Monday, August 1st, 2011

স্থলভাগের গ্যাসব্লকে আবারো বিদেশি কোম্পানি

দেশের স্থলভাগ ও অগভীর সমুদ্রের মোট ৩১টি ব্লক বিদেশি প্রতিষ্ঠানের কাছে ইজারা দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। ৬ এপ্রিল, ২০১১ সচিবালয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত এক আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠকে এ নিয়ে প্রথম সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। স্থলভাগে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে উচ্চ আদালতের নিষেধাজ্ঞা থাকায় এতদিন এ ব্লকগুলো ইজারা দেয়া যায়নি। সাবেক অর্থ সচিব শাহ আবদুল হান্নান ২০০১ সালে আদালতে একটি রিট করেন। বিদেশি প্রতিষ্ঠানের কাছে তিনি স্থলভাগের কোনো তেল-গ্যাস ব্লক ইজারা না দেয়ার আদেশ চান আদালতের কাছে। আদালত তার পক্ষে রায় দেন। এ ধরনের চুক্তির ক্ষেত্রে জাতীয় নীতিমালা প্রণয়নে সরকারের ওপর আদালত নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিলেন। উচ্চ আদালতের এই আদেশের কারণে গত আট বছর স্থলভাগের কোনো ব্লক বিদেশি প্রতিষ্ঠানের কাছে ইজারা দিয়ে উৎপাদন বণ্টন চুক্তি করা যায়নি।

বিচারপতি এম আনোয়ারুল হক এবং বিচারপতি এইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরী সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ ২৮ জানুয়ারি, ২০১১ রিটটি খারিজ করে এক রায় দেন। এই রায়ের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, রিট আবেদনকারীরা যেসব যুক্তি তুলে ধরেছেন, তা অনুমাননির্ভর। সুতরাং অনুমাননির্ভরের ওপর ভিত্তি করে আদালতের কোনো রকম বিচারিক হস্তক্ষেপ করার অবকাশ নেই।

উচ্চ আদালত এই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে নেয়ার ফলে এখন স্থলভাগের ব্লক ইজারার আয়োজনে পুরোদমে নেমে পড়েছে সরকারের জ্বালানি সংশ্লিষ্ট মহল। ইতোমধ্যে স্থলভাগে বিদেশিদের দিয়ে গ্যাস অনুসন্ধান করতে সরকারি নীতিগত সিদ্ধান্তের কাজটি সম্পন্ন করেছেন তারা। এ লক্ষ্যে দরপত্র আহ্বানের আয়োজন করতে মে মাসেই পেট্রোবাংলাকে মন্ত্রণালয় থেকে চিঠি পাঠানো হয়। চিঠিতে জুন মাসের মধ্যে বিদেশি প্রতিষ্ঠান ডেকে এখানে কাজ করার আহ্বান করার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের কথা বলা হয়েছে।

জ্বালানি মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, পেট্রোবাংলা এ বিষয়ে তাদের মতামত ইতোমধ্যে মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়ে দিয়েছে। ওই সূত্র নিশ্চিত করে, সব কিছু মিলিয়ে বিডিং হতে আরো কয়েক মাস সময় লেগে যেতে পারে। মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, জ্বালানি সংশ্লিষ্ট সরকারের উচ্চপদস্থ কয়েকজন আগে থেকেই স্থলভাগের গ্যাসব্লকগুলো বিদেশিদের কাছে ইজারা দেয়ার পক্ষে। এ প্রক্রিয়ার পুরোটা দেখাশোনা করছেন প্রধানমন্ত্রীর জ্বালানি উপদেষ্টা তৌফিক-ই-এলাহী চৌধুরী। এ বিষয়ে পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান অধ্যাপক হোসেন মনসুরের কাছে জানতে চাইলে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

জানা গেছে, স্থলভাগের যেসব ব্লকে গ্যাসক্ষেত্র আছে সেখানে রিং ফেস (গ্যাস তোলার জন্য নির্দিষ্ট স্থান) বাদ দিয়ে পুরো এলাকার জন্য দরপত্র আহ্বান করা হবে। এছাড়া সুন্দরবন জাতিসংঘ ঘোষিত সংরক্ষিত বনাঞ্চল বলে সেখানে কোনো গ্যাস অনুসন্ধান করা হবে না। স্থলভাগের সঙ্গে অগভীর সমুদ্রেরও কয়েকটি ব্লক বিদেশিদের দেয়া হবে।

