Friday, August 17th, 2007

ফুলবাড়ী দিবস ও কয়লা নীতি প্রসঙ্গে সাংবাদিক সম্মেলন

[গত ১৭ আগস্ট ফুলবাড়ী দিবস উপলক্ষে জাতীয় প্রেসক্লাবে জাতীয় কমিটির উদ্যোগে একটি সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন জাতীয় কমিটির আহ্বায়ক প্রকৌশলী শেখ মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ এবং মূল বক্তব্য উপস্থাপন করেন জাতীয় কমিটির সদস্য সচিব আনু মুহাম্মদ । সম্মেলনে উপস্থাপিত বক্তব্য নিচে দেয়া হলো।]

বাংলাদেশের মানুষ, বিশেষত দিনাজপুরের ফুলবাড়ী, বিরামপুর, পার্বতীপুর, নবাবগঞ্জ সহ ছয় থানার বাঙালী আদিবাসী নারী পুরুষ শিশু বৃদ্ধরা সম্মিলিতভাবে মানব ও পরিবেশ বিধ্বংসী এবং জনগণের সম্পদ লুণ্ঠনের জন্য প্রণীত জালিয়াতি ও অনিয়ম ভরা ফুলবাড়ী কয়লা প্রকল্প বিরোধীযে অবিস্মরণীয় জনপ্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন তার এক বছর পূর্তি হতে যাচ্ছে আগামী ২৬ আগস্ট, ২০০৭।

গত বছর এই দিনে এশিয়া এনার্জি নামে বৃটিশ-অস্ট্রেলিয়ান-জার্মান কোম্পানির মানব বিধ্বংসী এই প্রকল্প বাতিলের দাবীতে এবং এই অঞ্চলে ঘুষ, দুর্নীতি, প্রতারণা ও মিথ্যাচারে লিপ্ত এই কোম্পানির ফুলবাড়ীসহ বাংলাদেশ থেকে বহিষ্কারের দাবিতে প্রায় ৮০ হাজার মানুষ জমায়েত হয়েছিলেন, এশিয়া এনার্জির অফিস ঘেরাও কর্মসূচী, অফিস থেকে প্রায় এক কিলোমিটার দূরে। অবিলম্বে এশিয়া এনার্জির  দেশত্যাগের দাবী, প্রকল্প বাতিল এবং তাদের সামাজিক বয়কট কর্মসূচী দিয়ে শেষ হয়। জমায়েত শেষে সবাই যখন শান্তিপূর্ণভাবে ফেরত যাচ্ছেন সে সময়ই বিডিআর গুলিবর্ষণ করে। গুলিতে সঙ্গে সঙ্গে তিনজন কিশোর তরিকুল, আমিন ও সালেকিন শহীদ হন। আহত হন দুই শতাধিক যার মধ্যে গুলিবিদ্ধ হন আরও দশজন। তাদের মধ্যে তিনজনের অবস্থা ছিল গুরুতর।  এদের মধ্যে বাবলু রায় কদিন আগে হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফিরে গেছেন, তিনি এখন চিরস্থায়ী পঙ্গুত্বের শিকার। রবিউল ও আকছার নামে দুজন কিশোর সন্ত্রস্ত ও স্মৃতিভ্রষ্ট হয়ে কয়েক মাস দূর অঞ্চলে ছিলো। ঘটনাদৃষ্টে মনে হয় কোন কারণ ছাড়া এশিয়া এনার্জির প্রভাবিত সরকারি বাহিনীর গুলি করার উদ্দেশ্য ছিল, গুলি করে ভয় দেখিয়ে জনগণের আন্দোলন বন্ধ করা। কিন্তু যথারীতি তা হয়নি। জনগণ একবার যখন তাদের ভাষায় ‘বুকের মধ্যে’ কোন কিছু গ্রহণ করেন তখন দমন-পীড়ন করে তাকে স্তব্ধ করা যায় না।

২৬ আগস্ট অপরাহ্নে এই হত্যাকাণ্ডের পর বিডিআর পুলিশ ও সন্ত্রাসীরা পুরো এলাকায় ত্রাস সৃষ্টি করে। কিন্তু অস্ত্রের মুখেও নিরস্ত্র নারী শিশুরা প্রথম পাল্টা প্রতিরোধ সৃষ্টি করেন। ক্রমে তা গণঅভ্যুত্থানের রূপ নেয়। ছয় থানার লক্ষ লক্ষ মানুষ অবিস্মরণীয় ঐক্য ও সংহতি দিয়ে লাগাতার কর্মসূচী শুরু করেন। সারা বাংলাদেশের মানুষ এর সঙ্গে একাত্ম হয়ে নানা কর্মসূচী দিতে থাকলে এটি জাতীয় আন্দোলনের রূপ নেয়।

জনগণের এই প্রবল শক্তির মুখে সরকার মাথানত করতে বাধ্য হয় এবং ৩০ আগস্ট আন্দোলনকারী জনগণের সাথে চুক্তি স্বাক্ষর করে। এরপরই জনজীবন স্বাভাবিক হয়ে আসে।

