Wednesday, August 20th, 2008

জাতীয় ও রাষ্ট্রীয়ভাবে “ফুলবাড়ী দিবস” পালন করুন: ফুলবাড়ী দিবসের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তির প্রাক্কালে সাংবাদিক সম্মেলনে আহবান

[তেল-গ্যাস, খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির উদ্যোগে ২০ আগস্ট ২০০৮ একটি সাংবাদিক সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন কমিটির আহ্বায়ক প্রকৌশলী শেখ মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ। তিনি সূচনা পত্র উপস্থাপন এবং পাঠ করেন। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন কমিটির সদস্য সচিব আনু মুহাম্মদ। উক্ত সম্মেলনে দেশের প্রগতিশীল রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ এবং বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন।]

সূচনা পত্র

ফুলবাড়ী দিবস পালন

বহুজাতিক কোম্পানি তথা সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ফুলবাড়ী তথা বাংলাদেশের জনগণের বিজয় মুকুট অর্জনের দিন ২৬ আগস্ট।

সামনের ২৬ আগস্ট একটি বিজয় দিবস। দু’বছর আগে তেল-গ্যাস খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির নেতৃত্বে ফুলবাড়ীর জনগণ বেসরকারি বৃটিশ কোম্পানি এশিয়া এনার্জির কয়েক বছর ব্যাপী পরিচালিত ও বৃটিশ সরকার কর্তৃক প্রকাশ্যে সমর্থিত ঐ অঞ্চলের কয়লা খনি লুণ্ঠনের ও লক্ষ মানুষের জীবিকা, খাদ্য উৎপাদন ও ব্যাপক পরিবেশ বিধ্বংসী প্রকল্পের ষড়যন্ত্রকারীদের মেরুদণ্ড ভেঙ্গে দেয় Ñ নিজেদের রক্ত ও চরম আত্মত্যাগ অর্থাৎ জীবন দানের বিনিময়ে। ঐ দিন লক্ষ মানুষের শান্তিপূর্ণ আনন্দময় মিছিল শেষে বিনা উস্কানিতে জনগণের ট্যাক্সে লালিত সশস্ত্র বাহিনী সাম্রাজ্যবাদের বহুজাতিক কোম্পানির স্বার্থরক্ষায় নিবেদিত ধনিক শ্রেণীর সরকারের ইঙ্গিতে নিরস্ত্র মানুষের উপর গুলিবর্ষণ করে তিন কিশোর/যুবককে নিহত, কয়েকজনকে চিরতরে পঙ্গু ও শতাধিক লোককে আহত করে। এই নিষ্ঠুরতা ও বর্বরতা দ্বারা স্বীয় সম্পদ-রক্ষাকামী দেশপ্রেমিক জনগণকে নিরস্ত করা সম্ভব হয় নাই। পরদিন ও তার পরও দুই দিন আন্দোলন প্রবল আকার ধারণ করে। বিরাট সংখ্যায় আদিবাসী ও মা সহ মহিলারা ব্যাপক ভাবে অংশ নেয়। অবশেষে সরকার জনগণের দাবীর কাছে  নতি স্বীকার করে ৩০ আগস্ট তারিখে চুক্তি সই করতে বাধ্য হয়। তদানিন্তন সরকার বিদায় নেবার আগে চুক্তির সব শর্ত পালন করে যায় নাই। বর্তমান গদিনসীন সরকার বাকী শর্তগুলো পালনে কালক্ষেপন করছে। বড় যে দুটি শর্ত পূরণ করা বাকী আছে তা হল, এশিয়া এনার্জিকে দেশ থেকে বহিষ্কার করতে হবে, দেশের কোথায়ও কয়লা উত্তোলনের জন্য উন্মুক্ত খনন পদ্ধতি ব্যবহার করা চলবে না।

আমরা জানি, জনগণও জানে চুক্তি বাস্তবায়ন অচিরেই হবে। ন্যায়সঙ্গত দাবীর পূর্ণ অর্জন অবশ্যম্ভাবী। এই ২০০৬ সালের বিজয় বহুজাতিক কোম্পানির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে জনগণের শীর্ষ বিজয়। মনে রাখতে হবে,  ইতোপূর্বেও জনগণ দুটি অসামান্য বিজয় ছিনিয়ে এনেছে। যথা:

১. ২০০২ সালের বৃহত্তর সিলেটের হবিগঞ্জ জেলাধীন নবীগঞ্জ উপজেলার বিবিয়ানা কূপ থেকে নাম মাত্র মূল্যে ৩.৬৪ ট্রিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস (যা তৎকালীন হারে ৯ বছর ব্যাপী ও বর্তমান হারে সাড়ে ৫ বছর ব্যাপী দেশের সমুদয় চাহিদার সমান), আমেরিকার বহুজাতিক কোম্পানি ইউনোক্যাল কর্তৃক ভারতে পাচার করার ষড়যন্ত্র রদ করেছে।

২. ২০০৩ সালে চট্টগ্রাম নদীবন্দরের সন্নিকটে ভাটিতে আমেরিকান এক অখ্যাত বেসরকারী কোম্পানি স্টিভিডোর সার্ভিসেস অব আমেরিকা কর্তৃক ১৫০০ মিটার দীর্ঘ একটি জেটি নির্মাণের (যার মধ্যে ৬০০ মিটার প্রকৃত কন্টেইনার জেটি বাকী ৯০০ মিটার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নৌ-বাহিনীর ঘাঁটি কাজে ব্যবহারের জন্য) মাধ্যমে চট্টগ্রাম জাতীয় নৌ বন্দরকে  পঙ্গু ও অবশেষে লুপ্ত করা ও বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব হরণ করার ষড়যন্ত্র নস্যাৎ করেছে।

ফুলবাড়ীর জনগণকে সালাম জানাই।

জয় হোক বাংলাদেশের জনগণের,

সাম্রাজ্যবাদ নিপাত যাক।

ফুলবাড়ী দিবস পালন করুন।

জাতীয়ভাবে পালন করুন।

সাংবাদিক সম্মেলনের মূল বক্তব্য

প্রিয় সাংবাদিক বন্ধুগণ,

শুভেচ্ছা নিন।

আপনারা জানেন, আগামী ২৬ আগস্ট মানুষ ও পরিবেশ বিধ্বংসী এবং জনগণের সম্পদ লুণ্ঠনের জন্য প্রণীত জালিয়াতি ও অনিয়ম ভরা ফুলবাড়ী কয়লা প্রকল্প কেন্দ্র করে কতিপয় দালাল স্বার্থান্বেষী বাদে বাংলাদেশের বিশেষত, দিনাজপুর জেলার ফুলবাড়ী থানাসহ ছয় থানার, নারী পুরুষ শিশু বৃদ্ধ বাঙালী আদিবাসী মুসলমান হিন্দু খ্রীষ্টানসহ সকল মানুষের অসাধারণ দৃঢ়তা ও ঐক্যের উপর যে অবিস্মরণীয়  প্রতিরোধ গড়ে উঠেছিল তার দুই বছর পূর্তি হচ্ছে।

আজ আপনাদের সঙ্গে নিয়ে আমরা সেই মানুষদের স্মরণ করি এবং অভিনন্দন জানাই যাদের রক্ত ও সংগ্রাম দিয়ে বাংলাদেশ এক ভয়াবহ বিপদ থেকে রক্ষা পেয়েছে। যাদের লড়াই ও আপোষহীন দৃঢ়তা বহুজাতিক লুটেরা ও দুর্বৃত্তদের পৈশাচিক অট্টহাসি থামিয়ে দিয়েছে। যে রক্তের দায় বাংলাদেশের এক নতুন নিশানা তৈরি করেছে যেখানে বাংলাদেশের মানুষ দুর্বল নয়, সবল; মেরুদণ্ডহীন বা আত্মবিক্রিত নয়, আত্মমর্যাদায় উজ্জ্বল; যেখানে জনগণের জীবন ও সম্পদ জনগণের হাতে, কোন  দেশি বিদেশী লুটেরাদের হাতে নয়।

ফুলবাড়ী দিবসের প্রাক্কালে জাতীয় কমিটির পক্ষ থেকে আপনাদের, সংবাদ মাধ্যমের বন্ধুদের, অভিনন্দন জানাই যারা অনেক লোভ ভয় ভীতি তুচ্ছ করে জনগণের পাশে দাঁড়িয়েছেন, ব্যক্তিগত তুচ্ছ স্বার্থ উপেক্ষা করে দেশ ও মানুষের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ রক্ষায় নিজ নিজ ভূমিকা পালন করেছেন।

প্রিয় সাংবাদিক বন্ধুগণ,

৯০ দশকে পর পর দুই সরকারের আমলে অনিয়ম, দুর্নীতি ও জালিয়াতি ভরা এই ফুলবাড়ী কয়লা প্রকল্প সাজানো হয়েছিল জনগণকে না জানিয়ে। ৫৭২ মিলিয়ন টন কয়লাসহ বিশাল খনিজ সম্পদ দখল, লুণ্ঠন ও পাচারের মাধ্যমে লক্ষ লক্ষ কোটি টাকার মুনাফার এই প্রকল্প প্রথম দাঁড় করেছিল বিএইচপি ১৯৯৪ সালে। ১৯৯৭ সালে অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য ও বাংলাদেশের কতিপয় ব্যক্তি গঠন করে “এশিয়া এনার্জি কর্পোরেশন” নামে নতুন একটি কোম্পানি। রহস্যজনক ভাবে এই নতুন অনভিজ্ঞ কোম্পানির হাতে ফুলবাড়ী কয়লা খনির ব্যবসা হস্তান্তর করে বিএইচপি ১৯৯৮ সালে বাংলাদেশ ত্যাগ করে। ফুলবাড়ী অঞ্চলের মানুষের সম্মতি আদায়ের চেষ্টায় এশিয়া এনার্জি জনগণের সাথে যোগাযোগ শুরু করে ২০০৫ সালে । এই কারণে প্রকল্প প্রণয়নের ১১ বছর পর জনগণ প্রথম এই বিষয়ে জানতে পারেন। ক্ষতিপূরণ, পুনর্বাসন নিয়ে এশিয়া এনার্জির অসংলগ্ন কথাবার্তা ও জালিয়াতিপূর্ণ তৎপরতা নিয়েই জনগণের প্রথম সন্দেহ সৃষ্টি হয়। ক্রমান্বয়ে উন্মুক্ত খনন পদ্ধতির ভয়াবহতা সম্পর্কে অঞ্চলের মানুষ ধারণা অর্জন করেন, তথ্য উপাত্ত দিয়ে তা পরীক্ষা নিরীক্ষা করেন, কৃষক জনগণকে তা অবহিত করেন এবং প্রতিবাদ শুরু হয় সেই থেকেই।

এশিয়া এনার্জি ও তার সহযোগী বিভিন্ন আন্তজার্তিক সংস্থা, দালাল কনসালট্যান্ট, মন্ত্রী-উপদেষ্টা-আমলা প্রভৃতির পক্ষ থেকে উন্মুক্ত খনন পদ্ধতির পক্ষে নানা গল্প তৈরি করেও কোন লাভ হয়নি।  জনগণের বুঝতে অসুবিধা হয়নি যে, এই প্রকল্প অনুযায়ী ফুলবাড়ী কয়লা খনির মালিকানা চলে যাবে এশিয়া এনার্জির নামের এক নতুন অনভিজ্ঞ বিদেশী কোম্পানির হাতে, অনবায়নযোগ্য বহুমূল্য সম্পদ কয়লা চলে যাবে দেশের বাইরে, বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে পাবে শুধু  শতকরা ৬ ভাগ রয়্যালটি, কার্যত তার থেকেও কম; অন্যদিকে বাংলাদেশের কয়লাসম্পদ দিয়ে বিদেশী কোম্পানির মুনাফা বানানোর জন্য বাংলাদেশের উত্তরবঙ্গের এক বিশাল অংশের কৃষি জমির বিনাশ ঘটবে, খনি অঞ্চল মরুকরণ করার কারণে উত্তরবঙ্গ জুড়ে পানির স্তর নেমে যাবে, কয়লা উত্তোলন-মজুদ-প্রক্রিয়াজাতকরণে ও বৃষ্টিতে পানির যে দূষণ হবে তা জালের মতো ছড়িয়ে থাকা নদ-নদী খাল-বিলকে বিষাক্ত করবে যা সারা দেশের মৎস্য সম্পদ কৃষি আবাদ ও সুপেয় পানির ব্যবস্থাকে বিপর্যস্ত করবে। এই সবগুলো ঘটনাই দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও জীবন জীবিকার উপর বড় আকারের আঘাত।

উপরন্তু পুরো অঞ্চলে উন্মুক্ত খনি করবার কারণে এশিয়া এনার্জির হিসাব অনুযায়ী ৫০ হাজার ও সরকার গঠিত বিশেষজ্ঞ কমিটির হিসাব অনুযায়ী ১ লক্ষ ২৩ হাজার মানুষ ঘরবাড়ি আবাদ গাছপালা সহ উচ্ছেদ হবেন। উত্তরবঙ্গ জুড়েই আরও বহুগুণ মানুষের জীবন জীবিকা ভয়াবহভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কত লক্ষ মানুষকে ভিটেমাটি ও জীবিকা ছেড়ে অজানা জীবনে প্রবেশ করতে হবে তার হিসাব করা কঠিন। এতকিছু করে যে কয়লা উঠানো হবে তাও দেশের হাতে থাকবে না, দেশের কোন কাজে লাগবে না, পাচার হবে বাইরে। এর ফলে বাংলাদেশ এমন এক সম্পদ হারাবে যার ক্ষতিপূরণ সম্ভব নয়।

পুরো প্রকল্প তাই একইসঙ্গে খাদ্য নিরাপত্তা, জননিরাপত্তা ও জ্বালানী নিরাপত্তার জন্য এক ভয়াবহ আক্রমণ ছিল। আরও বিপদজনক ব্যাপার ছিল এই যে, তখন এশিয়া এনার্জির এই প্রকল্প অনুসরণ করে টাটাও বড়পুকুরিয়াতে একইরকম শর্তে কয়লা খনি করবার জন্য অপেক্ষমান ছিল। এশিয়া এনার্জি সফল হলে একে একে টাটা, মিত্তালসহ নানা সংস্থা পুরো উত্তরবঙ্গসহ দেশের বিশাল অঞ্চল তছনছ এবং বিষাক্ত করে নিজেদের মুনাফার পাহাড় গড়তো।

প্রিয় সাংবাদিক বন্ধুগণ,

অতএব, জেনেবুঝে জনগণ ক্রমেই ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেন এবং সংগঠিত হতে থাকেন। প্রতিবাদী  অনেক সভা সমাবেশ, ও অসম্মতি প্রকাশের পরও জ্বালানী মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতায় এশিয়া এনার্জি যখন তার কাজ অব্যাহত রাখে, যখন দুর্নীতি ছড়ানোর নানা অপচেষ্টা জনগণ হাতে নাতে ধরে ফেলেন, যখন  কোম্পানি জালিয়াতি ভরা প্রচার প্রচারণায় লিপ্ত হয় তখনই  ২০০৬ সালের ২৬ আগস্ট এশিয়া এনার্জি ঘেরাও কর্মসূচী দেয়া হয়। এই ঘেরাও কর্মসূচীতে ৭০ হাজার বাঙালী ও আদিবাসী মানুষ সমবেত হন। এশিয়া এনার্জিকে সেই রাতের মধ্যে অঞ্চল ত্যাগ করবার আলটিমেটাম দিয়ে যখন শান্তিপূর্ণ সমাবেশ শেষ হচ্ছে তখনই এশিয়া এনার্জির প্ররোচনায় বিডিআর গুলি করে। গুলিতে ঘটনাস্থলেই তিনজন কিশোর আমীন, সালেকীন ও তরিকুল শহীদ হন। গুলিবিদ্ধ হন ২০ জন, আহত হন দুইশতাধিক। আহতদের মধ্যে তিনজন, বাবলু রায়, প্রদীপ চন্দ্র রায় ও শ্রীমান বাস্কে মারাত্মক আহত হয়ে মৃত্যুর সঙ্গে যুদ্ধ করে বেঁচে উঠেন কয়েক মাস পর। এর মধ্যে বাবলু রায় এখন চিরপঙ্গুত্বের শিকার। কিন্তু  এদের সকলেরই চেতনা আগের চাইতেও দৃঢ়।

এশিয়া এনার্জি ও তার সহযোগীদের ধারণা ছিল গুলি করে মানুষ হত্যা করলে জনগণ ভীতসন্ত্রস্ত হবে এবং আন্দোলনের সেখানেই সমাপ্তি ঘটবে। কিন্তু জনগণের ভাষা তাদের জানা নাই। তাই ঘটনা ঘটে বিপরীত। ২৭ আগস্ট  থেকে বাংলাদেশ প্রত্যক্ষ করে জীবন ও সম্পদ রক্ষায় বহুজাতিক কোম্পানি সহ সাম্রাজ্যবাদী দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে জনগণের গণঅভ্যুত্থান। কিছু গণশত্র“ বাদে সারা দেশ এর সমর্থনে সক্রিয় হয়ে উঠে। এই গণপ্রতিরোধের মুখে টিকতে না পেরে  ৩০ আগস্ট ২০০৬ তৎকালীন সরকার জনগণের সঙ্গে চুক্তি করতে বাধ্য হয়। এই চুক্তির মূলকথা ছিল এশিয়া এনার্জি বহিষ্কার, উন্মুক্ত খনন পদ্ধতি পুরোপুরি নিষিদ্ধ করা এবং এশিয়ার এনার্জির দালালদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ।

২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি জরুরী অবস্থা জারির পর বর্তমান তত্ত্বাবধায়ক সরকার দুর্নীতির বিরুদ্ধে কথা বলতে থাকলেও দুর্নীতির উপর দাঁড়ানো এশিয়া এনার্জির গায়ে হাত দেয়নি, জনগণের সাথে স্বাক্ষরিত চুক্তি বাস্তবায়নেও কোন উদ্যোগ নেয়নি। এই কারণে এশিয়া এনার্জি আবার নতুন করে মাঠে নামার সাহস পায়। দেশের ভেতর হাতে গোনা কয়েকজন সাংবাদিক, কনসালট্যান্ট, আমলা ও রাজনীতিককে নিয়ে তারা দালাল ক্রয় কর্মসূচী শুরু করে, অপপ্রচারে লিপ্ত হয়, ধ্বংসযজ্ঞের প্রকল্পকে উন্নয়ন প্রকল্প হিসেবে প্রতিষ্ঠার অপচেষ্টা চালায়। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক, ব্রিটিশ হাইকমিশন ও বিশ্বব্যাংকসহ বিভিন্ন সংস্থা সরাসরি লবিস্টের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। কিন্তু জনগণের দৃঢ় প্রতিরোধ চেতনা, যা কখনো কখনো নীরবতার মধ্যেও প্রকাশিত হয়ে উঠে, এর সাথে জাতীয় কমিটির অব্যাহত নজরদারি ও মোকাবিলা এবং বিশ্বব্যাপী এই ধ্বংসাত্মক প্রকল্পের বিরুদ্ধে জনমত গড়ে উঠায় এদের সকলের পরিকল্পনা, দুর্নীতি বিস্তারের মাধ্যমে সমর্থক গোষ্ঠী তৈরির অপচেষ্টা সফল হতে পারেনি।

প্রিয় সাংবাদিক বন্ধুগণ,

কিন্তু দেশী বিদেশী লুটেরা গোষ্ঠীর চক্রান্ত বা অপচেষ্টা থেমেও যায়নি। বাংলাদেশের তেল গ্যাস সম্পদ এখন বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর হাতে জিম্মি। তাদের মুনাফা যোগান দিতে গিয়ে প্রতিবছর আমাদের গচ্চা দিতে হচ্ছে দুই হাজার কোটি টাকারও বেশী, সমুদ্রের গ্যাসসম্পদ দখল নেবার জন্য আন্তর্জাতিক জোর অপতৎপরতা চলছে। মাগুড়ছড়া বা টেংরাটিলার ক্ষতিপূরণ পাওয়া যায় নাই, উপরন্তু শেভ্রনকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে স্থানীয় কোর্টের মামলা থেকে, ক্ষতিপূরণ আদায় না করে নাইকোর দুর্নীতির বিচার না করে তার হাতে আবার গ্যাসফিল্ড তুলে দেয়া হচ্ছে। দেশের সমুদ্র তীরসহ বিভিন্ন খনিজসম্পদ বিদেশী লুটেরাদের হাতে তুলে দেবারও আয়োজন চলছে।

ক্ষতিপূরণ আদায় করে এশিয়া এনার্জির বহিষ্কার তার প্রাপ্য হলেও এখনও দেশে ও বিদেশে ফুলবাড়ী কয়লা নিয়ে তার দুর্নীতিমূলক তৎপরতা অব্যাহত আছে। সংবাদপত্রে বিজ্ঞাপনসহ নানা উপায়ে ঘুষ কর্মসূচি এখনও চলছে, নানা দেশী বিদেশী ব্যক্তিবর্গ জড়ো করে লবিংও চলছে। এদের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা না নিয়ে বরং ফুলবাড়ী অঞ্চলের দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলনের সংগঠকদের মিথ্যা মামলা, হুমকিসহ নানাভাবে হয়রানি করা হচ্ছে। আমরা এসবের প্রতিবাদ জানাই।

আমরা বার বার বলেছি, খনিজ সম্পদের উপর জনগণের শতকরা ১০০ ভাগ মালিকানা নিশ্চিতকরণ, রপ্তানি ও উন্মুক্ত খনন পদ্ধতি নিষিদ্ধকরণ এবং জাতীয় সক্ষমতা বিকাশের গণরায় থেকে কোন বিচ্যুতি বাংলাদেশের জনগণ গ্রহণ করবে না। ২৬ আগস্ট ২০০৬ মানুষ জীবন দিয়ে এই গণরায় ঘোষণা করেছেন এবং স্বাধীন বিশেষজ্ঞরাও বিভিন্ন সময়ে এই মত দিয়েছেন। আমরা সরকারের কাছে দাবী জানাই, এশিয়া এনার্জি বা অন্য কোন বহুজাতিক কোম্পানির স্বার্থ রক্ষায় কোন কৌশল অবলম্বন না করে বা প্রশ্রয় না দিয়ে অবিলম্বে এশিয়া এনার্জিকে বহিষ্কার ও তার দালালদের বিচারসহ ৩০ আগস্ট ২০০৬ জনগণের সাথে স্বাক্ষরিত ফুলবাড়ী চুক্তি বাস্তবায়ন করুন। নইলে আগের সরকারগুলোর মতো আপনারাও দুর্নীতি ও জাতীয় স্বার্থবিরোধী কাজের দায়ে অভিযুক্ত হবেন। এই চুক্তির সাথে অসঙ্গতিপূর্ণ কোন কিছু করার এখতিয়ার আপনাদের নেই।

