Saturday, October 6th, 2007

‘এশিয়া এনার্জির অপতৎপরতা এবং বাংলাদেশে এডিবি মিশন’- প্রসঙ্গে সাংবাদিক সম্মেলন

[এশিয়া এনার্জির সাম্প্রতিক বিভিন্ন অপতৎপরতা, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের একটি মিশনের ঢাকা সফর ও বক্তব্য এবং উন্মুক্ত খনন পদ্ধতি বহাল রাখার পক্ষে সা¤প্রতিক প্রচারণা প্রসঙ্গে জাতীয় কমিটি ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি মিলনায়তনে গত ৬ অক্টোবর, ২০০৭ ইং তারিখে একটি সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে। সম্মেলনে ভূমিকাপত্র উপস্থাপন করেন কমিটির আহ্বায়ক প্রকৌশলী শেখ মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ এবং মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সদস্য সচিব আনু মুহাম্মদ। অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি মোহাম্মদ গোলাম রব্বানী, অধ্যাপক শামসুল আলম এবং কমিটির অন্তর্ভুক্ত বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ উক্ত সম্মেলনে বক্তব্য রাখেন। পাঠকদের সুবিধার্থে উপস্থাপিত মূল বক্তব্য নিচে হুবহু দিয়ে দেয়া হলো]

ভূমিকা

গত কয়েকদিন যাবৎ সংবাদপত্রে টাটার বিনিয়োগ প্রস্তাব ও এশিয়া এনার্জির কয়লা খনির প্রস্তাব নিয়ে জোর তৎপরতার খবর প্রচারিত হচ্ছে। প্রস্তাবগুলির ব্যাপারে সরকারের সিদ্ধান্তহীনতার ব্যাপারে হতাশা ও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে টাটা কোম্পানি, এশিয়া এনার্জি কর্পোরেশন ও অর্থলগ্নী প্রতিষ্ঠান এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক। প্রথম দফায় কান্ট্রি ডিরেক্টর হুয়া দু আবার ব্যাংকের মিশনে আসার পর কুনিও সেঙ্গা দাবী করেছে এই সিদ্ধান্তহীনতা বিদেশী বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ভুল বার্তা পাঠাচ্ছে। বাংলাদেশের অর্থ উপদেষ্টাও এ ব্যাপারে একমত পোষণ করেছেন।

