Monday, February 11th, 2008

সমুদ্রসীমা, তেলগ্যাস চুক্তি ও জনগণের স্বার্থ

১৯৮২ সালের জাতিসংঘ সমুদ্র কনভেনশন আইন অনুযায়ী, যেকোন দেশ সমুদ্রের ভেতর ২০০ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত নিজ সীমা হিসেবে দাবী করতে পারে। এর মধ্যে ১২ মাইল সার্বভৌম সীমার অন্তর্ভুক্ত এবং পরবর্তী ১৮৮ মাইল অর্থনৈতিক অঞ্চল হিসেবে স্বীকৃত। স¤প্রসারিত হিসেবে সমুদ্র ভূমিতে একটি দেশ ৩৫০ মাইল পর্যন্ত নিজেদের কর্তৃত্বাধীন বিবেচনা করতে পারে।

সমুদ্র সাধারণভাবে বিশ্বের সকল মানুষের সম্পদ। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন আগ্রাসী দখলদার বিশ্বব্যবস্থায় এই বিশ্বের সকল মানুষের সাধারণ সম্পদ সাম্রাজ্যবাদী কিছু রাষ্ট্র আর বহুজাতিক সংস্থার মুনাফা আর দখল তৎপরতায় ক্ষত-বিক্ষত, দূষিত, বিপর্যস্ত। যে সমুদ্র অপরিমেয় সম্পদের ক্ষেত্র তা যুদ্ধ, ভয়ংকর গবেষণা এবং মুনাফামুখি নানা তৎপরতায় মানুষের কর্তৃত্বের বাইরে। সবল কতিপয় রাষ্ট্র ও সবল ক্ষুদ্র মুনাফাভোগী শ্রেণীর আধিপত্য এই পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে। এই আগ্রাসী পরিস্থিতির মধ্যে দুর্বল দেশগুলোর জনগণকে সতর্ক থাকতে হয়, অবস্থান নিশ্চিত রাখবার জন্য আন্তর্জাতিক বিভিন্ন আইনের আশ্রয় নেবার জন্য দক্ষ প্রস্তুতি রাখতে হয়। আর এসব দেশের সরকার যদি জনগণের স্বার্থ প্রতিনিধিত্ব না করে তাহলে জনগণের দিক থেকে সতর্কতা বাড়াতে হয় আরও বহুগুণ।

বাংলাদেশ ২০০১ সালে জাতিসংঘ কনভেনশনে অনুস্বাক্ষর করেছে এবং ১০ বছরের মধ্যে অর্থাৎ ২০১১ সালের মধ্যে সমুদ্রসীমায় তাদের সব দাবী প্রতিষ্ঠার জন্য সব প্রমাণাদি ও কাগজপত্র জমা দেবার কথা। কিন্তু এখনও পর্যন্ত এ বিষয়ে কার্যত কোন অগ্রগতি হয়নি। ২০০৪ সালে পেট্রোবাংলা, জিএসবি, নেভি, স্পারসো, আইডব্লি¬উটিএ, সার্ভেয়ার অব বাংলাদেশ থেকে প্রতিনিধি নিয়ে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছিল কিন্তু সেটি এখনও অকার্যকর রয়েছে। বর্তমান সরকারও এ ব্যাপারে কোন উদ্যোগ গ্রহণ করেছে বলে জানা যায় না। এরকম অবস্থাতেই গত ৫ ফেব্র“য়ারি বর্তমান সরকারের উপদেষ্টা পরিষদ সমুদ্র অঞ্চলকে ২৮টি ব্লকে (৮টি অগভীর ও ২০টি গভীর সমুদ্রে) ভাগ করে তৃতীয় দফা বিডিংএর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন এবং তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য গত ১৫ ফেব্র“য়ারি আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করেছেন। ইতোমধ্যে এর জন্য একটি উৎপাদন অংশীদারী চুক্তির (প্রডাকশন শেয়ারিং কন্ট্রাক্ট বা পিএসসি) মডেল দাঁড় করানো হয়েছে এবং একটি আইনজীবি প্রতিষ্ঠান দিয়ে তা চূড়ান্ত করা হয়েছে। এই মডেল পিএসসি সম্পর্কে জনগণকে সম্পূর্ণ অন্ধকারে রাখা হয়েছে। চূড়ান্ত করবার পরই কেবল তা দেয়া হয়েছে ওয়েবসাইটে। এর আগে এরশাদ আমলে বাংলাদেশের ভূমি ২৩টি ব্লকে ভাগ করা হয়েছিল এবং পরবর্তী খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনা সরকারের সময়ে তেল-গ্যাস সমৃদ্ধ ১৫টি ব্লক বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর কাছে ইজারা দেওয়া হয়েছে। সংবিধান অনুযায়ী তেল-গ্যাস খনিজ সম্পদ জনগণের সাধারণ সম্পত্তি হলেও এসব চুক্তি করা হয়েছে জনগণের অগোচরে। কিন্তু ক্রমে পরিষ্কার হয়েছে যে, এই চুক্তিগুলো দুর্নীতিযুক্ত, জাতীয় স্বার্থবিরোধী এবং অর্থনীতির উপর বোঝাস্বরূপ। এসব চুক্তির ফলে বাংলাদেশের সম্পদ বাংলাদেশের জন্য বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

