Sunday, June 15th, 2008

সমুদ্র বক্ষে তেল-গ্যাস সম্পদ লুণ্ঠনের জন্য ইজারার পাঁয়তারা

১৯৪৯ সালে সমারসেট মম ভারতে এসেছিলেন এবং দিনলিপিতে যে বিবরণ দিয়েছিলেন তার সংক্ষিপ্ত এই: “যখন আমি ভারত ছেড়ে আসছিলাম তখন বন্ধুবান্ধবরা আমাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন এদেশের কোন বস্তুটি আমার মনে গভীর ছাপ ফেলেছে। কিন্তু তাজমহল, মাদুরার মন্দির অথবা ত্রাভাঙ্কোরের পর্বতমালা, এদের কোনটিই আমাকে অভিভূত করতে পারেনি। ভয়ানকভাবে কৃশ শরীর, রোদে পোড়া যে মাটি চষে সেই মেটে রঙের একটুকরো কাপড়ে নগ্নতা ঢাকা, ভোরে শীতে কাঁপতে থাকা, দুপুরের সূর্যতাপে ঘর্মাক্ত, ফেটে চৌচির হওয়া ক্ষেতে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত লাঙ্গল বাওয়া কৃষক, বিরামহীন শ্রমে নিয়োজিত ভারতের উত্তর, দক্ষিণ, পূব, পশ্চিমের দিগন্তে বিলীন প্রান্তরে কর্মরত ক্ষুধার্ত কৃষক, হাজার হাজার বছর ধরে বংশপরম্পরা একমুঠো ভাতের জন্য মেহনত করা কৃষক, যার একমাত্র কামনা তাঁর শরীর আর সত্তাকে কোনোরকমে বাঁচিয়ে রাখা, সেই কৃষকের ছবি আমাকে সবচেয়ে বেশি অভিভূত করেছে।”

ওই নিরীহ দুর্বল কামনা শোষণের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ সংগ্রাম ক্রমাগত দৃঢ় থেকে দৃঢ়তর আন্দোলনের রূপ ধারণ করে সর্বশেষ পর্যায়ে ভারত উপমহাদেশের পূর্ব প্রান্তে জন্ম দিল এক নতুন রাষ্ট্রের- গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ রাষ্ট্রের। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতার যুদ্ধ তাই সঠিক অর্থে বাঙ্গালি কৃষকদের সশস্ত্র বিপ্লব যার মাধ্যমে তারা হাজার বছরের বিরাজমান অসহনীয় শোষণ থেকে মুক্তি চেয়েছিলেন। ফলস্বরূপ এই আকাঙ্ক্ষার বাস্তবায়নের শপথগুলো উচ্চারিত হয়েছে বাংলাদেশের সংবিধানে যাদের একটি পাওয়া যাবে ৭ অনুচ্ছেদে: “প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ” এবং আর একটি রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি ভাগে ১৬ অনুচ্ছেদে “নগর ও গ্রামাঞ্চলের জীবনযাত্রার মানের বৈষম্য দূর করিবার উদ্দেশ্যে কৃষিবিপ্লবের বিকাশ, গ্রামাঞ্চলে বৈদ্যুতীকরণের ব্যবস্থা, কুটিরশিল্প ও অন্যান্য শিল্পের বিকাশ এবং শিক্ষা, যোগাযোগ ব্যবস্থা ও জনস্বাস্থ্যের উন্নয়নের মাধ্যমে গ্রামাঞ্চলের আমূল রূপান্তর সাধনের জন্য রাষ্ট্র কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করিবেন।”

বাংলাদেশের খনিজ সম্পদ সীমিত থাকায় এই সীমিত সম্পদের গণকল্যাণমুখী পরিকল্পনার মাধ্যমে পুরোটাই এমনভাবে ব্যবহার করা উচিত যাতে সারা দেশের জ্বালানী চাহিদা যথাসম্ভব সর্বোচ্চ পরিমাণে ও সময়ব্যাপী মেটানো যায়। সংবিধানের ১৪৩ অনুচ্ছেদ বলে বাংলাদেশের ভূমির অন্ত:স্থ ও রাষ্ট্রীয় জলসীমার অন্তর্বর্তী মহাসাগরের অন্ত:স্থ সকল খনিজ সম্পদ প্রজাতন্ত্রের উপর ন্যস্ত হবে এবং পূর্বেই উল্লেখ করেছি সংবিধান বলে প্রজাতন্ত্রের মালিক জনগণ। বর্তমান তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার অধীনে বিদ্যুৎ ও জ্বালানী মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত বিশেষ সহকারী ড. ম. তামিম বঙ্গোপসাগরের গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনের জন্য ২৮টি ব্লক চিহ্নিত করে সেগুলো অতি দ্রুত অর্থাৎ নির্বাচিত সরকার আসার আগেই ২০০৮ অক্টোবরের মধ্যে বিদেশী কোম্পানিদেরকে লুণ্ঠনভিত্তিক ইজারা দেবার জন্য তোড়জোড় করছেন। প্রথমেই একথা অনায়াসে বলা যায় যে তার এই তোড়জোড় বাংলাদেশের সংবিধান আদৌ সমর্থন দেয় না, বরং এটা সংবিধানের নির্দেশ অমান্য করার একটি অপরাধ। সংবিধানের ৫৮ ঘ অনুচ্ছেদ এই নির্দেশ দেয় যে, তত্ত্বাবধায়ক সরকার সরকারের দৈনন্দিন কার্যাবলী সম্পাদন করিবেন; এবং এইরূপ কার্যাবলী সম্পাদনের প্রয়োজন ব্যতীত কোন নীতি নির্ধারণী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিবেন না। উপরোক্ত ২৮টি ব্লকের মধ্যে ১০টি ব্লক ইতোমধ্যে ইজারা দেবার উদ্দেশ্যে প্রস্তুত “উৎপাদন অংশীদারিত্ব চুক্তি”র মডেল ২০০৮ আমরা দেখেছি। এই চুক্তি সংক্রান্ত কাজগুলোর পরিসংখ্যান ও তথ্য গোপন রাখতে হবে এবং চুক্তির মেয়াদ শেষ থেকে ৫ বছরতক এইগুলো গোপন রাখতে হবে। এই রাখঢাক ব্যাপারটির অর্থ কী হতে পারে তা সহজেই বুঝা যায়, স্পষ্ট করার দরকার পড়ে না।

বঙ্গোপসাগরের ওই ১০টি ব্লকে যে পরিমাণ গ্যাস পাওয়া যাবে তা পুরোপুরি জনগণের জন্য দরকার হবে। কারণ এটা প্রয়োজনের চাইতে অনেক কম। কাজেই এমন লঘুব্যয়ী সরল ব্যবস্থা থাকতে হবে যেন ব্লক থেকে উত্তোলিত গ্যাস সরাসরি পাইপ লাইনের মাধ্যমে বাংলাদেশের ভূখণ্ডে সরবরাহ করা যায়। আলোচ্য চুক্তিটির ১৫.৫.১ ও অন্যান্য ধারায় বলা হয়েছে ইজারা গ্রহীতা উত্তোলিত গ্যাস তরলিকৃত করে শতকরা ৮০ ভাগ রপ্তানি করতে পারবে এবং এই উদ্দেশ্যে প্রতি বছর গ্যাস মজুদের শতকরা ৭.৫ ভাগ হারে উত্তোলন করতে পারবে। এই শর্তটির অর্থ হল উত্তোলন শুরু করার ১৩ বছরের মধ্যেই গ্যাসভাণ্ডার নিঃশেষ হয়ে যাবে। এই শর্তটির পরিবর্তে এই শর্তটিই থাকা উচিত ছিল যে, ইজারাদারকে বাংলাদেশের জনগণের চাহিদা অনুযায়ী সীমিত হারে গ্যাস উত্তোলন করতে হবে এবং সেটা পাইপ লাইনের মাধ্যমে সরবরাহ করা হবে এবং উত্তোলিত গ্যাসের কোন পরিমাণই তরলিকৃত বা রপ্তানি করা যাবে না। উল্লেখ্য, চুক্তিতে উত্তোলিত গ্যাস তরলিকৃত করে কন্টেইনারে ভরে রপ্তানি করার বিধান আছে যা বহুদূরস্থিত বিদেশী ক্রেতারা পুনরায় তা গ্যাসে রূপান্তরিত করে ব্যবহার করতে পারেন। আমাদের ব্যবহারের জন্য নিজস্ব গ্যাসফিল্ড থেকে দেশের ভূখণ্ডে গ্যাস আনতে এই ব্যয়বহুল পদ্ধতিটির আদৌ প্রয়োজন নেই, পাইপ লাইনে গ্যাস পরিবহণই সুবিধাজনক হবে। এ ছাড়া চুক্তিটির অন্যান্য ধারাগুলোও জনস্বার্থবিরোধী। তবে আমরা যে দাবিটি এখন করব তার পরিপ্রেক্ষিতে অন্যান্য ধারাগুলো বিশ্লেষণ করার দরকার হচ্ছে না। ভবিষ্যতে প্রয়োজনবোধে সেটা করা হবে।

আমরা ইজারা দেবার উপরোক্ত চুক্তিসহ পুরো প্রক্রিয়ার বিরোধীতা করছি এবং অনতিবিলম্বে প্রজাতন্ত্রের প্রতিষ্ঠাতা ও মালিক জনগণের সত্তাধিকার লঙ্ঘনকারী এই কার্যক্রম থেকে বিরত থাকার দাবী করি অন্যথায় সংশ্লিষ্ট সকলকে বিশেষ করে প্রধান উপদেষ্টা ও তার বিশেষ সহকারীকে বাংলাদেশের জনগণ ক্ষমা করবে না- ইতিহাসও ক্ষমা করবে না। কোনকালে এ ধরণের অপরাধ ক্ষমা করা হয়েছে এমন কোন নজির ইতিহাসে খুঁজে পাওয়া যায় না।

 

[১৫ জুন ২০০৮ তারিখে জাতীয় কমিটি কর্তৃক আয়োজিত সাংবাদিক সম্মেলনে পঠিত।]