সূত্র জানায়, স্থলভাগের ২৩টি এবং অগভীর সমুদ্রের ৮টি মোট ৩১টি ব্লকের জন্য আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা হতে পারে। তবে স্থলভাগের কম ঝুঁকিপূর্ণ কয়েকটি ক্ষেত্র দেশীয় প্রতিষ্ঠান বাপেক্সের জন্য রাখা হতে পারে। এর মধ্যে ৮ ও ১১ নম্বর ব্লক বাপেক্সের জন্য আগে থেকেই রাখা হয়েছে। স্থলভাগের ব্লকগুলোর মধ্যে বাপেক্সকে নতুন করে সম্পূর্ণ চারটি ব্লক দেয়া হতে পারে। এগুলো হলো ৩এ, ৩বি, ৬এ এবং ৬বি। এছাড়া সুন্দলপুরসহ অন্য ব্লকে সম্ভাবনাময় অন্তত ২০টি স্থান বাপেক্সকে দেয়া হতে পারে।

স্থলভাগের ৯, ১২, ১৩ ও ১৪ নম্বর ব্লকে এখন বিদেশি প্রতিষ্ঠান গ্যাস তুলছে। এর বাইরে স্থলভাগের ১৬টি ব্লকে এখনো কোনো অনুসন্ধান কাজ করা হয়নি। এগুলো হচ্ছে ১, ২ক, ২খ, ৩ক, ৩খ, ৪ক, ৪খ, ৫, ৬ক, ৬খ, ১৫ক, ১৫খ, ২২ক, ২২খ, ২২গ এবং ২৩ নম্বর ব্লক। এর মধ্যে ১৫ ও ২২ নম্বর ব্লক পার্বত্যাঞ্চলে অবস্থিত। অন্যগুলো দেশের পুরো উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল জুড়ে।

উত্তর পশ্চিমের ১০টি ব্লকের মধ্যে কয়েকটিতে, বিশেষ করে ৩, ৪ ও ৫ নম্বর ব্লকে দ্রুতই দ্বিমাত্রিক জরিপ করার পক্ষে জ্বালানি মন্ত্রণালয়। কোন কোন এলাকায় এই জরিপ করা হবে তা এখনো ঠিক করা হয়নি। কুষ্টিয়া, পাবনা, নাটোর, রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁ, বগুড়া, জয়পুরহাট, রংপুর, দিনাজপুর, লালমনিরহাট, ঠাকুরগাঁও, চুয়াডাঙ্গা, ঝিনাইদহ, মাগুরা, যশোর, নড়াইল, সাতক্ষীরা, খুলনা ও পঞ্চগড় জেলায় এসব ব্লকের অবস্থান। এগুলোতে এখনো কোনো অনুসন্ধান হয়নি। অনুসন্ধান না করা অন্য ৫টি ব্লক পাবর্ত্য চট্টগ্রামে। এগুলো হচ্ছে ২২ এর ক, খ ও গ এবং ১৫ এর ক ও খ। সরকারের জ্বালানি মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা অল্প সময়ের মধ্যে এসব ব্লকে অুসন্ধানের জন্য বিদেশি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর অংশগ্রহণে দরপত্র আহ্বানের চেষ্টা চালাচ্ছেন।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক জ্বালানি উপদেষ্টা ম তামিম সরকারের এ সিদ্ধান্তের সমর্থন জানিয়ে বলেন, ‘স্থলভাগের ব্লকগুলো আমরা বাপেক্সের জন্য রেখে দিতে পারি। বাপেক্স এগুলোতে কাজ করতে পারবে। কিন্তু এটা বিশাল সময়সাপেক্ষ। বাপেক্সের যে লোকবল এবং সামর্থ্য, এর পুরোটা কাজে লাগিয়েও আগামী ৩-৪ বছরে তারা নতুন কোনো কাজে হাত দিতে পারবে না। আর পুরো স্থলভাগের কাজ বাপেক্সকে দিয়ে করাতে চাইলে তা তো দশকের পর দশকের ব্যাপার। এমনকি শতকও লাগতে পারে। আমাদের এখন গ্যাস সঙ্কট আছে। বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলো সামর্থ্য, প্রযুক্তি, অর্থ সব দিক থেকেই বাপেক্সের চেয়ে এগিয়ে। তাই আমাদের নিজেদের স্বার্থেই উচিত বাপেক্সের জন্য কিছু ক্ষেত্র বরাদ্দ রেখে অন্য ক্ষেত্রগুলো ছেড়ে দেয়া। তাছাড়া স্থলভাগের ব্লকগুলোর মধ্যে পার্বত্য অঞ্চলের মতো অনেক জায়গাতেই খনিজ সম্পদ অনুসন্ধান বা উত্তোলন করার মতো ক্ষমতা বাপেক্সের নেই। ওই এলাকায় আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান দিয়ে অনুসন্ধানের কাজ করা যেতে পারে। পার্বত্য এলাকার ভূ-গঠন উচ্চভাঁজ হওয়ায় সেখানে কাজ করা কঠিন ও ঝুঁকিপূর্ণ। তাই স্থলভাগে বিদেশিদের ডাকা যাবে না এটা অযৌক্তিকও বটে।’

