Friday, January 4th, 2008

বিদ্যুৎ সংকট প্রসঙ্গে জাতীয় কমিটির বক্তব্য

[জাতীয় কমিটি কর্তৃক আয়োজিত ৪ জানুয়ারী ২০০৮ তারিখে সকাল ১০টায় জাতীয় প্রেসক্লাব এর ভিআইপি লাউঞ্জে কমিটির আহ্বায়ক প্রকৌশলী শেখ মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ-এর সভাপতিত্বে এবং বিভিন্ন গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং বিশেষজ্ঞ ব্যক্তিবর্গের উপস্থিতিতে নিম্নোক্ত প্রবন্ধটি উপস্থাপিত হয়। ভূমিকা পত্র উপস্থাপন করেন কমিটির আহবায়ক প্রকৌশলী শেখ মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ্ এবং মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন জাতীয় কমিটির সদস্য চট্রগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব এনার্জি টেকনোলজির পরিচালক এবং তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক বিভাগের ডীন অধ্যাপক এম. শামসুল আলম। প্রবন্ধের উপর উপস্থিত আলোচকবৃন্দ বিশেষজ্ঞ মতামত ব্যক্ত করেন।]

পূর্ব কথা

আধুনিক সভ্যতার চালিকাশক্তি প্রধানতঃ বিদ্যুৎ শক্তি। কৃষি উৎপাদনে ও বিশেষ করে শিল্প উৎপাদনে বিদ্যুৎ শক্তিই প্রধান ভিত্তি। মহামতি লেনিন তাই সার্বজনীন ও সুলভ বিদ্যুৎ শক্তির সঙ্গে সামজতন্ত্র রচনার সমীকরণ করেছিলেন। আমাদের দেশে গ্যাস সুলভ। তাই অনায়াসে আমরা বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রয়োজনের তুলনায় যথেষ্ট অগ্রগামী থাকতে পারতাম। কিন্তু ধনিক শ্রেণীর সরকারগুলির দুর্নীতি, অদক্ষতা, দলীয়করণ ও সাম্রাজ্যবাদী ষড়যন্ত্রের কাছে নতি স্বীকারের ফলে বিদ্যুৎ শক্তি উৎপাদনে আমরা একবারে ক্ষীনবল। পার্শ্ববতী দেশ ভারতের সমান জনপ্রতি বিদ্যুৎ উৎপাদন হার ধরলে আমাদের প্রয়োজন ১৫,০০০ মেগাওয়াট। আমদের কৃষি ও শিল্পের স্বচ্ছন্দ দাবি অনুযায়ী আমদের চাহিদাও প্রায় ১৫০০০ মেগাওয়াট। কিন্তু বর্তমান উৎপাদন প্রায় ৩,০০০ মেগাওয়াট যা শূন্যের কোঠার কাছাকাছি বলা যায়। ভবিষ্যতেও বিদ্যুৎ উৎপাদনে ঘাটতি মোকাবেলার জন্য সরকারের কার্যকরী উদ্যোগ অনুপস্থিত বিদ্যুৎ শক্তির এই দুরবস্থার সঙ্গে আমাদের অর্থনৈতিক উন্নয়ন, চরম দারিদ্রদশা প্রত্যক্ষভাবে সম্পর্কিত। কেন আমাদের এই অবস্থা? এক কথায়, মূল কারণ সাম্রাজ্যবাদ। তারা মুখে অনেক উন্নয়ন ও বিকাশের সম্ভাবনা ও সাহায্যের ফুলঝুড়ির কথা পৌণ:পুনিকভাবে জোর গলায় উচ্চারণ করলেও তারা দুর্বল ও দরিদ্র দেশগুলির উৎপাদন শক্তি ও সম্ভাবনার টুটি চেপে ধরে তাঁদের পণ্যের বাজারে পরিণত করতে চায়। সেই নীতিতে তারা বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রবল প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। তারা এইসব দেশে ধনিক শ্রেণীর সরকারগুলিকে দুর্নীতিগ্রস্ত করে, ভোগবাদের লালসায় উদ্দীপ্ত করে, ঘৃন্যভাবে লোভাতুর করে ও সাম্রাজ্যবাদের লুণ্ঠনকে অবারিত করার সুযোগ করে দেয়ার মাধ্যমে অর্থনৈতিকভাবে দেশগুলিকে ক্রীতদাসে পরিণত করে। আমদের দেশে তারা ঠিক সেই কাজটিই করেছে। স্বাধীনতার পর যতগুলি ধনিক শ্রেণীর সরকার মসনদে বসেছে সবাই সাম্রাজ্যবাদের ষড়যন্ত্রে বিদ্যুৎ উৎপাদনকে দাবিয়ে রেখেছে। উন্নত হতে দেয়নি। তাছাড়া সাম্রাজ্যবাদী শক্তি সরাসরি লুণ্ঠন করেছে বিদ্যুৎ, সার ও শিল্পে ব্যবহৃতব্য গ্যাস, অসম উৎপাদন বণ্টন চুক্তির মাধ্যমে। তাছাড়া, বহুজাতিক কোম্পানি অতি মুনাফার স্বার্থে অনভিজ্ঞ, অযোগ্য, অদক্ষ ও সর্বাধিক উৎকোচ প্রদানকারী কোম্পানির নিযুক্তির মাধ্যমে মাগুরছড়া ও ছাতকে আমাদের অমূল্য গ্যাস পুড়িয়ে ও এই গ্যাসের দ্বারা বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবহার থেকে আমাদের বঞ্চিত করেছে। আমাদের যে সামান্য গ্যাস সম্পদ ছিল তার মধ্যে বিবিয়ানা গ্যাস কূপ থেকে বছরে ৫০ কোটি ঘনফুট হারে ২০ বছরে ১,০০০ কোটি ঘনফুট গ্যাস পানির দরে বহুজাতিক কোম্পানি ইউনোক্যাল ভারতে পাচার করতে অতি তৎপর হয়েছিল। আমাদের জাতীয় কমিটি জনগণের সহযোগিতায় এই পাচার চক্রান্ত নস্যাৎ করেছে।