আমরা স্পষ্টভাবে জানাতে চাই এই বার্তা ভুল নয়, একেবারে সঠিক, যা বিনিয়োগ প্রস্তাবকারীগণও বিলক্ষণ জানেন। বাংলাদেশের জনগণ এইসব জাতীয় স্বার্থবিরোধী, লুণ্ঠনধর্মী ও প্রতারণামূলক বিনিয়োগ চায় না। দেশে গ্যাসভাণ্ডার শূন্যের কোঠায় যেতে চলেছে, গ্যাসের অভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন, দেশীয় কারখানা, সার উৎপাদনে হাহাকার সৃষ্টি হয়েছে, চোখের সামনে সবাই দেখতে পাচ্ছে – এ অবস্থায় টাটা কোম্পানির ১০/১২ বছরে বিপুল পরিমাণ গ্যাস সরবরাহের চাহিদা ও তার বিনিময়ে গ্যাসজাত পণ্য যথা সার ও ইস্পাত বিদেশে পাচারের ষড়যন্ত্র গরীব মানুষের ভাতমারা ধনিক শ্রেণীর সরকারসমূহ মানতে পারেন, সচেতন জনগণ মানবে না। এশিয়া এনার্জি আমাদের ফুলবাড়ি ধ্বংস করে পরিবেশের চরম বিভীষিকাময় বিপর্যয় সৃষ্টি করে তার বিনিময়ে আমাদের মালিকানার কয়লার মাত্র শতকরা কুড়ি ভাগ বখশিশ দিয়ে প্রতিবছর ১২ মিলিয়ন টন বিদেশে পাচার করার প্রস্তাব জনগণ রক্ত দিয়ে রুখেছে। অতএব এই লুণ্ঠন, এই প্রতারণা বাংলাদেশের জনগণ মেনে নেবে এই আশায় বসে থাকাটাও ধৃষ্টতা এবং বিদ্যাবুদ্ধি ও দেশপ্রেমবোধের প্রতি চরম অবমাননাজনক। বাংলাদেশের সরকারের সিদ্ধান্তহীনতার জন্য সরকারের অলসতা বা ইচ্ছার অভাব দায়ী নয়। বাংলাদেশের জনগণের ন্যায্য প্রতিরোধের মুখে জাতীয় স্বার্থবিরোধী পদক্ষেপ নিতে সরকারের অসামর্থ্যই দায়ী। আমাদের অবাক লাগে কীভাবে লুণ্ঠনকারী বিনিয়োগকারীগণ আশা করে যে তাদের লুণ্ঠনধর্মী প্রস্তাব জনগণ বুঝতে পারবে না। যে বিনিয়োগ আসছে তাতে আমাদের সমূহ সর্বনাশ হবে তা না জেনে, না বুঝে আনন্দে আহ্লাদে জনগণ ঐ প্রস্তাব গিলবে। টাটা চতুরভাবে ক্রমান্বয়ে তাদের শর্ত শিথিল করে গেছে, গ্যাসের মূল্য নিয়ে ছাড় দিয়েছে। এতে কিছু আসে যায় না। আমাদের বিদ্যুৎ, সার ও শিল্প উৎপাদনকে ধ্বংস করে তাদের গ্যাস কয়লা দেয়া সম্ভব নয়। এটা যত তাড়াতাড়ি বুঝতে পারে ও দেশ থেকে গুটিয়ে নেয় ততই তাদের মঙ্গল, আমাদের তো বটেই।

এশিয়া এনার্জি তাদের প্রস্তাব রি-নেগোশিয়েট করতে চাচ্ছে আমাদের মন গলানোর জন্য। ১০০ ভাগ সর্বনাশ থেকে ৫/১০ ভাগ কমালেও সর্বনাশ সর্বনাশই থেকে যাবে। তাদের বুঝতে হবে তারা যে অবৈধ ভিত্তিতে ও মিথ্যা প্রতিশ্র“তি দিয়ে ও অবৈধভাবে স্থানীয় ও জাতীয়ভাবে প্রজেক্ট প্রমোশন ও পাবলিক রিলেশন চালিয়ে যাচ্ছেন তার ফলাফল হবে শূন্য। এই বহুজাতিক বিনিয়োগকারীরা বড় বিনিয়োগের প্রস্তাব দেবার পর এটা গ্রহণ করতে গড়িমসি করাতে বিরক্তিবোধ করে, অর্থাৎ আমাদের জনগণের এতসব বোঝার দরকার নেই। যে প্রস্তাব তারা দেবে জনগণ চোখ-কান বুজে রাজী হবে। ধনিক শ্রেণীর সরকার যারা গরীব দেশের জনগণের স্বার্থ দেখে না, তারা চাপ দিয়ে জনগণকে রাজী করাবে এটাই তারা আশা করে। বর্তমান জরুরী অবস্থায় মিটিং মিছিল করা যাবে না, জনগণের প্রতিবাদের কণ্ঠ আজিকে রুদ্ধ, বাঁশী সঙ্গীত হারা। তাই লুণ্ঠনকারী বিনিয়োগকারীদের এত জরুরী তৎপরতা, এই জরুরী অবস্থার মধ্যে তাদের প্রস্তাব গেলানোর তাগিদ।