সরকারের এই সিদ্ধান্ত নিয়ে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্থলভাগে আর কোনো বিদেশি প্রতিষ্ঠান আনা ঠিক হবে না। কারণ সময় বেশি লাগলেও বাপেক্সকে দিয়েই এই কাজ করানো উচিত। বাপেক্সকে দিয়ে গ্যাস অনুসন্ধান করালে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে। বিদেশিদের দিয়ে কাজ করালেই যে দ্রুত সে কাজ শেষ হবে তারও কোনো নিশ্চয়তা নেই। কারণ তারা ব্লক নিজেদের আয়ত্তে নিয়ে কাজ করে না, এমন অনেক নজিরও আছে। তাছাড়া বিদেশি প্রতিষ্ঠান আনলে দেশের গ্যাস দেশের মানুষ ভোগ করতে পারবে না। আমাদের গ্যাস আমাদেরকেই কিনে নিতে হবে। তারা মনে করেন, দেশীয় প্রতিষ্ঠানকে আরো দক্ষ ও যোগ্য করে স্থলভাগে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে যাওয়া উচিত। বর্তমানে বাপেক্সকে উন্নত করার নানা চেষ্টাও চলছে। বিশেষজ্ঞরা প্রশ্ন তুলেছেন, যদি গ্যাস ব্লকগুলো সব বিদেশি বহুজাতিকদেরই দিয়ে দেয়া হয় তাহলে বাপেক্সের উন্নতির কী অর্থ থাকে।

জ্বালানি মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, শেলওয়েল নামের একটি প্রতিষ্ঠানের কাছে ১৯৮৬ সালে ২২ ও ২৩ নম্বর ব্লকের ইজারা দেয় সরকার। দীর্ঘ ৬ বছর কোনো কাজ না করে ১৯৯১ সালে প্রতিষ্ঠানটি চলে যায়। পরবর্তীতে ১৯৯৫ সালে ইউনাইটেড মেরিডিয়ানের কাছে ২২ নম্বর ব্লক ইজারা দেয়া হয়। কিন্তু ইউনাইটেড মেরিডিয়ান ইজারা নেয়ার ৫ বছরের মাথায় ২০০০ সালে ২২ নম্বর ব্লকটি ওমান এনার্জির কাছে হস্তান্তর করে চলে যায়। ২০০৪ সালে ওমান এনার্জিও গ্যাস ব্লকটিতে কোনো কাজ না করে চলে যায়। ২২ নম্বর ব্লকের মতোই অন্য ব্লকগুলোরও একই অবস্থা। সূত্রমতে, কেয়ার্ন ৫ নম্বর ব্লকের কাজ ছেড়ে দিয়ে চলে গেছে। ১০ নম্বর ব্লক তাদের দেয়া হয়েছিল যার সময়ও শেষ হয়ে গেছে। ১৯৯৩-৯৪ সালে ওকল্যান্ড এবং রেক্সউডের কাছে বঙ্গোপসাগরের কক্সবাজার সংলগ্ন ১৭ ও ১৮ নম্বর ব্লক ইজারা দেয়া হয়। কিন্তু তারা কোনো অনুসন্ধান কাজ করেনি। একই সঙ্গে দেশের পার্বত্যাঞ্চলের ২২ নম্বর ব্লক ইউএমসিকে ইজারা দেয়া হলেও তারা কোনো অনুসন্ধান কাজ করেনি।