৩০ আগস্ট স্বাক্ষরিত চুক্তি

স্বাক্ষরিত চুক্তিতে সরকারের স্পষ্ট অঙ্গীকার ছিল নিম্নরূপঃ

তেল, গ্যাস, খনিজ সম্পদ, বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষার জাতীয় কমিটির ফুলবাড়ী শাখা কর্তৃক উত্থাপিত ৬ (ছয়) দফা দাবী নিম্নোক্তভাবে বাস্তবায়ন করা হবে।

(ক) এশিয়া এনার্জির সাথে সকল চুক্তি বাতিল করে এশিয়া এনার্জিকে ফুলবাড়ীসহ ৪ থানা ও বাংলাদেশ থেকে প্রত্যাহার করা হবে। ফুলবাড়ীসহ ৪ থানা ও বাংলাদেশের কোন জায়গায় উন্মুক্ত মুখ খনন পদ্ধতিতে কয়লা খনি করা হবে না। অন্য কোন পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলন করতে হলে জনগণের সম্মতির ভিত্তিতে করতে হবে।

(খ) ২৬ আগস্ট, ২০০৬ ইং তারিখে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গুলিতে নিহতদের প্রত্যেক পরিবারকে ২,০০,০০০ (দুই লক্ষ) টাকা ক্ষতিপূরণ দেয়া হবে।

(গ) আহতদের ক্ষতিপূরণ এবং দোকান-পাট, হোটেল রেস্তোরাঁ, রিকশা, ভ্যান, মাইক, বাড়িঘর ভাংচুরে ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ প্রদানের লক্ষ্যে ৯,০০,০০০ (নয় লক্ষ) টাকা বরাদ্দ প্রদান করা হবে। উপজেলা নির্বাহী অফিসার, ফুলবাড়ী, দিনাজপুর, সহকারী পুলিশ সুপার, ফুলবাড়ী সার্কেল, সিভিল সার্জনের একজন প্রতিনিধি এবং তেল-গ্যাস, খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির ফুলবাড়ী শাখার দুইজন প্রতিনিধির সমন্বয়ে গঠিত কমিটির মাধ্যমে   ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিগ্রস্ততার পরিমাণ নিরূপণ পূর্বক ক্ষতিপূরণ দেয়া হবে।

(ঘ) ২৬ আগস্টের ঘটনায় গুলিতে নিহতদের বিষয়ে তদন্ত করে প্রতিবেদন দাখিলের জন্য অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে নিয়ে এক সদস্য বিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। উক্ত কমিটির তদন্ত প্রতিবেদন প্রাপ্তির পর এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

(ঙ) একজন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক, একজন সহকারী পুলিশ সুপার এবং তেল-গ্যাস, খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির ফুলবাড়ী শাখার দুই জন প্রতিনিধি সমন্বয়ে হত্যা করে গুম করা লাশ উদ্ধার বিষয়ে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে। এই কমিটি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ প্রাপ্তি সাপেক্ষে তদন্ত করে প্রতিবেদন দাখিল করবেন। প্রাপ্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।

(চ) নিহতদের নামে ফুলবাড়ীর নতুন ব্রীজের পাশে উপযুক্ত স্থানে সরকারী উদ্যোগে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হবে।

(ছ) এশিয়া এনার্জির চিহ্নিত দালালদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ সুপার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিবেন। কয়লাখনি বিরোধীআন্দোলনের সাথে জড়িত নেতৃবৃন্দের নামে দায়েরকৃত মামলা-জিডি, প্রত্যাহার করা হবে এবং এ বিষয়ে নতুন কোন মামলায় নেতৃবৃন্দকে জড়ানো হবে না।

এই চুক্তির খ ও ঘ পূর্ণ বাস্তবায়ন হয়েছে, ঙ এখন আর প্রাসঙ্গিক নেই। অন্য বিষয়গুলো এখনও পূর্ণ বাস্তবায়িত হয়নি। আমরা আশা করি  বর্তমান সরকার এগুলো বাস্তবায়নে যথাযথ উদ্যোগ গ্রহণ করবেন।