বিবিয়ানা গ্যাস পাচারের ষড়যন্ত্রকালেও দেখা গিয়েছিল গ্যাস রপ্তানি চুক্তি হবার পূর্বেই অবশ্যম্ভাবীভাবে প্রস্তাব গৃহীত ও অনুমোদিত হবে, এই ভিত্তিতে গ্যাস পাইপ লাইনের ভারতীয় অংশে কয়েকশত মাইল পাইপ লাইন বসানোর স্টিপুলেটিভ কন্ট্রাক্টও ইউনোক্যাল করেছিল। পশ্চিম বঙ্গের তিনটি ২১০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কেন্দ্রে বিকল্প গ্যাস-ফুয়েল বসানোর কাজও শুরু হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু বিবিয়ানা থেকে ভারতে গ্যাস পাচারের ষড়যন্ত্র সচেতন জনগণ ব্যর্থ করে দেয়, ভবিষ্যতেও এ ধরনের পাচারের সব ষড়যন্ত্র ব্যর্থ করে দেবে। একথা মনে রাখলেই ভবিষ্যৎ লুণ্ঠনকামীগণ বিফলতার বেদনা থেকে মুক্তি পাবে।

প্রিয় সাংবাদিক বন্ধুগণ,

এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) একটি মিশন ঢাকা সফরে এসে এশিয়া এনার্জি ও টাটার পক্ষে সরকারের কাছে তদ্বির করছে, চাপ প্রয়োগ করছে, সংবাদপত্রে প্রকাশিত খবর থেকে এই তথ্য জেনে আমরা উদ্বিগ্ন ও ক্ষুব্ধ। একই সঙ্গে আমরা ক্ষুব্ধ এই খবর দেখে যে তাদের সঙ্গে বর্তমান সরকারের অর্থ ও জ্বালানি উপদেষ্টা দুজনই একই সুরে কথা বলছেন এবং ফুলবাড়ী কয়লা প্রকল্প নিয়ে এশিয়া এনার্জির সঙ্গে নতুন আলোচনা শুরুর আগ্রহ প্রকাশ করেছেন।

এশিয়া এনার্জির ফুলবাড়ী কয়লা প্রকল্পের জনবিরোধী, পরিবেশবিরোধী ও জাতীয় স্বার্থবিরোধী চরিত্র উন্মোচিত হবার পর জনগণ বিভিন্ন সময়ে তাদের প্রতিবাদ জানিয়েছেন এবং এক পর্যায়ে জীবন দিয়ে ফুলবাড়ীসহ ছয় থানার মানুষ এই প্রকল্প প্রত্যাখ্যান করেছেন। এরকম একটি প্রকল্প নিয়ে সেই রক্তমাখা কোম্পানির সাথে পুনরায় আলোচনার সুযোগ কী করে সম্মানিত উপদেষ্টারা দেখছেন সেটাই আমাদের প্রশ্ন। অন্যদিকে এডিবি বোর্ডে এখনও এশিয়া এনার্জি প্রকল্প অনুমোদন পায়নি। অনুমোদনের আগেই এডিবি’র ‘পাবলিক কনসালটেশন’, তথ্য প্রকাশ, পরিবেশ রক্ষা, জনসম্মতি ইত্যাদি সব শর্ত ভঙ্গ করে প্রণীত এই প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য এডিবির কর্মকর্তারা তদ্বির চালাচ্ছেন, করপোরেট লবিস্ট এর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন। এডিবির কান্ট্রি ডিরেক্টরও এর আগে এই প্রকল্পের পক্ষে তদ্বির করেছেন, চাপ প্রয়োগ করেছেন। জনগণ যে প্রকল্প প্রত্যাখ্যান করেছে, সরকার গঠিত বিশেষজ্ঞ কমিটি পরিবেশ, জাতীয় স্বার্থ, আইন ও প্রচলিত নিয়মকানুন, কৃষি, জনবসতি সব বিবেচনাতেই যে প্রকল্প অগ্রহণযোগ্য বলে জানিয়েছেন, এমনকি যে প্রকল্প তাদের নিজেদের শর্তই পূরণ করে না সেই প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য এডিবির কর্মকর্তারা এত উদগ্রীব কেন? আমাদের উপরোক্ত উপদেষ্টারাই বা কেন দেশ ও জনগণের প্রশ্ন উপেক্ষা করে তাদের সাথে এক সুরে কথা বলেন?

এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক বিভিন্ন দেশের জনগণের করের অর্থে পরিচালিত। সেই অর্থ এডিবির আমলারা কীভাবে কিছু কোম্পানির মুনাফা বৃদ্ধির কাজে লাগায় তা এশিয়া এনার্জির ধ্বংসাত্মক প্রকল্পে অর্থসংস্থানে তাদের প্রস্তুতি, দেন-দরবার ও চাপ প্রয়োগে আরেকবার প্রমাণিত হচ্ছে। বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ-এর মতো এডিবিকেও তাই কোনভাবেই ‘দাতা সংস্থা’ বা ‘উন্নয়ন সহযোগী’ বলা যায় না। বাংলাদেশে এডিবি বিভিন্ন প্রকল্পে ঋণ হিসেবে অর্থ যোগান দিয়েছে। তাদের বিভিন্ন প্রকল্পের কারণে দেশের বন, পানি, শিক্ষা, জ্বালানী ও বিদ্যুৎ খাতে যে ধ্বংস, ক্ষয়, অপচয় এবং জাতীয় সক্ষমতার বিনাশ ঘটেছে তার দায়-দায়িত্ব নির্দিষ্ট করবার এখন সময় এসেছে। উন্নয়ন ও দারিদ্র্য বিমোচনের নামে চাপানো এসব প্রকল্পের কারণে উন্নয়ন ক্ষমতার বিনাশ হয়েছে, দারিদ্র্য আরও স্থায়ীরূপ নিয়েছে। যেখানে এসব প্রকল্পের জন্য এডিবির জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা দরকার সেখানে তাদের এরকম আরও ‘অর্থ প্রাপ্তির’ অজুহাতে আরেকটি ভয়াবহ প্রকল্প বাস্তবায়নের আয়োজনের চক্রান্ত চলছে। বিভিন্ন অঞ্চলে এডিবির বিভিন্ন প্রকল্পের ধ্বংসাত্মক পরিণতিতে ক্ষতিগ্রস্ত জনগণ ক্রমেই সজাগ হচ্ছেন। দেশে দেশে তাদের বিরুদ্ধে বিশেষজ্ঞ ও জনগণের আদালত বসছে, বাংলাদেশেও বসবে।