পেট্রোবাংলার হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে ১৮টি ক্ষেত্র থেকে দৈনিক গড়ে দুই হাজার মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উত্তোলিত হয়। উত্তোলিত মোট গ্যাসের শতকরা ৫০ শতাংশের বেশি আসে বিদেশি কোম্পানির কর্তৃত্বে থাকা পাঁচটি ক্ষেত্র থেকে। বর্তমানে সিলেট অঞ্চলে ১২, ১৩ ও ১৪ নম্বর ব্লক শেভরন, ১৭ ও ১৮ নম্বরে টোটাল এবং ৯ নম্বর ব্লক তাল্লোর কাছে ইজারা দেয়া আছে। দীর্ঘদিন পর ১৭ ও ১৮ নম্বর ব্লকে জরিপ কাজ শুরু হয়েছে। এর আগে ১১ ও ১২ নং ব্লকে কোনো কাজ না করে ছেড়ে দেয় শেভরন। ১৯৯৮ সালে ৭ নং ব্লকের গ্যাস অনুসন্ধানের চুক্তি করা হলেও ২০১০ এর ফেব্রুয়ারিতে তারা সেখানে দ্বিমাত্রিক সিসমিক সার্ভে শুরু করে। কেয়ার্ন কাজ করেছিল সমুদ্রবক্ষের ১৬ নম্বর ব্লকের সাঙ্গু, মগনামা ও হাতিয়া গ্যাসক্ষেত্রে। সাঙ্গু গ্যাসক্ষেত্রটি তাদের অদক্ষতার কারণে অকালে শেষ হয়ে গেছে। গত বছর কেয়ার্ন তার অংশ অস্ট্রেলীয় প্রতিষ্ঠান স্যান্টোসের কাছে বিক্রি করে চলে যায়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলো আমাদের অনেক পিছিয়ে দিয়েছে। ৮০ ভাগ মালিকানা দিয়ে বিদেশি কোম্পানিগুলোকে গ্যাসক্ষেত্র ইজারা দেয়া হলেও তারা সময়মতো গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলন কার্যক্রম চালায়নি। ২২, ২৩, ১৭, ১৮, ১০, ৭ ও ৫ নম্বর ব্লকগুলোর মধ্যে অতিসম্প্রতি কেবল ৭ নং ব্লকে কাজ শুরু হলেও ১৯৯৩ ও ১৯৯৭ সালে ইজারা দেয়ার পর বহু বছর পার হয়ে গেলেও বাংলাদেশ আজো জানতে পারেনি ব্লকগুলোর মজুদ কত! কারণ কেয়ার্ন, ইউনিকল, ইউনাইটেড মেরিডিয়ান, ওমান এনার্জি, শেলওয়েল, ওকল্যান্ড, রেক্সউডের মতো কোম্পানিগুলোর কাছে ব্লকগুলো কেবল হাত বদল হয়েছে, কোনো কাজই হয়নি।

ঢাকা বিশ্ববিদালয়ের ভূ-তত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক আফতাবুল আলম বলেন, ‘গ্যাসের চরম সঙ্কটের প্রেক্ষিতেও বিদেশি বহুজাতিকদের দিয়ে গ্যাস তোলার কাজ করানো যায়নি। আগের পিএসসি চুক্তিতে গ্যাসের যে সর্বোচ্চ দাম বেঁধে দেয়া আছে তা আরো বাড়ানো এবং তৃতীয় পক্ষের কাছে গ্যাস বিক্রির অনুমোদন দেয়া হলেই কেবল তারা কাজ করতে আগ্রহী। যেমন ১৯৯৭ এর মডেল পিএসসি অনুসারে বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলো প্রতি হাজার ঘনফুট গ্যাস পেট্রোবাংলার কাছে সর্বোচ্চ ৩.৩৮ ডলার বা ২৩৬ টাকা দরে বিক্রি করবে। এবং কোনোক্রমেই পেট্রোবাংলা ছাড়া তৃতীয় পক্ষের কাছে গ্যাস বিক্রি করতে পারবে না। বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, নতুন পিএসসির ফলে পেট্রাবাংলার কাছে বিক্রি করা গ্যাসের সর্বোচ্চ দাম বেড়ে যাবে এবং তৃতীয় পক্ষের কাছে গ্যাস বিক্রির অনুমোদনও তাতে থাকতে পারে। উল্লেখ্য, মডেল পিএসসি ২০০৮ এ গ্যাসের সর্বোচ্চ দাম ১৯৯৭ এর পিএসসির ১৪০ ডলার থেকে বাড়িয়ে করা হয়েছিল ১৮০ ডলার। ইতোমধ্যে স্যান্টোসকে তৃতীয় পক্ষের কাছে গ্যাস বিক্রির অনুমোদন দেয়া হয়ছে। নতুন করে আসা বহুজাতিকরা এ সুবিধা চাইবেই। এর ফলে আগামীতে পেট্রোবাংলাকে হয় আরো উচ্চমূল্যে গ্যাস কিনতে হবে অথবা গ্যাসের অভাবে রাষ্ট্রীয় বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র ও সার কারখানাগুলোকে বন্ধ করে রাখতে হবে! এভাবেই একের পর এক আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত নিয়ে ধ্বংস হয়ে যাব আমরা।’

স্থলভাগের গ্যাসক্ষেত্র নতুন করে ইজারার প্রসঙ্গে অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আবু আহমেদ বলেন, ‘বর্তমান সরকার যেভাবে একের পর এক আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে চলেছে তাতে আমি আগেই আশঙ্কা করেছি আমাদের গ্যাস সম্পদের বাকিটাও হয়ত বিদেশি প্রতিষ্ঠানের দখলে চলে যাবে। অতীতে যেসব উৎপাদন বণ্টন চুক্তি বা পিএসসি সই হয়েছে, সেগুলোতে বিদেশি বহুজাতিকদের বিনিয়োগ ব্যয়ের বিষয়টি নির্ধারিত করা যায়নি। ওদের বিনিয়োগ ব্যয় তো হাতির খোরাক। এটা কখনও শেষ হওয়ার নয়। ওই ব্যয় তদারক করার জন্য পেট্রোবাংলার একটা জয়েন্ট কমিটি আছে বটে, তবে সত্য হলো মার্কিন প্রতিষ্ঠান শেভরন, ব্রিটিশ প্রতিষ্ঠান কেয়ার্ন ও আইরিশ প্রতিষ্ঠান তাল্লো যে হিসাব দেয়, সে হিসাবকেই পেট্রোবাংলা চোখ বুজে গ্রহণ করে নেয়। বিদেশিদের বাণিজ্য দুই দিকেই হচ্ছে। ব্যয় বেশি করে দেখিয়ে এবং পেট্রোবাংলার কাছে প্রতি ইউনিট গ্যাস ২৫০ টাকা করে বেচে। যদিও এই একই গ্যাস পেট্রোবাংলা দেশীয় প্রতিষ্ঠান বাপেক্স থেকে কিনছে মাত্র ২৫ টাকা করে।’

তিনি আরো বলেন, ‘কেন বিদেশিদের স্থলভাগের রিজার্ভ ব্লকগুলোতে আনা হচ্ছে এ প্রসঙ্গে সরকারের যুক্তি হচ্ছে, বাপেক্সকে দিয়ে নতুন কূপ খনন সম্ভব হবে না। বাপেক্সের লোকবল, যন্ত্রপাতি ও অভিজ্ঞতা অপর্যাপ্ত। আমাদের অনেক গ্যাসক্ষেত্র পড়ে আছে। বাপেক্স যদি এগুলোতে কাজ করতে চায় তাহলে শত বছর লেগে যাবে। অথচ আমাদের গ্যাস উৎপাদন বাড়ানো দরকার। কিন্তু আমরা দেখেছি, ২০০০ সাল পর্যন্ত আমাদের প্রয়োজনের সিংহভাগ গ্যাসই তো বাপেক্স জোগান দিত। যখন থেকে বিদেশি প্রতিষ্ঠান লিজের নামে আমাদের গ্যাস ব্লকগুলো দখল করতে লাগল তখন জ্বালানি মন্ত্রণালয় আস্তে আস্তে বাপেক্সকে অকেজো করে দিতে লাগল। এই প্রতিষ্ঠানকে অর্থ এবং লোকজন দেয়া কমিয়ে দেয়া হলো। বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে ব্যবসা দেয়ার জন্য এমন কূটকৌশল বোধ করি অন্য কোনো দেশে নেই।’

বিশেষজ্ঞদের মতে, গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য ইতোমধ্যে বাপেক্স কারিগরি সক্ষমতা অর্জন করেছে। গ্যাস উন্নয়ন তহবিলের মাধ্যমে আর্থিক সক্ষমতা অর্জন করেছে পেট্রোবাংলা। বিদেশি তেল-গ্যাস প্রতিষ্ঠানগুলোর চেয়ে ঈর্ষণীয়ভাবে বেশি সাফল্য বাপেক্সের। এ অবস্থায় বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে স্থলভাগের সম্ভাবনাময় গ্যাসব্লক ইজারা দেয়া আত্মঘাতী সিদ্ধান্তই হবে। এর মাধ্যমে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে আবারো জিম্মি হয়ে পড়বে। দেশের সম্পদ চলে যাবে বিদেশিদের কাছে। এর ফলে পরনির্ভরশীলতা দীর্ঘস্থায়ী রূপ নেবে।

তেল-গ্যাস বিদ্যুৎবন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির সদস্য সচিব, অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেন, ‘গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনের জন্য বাপেক্সকে ৪০০ কোটি টাকা দিতে পুঁজির অভাব হলেও একই পরিমাণ গ্যাস বিদেশি কোম্পানির কাছ থেকে ৪/৫ হাজার কোটি টাকায় কিনে নেয়ার সময় আমাদের পুঁজির অভাব হচ্ছে না। স্থলভাগে গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনের এমন কোনো কাজ নেই যা বাপেক্স দক্ষতার সঙ্গে স্বল্প খরচে সম্পন্ন করতে পারে না। মাত্র ৪ কোটি টাকায় বাপেক্স একটি গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার করেছে। অথচ সরকার বিশাল পুঁজি দরকার বলে জুজুর ভয় দেখাচ্ছে।’

তিনি আরো বলেন, ‘কনোকো ফিলিপসের সঙ্গে চুক্তির সময় সরকার পক্ষ যুক্তি দিয়েছিল গভীর সমুদ্রে বিনিয়োগ ব্যয় বেশি এবং বাপেক্সের অভিজ্ঞতাও কম। তখন স্থলভাগের ক্ষেত্রে সক্ষমতার কথা বলা হয়েছিল। আসলে দক্ষতা বা অদক্ষতা কোনো বিষয় না। স্থলভাগে আবার বিদেশিদের ডাকাটা প্রশ্নাতীতভাবে প্রমাণ করছে সব বিকিয়ে দেয়াই তাদের মূল লক্ষ্য। তারা গ্যাস সঙ্কটের যুক্তি দিচ্ছে। অথচ এসব প্রতিষ্ঠান এসে পাঁচ-ছয় বছরেও কিছু করতে পারবে না। অতীত অভিজ্ঞতা তাই বলে। কিন্তু আগামী তিন-চার বছরের মধ্যে সুনেত্র থেকে বাপেক্স কর্তৃক গ্যাস তোলার আশা করা হচ্ছে। এটা হলে তো আর সঙ্কট থাকছে না। পুঁজির অভাবের কথা বলে তারা বিদেশিদের ডেকে আনছে। যত অভাব তার ১০ গুণ বেশি ভর্তুকি দিচ্ছি আমরা। এসব পিএসসি বাড়বে। আমাদের ঋণগ্রস্ততা বাড়বে। ক্রমশ আরো ভয়াবহ পরিস্থিতির দিকে এগিয়ে যাব আমরা।’