টাটা কোম্পানিকে আমাদের সামান্য গ্যাস সম্পদ উপহার দিয়ে তা থেকে সার বিদ্যুৎ উৎপাদন করে তা বিদেশে পাচার করার উদ্যোগ তথা গ্যাস সম্পদ পাচার করে বিদেশী বিনিয়োগের মহিমার আড়ালে আমাদের ফতুর করতে চেয়েছে। সেটাও জনগণের প্রতিরোধের কারণে এ যাবৎ সফল হতে পারেনি।

কয়লা দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়। যে ১,১০০ মিলিয়ন টন কয়লা প্রমাণিত রিজার্ভ আমাদের আছে তার থেকে আমরা ২৫/৩০ বছর বিদ্যুৎ পেতে পারি যদি সবটা আমাদের বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহৃত হয়। কিন্তু কয়লার অতি বৃহৎ অংশ বহুজাতিক কোম্পানির মাধ্যমে পাচার করার ষড়যন্ত্র চলছে। আমাদের কমিটির তৎপরতায় জনগণের আন্দোলনের ফলে বহুজাতিক কোম্পানির ষড়যন্ত্র থমকে গেছে। কিন্তু তারা এখনও হাল ছাড়েনি। আমাদের দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন করার যে জ্বালানী শক্তি আছে তা শুধু আমাদের উন্নতির কাজে ব্যবহার করব, বহুজাতিক কোম্পানির মুনাফার রসদ হতে দেব না। আমরা জানি, জনগণের ন্যায্য আন্দোলন সফল হবেই। লুণ্ঠনকারীরা পালাবেই।

বিদ্যুৎ খাতে দুরাবস্থা নিয়ে মূল প্রবন্ধের লেখক আমাদের জাতীয় কমিটির সদস্য ও চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের তড়িৎ ও ইলেক্ট্রনিক কৌশল বিভাগের ডীন, ইনস্টিটিউট অব এনার্জি’র পরিচালক অধ্যাপক ড.এম শামসুল আলম প্রচুর গবেষণা করে বহু তথ্যের সমাবেশ ঘটিয়েছেন ও সমস্যা উত্তরণের জন্য আমাদের দাবির কর্মসূচী দিয়েছেন। তাঁর গবেষণালব্ধ তথ্য থেকে আমাদের ধনিক শ্রেণীর সরকারগুলি দুর্নীতি, অযোগ্যতা, অদক্ষতা ও সাম্রাজ্যবাদের দাস হিসাবে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনাকে কিভাবে নষ্ট করেছেন তার চিত্র প্রষ্ফুটিত হয়েছে। আমরা যেখানে প্রতিবেশী দেশের তুলনায় এগিয়ে থাকতে পারতাম সেখানে আমরা কতখানি পিছিয়েছি তা দেখিয়েছেন।

সাম্রাজ্যবাদ যে কিভাবে আমাদের উন্নতির পথ রোধ করে দাঁড়ায় তার দু’টি দৃষ্টান্ত দেব।