প্রিয় সাংবাদিক বন্ধুগণ,

আপনারা জানেন, এডিবি, আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের সমর্থন নিয়ে বিগত সরকারগুলো উন্নয়নের কথা বলে তেল-গ্যাস, কয়লা ও বিদ্যুৎ খাতে দুর্নীতির মাধ্যমে বহু চুক্তি করেছে। এগুলো যে কতটা ক্ষতিকর ও অর্থনীতির জন্য স্থায়ী বোঝাস্বরূপ তা ইতিমধ্যেই পরিস্কার হয়েছে। জাতীয় কমিটির নেতৃত্বে জনগণের প্রতিবাদের কারণে আরও অনেক ক্ষতির হাত থেকে আমরা রক্ষা পেয়েছি। গ্যাস রপ্তানি বন্ধ ছাড়াও ফুলবাড়ী কয়লা প্রকল্প প্রতিরোধ এরই একটি বড় দৃষ্টান্ত। আমরা আবারও এই সরকারকে মনে করিয়ে দিতে চাই যে, জনগণের ব্যাপক প্রতিরোধের মুখে এই প্রকল্প পুরোপুরি বাতিল ও উন্মুক্ত খনন পদ্ধতি গ্রহণ না করবার ব্যাপারে অঙ্গীকার করে জনগণের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষর করেছিল বিগত সরকার। বলাই বাহুল্য, বর্তমান সরকার এশিয়া এনার্জির সঙ্গে সম্পাদিত দুর্নীতিযুক্ত চুক্তি বা গোপন সমঝোতা বাতিল না করে জনগণের রায়ের ভিত্তিতে জনগণের সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তি অস্বীকার করলে তা হবে জনগণের সঙ্গে চরম বিশ্বাসঘাতকতার শামিল আর তাদের দুর্নীতির বিরোধিতার কথা হবে প্রহসন। আমরা সরকারের আরও দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই এই দিকে যে, যেখানে সরকার থেকেই বলা হয়েছে এশিয়া এনার্জির সঙ্গে কোন ‘মাইনিং লাইসেন্স’ চুক্তি নেই সেখানে এখনও এই কোম্পানি বাংলাদেশের কয়লা দেখিয়ে লন্ডন শেয়ার মার্কেটে অর্থ তুলছে। এরকম দুর্নীতিগ্রস্ত তৎপরতার বিষয়ে আমরা এখনও সরকারের কোন ভূমিকা দেখতে পাইনি। শুধু বিদেশেই নয়, এশিয়া এনার্জি বাংলাদেশে সবসময়ই দুর্নীতি ছড়ানোর চেষ্টা  করেছে, এখনও তা অব্যাহত আছে। স¤প্রতি দেশের বিভিন্ন সংবাদপত্রে বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে এই কোম্পানি মিথ্যা প্রচার শুরু  করেছে। আমরা খুবই দুঃখিত যে, জাতীয় কয়েকটি সংবাদপত্র এই জালিয়াত কোম্পানির প্রচারে সহযোগী হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমাদের প্রশ্ন, কোনরকম লাইসেন্স যখন তাদের নেই, এবং যখন জনগণের মত প্রকাশের সুযোগ সংকুচিত তখন এই জনধীকৃত কোম্পানি কীভাবে এরকম মিথ্যা প্রচার করতে পারছে? কিছু সংবাদপত্র কীভাবে তাদের মিথ্যা প্রচারের বাহন হচ্ছে? পয়সা ও লোভ ছড়িয়ে কোম্পানি প্রকাশ্যেই সাংবাদিক, কনসালট্যান্ট, আমলাদের দুর্নীতিগ্রস্ত করছে। বিভিন্ন সংবাদপত্রের মালিকদের কাছে আমাদের অনুরোধ কিছু অর্থ প্রাপ্তির জন্য এশিয়া এনার্জির মতো লুটেরা কোম্পানির কাছে নিজেদের বিক্রি করবেন না। জনগণ যাদের রক্ত দিয়ে প্রত্যাখ্যান করেছে, শুধু কিছু টাকার জন্য তাদের অপকর্মের ভাগীদার হবেন না।

প্রিয় সাংবাদিক বন্ধুগণ,

আমরা সংবাদপত্রের মাধ্যমে আরও জানতে পেরেছি যে, প্রস্তাবিত কয়লা নীতিতে কয়লা উত্তোলনের জন্য উন্মুক্ত খনন পদ্ধতি বহাল রাখার অপচেষ্টা চলছে। এশিয়া এনার্জির আতিথ্যে যেসব সাংবাদিক জার্মানী সফর করেছেন তাদের কেউ কেউ এই পদ্ধতির পক্ষে বা কার্যত এশিয়া এনার্জির প্রকল্পের পক্ষে প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন। আমরা বারবার তথ্য উপাত্ত দিয়ে দেখিয়েছি, বিশেষজ্ঞরা দেখিয়েছেন যে, বাংলাদেশের মতো জনবসতি, পানি, উর্বর মাটি, কৃষি ও জীববৈচিত্র্য সমৃদ্ধ অঞ্চলে উন্মুক্ত খনন পদ্ধতি গ্রহণের কোন দৃষ্টান্ত পৃথিবীর কোথাও নেই। মাটির নীচের সম্পদ তোলার জন্য এমন পদ্ধতি কোন দায়িত্বশীল কাণ্ডজ্ঞানসম্পন্ন মানুষই অনুমোদন করবে না যা মাটির উপরের সম্পদ দীর্ঘমেয়াদে বিনষ্ট করবে, মানুষ প্রকৃতি এবং জাতীয় অর্থনীতি বিপন্ন করবে।

