসন্ধান কাজ করতে পারছে না। এসব ক্ষেত্রে কোন উদ্যোগ নেই কিন্তু অন্যদিকে আরও গ্যাসক্ষেত্র বহুজাতিক কোম্পানির হাতে তুলে দেবার সক্রিয়তা রয়েছে।

(ঘ) মার্কিন তেল কোম্পানি শেভ্রনের কাছে মাগুড়ছড়া বিস্ফোরণের সূত্রে আমাদের পাওনা কমপক্ষে ৯ হাজার কোটি টাকা; কিন্তু এই ক্ষতিপূরণ আদায় করবার জন্য আগের সরকারগুলোর মতো এই সরকারও কোন উদ্যোগ গ্রহণ করেনি। উল্টো তাদের হাতে তুলে দেয়া হয়েছে লাউয়াছড়া রিজার্ভ ফরেস্ট। এদের দায়িত্বহীন কর্মকাণ্ডে রিজার্ভ ফরেস্টের অমূল্য সম্পদ এখন ধ্বংসের মুখে। জ্বালানী মন্ত্রণালয় এই ধ্বংসযজ্ঞ থামানোর কোন চেষ্টা নেয়নি।

(ঙ) আগের উৎপাদন অংশীদারী চুক্তির কারণে বাংলাদেশের গ্যাস সম্পদ জিম্মি হয়ে আছে কতিপয় কোম্পানির কাছে। উপরন্তু এসব চুক্তির কারণে প্রতিবছর আমাদের ভর্তুকি দিতে হচ্ছে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা। এই অভিজ্ঞতা থাকা সত্ত্বেও তড়িঘড়ি করে গোপনে জনগণকে না জানিয়ে আবারও রপ্তানিমুখি পিএসসি মডেল দাঁড় করানো হয়েছে এবং তার ভিত্তিতে সমুদ্রের বিশাল সম্ভাবনাময় সম্পদ বহুজাতিক কোম্পানির হাতে তুলে দেবার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। সমুদ্র সীমা এখনও অনির্দিষ্ট থাকায় বাংলাদেশের সমুদ্র ও সমুদ্র সম্পদ দুটোই অরক্ষিত হয়ে পড়েছে। বলাইবাহুল্য, এই উদ্যোগ সফল হলে ভর্তুকি আরও বহুগুণ বাড়বে, গ্যাস সম্পদ হাতছাড়া হবে এবং এসব কোম্পানির মুনাফা নিশ্চিত করার জন্য গ্যাস বিদ্যুতের দাম বাড়তে থাকবে।

(চ) যেখানে বাংলাদেশ নিজেই গ্যাস সংকটের মুখে সেখানে জ্বালানী মন্ত্রণালয়ের আগ্রহে ২০/২৫ বছরের গ্যাস সরবরাহের বাধ্যবাধকতা সম্বলিত টাটা প্রকল্প নিয়ে সরকার আবারো আলোচনা শুরু করতে যাচ্ছে।

আমরা সাংবাদিক বন্ধুদের মাধ্যমে সরকারের কাছে এই অবস্থার অবসান দাবী করি। সেজন্য আবারও দাবী জানাই:

১। প্রায় দুই বছর আগে জনগণের সঙ্গে সরকারের লিখিত অঙ্গীকার অনুযায়ী অবিলম্বে ফুলবাড়ী কয়লা প্রকল্প বাতিল ও এশিয়া এনার্জিকে বহিষ্কার করুন। উত্তরবঙ্গ জুড়ে সহিংসতা, দুর্নীতি ও ভয়-ভীতি সৃষ্টির সবরকম তৎপরতা বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিন। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞরা যে প্রকল্পকে মানুষ, কৃষি ও পরিবেশ বিধ্বংসী, বেআইনী, খাদ্য নিরাপত্তার জন্য হুমকিজনক প্রকল্প হিসেবে অভিহিত করেছেন, জনগণ যাকে বারবার প্রত্যাখ্যান করছেন, সে প্রকল্প বাতিল এবং এশিয়া এনার্জির বহিষ্কারের পরই কেবল কয়লা খাত উন্নয়ন নিয়ে দেশের ভেতর যথাযথ আলোচনা পর্যালোচনার পরিবেশ সৃষ্টি সম্ভব।

২। লাউয়াছড়ায় শেভ্রনের অনুসন্ধান কর্মসূচি অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে। তাদের কারণে ইতোমধ্যে যে ক্ষতি হয়েছে, তার ক্ষতিপূরণসহ মাগুরছড়ার বিস্ফোরণের জন্য প্রাপ্য ক্ষতিপূরণ আদায়ের কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। এই ক্ষতিপূরণের অর্থ দিয়ে জাতীয় সংস্থার বিকাশ, দক্ষ জনশক্তি তৈরি, গবেষণা প্রতিষ্ঠান স্থাপনের উদ্যোগ নিতে হবে।

৩। সমুদ্রে গ্যাস-তেল সম্পদ অনুসন্ধানে বর্তমান রপ্তানিমুখি পিএসসি বাতিল করতে হবে। জাতীয় সংস্থার কর্তৃত্বে দেশের বিদ্যুৎ ও শিল্পায়নের প্রয়োজনে গ্যাস, তেল উত্তোলন করতে হবে, বিদেশী কোম্পানির মুনাফার জন্য নয়। সম্পদ ও সমুদ্রের উপর জাতীয় কর্তৃত্ব নিশ্চিত করবার জন্য সমুদ্র সীমা সংক্রান্ত অস্পষ্টতা- অনিশ্চয়তা দূর করতে হবে।

৪। তেল, কয়লা, গ্যাস ও তা থেকে সৃষ্ট পণ্য রপ্তানি আইন করে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করতে হবে। অতএব এ ধরনের রপ্তানিমুখি কোন প্রকল্প গ্রহণ করা যাবে না।

৫। কোল বাংলা গঠন ও বাপেক্সসহ জাতীয় সংস্থাসমূহের বিকাশে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।

আমরা আশা করি সরকার জনগণের ভাষা বুঝতে পারবেন ও সেই অনুযায়ী তড়িৎ ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন।

আপনাদের সবাইকে ধন্যবাদ।