Thursday, February 22nd, 2007

ফুলবাড়ী চুক্তি,বাংলাদেশের সামগ্রিক জ্বালানী নিরাপত্তা, জাতীয় সম্পদ ও জাতীয় প্রতিষ্ঠান বিষয়ে সংবাদ সন্মেলন

[ঢাকা রিপোর্টাস ইউনিটির সম্মেলন কক্ষে ২২ ফেব্রুয়ারি, ২০০৭ তারিখে তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটি একটি সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে। কমিটির আহ্বায়ক প্রকৌশলী শেখ মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ মূল বক্তব্য উপস্থাপনের পর সাংবাদিক সম্মেলনের জন্য লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন কমিটির সদস্য সচিব আনু মুহাম্মদ, অধ্যাপক। বক্তব্যটি হুবহু তুলে ধরা হলো।]

প্রিয় সাংবাদিক বন্ধুগণ,

গত অক্টোবরের পর আমরা আপনাদের সামনে আবারও হাজির হয়েছি ফুলবাড়ী চুক্তি বাস্তবায়ন, বাংলাদেশের সামগ্রিক জ্বালানী নিরাপত্তা, জাতীয় সম্পদ ও জাতীয় প্রতিষ্ঠান বিষয়ে বক্তব্য রাখবার জন্য। আপনাদের শুভেচ্ছা জানিয়ে আমরা আমাদের বক্তব্য শুরু করছি।

আমরা বিভিন্ন সময়ে বলে আসছি যে, জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করতে গেলে এবং বাংলাদেশের উন্নয়নে জ্বালানী সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করতে গেলে যে কোন নীতি নির্ধারণী আলোচনায় ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগে চারটি বিষয় আমাদের সকলেরই মনে রাখা দরকার।

প্রথমত, এই সম্পদ অনবায়নযোগ্য। সে কারণে একবার ভুল সিদ্ধান্ত হলে তার আর সংশোধনের কোন সুযোগ নেই। সে কারণে এ ব্যাপারে সকল সিদ্ধান্তের দায়-দায়িত্বও সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত থাকতে হবে।

দ্বিতীয়ত, এই সম্পদ বাংলাদেশের জাতীয় সম্পদ। এর মালিক বাংলাদেশের মানুষ। এই মালিকানা প্রশ্নে কোন প্রকার ছাড় দিলে তা হবে জনগণের সাথে বিশ্বাসঘাতকতার শামিল। জ্বালানী সম্পদ ব্যবহারের যে কোন সিদ্ধান্ত, অতএব, বাংলাদেশের মানুষের পূর্ণ মালিকানা রেখেই করতে হবে।

তৃতীয়ত, এই সম্পদ সীমিত। সুতরাং এর ব্যবহার হতে হবে সম্পূর্ণ জনগণের প্রয়োজনে। কোম্পানির মুনাফার জন্য নয়।

চর্তুথত, বিশ্বব্যাপী তেল, কয়লাসহ জ্বালানী সম্পদ নিয়ে অস্থিরতা এখন প্রকট। দাম কিংবা প্রাপ্তির কোনই নিশ্চয়তা নেই। এই পরিপ্রেক্ষিতে কম দামে বেচে বেশী দামে কেনার কিংবা এই সীমিত সম্পদ উন্নয়নের নামে কোন বিদেশী কোম্পানির কর্তৃত্বে দেবার প্রকল্প স্পষ্টতই জাতীয় নিরাপত্তার হুমকিস্বরূপ।

