Friday, February 13th, 2009

বহুজাতিক কোম্পানির স্বার্থে সাগরের গ্যাসব্লক ইজারা দানের চলতি চক্রান্ত, ফুলবাড়ী উন্মুক্ত কয়লাখনির পুরাতন চক্রান্ত রুখে দাঁড়ান, বাংলাদেশের সম্পদ দেশের কাজেই লাগাতে হবে

দুই বছরের অনির্বাচিত সরকারের পর বিপুল ভোটে বর্তমান সরকার নির্বাচিত হয়েছে। জাতীয় সম্পদের উপর জনগণের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা, সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার, জ্বালানী নিরাপত্তা নিশ্চিত করবার জন্য বর্তমান নির্বাচিত সরকার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেবেন এটাই জনগণের প্রত্যাশা। কিন্তু অতীতে দেশের সম্পদ লুণ্ঠন-পাচার ও অন্যান্য অনুরূপ তৎপরতার দরুণ অভিযুক্ত সাবেক জ্বালানী সচিব ড. তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরীকে জ্বালানী মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টার দায়িত্ব দেয়ায় মন্ত্রণালয়ে তাঁর অতীতের ন্যায় তৎপরতায় দ্রুত লিপ্ত হওয়ায় দেশবাসী ভীষণ উৎকণ্ঠিত।

আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী সীমা নির্ধারণ গত সরকারগুলির অমার্জনীয় অবহেলার দরুণ বাংলাদেশের সমুদ্র নানাভাবে অরক্ষিত। যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তা রিচার্ড বাউচারের সা¤প্রতিক ঘোষণা থেকে স্পষ্ট যে, নিরাপত্তার কথা বলে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ এখন সমুদ্রসীমার মধ্যে স্থায়ীভাবে অবস্থান গ্রহণ করতে চাচ্ছে। কিন্তু এই সমুদ্র বাংলাদেশের সাথে বিশ্বের নানা দেশের যোগাযোগ মাধ্যম, এই সমুদ্র বিপুল জানা অজানা সম্পদের আধার। গত অনির্বাচিত সরকার সমুদ্র এলাকার ২৮টি ব্লকের মধ্যে ৯টি ব্লকে তেল-গ্যাস পাচারের জন্য তুলে দেয়ার চেষ্টা চালায় কিন্তু তীব্র প্রতিবাদের মুখে ব্যর্থ হয়।

সমৃদ্ধ ফুলবাড়ী কয়লা খনি অনভিজ্ঞ বিদেশী কোম্পানি এশিয়া এনার্জিকে দেওয়ার অপচেষ্টা হয়েছিল। জনগণের প্রতিরোধের কারণে অপচেষ্টা ব্যর্থ হলেও চক্রান্ত এখনও শেষ হয়নি। ঐ প্রতিরোধের চূড়ান্ত পর্যায়ে ২০০৬ সালের ৩০ আগস্ট তৎকালীন সরকার জনগণের সঙ্গে ৬ দফা একটি চুক্তি করেছিল এবং তৎকালীন বিরোধী দলীয় নেত্রী বর্তমান ক্ষমতাসীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই চুক্তির প্রতি পূর্ণ সমর্থন ব্যক্ত করেন ও দ্রুত বাস্তবায়নের দাবী জানান। কিন্তু সেই চুক্তি এখনও পূর্ণ বাস্তবায়ন হয়নি, চুক্তি অনুযায়ী যেই এশিয়া এনার্জি (জিসিএম) বহিষ্কৃত হবার কথা সেটি এখনও দেশে-বিদেশে নানা দুর্নীতি ও অপরাধমূলক তৎপরতায় লিপ্ত আছে।

বর্তমান অবস্থা থেকে মুক্তির লক্ষে জ্বালানী ও বিদ্যুৎ সংক্রান্ত যথাযথ নীতিমালা প্রণয়ন ও দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য বর্তমান সরকারের কাছে আমরা জনগণের পক্ষ থেকে নিম্নোক্ত দাবীনামা উপস্থিত করছি:

ক. মালিকানার ও কর্তৃত্বের প্রশ্ন

১. খনিজ সম্পদের মালিক জনগণ। সংবিধানের এই সিদ্ধান্ত লঙ্ঘন করে গত সরকারগুলি বিভিন্ন বিদেশী কোম্পানির হাতে এই সম্পদ তুলে দিয়েছে, দেবার চেষ্টা করছে। এই পরিস্থিতির অবসান ঘটিয়ে সম্পদের শতভাগ মালিকানা অবশ্যই জনগণের থাকতে হবে।

২. পূর্বে সম্পাদিত জাতীয় স্বার্থবিরোধী জ্বালানী সম্পদের চুক্তিগুলি প্রকাশ করে একটি দেশপ্রেমিক বিশেষজ্ঞ দলের মাধ্যমে পর্যালোচনা করতে হবে ও জাতীয় স্বার্থবিরোধী সকল চুক্তি অবিলম্বে বাতিল করতে হবে।

৩. গ্যাস বা কয়লা বা তদজাত পণ্য রপ্তানি আইন করে নিষিদ্ধ করতে হবে।

খ. ক্ষতিপূরণ আদায় ও অনিয়মের শাস্তি

৪. মাগুরছড়া ও টেংরাটিলার জন্য প্রাপ্য ক্ষতিপূরণ শেভ্রন এবং নাইকোর কাছ থেকে আদায় করতে হবে।