কিন্তু এত ধ্বংসযজ্ঞ করে যে বিপুল কয়লা তোলা হবে তার চাহিদা যেহেতু বাংলাদেশে নেই সেহেতু তিন চতুর্থাংশই রপ্তানির চাপ থাকবে। আর মালিকানা যদি বিদেশী কোম্পানির হয় তাহলে রফতানির অর্থ দাঁড়াবে পাচার, কারণ এর থেকে আয় বিদেশী কোম্পানিরই হবে, উপরন্তু বাংলাদেশকে নিজেদের কয়লা কিনতে হবে আন্তর্জাতিক দামে। জ্বালানী নিরাপত্তা বিপর্যস্ত হবে। জার্মানী, অস্ট্রেলিয়া, ভারত, চীনসহ যেসব দেশে উন্মুক্ত খনন পদ্ধতি নেয়া হয়েছে তার সবগুলোই পাহাড় বা মরুভূমিতে এবং দেশীয় সংস্থার মালিকানায়। তাদের জাতীয়ভিত্তিক জনঘনত্ব বাংলাদেশের চাইতে অনেক কম, মাটির উপরের সম্পদ নষ্টের অনুপাত কম, রাষ্ট্রীয় আইন ও তদারকি তুলনামূলকভাবে বেশী। তারপরও এসব দেশ নতুন করে এই পদ্ধতি আর গ্রহণ করছে না। আর্জেন্টিনা, পেরু, কোস্টারিকা, ইকুয়েডর এমনকি যুক্তরাষ্ট্র গত একবছরে উন্মুক্ত খনন পদ্ধতির বিরুদ্ধে নানামাত্রায় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে।

এরকম দেশীয় ও বৈশ্বিক পরিপ্রেক্ষিতেও বাংলাদেশের জন্য উন্মুক্ত খনন পদ্ধতি বহাল রাখার চেষ্টা স্পষ্টতই এশিয়া এনার্জি বা টাটার মতো কোম্পানিগুলোর স্বার্থ রক্ষার জন্যই করা হচ্ছে। আমরা আশা করি সামগ্রিক পরিপ্রেক্ষিত বিবেচনা করে সরকার গঠিত কয়লা নীতি কমিটি উন্মুক্ত খনন পদ্ধতি পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করবেন। আমরা বারবার বলেছি, কয়লা উত্তোলনের জন্য নিরাপদ, পরিবেশ কৃষি ও মানুষ অনুকূল প্রযুক্তি উদ্ভাবনের জন্য বিশ্বব্যাপী নানা গবেষণা চলছে। কয়লা সম্পদের উপর আমাদের মালিকানা ও কর্তৃত্ব বহাল থাকলে এবং জাতীয় সক্ষমতা বিকাশের নীতি গ্রহণ করলে আমরা এই কয়লা সম্পদ মানুষ ও পরিবেশের কোন ক্ষতি না করে জ্বালানি নিরাপত্তা বৃদ্ধির কাজে লাগাতে পারবো।

এসব বিষয় এবং বৈশ্বিক অভিজ্ঞতা বিবেচনা করলে কয়লাসহ জ্বালানী সম্পদ সংক্রান্ত নীতিমালা প্রণয়নে যে নীতিগত অবস্থান অপরিহার্য যা আমরা আগেও বলেছি আবারও তা উল্লেখ করছি:

১. এই সম্পদ সাধারণ সম্পত্তি এবং এর উপর সামগ্রিক নিরাপত্তা নির্ভরশীল বলে এর উপর জনগণের শতকরা ১০০ ভাগ মালিকানা অর্থাৎ জনগণের সম্পদের উপর জনগণের কর্তৃত্ব নিশ্চিত করতে হবে।

২. যেহেতু এই সম্পদ সীমিত ও অনবায়নযোগ্য সেজন্য রপ্তানির ঘোর থেকে মুক্ত হয়ে বিদ্যুৎসহ জ্বালানী নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে দেশের অভ্যন্তরে এর সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। উৎপাদনশীল খাতগুলোর গতিশীলতা বৃদ্ধিতে এর ব্যবহার হবে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে। আইন করে রপ্তানি নিষিদ্ধ করতে হবে।

৩. বাংলাদেশে উর্বর জমি, স্বাদু পানি, ভূ-বৈচিত্র্য ও জীববৈচিত্র্য খনিজ সম্পদের মতোই মূল্যবান। সে কারণে পরিবেশ, জমি, কর্মসংস্থান, পানি, জীবন-জীবিকা রক্ষা করেই কয়লাসহ জ্বালানী সম্পদের উত্তোলনের পদ্ধতি নির্ধারণ করতে হবে। ঘন জনবসতি, জমির উচ্চ ব্যবহার মূল্য, ভূ-উপরিস্থ ও ভূ-গর্ভস্থ পানির বিন্যাস, বিদ্যমান জীবন-জীবিকা পরীক্ষা করে এ ব্যাপারে আমরা নিশ্চিত যে বাংলাদেশে উন্মুক্ত খনন পদ্ধতি ভয়ংকর পরিণতি আনবে। কারিগরি ও অর্থনৈতিক সামাজিক, কোন বিবেচনাতেই তা গ্রহণযোগ্য নয়।

৪. জ্বালানী সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করতে হলে জাতীয় সক্ষমতা বাড়াতে হবে। এর জন্য দরকার বাপেক্স, পেট্রোবাংলা, জিওলজিক্যাল সার্ভে অব বাংলাদেশ, ব্যুরো অব মিনারেল ডেভেলপমেন্ট ইত্যাদি প্রতিষ্ঠানগুলোকে পরিকল্পিতভাবে পঙ্গু করবার নীতি থেকে বের হয়ে আসা, বিপরীতে এগুলোকে শক্তিশালী করবার ব্যবস্থা গ্রহণ। একইসঙ্গে কোল বাংলা ধরণের এমন একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে হবে যেটি কয়লা সম্পদ অনুসন্ধান, উত্তোলন এবং তার কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করবে।

আমরাও মনে করি সিদ্ধান্তহীনতা ঠিক নয়। আমরা আশা করি জনগণের পক্ষে উপরোক্ত নীতিগত অবস্থান নিশ্চিত করে সবরকম দুষ্টপ্রভাব থেকে মুক্ত হয়ে সরকার অবিলম্বে ফুলবাড়ী কয়লা প্রকল্প বাতিল করবেন। এবং সব অপতৎপরতা বন্ধ করে ও এসবের জন্য ক্ষতিপূরণ আদায় করে বাংলাদেশ থেকে এশিয়া এনার্জির বহিষ্কার নিশ্চিত করবেন। আর এডিবিসহ সব আন্তর্জাতিক সংস্থার কাছে জনগণের এই বার্তা পৌঁছে দেবেন যে গণরায় হচ্ছে, বাংলাদেশের সম্পদ কোন কোম্পানির মুনাফার জন্য নয়, তা কেবল দেশের মানুষের স্বার্থে সর্বোত্তম ব্যবহারের জন্য। এব্যাপারে জনগণই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবেন। কোন লবিস্টদের তৎপরতা আমরা এখানে গ্রহণ করবো না।

জনস্বার্থ, জাতীয় স্বার্থ, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বার্থ, মাটি, পানি ও কৃষি রক্ষা, খনিজ সম্পদের উপর জনগণের সংবিধান স্বীকৃত মালিকানা এবং জ্বালানী নিরাপত্তা নিশ্চিত করবার প্রশ্নে সরকার যদি স্পষ্ট অবস্থান নেয় তবে তা আন্তর্জাতিক মহলের কাছে কোন ‘ভুল সংকেত’ দেবে না। বরঞ্চ বিদেশী বিনিয়োগকারীসহ আন্তর্জাতিক মহলে তা এই সঠিক সংকেত দেবে যে বাংলাদেশের মানুষের বোধশক্তি আছে, মেরুদণ্ড আছে, এখানে  বিনিয়োগের নামে ধ্বংস ও লুণ্ঠনের যে কোন প্রকল্প গছিয়ে দেয়া যাবে না।

আপনাদের সবাইকে ধন্যবাদ।