প্রিয় সাংবাদিক বন্ধুগণ,

ফুলবাড়ী দিবস যে গণজাগরণ সূচনা করেছে, যে গণরায় প্রতিষ্ঠা করেছে বাংলাদেশের জন্য তার তাৎপর্য বিশাল। এটা দেখিয়েছে বহুজাতিক কোম্পানির সঙ্গে যত দানবীয় শক্তিই থাকুক জনগণের শক্তির সামনে তা দাঁড়াতে পারে না। গণশত্র“দের অর্থ আছে, অস্ত্র আছে। কিন্তু জনগণ যদি তাদের চিনতে পারেন তাহলে নিরস্ত্র গরীব মানুষের ঐক্যবদ্ধ শক্তি তাদেরকে পরাভূত করতে সক্ষম। এই বিশাল কিন্তু রক্তাক্ত গণজাগরণ দুর্বল দরিদ্র হিসেবে পরিচিত বাংলাদেশের সবলতাকে বিশ্বের কাছে পৌঁছে দিয়েছে, তা এই বার্তা দিয়েছে যে, এই দেশের মানুষ নিজের জীবন ও সম্পদ রক্ষায় সক্ষম এবং এদেশে জনগণ ঐক্যবদ্ধ হলে সংগঠিত হলে তাদের সম্মতির বাইরে কোন কিছু করবার ক্ষমতা কারও নেই।

রক্তের দায় দিয়ে এই গণরায় একইসঙ্গে নতুন বাংলাদেশ নির্মাণের সাহস ও নিশানা দিয়েছে। বাংলাদেশের সম্পদ জনগণের, এই সম্পদ বাংলাদেশেই থাকবে, আর সেই সম্পদ ব্যবহৃত হবে  কেবল জনগণের প্রয়োজনে, কোন কোম্পানির মুনাফার জন্য নয়। নিজেদের জীবন ও সম্পদ নিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের এখতিয়ার কেবলমাত্র জনগণেরই।

এই ফুলবাড়ী গণঅভ্যূত্থান এবং শহীদদের স্মরণ করে জাতীয় কমিটি ঢাকা ও ফুলবাড়ীতে ২৬ থেকে ৩০ আগস্ট পর্যন্ত বিভিন্ন কর্মসূচি নিয়েছে। ২৬ আগস্ট ফুলবাড়ী দিবসের কেন্দ্রীয় কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হবে ফুলবাড়ী। সকালে শহীদ স্মৃতিস্তম্ভে পুস্পস্তবক অর্পণের মধ্যে দিয়ে দিনের কর্মসূচি শুরু হবে। এছাড়া শোক র‌্যালী, আলোচনা সভা এবং গান, নাটক ও চলচ্চিত্রসহ বিভিন্ন কর্মসূচি নেয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। বিভিন্ন স্থানে দোয়া ও প্রার্থনার আয়োজন করছেন এলাকার জনগণ। ফুলবাড়ীতে ৩০ তারিখ পর্যন্ত এসব কর্মসূচী অব্যাহত রাখার জন্য আমরা স্থানীয় প্রশাসনসহ সরকারের সহযোগিতা কামনা করি ।

ঢাকায় ২৬ আগস্ট সকালে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে  পুস্পস্তবক অর্পণের মধ্য দিয়ে কর্মসূচি শুরু হবে। বিভিন্ন জেলা, উপজেলা ও অঞ্চল কমিটি ২৬ আগস্ট স্ব স্ব শহীদ মিনারে পুস্পস্তবক  অর্পণ, আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে এই সপ্তাহটি পালনের যথাযথ উদ্যোগ গ্রহণ করবেন। ৩০ আগস্ট ফুলবাড়ী চুক্তি বাস্তবায়নের দাবীতে কেন্দ্রীয় কর্মসূচী ঢাকায় অনুষ্ঠিত হবে। জনগণের পক্ষে ক্রিয়াশীল সকল রাজনৈতিক দল, শ্রেণী পেশা ও ছাত্র সংগঠনসমূহও এই সপ্তাহে বিশেষ কর্মসূচী গ্রহণ করবেন বলে আমরা আশা করি।

আমরা এই সাংবাদিক সম্মেলনের মাধ্যমে জাতীয় ও রাষ্ট্রীয়ভাবে বাংলাদেশের এই বিশাল ও তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায়কে উদযাপন করবার লক্ষ্যে ফুলবাড়ী দিবস পালন করবার জন্য সরকারসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে আহবান জানাই। আমরা মনে করি এই দিবসের মর্যাদা প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ তার নতুন পরিচয় প্রতিষ্ঠার পথে অগ্রসর হতে সক্ষম হবে।