৫. নাইকোর সঙ্গে যে দুর্নীতিমূলক চুক্তির দায়ে সাবেক দুই প্রধানমন্ত্রীকে বিচারের সম্মুখীন করা হয়েছে তাতে নাইকোর ছাড় দেয়া চলবে না।

৬. কেয়ার্ন এনার্জি সাঙ্গু গ্যাসক্ষেত্রে মিথ্যা তথ্য দিয়ে দেশের ভয়াবহ আর্থিক ক্ষতি করেছে যার জন্য কেয়ার্ন এনার্জি এবং সংশ্লিষ্ট দেশী ব্যক্তিসমূহের শাস্তি দিতে হবে, ক্ষতিপূরণ আদায় করতে হবে।

৭. বাংলাদেশের আবিষ্কৃত জালালাবাদ গ্যাসফিল্ড শেভ্রনের হাতে তুলে দিয়ে তার অসঙ্গত লাভের আয়োজন করা হয়েছে আবার সংযুক্ত আরেকটি গ্যাসফিল্ডও তাদের দেয়া হয়েছে। এর সাথে জড়িতদের শাস্তি দান ও ক্ষতিপূরণ আদায় করতে হবে।

গ. সমুদ্রসীমা ও সমুদ্র সম্পদ

৮. সমুদ্রসীমা যথাযথভাবে নির্ধারণ ও তার উপর বাংলাদেশের অধিকার ও কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে হবে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে। “সমুদ্র মন্ত্রণালয় বা অধিদপ্তর” প্রতিষ্ঠা করতে হবে। রপ্তানিমুখি পিএসসি মডেল বাতিল করতে হবে। সমুদ্রে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে দক্ষতা তৈরির জন্য সব ব্লকে বাপেক্সকে বাধ্যতামূলকভাবে প্রধান হিসেবে যুক্ত রাখতে হবে।

ঘ. কয়লা সম্পদ রক্ষা ও তার সর্বোত্তম ব্যবহার

৯. বড়পুকুরিয়া খনি পরিচালনায় অনিয়ম ও দুর্নীতি দূর করতে হবে। খনির কারণে সৃষ্ট ভূমিধ্বস দূর করবার জন্য বালু ভরাট করতে হবে, অন্যান্য ক্ষতিপূরণ পূর্ণভাবে দিতে হবে।

১০. এশিয়া এনার্জি (জিসিএম)কে বহিষ্কার ও উন্মুক্ত খনন পদ্ধতি নিষিদ্ধ করতে হবে। জনগণের সাথে সম্পাদিত ৬ দফা চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়ন করতে হবে। উন্মুক্ত খনন পদ্ধতির ভয়ঙ্কর পরিণতি সবাই জানা সত্ত্বেও পরীক্ষামূলক খনন করে অনর্থক অর্থ অপচয় ও জনগণের দুর্দশা ঘটানো কর্মসূচী রদ করতে হবে।

ঙ. জাতীয় সক্ষমতার প্রশ্ন

১১. জাতীয় সম্পদের উপর জাতীয় কর্তৃত্ব নিশ্চিত করবার জন্য জাতীয় প্রতিষ্ঠানের বিকাশ ঘটাতে হবে। এজন্য বাপেক্স, পেট্রোবাংলা, জিওলজিক্যাল সার্ভে ও ব্যুরো অব মিনারেল ডেভেলপমেন্ট এর যথাযথ উন্নয়ন এবং অবিলম্বে প্রস্তাবিত “খনি বাংলা” প্রতিষ্ঠা করে তাকে কার্যকর করতে হবে। খনিজ সম্পদ উন্নয়ন ও তার সর্বোত্তম ব্যবহারে শিক্ষাদান ও গবেষণা কাজ চালু করতে হবে।

চ. বিদ্যু

১২. বিদ্যুৎকে গণপণ্য হিসেবে বিবেচনা করে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে, এবং সম্পূরক হিসেবে বেসরকারি দেশীয় মালিকানায় বিদ্যুৎ প্ল্যান্ট স্থাপনের নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে। এক্ষেত্রে বেশী দামে বিদ্যুৎ কেনার ও বিদ্যুৎ খাতকে বহুজাতিক কোম্পানির হাতে জিম্মি করবার বিদ্যমান নীতি, চুক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা থেকে দেশকে সম্পূর্ণ মুক্ত করতে হবে। সকল দুর্নীতি উৎপাটন করতে হবে।

ছ. বিচার

১৩. তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরীসহ যেসব মন্ত্রী, আমলা, কনসালট্যান্ট ও ব্যবসায়ী জাতীয় সম্পদ লুণ্ঠন ও পাচার করার অপচেষ্টায় যুক্ত ছিলেন তাদের বিচারের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।

আমরা সরকারের অভ্যন্তরে আর দেশী বিদেশী কোম্পানির লবিস্ট ও কমিশনভোগীদের দেখতে চাই না। আমরা আর এরকম পরিবেশ মন্ত্রণালয় চাই না যে মন্ত্রণালয় পরিবেশ বিধ্বংসী তৎপরতাকে সহযোগিতা করে, আমরা এরকম জ্বালানী মন্ত্রণালয় চাই না যারা দেশের সম্পদ বহুজাতিক কোম্পানির হাতে তুলে দেয়ার জন্য সর্বশক্তি নিয়োগ করে কিংবা তাদেরই মুখপাত্র হিসেবে কাজ করতে চেষ্টা করে।

 

[১৯ ফেব্রুয়ারি ২০০৯, বিকাল তটায় তেল-গ্যাস, খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটি আয়োজিত ঢাকার মুক্তাঙ্গনের জনসভায় পঠিত]