বাপেক্সের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক জামালউদ্দিন বলেন, ‘স্থলভাগে আবার নতুন করে বহুজাতিকদের ডেকে আনাটা হবে আত্মঘাতী। বাপেক্স এখন যথেষ্ট শক্তিশালী। আমাদের দেশে এখন যেসব বিদেশি প্রতিষ্ঠান কাজ করছে কাজই প্রমাণ করেছে এদের চেয়ে বাপেক্স এগিয়ে। আমরা দেখছি, শেভরন কোনো সার্ভে করে না। ড্রিলিং করে না। কাজগুলো তারা সব অন্যদের দিয়ে করায়। লোকবল বাড়ানো গেলে বাপেক্স এদের চেয়ে সব দিক থেকে ভালো করবে। দ্বিমাত্রিক সিসমিক সার্ভে থেকে শুরু করে গ্যাস অনুসন্ধান, কূপ খনন ও গ্যাস উত্তোলনের সকল কাজ বাপেক্স সফলভাবে শুধু নিজের ব্লকগুলোতেই করছে না, এমনকি বিদেশি কোম্পানিগুলোকেও সাব-কন্ট্রাকটর হিসেবে এই কাজগুলো করে দিয়েছে। বাপেক্স ফেনী-২ এ নাইকোর একটা অনুসন্ধান কূপ খনন করে দেয়, টাল্লোর হয়ে লালমাই ও বাঙ্গোরায় সিসমিক সার্ভের কাজ করে, চাঁদপুরে একটা কন্ট্রোল পয়েন্ট স্থাপন করে দেয় এবং বাঙ্গোরায় টাল্লোর একটা কূপও খনন (ওয়ার্ক ওভার) করে দেয়। তাছাড়া বাপেক্সের সাফল্যের হারও বিদেশি প্রতিষ্ঠানের তুলনায় বেশি। বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলো যেখানে প্রতি ৩টি কূপ খননে ১টি সাফল্য পেয়েছে বাপেক্স সেখানে প্রতি ১.৩৩টি কূপ খননে ১টি সাফল্য পেয়েছে। এই সাফল্য অর্জনের ক্ষেত্রে অক্সিডেন্টাল ও নাইকোর মতো ’উন্নত প্রযুক্তি’ সম্পন্ন প্রতিষ্ঠানগুলোর মতো মাগুরছড়া ও টেংরাটিলার ধাঁচে পরিবেশ ও সম্পদ বিনাশী দুর্ঘটনা একটিও ঘটায়নি! তাছাড়া গ্যাস উন্নয়ন তহবিল হওয়ায় বাপেক্সের তো এখন টাকারও কোনো অভাব নেই। তাহলে কেন এই মুহূর্তে স্থলভাগে বিদেশিদের ডেকে আনা। এটা সব দিক থেকে আমাদের ক্ষতির কারণ হবে।’

বাপেক্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মর্তুজা আহমেদ ফারুক বলেন, ‘আমরা যতদূর জানি, এ বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। বাপেক্সের সক্ষমতার প্রায় পুরোটাই এখন ব্যবহৃত হচ্ছে। যে হারে বাপেক্সের সক্ষমতা বাড়ছে তা বিবেচনা করে বাপেক্স যতটা পারবে ততটা রেখেই নিশ্চয়ই তারা সিদ্ধান্ত নেবে।’ স্থলভাগে নতুন করে বহুজাতিকদের ডাকার কোনো প্রয়োজনীয়তা আছে কি? ধীরে ধীরে বাপেক্স কি স্থলভাগের ব্লকগুলোতে কাজ করতে পারবে না? এমন প্রশ্ন করা হলে বাপেক্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, ‘এ প্রসঙ্গে এখনো কোনো মন্তব্য করার সময় আসেনি। আমি মনে করি, দেশের ভালোর কথা ভেবেই যা ভালো সে সিদ্ধান্তটা সরকার নেবে।’