গত দুই দশকে বিভিন্ন সামরিক বেসামরিক সরকার জ্বালানী সম্পদ নিয়ে যেসব চুক্তি করেছে এবং যেসব প্রকল্প হাতে নিয়েছে সেগুলো এসব শর্ত পরিষ্কারভাবে লঙ্ঘন করেছে। ৮০ দশকের শেষে বাংলাদেশকে ২৩টি ব¬কে ভাগ করা হয় এবং জ্বালানী সম্পদ উন্নয়নে বেসরকারি খাতের ভূমিকার নামে একদিকে বিভিন্ন গ্যাস ব্লক উত্তর আমেরিকা ও ইউরোপীয় বিভিন্ন বহুজাতিক কোম্পানির হাতে দেয়া শুরু হয় এবং অন্যদিকে দক্ষতা অর্থ অপচয় রোধের নামে রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলো যেমন পেট্রোবাংলা, বাপেক্সেকে দুর্বল বানানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়। এরপর থেকে ধারাবাহিকভাবে অর্থ বরাদ্দ কমিয়ে, নিয়োগ বন্ধ রেখে, কাজের ক্ষেত্র সংকুচিত করে, দক্ষ জনশক্তির প্রতিষ্ঠান ত্যাগে উৎসাহিত করে, মেশিনপত্র অব্যবহারে নষ্ট করে পুরো প্রতিষ্ঠানগুলোকে পঙ্গু করে ফেলা হয়। দেশীয় সংস্থা যে দামে গ্যাস উত্তোলন করতে সক্ষম ছিল তার তিনগুণ দামে ও বৈদেশিক মুদ্রায় বিদেশী কোম্পানির কাছ থেকে গ্যাস কেনার ফলে পেট্রোবাংলা ক্রমে লাভজনক প্রতিষ্ঠান থেকে লোকসানী প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়। এর সমাধান হিসেবে ক্রমান্বয়ে গ্যাসের দামবৃদ্ধির পরামর্শ ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এই দামবৃদ্ধির অজুহাত ধরে আবার বৃদ্ধি করা হচ্ছে বিদ্যুৎ ও অন্যান্য গ্যাসনির্ভর সামগ্রীর দাম। এগুলোই হচ্ছে তথাকথিত উন্নয়নএর চিত্র।

আবার বিভিন্ন গ্যাসব্লকে গ্যাসের পরিমাণ, উৎপাদন ব্যয়ে বড় বড় জালিয়াতিপূর্ণ ঘটনা ঘটিয়ে এসব কোম্পানি হাজার হাজার কোটি টাকার অনিয়ম করছে যার দায়ভারও বাংলাদেশের জনগণের উপরই পড়ছে। উপরন্তু বাংলাদেশের গ্যাস সম্পদের উপর বহুজাতিক কোম্পানির কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার ফলে দেশের প্রয়োজনের সাথে এর যোগান আর সম্পর্কিত নেই। পুরো বাংলাদেশই এখন তাদের হাতে জিম্মি। যে কোন সময়ে গ্যাস যোগান বন্ধ রেখে তার বহুজাতিক পুঁজির অধিকতর আগ্রাসন নিশ্চিত করবার নানা প্রকল্প বাস্তবায়নে চাপ দিতে সক্ষম। এবং সে অভিজ্ঞতা আমাদের ইতোমধ্যেই হয়েছে। রক্ষা যে, জনগণের প্রতিরোধের কারণে তারা তাদের অধিকতর লুণ্ঠনমূলক সব পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে পারেনি। গ্যাসব্লকগুলোর পাশাপাশি কয়লা সম্পদ দখলের জন্যও গত ১৩ বছর ধরে নানাদিক থেকে চেষ্টা চলছে। ব্রিটিশ অস্ট্রেলিয়ান কোম্পানি এশিয়া এনার্জি এবং ভারতের টাটা কোম্পানি বাংলাদেশের দুটো বৃহৎ কয়লাখনি দখলের জন্য নানা উন্নয়ন প্রকল্প পাশ করতে ব্যস্ত। এশিয়া এনার্জির মানুষ, বসতি, পরিবেশ বিধ্বংসী ফুলবাড়ী কয়লা প্রকল্প বাতিলের দাবীতে দিনাজপুরের চার থানা জুড়ে এক অবিস্মরণীয় গণঅভ্যুত্থানের সৃষ্টি হয় ২০০৬ সালের আগস্ট মাসে। তাতে তিনজন শহীদ হন এবং বিশজন গুলিবিদ্ধসহ দুই শতাধিক আহত হন। এর ফলে বিগত সরকার জনগণের সাথে এক চুক্তি সম্পাদন করে অঙ্গীকার করে যে, ফুলবাড়ী কয়লা প্রকল্প বাতিল হবে এবং সারাদেশে আর কোথাও বিদেশী মালিকানায় উন্মুক্ত পদ্ধতির কয়লা খনি হবে না। এরপরও এই প্রকল্পসহ টাটার একইরকম প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য নানা তৎপরতা চলছে। অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ, এডিবিসহ বিভিন্ন সংস্থা এ ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য সম্ভাব্য সবরকম চাপ দিয়ে যাচ্ছে।

বর্তমান তত্ত্বাবধায়ক সরকার আগের সরকারগুলোর সময়ে দুর্নীতির জন্য দায়ী ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে শাস্তি বিধানের কর্মসূচী নিয়েছেন। এই পরিপ্রেক্ষিতে আমরা ইতোমধ্যেই বর্তমান সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ডক্টর ফখরুদ্দীন আহমদের কাছে দেয়া স্মারকলিপিতে তাঁর দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেছি, এই তেল গ্যাস বা কয়লা চুক্তির মধ্যে সবচেয়ে বড় আকারের দুর্নীতি হয়েছে। এক্ষেত্রে তদন্ত করলে জ্বালানী সম্পদ নিয়ে লুটপাটে জড়িত দেশী বিদেশী পক্ষগুলোকে চিহ্নিত করা যাবে এবং জ্বালানী সম্পদ তথা দেশ ও জনগণকে রাহুমুক্ত করা সম্ভব হবে।

কারণ তথ্য যুক্তি আর জনমত সবদিক থেকেই এসব দুর্নীতিবাজ লুটেরা দেশী বিদেশী মহল বারবার পরাজিত হলেও তাদের তৎপরতা থেমে নেই। দেশের কিছু কিছু মহল নিজেদের ক্ষুদ্র স্বার্থে জনগণের জীবন, জাতীয় স্বার্থ সবকিছুর প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে এখনও এসব কোম্পানির হাতে দেশের সম্পদ তুলে দেবার অপচেষ্টা করে যাচ্ছে। এশিয়া এনার্জি তার নাম পাল্টে আবির্ভূত হয়েছে। টাটা নতুন করে দেনদরবার শুরু করেছে। এশিয়া এনার্জি বা টাটার হাতে দেশের কয়লা সম্পদ তুলে দেবার জন্য বিগত সরকার যে কয়লা নীতি করেছিল তা গ্রহণ করবার জন্যও এই মহল চেষ্টা চালাচ্ছে। আমরা এই ধরনের তৎপরতা অবিলম্বে বন্ধের দাবি জানাচ্ছি। জনগণের মালিকানা এবং জাতীয় স্বার্থ অক্ষুন্ন রেখে সর্বোত্তম ব্যবহারের জন্য নতুন সামগ্রিক জ্বালানী নীতি প্রণয়নের জন্য আমরা আমাদের দাবি পুর্ণব্যক্ত করছি।

আপনারা জানেন, আমরা এশিয়া এনার্জির এই প্রকল্পের বিরোধিতা করেছি ও করছি প্রধানত দুই কারণে। প্রথমত, এই প্রকল্পে বাংলাদেশের জনগণের সম্পদ জনগণকে না জানিয়ে তার শতকরা একশোভাগ মালিকানা তুলে দেয়া হয়েছে এই ব্রিটিশ কোম্পানির হাতে। দ্বিতীয়ত, যে পদ্ধতিতে তাদেরকে কয়লা উত্তোলনের রাস্তা করে দেয়া হচ্ছিল তাতে কোম্পানি বিপুল লাভ করতে পারতো ঠিকই , কিন্তু পুরো অঞ্চল একটি ধ্বংসস্তুপে পরিণত হতো। লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবন বিপন্ন হতো। আর শুধু খনি অঞ্চল নয়, পুরো উত্তরবঙ্গের ভূ-গর্ভস্থ ও ভূ-উপরিস্থ পানিসম্পদ ভয়াবহভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হতো। তার প্রভাব বাংলাদেশের অন্যান্য অঞ্চলেও পড়তো। কৃষি, জীবন-জীবিকা, জীববৈচিত্র্য সবই ভয়ংকরভাবে বিপন্ন হতো। এতসব ধ্বংসযজ্ঞ করে যে কয়লা উত্তোলন হতো তাও কোনভাবেই বাংলাদেশের অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত হতো না। কারণ শতকরা ৭০ থেকে ৮০ ভাগ বিদেশে রপ্তানি করা হতো। এই রপ্তানির আয়ও বাংলাদেশ পেতো না। কারণ এসবের মালিকানা কোম্পানির।

এরকম একটি ধ্বংসাত্মক প্রকল্প প্রস্তাব যেখানে প্রথমেই বাতিল করে দেবার কথা সেখানে তা কার্যকর করবার জন্য নানারকম অনিয়ম করে গত দুই সরকারের বিশেষত জ্বালানী মন্ত্রণালয়ের দিক থেকে নানা চেষ্টা অব্যাহত ছিল। বিশ্বব্যাংক ও এডিবিসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা, যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্যসহ বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় প্রশাসন যেগুলো বহুজাতিক কোম্পানির স্বার্থ সংরক্ষণেই সদাব্যস্ত থাকে তারা যথারীতি উন্নয়নের বুলি দিয়ে এই ধ্বংসাত্মক প্রকল্পের পক্ষে দাঁড়িয়েছিল। এরকম পরিস্থিতিতে সম্পদ ও মানুষ রক্ষায় ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন গড়ে তোলা ছাড়া বাংলাদেশের জনগণের সামনে আর কোন পথ খোলা ছিল না।

ফুলবাড়ীসহ ছয় থানার মানুষেরা তাদের জীবন ও অসাধারণ এক ঐক্য সংহতি দিয়ে শুধু যে নিজেদের জীবন বর্তমান ও ভবিষ্যৎ রক্ষা করেছেন তাই নয়, তারা রক্ষা করেছেন দেশের সম্পদ, বাংলাদেশের মানুষের ভবিষ্যৎ। গত সরকার গঠিত বিশেষজ্ঞ কমিটিও রায় দিয়েছেন এই প্রকল্প বাতিলের পক্ষে।

প্রিয় সাংবাদিক বন্ধুগণ,

সামগ্রিক পরিপ্রেক্ষিতে আমরা বর্তমান সরকারের কাছে জাতীয় স্বার্থ ও জ্বালানী নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আর সেইসঙ্গে লুটেরাদের কবল থেকে জাতীয় সম্পদ ও জাতীয় প্রতিষ্ঠান রক্ষা করবার জন্য জনগণের পক্ষ থেকে নিম্নোক্ত দাবীগুলো রাখছি।

প্রথমত, আর কালক্ষেপণ না করে ফুলবাড়ীসহ ছয় থানার আন্দোলনরত জনগণ এবং জাতীয় কমিটির সঙ্গে সম্পাদিত সাবেক সরকারের চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় আইনগত ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা গ্রহণ করুন। এর অংশ হিসেবে যে নামেই থাকুক না কেন, এশিয়া এনার্জির সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তি বাতিলের আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে তাদের দেশ থেকে বিতাড়ন করুন। গত দুই সরকারের সময়ে এরকম একটি বেআইনী, জাতীয় স্বার্থবিরোধী এবং ধ্বংসযজ্ঞের প্রকল্প যারা বাস্তবায়নের জন্য নানা ফন্দিফিকির করেছে তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিও আমরা এইসঙ্গে দাবী করি। ২৬ আগষ্ট হত্যাকাণ্ডের জন্য এশিয়া এনার্জির সঙ্গে সঙ্গে এরকম একটি ধ্বংসাত্মক প্রকল্পের দেশীয় সহযোগীরাও দায়ী।