উন্মুক্ত মুখ খনন পদ্ধতির পক্ষে এশিয়া এনার্জির প্রচারণা

স¤প্রতি যখন সরকার গঠিত কয়লা নীতি পর্যালোচনা কমিটি দেশের কয়লা সম্পদ উত্তোলন ও ব্যবহার সংক্রান্ত নীতিমালা চূড়ান্ত করার জন্য কাজ করছে ঠিক তখন প্রত্যাখ্যাত কোম্পানি এশিয়া এনার্জি নতুন করে সংবাদ মাধ্যমের উপর নিজের প্রভাব সৃষ্টির জন্য নানা কর্মসূচী নিচ্ছে। সাংবাদিক ও কনসালট্যান্ট ক্রয়ের মাধ্যমে বিভ্রান্তি তৈরি তার বিশেষ লক্ষ্য। এরই অংশ হিসেবে কোম্পানি বাংলাদেশের সংবাদপত্র ও টিভি চ্যানেলের বেশ কয়েকজন সাংবাদিককে জার্মানীতে নিয়ে যায়। এর মধ্যে কেউ কেউ ফিরে সংবাদপত্রে ও টিভিতে জার্মানীর উন্মুক্ত খনন পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলন কতটা সফল ও কার্যকর এবং তা থেকে বাংলাদেশ কতভাবে শিক্ষা নিতে পারে সে বিষয়ে রিপোর্ট করছেন। স্পষ্টতই এসব রিপোর্ট এশিয়া এনার্জির ফুলবাড়ী কয়লা প্রকল্প সমর্থন করবার উদ্দেশ্যে নিয়োজিত। এসব রিপোর্টে এশিয়া এনার্জির সহযোগী জার্মানীর RHE কোম্পানির কর্মকর্তাদের ভাষ্যই কেবল নেয়া হয়েছে। ধারণা করা কঠিন নয় যে, এশিয়া এনার্জির প্রচারণার বিরুদ্ধে যাবে বলে এই উন্মুক্ত খনন পদ্ধতির বিরুদ্ধে জার্মানীর যেসব সংগঠন ও বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন করছেন তাদের কোন বক্তব্য এখানে নেয়া হয়নি।

জার্মানীর উন্মুক্ত খনন পদ্ধতি কী কী কারণে বাংলাদেশের সঙ্গে তুলনীয় নয় তা সংক্ষেপে নিম্নরূপঃ

(১) বাংলাদেশের মাটির গঠন, পানির গভীরতা, বৃষ্টি ও বন্যার ধরন সবকিছুই জার্মানী থেকে ভিন্ন এবং তা কোনভাবেই উন্মুক্ত খনন পদ্ধতির উপযোগী নয়।

(২) বাংলাদেশের জনবসতির ঘনত্ব জার্মানীর তুলনায় এতগুণ বেশী যে তা কোনভাবেই তুলনীয় হতে পারে না। জার্মানীতে যেমন এক অঞ্চলের মানুষদের সরিয়ে অন্যত্র নতুন জনবসতি স্থাপন করা যায় বাংলাদেশে তা কোনভাবেই সম্ভব নয়।

(৩) বাংলাদেশের নদ-নদী, খাল-বিল জালের মতো ছড়ানো যা জার্মানীতে নেই। এক জায়গায় দূষণ ঘটলে তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। বন্যায় যার তীব্রতা আরও বৃদ্ধি পায়। উন্মুক্ত খনন পদ্ধতিতে দূষণ তাই বাংলাদেশে যেভাবে ছড়াবে জার্মানীতে ততটা হয় না। ভূ-গর্ভস্থ পানি প্রত্যাহারের যে প্রয়োজন বাংলাদেশে আছে তাতে মরুকরণের যে বিস্তার ঘটবে জার্মানীতে তার সম্ভাবনা কম। মাটির গঠনের কারণে বাংলাদেশে মাটির ধ্বস যেভাবে ঘটে, জার্মানীতে তার সম্ভাবনা নেই। তারপরও জার্মানীতে এই খনির জন্য ২৪৪টি গ্রাম নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। পানি চিরদিনের জন্য টলটলে দেখালেও বিষাক্ত। তাহলে বাংলাদেশের কী অবস্থা ঘটতে পারে?

(৪) জার্মানীর যে কোম্পানি এই পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলন করছে তা জার্মান কোম্পানি। তারপরও ওখানে মালিকানা ঐ কোম্পানির হাতে কেন্দ্রীভূত নয়। বাংলাদেশে ফুলবাড়ী কয়লা প্রকল্পে সামান্য কিছু রয়্যালটির বিনিময়ে পুরো খনি তুলে দেয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল বিদেশী কোম্পানির হাতে।

(৫) জার্মানীতে উন্মুক্ত খনন পদ্ধতি ব্যবহার করে কয়লা উত্তোলন করা হয়েছিল অভ্যন্তরীণ বিপুল চাহিদা পূরণের তাগিদ থেকেই। কোম্পানির মুনাফার লক্ষ্যে বিদেশে রপ্তানির জন্য ক্রয় নয়, যেমনটি বাংলাদেশে প্রস্তাব করা হয়েছে। উল্ল্যেখ্য, জার্মানীর এই উন্মুক্ত খনন পদ্ধতি তারপরও প্রশ্নের ঊর্ধ্বে নয়। এর ক্ষয়-ক্ষতির তালিকা দীর্ঘ। জার্মান রাষ্ট্রের অনেক দক্ষ তত্ত্বাবধান ও পরিবেশ দূষণ রোধে ব্যয়বহুল ব্যবস্থা গ্রহণের পরও বিষাক্ত পানি, চাষের অনুপযোগী মাটির তথ্য এসব স্পনর্সড্ রিপোর্টে উল্ল্যেখ করা না হলেও সেসব তথ্য সুলভ।