প্রতি হাজার ঘনফুট গ্যাস যেখানে দেশীয় সংস্থা বাপেক্স এর কাছ থেকে কেনা হয় ৭ টাকা করে, সেখানে এসব চুক্তি অনুযায়ী বিদেশী কোম্পানির কাছ থেকে একই পরিমাণ গ্যাস কেনা হয় ২৫০ টাকারও বেশী দামে বা ৩০ গুণেরও বেশী দামে এবং বিদেশী মুদ্রায়। বিদেশী কোম্পানির কাছ থেকে বেশী দামে কেনার কারণে বাংলাদেশকে প্রতি বছর ভর্তুকি গুণতে হচ্ছে ১ হাজার কোটি টাকারও বেশী। এর ফলে এককালে লাভজনক পেট্রোবাংলা ক্রমেই লোকসানী প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রায় কেনার ফলে যত গ্যাস কেনা হচ্ছে তত চাপ পড়ছে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের উপর। প্রবাসী আর গার্মেন্টস শ্রমিকদের হাড়ভাঙা খাটুনির বিনিময়ে  যে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হয় তা দিয়েই কেনা হয় আমাদের নিজেদের গ্যাস সম্পদ।

অন্যদিকে বাপেক্স ক্রমাগত পঙ্গু হচ্ছে উৎপাদন ব্যয়ের চাইতে অনেক কম দামে গ্যাস বিক্রয় করবার ফলে। একদিকে বাংলাদেশের গ্যাসসম্পদ দিয়ে মুনাফা গড়ছে বিদেশী কোম্পানি অন্যদিকে তাদের বেশী বেশী জায়গা দেবার জন্য সুপরিকল্পিতভাবে পঙ্গু করা হচ্ছে জাতীয় প্রতিষ্ঠান। সরকার পরিবর্তন হয় কিন্তু এসব নীতির কোন পরিবর্তন দেখা যায় না। এসব নীতির কারণে জাতীয় প্রতিষ্ঠানের নিজের অনুসন্ধান কাজ পরিচালনা, দক্ষ জনশক্তি তৈরি ও নিয়োগ অসম্ভব হয়ে পড়েছে। মাগুরছড়া ও টেংরাটিলায় মার্কিনী ও কানাডীয় কোম্পানির অদক্ষতা ও অবহেলায় বিপুল গ্যাস সম্পদ বিনষ্ট হলেও ক্ষতিপূরণ আদায়ের কোন  কার্যকর ব্যবস্থাই নেয়া হয়নি। এই ক্ষতিপূরণ আদায়ের বিষয়টিও চুক্তিতে স্পষ্টভাবে ছিল না বলে জানা যায়।

গত ১০/১২ বছরে একাধিক বিদেশী কোম্পানি তাদের আন্তর্জাতিক ব্যবসার অংশ হিসেবে এদেশে তাদের মালিকানা হস্তান্তর করেছে। আমরা অবাক বিস্ময়ের সঙ্গে দেখেছি এসব বিষয়েও সরকার বা পেট্রোবাংলার অনুমতির তারা তোয়াক্কা করেনি। বলা হয় এসব বিষয়েও কোন অনুমতির প্রয়োজন নেই। এর অর্থ হলো চুক্তিগুলোই এমন হয়েছিল যাতে বাংলাদেশ সম্পদে ধ্বংস কিংবা এই সম্পদকে নানা আন্তর্জাতিক ব্যবসার ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করলেও এ সম্পর্কে তাদের কোন জবাবদিহিতা করতে হয় না।

বাংলাদেশের এই সীমিত গ্যাস সম্পদ রপ্তানির জন্য মার্কিন-ব্রিটিশ-ভারতীয় দূতাবাস, বিশ্বব্যাংক-এডিবি আর তেল কোম্পানিগুলোর সাথে এদেশীয় নানা স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর নানা অপতৎপরতা আমরা প্রত্যক্ষ করেছি। জাতীয় কমিটির নেতৃত্বে ধারাবাহিক আন্দোলন ও জনপ্রতিরোধের কারণে সেই নকশা বাস্তবায়িত হয়নি। আবার টাটার প্রস্তাব এসেছে সেই গ্যাস ও কয়লা কেন্দ্র করেই। জাতীয় কমিটি ধারাবাহিকভাবে সেগুলোর প্রতারণা ও জাতীয় স্বার্থবিরোধী তৎপরতা উন্মোচন করেছে। অন্যদিকে নিজেদের জীবন ও জাতীয় কয়লা সম্পদ রক্ষার জন্য জীবন দিয়ে  ফুলবাড়ীতে ইতিহাস গড়েছে এই দেশেরই মানুষ। দুষ্ট বিশ্বজোট এখনও সক্রিয়।

এসব জাতীয় স্বার্থবিরোধী ধ্বংসাত্মক চুক্তিগুলো গোপন ও বহাল রেখেই আবার আরও বিশাল সম্ভাবনাময় সমুদ্র ক্ষেত্রে ব্ল¬ক বরাদ্দের দরপত্র আহ্বান করা হচ্ছে বলে আমরা শঙ্কিত। একদিকে যখন আন্তর্জাতিক জ্বালানী বিশেষজ্ঞরা বলছেন যে, বাংলাদেশের সমুদ্র সীমার বিপুল তেল, গ্যাস, খনিজ সম্পদ পাবার সম্ভাবনা উজ্জল, অন্যদিকে তখন এই সমুদ্র সীমা এখনও অনির্ধারিত রাখা হয়েছে। আন্তর্জাতিক নিয়মনীতি অনুযায়ী বাংলাদেশের জন্য নির্ধারিত যে সীমা সেই সীমা নির্ধারণ ও তাতে পাকাপাকি দখলিস্বত্ব নেবার ক্ষেত্রে অতীতের বিভিন্ন সরকার ক্ষমার অযোগ্য শৈথিল্য প্রদর্শন করেছে, বর্তমান সরকারও এ বিষয়ে কোন মনোযোগ দিচ্ছে না। এই সুযোগে বাংলাদেশের সমুদ্র সীমায় ভারত ও মায়ানমার দখল নিচ্ছে। এবং শুধু তাই নয়, এসব ক্ষেত্র তারা বিভিন্ন বহুজাতিক তেল কোম্পানির কাছে বরাদ্দও দিচ্ছে। এরকম অনিশ্চয়তা জিইয়ে রাখা বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় নিরাপত্তার জন্য বড় আকারের হুমকিস্বরূপ।

“নিউ এক্সপ্লোরেশন লাইসেন্সিং পলিসি”-র অধীনে ভারতীয় সরকার তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য ৫৫টি নতুন ব্লক নির্ধারণ করেছে। ১৫ সেপ্টেম্বর এই ব্লকগুলোর দরপত্র জমাদানের শেষ সময়সীমা ছিল। ভারতীয় সরকার এ বিষয়ে যে ম্যাপ প্রকাশ করেছে সেখানে ডি-২৩ (৮,৭০৬ বর্গ কিলোমিটার) এবং ডি-২২ (৭৭৯০ বর্গকিলোমিটার) বঙ্গোপসাগরে সুন্দরবন থেকে দক্ষিণে বাংলাদেশের সীমার উপর পড়েছে। ভারত অবশ্য তার এই বরাদ্দে কর্তৃত্ব বজায় রেখেছে ভারতীয় সংস্থারই। সংবাদপত্রে প্রকাশিত খবর অনুযায়ী বাংলাদেশের ব্লকগুলোর জন্য নতুন চুক্তিতে এই তেল-গ্যাস সম্পদের পূর্ণ কর্তৃত্ব পাবে বিদেশী কোম্পানি এবং গ্যাস রপ্তানি হবে মুখ্য বিষয়।

এই পরিপ্রেক্ষিতে জনগণের পক্ষ থেকে আমাদের দাবী, অবিলম্বে সমুদ্র সীমা যথাযথভাবে নির্ধারণ ও তার উপর বাংলাদেশের অধিকার ও কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা হোক। দ্বিতীয়ত, আগের চুক্তিগুলো প্রকাশ ও অসম-অন্যায় চুক্তি বাতিল করা হোক। তৃতীয়ত, যে পিএসসি মডেল প্রণয়ণ করা হয়েছে সেটা সর্বসমক্ষে প্রকাশ করা হোক এবং জনগণের মতামতের ভিত্তিতে তা চূড়ান্ত করা হোক। তেল কোম্পানির আইনজীবীদের মতামত নিয়ে গোপনে তা গ্রহণ করা চলবে না। চতুর্থত, জাতীয় সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য বাপেক্সসহ জাতীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি বৈষম্যমূলক, বিধ্বংসী নীতিমালা পরিবর্তন করে যথাযথ দক্ষতা ও যোগ্যতা বৃদ্ধির প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হোক। পঞ্চমত, সমুদ্রে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে দক্ষতা তৈরির জন্য সব ব্লকে বাপেক্সকে প্রধান হিসেবে যুক্ত রাখা বাধ্যতামূলক করা হোক। ষষ্ঠত, বাংলাদেশের তেল-গ্যাস সম্পদ উত্তোলন করতে হবে দেশের মানুষের প্রয়োজনে, বিদেশী কোম্পানির মুনাফার লক্ষ্যে রপ্তানির জন্য নয়।

বাংলাদেশের সমুদ্র এখন নানাভাবে অরক্ষিত। সেখানে বিভিন্ন দেশের সামরিক বেসামরিক কর্তাব্যক্তিদের কিংবা জাহাজের সন্দেহজনক গতিবিধি, অনুপ্রবেশও মানুষের চোখ এড়াবার মতো নয়। কিন্তু এই সমুদ্র বাংলাদেশের সাথে বিশ্বের যোগাযোগ মাধ্যম, এই সমুদ্র বিপুল জানা অজানা সম্পদের আধার এবং আইনসিদ্ধ সীমায় জনগণের কর্তৃত্বে এই সমুদ্র এই দেশের সার্বভৌমত্বের প্রতীক।

বাংলাদেশের জনগণের সম্পদ নিয়ে কোন চুক্তি জনগণকে না জানিয়ে বা তার সম্মতি না নিয়ে করা যাবে না। জনগণকে না জানিয়ে বা সম্মতি না নিয়ে করা কোন চুক্তি গ্রহণ করবার কোন দায়-দায়িত্ব জনগণের নেই।

 

[১১ ফেব্র“য়ারি ২০০৮ ইং তারিখে জাতীয় কমিটি কর্তৃক আয়োজিত সাংবাদিক সম্মেলনে পঠিত]