দ্বিতীয়ত, জনগণের গণরায় অনুযায়ী বাংলাদেশের জ্বালানী সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করবার জন্য দুটো লক্ষ্য নিশ্চিত করুন। এক. বাংলাদেশের খনিজ সম্পদ জনগণের সাধারণ সম্পত্তি, সেই মালিকানা কোনভাবেই খর্ব করা যাবে না। এবং দুই. এই সম্পদ স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার মাধ্যমে মুনাফার জন্য নয় জনগণের বিদ্যুৎ শিল্পায়নসহ বিভিন্ন প্রয়োজনেই কেবল ব্যবহার করতে হবে। এই লক্ষ্যের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ সামগ্রিক জ্বালানী নীতি প্রণয়নের কাজ শুরু করুন। এই লক্ষ্যের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ কয়লা নীতি বাতিল করুন। ১৯৬৮ সালের মাইনিং রুলস ( পরবর্তী বিভিন্ন সংশোধন সহ) বাতিল করে জাতীয় স্বার্থের উপযোগী করে নতুনভাবে প্রণয়ন করুন। বলা দরকার যে, গত সরকারের সময় কয়লা নীতি প্রণয়ন করা হয়েছিল বাংলাদেশের কয়লা সম্পদ সামান্য রয়্যালটির বিনিময়ে বিদেশী কোম্পানির হাতে তুলে দেয়া এবং দেশের প্রয়োজন না মিটিয়ে সেই সম্পদ বিদেশে রপ্তানি করবার জন্য। মাইনিং রুলস এ শুধু কয়লা বা অন্যান্য মূল্যবান সামগ্রী নয় এমনকি মাটির নীচে সোনা পাওয়া গেলেও তা সর্বোচ্চ শতকরা ১৫ ভাগ রয়্যালটির মাধ্যমে বিদেশী কোম্পানির হাতে তুলে দেবার বিধান রাখা হয়েছে।

তৃতীয়ত, গত প্রায় দেড় দশকে বাংলাদেশের জনগণের সম্পদ বাংলাদেশের মানুষকে না জানিয়ে বিদেশী কোম্পানির হাতে তুলে দেয়া হয়েছে উৎপাদন অংশীদারী চুক্তিসহ বিভিন্ন চুক্তির মাধ্যমে। আমরা এসব চুক্তি অবিলম্বে জনগণের সামনে প্রকাশ এবং জাতীয় স্বার্থবিরোধী সকল চুক্তি বাতিল করবার দাবি জানাই। একইসঙ্গে মাগুড়ছড়া ও টেংরাটিলা ধ্বংসযজ্ঞের জন্য ক্ষতিপূরণ এর টাকা আদায়ের উদ্যোগ নিতেও তাগিদ দিচ্ছি।

চতুর্থত, আমরা মনে করি বর্তমানে সারাদেশে যে বিদ্যুৎ সংকট এখনও চলছে তার জন্য জ্বালানী সম্পদ নিয়ে জাতীয় স্বার্থবিরোধী বিভিন্ন চুক্তি, এসব সম্পদ নিয়ে দেশী বিদেশী সম্মিলিত লুটেরা চক্রের আধিপত্য বিস্তার এবং বিদ্যুৎ ক্ষেত্রে বিদ্যমান প্ল্যান্ট মেরামত ও নতুন প্ল্যান্ট স্থাপনে সীমাহীন দুর্নীতি দায়ী। বিশ্বব্যাংক ও এডিবি এই খাতে কখনো অর্থ সংস্থান করে ও কখনো তা বন্ধ করে পুরো খাতকে বহুজাতিক কোম্পানির বাণিজ্যিক আধিপত্যের মধ্যে নিয়ে আসার কাজ করছে বহুদিন, আর এই প্রক্রিয়ায় সীমাহীন লুটপাটের মাধ্যমে সাবেক সরকারগুলোর মন্ত্রী, আমলা, ব্যবসায়ীদের চক্র তাদের ভাগ বাড়ানোর চেষ্টা করেছে। এই দুই এর মিলিত ফল হল এই খাতে নৈরাজ্য এবং সংকট। এ থেকে উদ্ধার পাবার জন্য তাই বিশ্বব্যাংক বা এডিবির অর্থায়ন নয়, গ্যাস ও কয়লা সম্পদকে রাহুমুক্ত করে যথাযথ পরিকল্পনায় বিদ্যুৎ খাতকে পুনর্বিন্যাস করতে হবে। পুঁজির অভাবের যুক্তি দেয়া হয় যা সম্পূর্ণ ভ্রান্ত। গত সরকারের আমলে বিদ্যুৎ খাতে প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকা খরচ করা হয়েছে। মাগুড়ছড়া ও টেংরাটিলা ধ্বংসযজ্ঞের জন্য আমরা ক্ষতিপূরণ বাবদ পাই ১৩ হাজার কোটি টাকা। এর যে কোন একটি দিয়ে বাংলাদেশে প্রায় ৩ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্ল্যান্ট স্থাপন সম্ভব ছিল। অথচ বাংলাদেশে এখন বিদ্যুৎ ঘাটতি প্রায় ২ হাজার মেগাওয়াট। এই বিষয়গুলো ফয়সালা না করে সাবেক সরকারের নীতি অব্যাহত রাখা বা তড়িঘড়ি কোন চুক্তিরও আমরা বিরোধী।

পঞ্চমত, দুর্নীতি ও অযোগ্যতার অজুহাত তুলে চট্টগ্রাম বন্দর বেসরকারিকরণ বিষয়ে বিভিন্ন মহল থেকে বক্তব্য দেয়া হচ্ছে। আমরা এখানে বলতে চাই যে, চট্টগ্রাম বন্দর নিছক একটি অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান নয় এটি একই সঙ্গে একটি জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ একটি জাতীয় প্রতিষ্ঠান। এই প্রতিষ্ঠান সচল, দুর্নীতিমুক্ত এবং গতিশীল করা গুরুত্বপূর্ণ বলে আমরা মনে করি। এর পথে বাধাসমূহ দূর করা, যারা এর পথে বাধা তাদের চিহ্নিত করা খুবই প্রয়োজনীয়। কিন্তু এসব না করে যারা এই প্রতিষ্ঠান অচল করবার জন্য দায়ী সেই প্রভাবশালী মহলের স্বার্থেই তাকে বেসরকারিকরণ করার যে কোন চেষ্টা জাতীয় স্বার্থবিরোধী। আমরা এই প্রসঙ্গে স্মরণ করছি যে, ১৯৯৮ সালে তৎকালীন সরকারের পাঁচজন সচিব এসএসএ নামে এক জালিয়াত কোম্পানির হাতে বন্দরকে তুলে দেবার সুপারিশ করেছিলেন। মার্কিন দূতাবাসও এর বাস্তবায়নের জন্য চাপ দিয়েছিল। জনগণের প্রতিরোধের মুখে বন্দর ও জাতীয় স্বার্থ বিরোধী এই ভয়ংকর অপচেষ্টা তখন রোধ করা সম্ভব হয়েছিল। আমরা এসব অপচেষ্টার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে তদন্ত করবার আহ্বান জানাই। এদের সনাক্ত করলেই বন্দর সচল করবার বাধা চিহ্নিত করা সম্ভব হবে বলে আমরা বিশ্বাস করি।

প্রিয় সাংবাদিক বন্ধুগণ,

আপনাদের মাধ্যমে আমরা এই কথা বলে শেষ করতে চাই যে, যেহেতু বর্তমান সরকার দুর্নীতি অনিয়মের বিরুদ্ধে অঙ্গীকার ঘোষণা করেছেন সেহেতু জাতীয় স্বার্থে জনগণের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা নিশ্চিত করবার জন্য এইসব কর্মসূচী বাস্তবায়নে সরকার আগ্রহের সঙ্গে তড়িৎ ও সর্বাত্মক উদ্যোগ গ্রহণ করবেন এটাই আমরা আশা করি। আপনাদের সবাইকে ধন্যবাদ।

 

তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যু -বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটি

ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি। ঢাকা। ২২ ফেব্রুয়ারি, ২০০৭