১. আশির দশকের প্রথম দিকে আমাদের সরকার আরিচা-নগরবাড়ী পয়েন্টে যমুনা নদীর উপর বিদ্যুৎ পরিবহন ক্রসিং এর জন্য ৪০০০ ফুট স্প্যানx১১ অর্থাৎ প্রায় আট মাইল দীর্ঘ একটি বিদ্যুৎ সংযোগ প্রকল্প হাতে নেয়। তার প্রাক্কলিত  ব্যয় ছিল ১৪০কোটি টাকা। গ্যাসজাত বিদ্যুতের প্রতি ইউনিটে তখন গ্যাস জ্বালানীর খরচ মাত্র ১৬ পয়সা। ডিজেল বা ন্যাপথা বা ফার্নেস অয়েল চালিত বিদ্যুৎ কেন্দ্রে জ্বালানী বাবদ প্রতি ইউনিটে তখনকার ব্যয় পড়ত ১১০ পয়সা; অর্থাৎ গ্যাসের তুলনায় ৭ গুণ সবগুলি গ্যাসক্ষেত্র গঙ্গা-যমুনা নদীর পূবাঞ্চলে অবস্থিত, পশ্চিমাঞ্চলে নেই। যমুনা সেতু তখন নির্মিত হয়নি। অতএব গ্যাস পশ্চিমাঞ্চলে যেতে পারেনি। তাই সরকার সিদ্ধান্ত নেয় পশ্চিমাঞ্চলে আর কোনও বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র নির্মাণ করবে না। পূর্বাঞ্চলের উৎপাদন থেকে ৫৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উপরোক্ত বিদ্যুৎ লাইন সংযোগ প্রকল্পের মাধ্যমে পশ্চিমাঞ্চলে পৌঁছাবে। গ্যাস ও তেল এর জ্বালানী ব্যায়ে বিরাট পার্থক্যের দরুণ এই সংযোগ প্রকল্পের জন্য ১৪০ কোটি টাকা ব্যয় মাত্র দুই বছরে উঠে যেত। বিনিয়োগের রিটার্ন এত উচ্চহারে অবিশ্বাস্য। এত লাভজনক প্রকল্পেও বিশ্ব ব্যাংক, এডিবি ঋণ দানে অসম্মত হয়। শেষ পর্যন্ত কুয়েত সরকারের ফান্ডে এই সংযোগ প্রকল্প নির্মাণ সম্ভব হয়। এই হল উন্নয়ন সহযোগীর ও দারিদ্র উপশমকারীর দাবিদার সাম্রাজ্যবাদের চরিত্র!!

২.স্বাধীনতার পর বিদ্যুৎ উৎপাদনে সোভিয়েত ইউনিয়ন আমাদের দেশে যে অবদান রেখেছিল তা কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণীয়। সোভিয়েত ইউনিয়ন ঘোড়াশাল তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্রে ১৮ বছর ধরে একে ২x৫৫ মেগাওয়াট ৪x২১০ মেগাওয়াট = ৬টি বিদ্যুৎ কেন্দ্র (মোট ৯৫০ মেগাওয়াট) স্থাপন করে। কোন বৈদেশিক মুদ্রা লাগেনি, সম্পূর্ণ বার্টার পদ্ধতিতে মূল্য পরিশোধ করা হয়। অর্থাৎ পাট, চামড়া, চা ইত্যাদি বিনিময়ে এ কেন্দ্রগুলি নির্মিত হয়। সোভিয়েত ইউনিয়ন এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলো সরকারকে ঋণ দেয়। সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলির বিভিন্ন কোম্পানী কর্তৃক আশুগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সরকারের অধীনে বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপিত হয়। ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদনে দেশে যথেষ্ট অগ্রগতি হয়। নব্বই দশকে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে যাওয়ার পর একদিকে তাদের অবদান থেকে দেশ বঞ্চিত হয়, অন্যদিকে বিশ্বব্যংক, এডিবি সরকারকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করার জন্য ঋণ দান বন্ধ করে দেয় এবং শুধুমাত্র তাদের বিদেশী বহুজাতিক কোম্পানিকে সরাসরি ঋণ বা সাহায্য দান করার নীতি গ্রহণ করে। ফলে বহুজাতিক কোম্পানিগুলি তাদের উচ্চ মুনাফা নিশ্চিত করার জন্য সরকারকে চাপে রাখে। এরপর থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের অগ্রগতিতে ভয়াবহ ভাটা পড়ে। বর্তমান বিদ্যুৎখাতের দুরাবস্থার জন্য সাম্রাজ্যবাদের ষড়যন্ত্র ও নিয়ন্ত্রণ ও দেশের ধনিক শ্রেণীর সরকারগুলির আজ্ঞাবহ অবদানই দায়ী।

 

প্রকৌশলী শেখ মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ

আহবায়ক

তেল-গ্যাস, খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটি