Thursday, May 19th, 2011

তৃতীয় পক্ষের কাছে গ্যাস বিক্রি: বহুজাতিক সান্তোস’দের সন্তুষ্ট করবার কায়-কারবার

অগভীর সমুদ্রের ১৬ নম্বর ব্লকের সাঙ্গু গ্যাস ক্ষেত্রকে চুষে ছিবড়ে বানিয়ে বিপুল মুনাফা লূটে নিয়ে সান্তোস-হ্যালিবার্টনের কাছে ঐ ব্লকের বাকি অংশটকু তুলে দিয়ে কেটে পড়েছে বহুজাতিক কেয়ার্ন। এবার লুট করার পালা সান্তোস-হ্যালিবার্টনের। তারই সুযোগ করে দিতে কেয়ার্নের মতই, সান্তোসকেও তৃতীয় পক্ষের কাছে গ্যাস বিক্রির অনুমতি দিল ক্ষমতাসিন মহাজোট সরকার। গত ১৬ মে, সোমবার পেট্রোবাংলার সাথে অষ্ট্রেলিয়া ভিত্তিক বহুজাতিক সান্তোসের এক সংশোধিত গ্যাস পার্চেজ এন্ড সেলস এগ্রিমেন্ট(জিপিএসএ) চুক্তি স্বাক্ষরের মাধ্যমে বিষয়টি চুড়ান্ত করা হয়। এর আগে বর্তমান মহাজোট সরকার কেয়ার্নের সাথে ১৬ নম্বর ব্লকের সাঙ্গু গ্যাস ক্ষেত্রের ব্যাপারে এ সংক্রান্ত চুক্তি স্বাক্ষর করেছিলো। কিন্তু কেয়ার্ন চলে যাওয়ায় সেটা তখন বাস্তবায়িত হয় নি। কেয়ার্নের কাছ থেকে এরপর সান্তোস ও হ্যালিবার্টন ১৬ নম্বর ব্লকের মালিকানা হস্তগত করে। বর্তমানে সাঙ্গু গ্যাস ক্ষেত্রের ৭৫ % মালিকানা সান্তোসের এবং ২৫ % মালিকানা মার্কিন বহুজাতিক হ্যালিবার্টনের। এছাড়া ১৬ নম্বর ব্লকের মগনামা এবং হাতিয়া গ্যাস ক্ষেত্রের শতভাগ মালিকানা সান্তোসের। সাঙ্গুসহ ১৬ নম্বর ব্লকের সকল গ্যাস ক্ষেত্রের গ্যস তৃতীয় পক্ষের কাছে গ্যাস বিক্রির অনুমতি দেয়ার চুক্তি স্বাক্ষর করেন- পেট্রোবাংলার পক্ষে সংস্থার সচিব ইমাম হোসেন এবং সান্তোস এর পক্ষে সান্তোস বাংলাদেশ লিমিটেড এর প্রেসিডেন্ট  জন চেম্বার।

সান্তোসকে সরাসরি তৃতীয় পক্ষের কাছে গ্যাস বিক্রির এই অনুমতি প্রদান করা হলো এমন একটা সময়ে যখন সরকার জ্বালানি খাতে ভর্তুকী কমানোর কথা বলে ডিজেল ও গ্যাসের দাম বৃদ্ধি করেছে। অথচ এই ধরণের চুক্তির মাধ্যমে বিদেশী কোম্পানিকে প্রদত্ত ভর্তুকী বাড়ানোরই ব্যাবস্থা হলো এবং সেই সাথে রাষ্ট্রীয় বিদ্যুৎ ও সারকারখানার মতো জনগুরুত্বপূর্ণ খাতে জ্বালানি সরবরাহের ব্যাপারে অনিশ্চয়তা আরো বাড়ানো হলো।

 

স্থলভাগের এবং অগভীর সমুদ্রের বিদ্যমান প্রডাকশান শেয়ারিং কণ্ট্রাক্ট(পিএসসি) বা উৎপাদন অংশীদ্বারিত্ব চুক্তিতে সাধারণত উত্তোলিত গ্যাসের ৮০ ভাগ মালিকানা বহুজাতিক কোম্পানির হাতে তুলে দেয়া হলেও শর্ত থাকে যে ঐ গ্যাস বহুাজাতিক কোম্পানি নির্ধারিত মূল্যে পেট্রোবাংলা ছাড়া আর কারও কাছে বিক্রি করতে পারবে না। শুধু মাত্র পেট্রবাংলা গ্যাস কিনতে অপারগতা প্রকাশ করলেই তৃতীয় পক্ষ অর্থাৎ বেসরকারি দেশি-বিদেশী কোম্পানির কাছে বিক্রি করতে পারবে। কিন্তু এভাবে নির্ধারিত দামে বাপেক্সের কাছে গ্যাস বিক্রির মানে হলো বহুজাতিক কোম্পানির জন্য তুলনামূলক কম মুনাফা অর্থাৎ যা তাদের বিবেচনার্য় ‘লস’ বলেই গণ্য হয় কারণ আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানি করতে পারলে এর চেয়ে বহুগুণ দামে সে বিক্রি করে আরো দ্রুত আরো বেশি মুনাফা তুলে নিতে পারতো! ফলে এ দেশে গ্যাস উত্তোলণের শুরু থেকেই বহুজাতিক কোম্পানিগুলো শুধু ৮০ ভাগ মালিকানা নিয়েই সন্তুষ্ট ছিল না, সেই সাথে বিদেশে রপ্তানির ধান্দাও তারা বারবার করেছে। কিন্তু জনগণের আন্দোলনের মুখে সেটা এখন পর্যন্ত  করতে সক্ষম না হলেও এবার কৌশলে দেশের ভেতরেই রপ্তানি মূল্য হাসিল করার আয়োজন করে জনগণকে তার জ্বালানি সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যাবহার থেকে বঞ্চিত করবার সকল আয়োজন সম্পন্ন করা হলো।

বাপেক্স বা পেট্রবাংলা গ্যাস উত্তোলন করলে তার খরচ প্রতি হাজার ঘন ফুট (এমসিএফ) এ ২৫ টাকার মতো পড়লেও বিদেশী কোম্পানির সাথে পিএসসি চুক্তির মাধ্যমে নিজেদের দেশের গ্যাস সরকারকে এতদিন কিনতে হতো চুক্তি ভেদে প্রায় ৩ থেকে ৩.৫ ডলার মূল্যে অর্থাৎ ২০০ থেকে ২৫০ টাকা মূল্যে। এভাবে ২৫ টাকার গ্যাস ২০০/২৫০ টাকায় বিদেশী কোম্পানির কাছ থেকে কিনে সরকার আসলে ১৭৫/২২৫ টাকা ভর্তুকি দিচ্ছে বহুজাতিক কোম্পানিকে। আর সেই ভর্তুকি পুষিয়ে নেয়ার জন্য সময় সময় গ্যাস ও অন্যান্য জ্বালানির দাম বাড়াচ্ছে! তৃতীয় পক্ষের কাছে গ্যাস বিক্রির অনুমোদন দেয়ার ফলে সরকারকে এখন বহুজােিতর কাছ থেকে আরও বেশি দামে গ্যাস কিনতে হবে ফলে আরো বাড়তি ভর্তুকী দিতে হবে । সরকার কর্তৃক এভাবে বহুজাতিক কোম্পানির কাছ থেকে বাড়তি মূল্যে গ্যাস কেনাটা বাপেক্স বা পেট্রবাংলা তথা দেশের জনগণের জন্য সুস্পষ্ট লস এটা নিয়ে কোন সন্দেহ নাই। কিন্তু বহুজাতিক কোম্পানির চোখ দিয়ে দেখলে পেট্রবাংলার কাছে ৩ ডলার মূল্যে গ্যাস বিক্রি করাটা এক অর্থে বহুজাতিক কোম্পানির জন্যও ”লস” কারণ রপ্তানি করতে পারলে তো সে অবলীলায় প্রতি ইউনিট ১০/১২ ডলারে বিক্রি করতে পারতো!! যেমন: কেয়ার্ন কিংবা সান্তোসের কাছ থেকে এতদিন পিএসসি চুক্তি অনুসারে সরকার প্রতি এমসিএফ(১ হাজার ঘনফুট) গ্যাস কিনতো ২.৯ ডলার বা ২০৩ টাকা মূল্যে। এভাবে কেয়ার্ন সাংগু গ্যাস ক্ষেত্র থেকে ৮০ ভাগ মালিকানায় গ্যাস উত্তোলণ করে এবং সেটা পেট্রোবাংলার কাছে বিক্রি করে কম মুনাফা করেনি। কিন্তু তারপরও ছলে-বলে কৌশলে মুনাফা সর্বোচ্চ করণের চেষ্টার কোন কমতি ছিলনা কেয়ার্নের। বিডিং এর সময় প্রকল্প ব্যায় মাত্র ১০.৮১ মিলিয়ন ডলার দেখালেও গ্যাস কূপ খনন, সমুদ্রে প্লাটফর্ম তৈরী ইত্যাদি নানান খাতে বাড়তি খরচ দেখিয়ে শেষ পর্যন্ত প্রকল্প ব্যায় চার চারটি সংশোধিত বাজেটের মাধ্যমে ২৬৪ মিলিয়ন ডলারে উন্নীত করে এবং কস্ট রিকভারী গ্যাসের মাধ্যমে তার চেয়ে আর অনেক বেশি উসুলও করে নেয়। আবার দ্রুত মুনাফা লাভের আশায় নির্ধারিত মাত্রার চেয়ে বেশি অনুপাতে গ্যাস উত্তোলণ করে সাঙ্গু গ্যাস ক্ষেত্রকে সময়ের আগেই অনুত্তোলন যোগ্য করে তোলে। তারপরও খায়েশ মেটেনি। কোম্পানিটি ২০০৮ সালে ১৬ নং ব্লকের মগনামায় গ্যাস আবিস্কারের সম্ভাবনা আবিস্কারের পর মগনামা ও হাতিয়া স্ট্রাকচারের গ্যাস অনুসন্ধান কার্যক্রম স্থগিত করে দেয়। তারা যুক্তি দেয় পিএসসি চুক্তি অনুযায়ী নির্ধারিত দামে যদি পেট্রবাংলার কাছে গ্যাস বিক্রি করতে হয় তাহলে তাদের পোষাবেনা। তারা আবদার করে পিএসসি চুক্তি ভঙ্গ করে হলেও হয় তাদের বিদেশে গ্যাস রপ্তানি করতে দিতে হবে নতুবা বেশি দামে দেশের ভেতরেই তৃতীয় পক্ষের কাছে গ্যাস বিক্রির অনুমোদন দিতে হবে।

একই ধারাবাহিকতায় সান্তোস ত্রিমাত্রিক বা থ্রিডি সিসমিক সার্ভের মাধ্যমে সাঙ্গু-১১, দক্ষিণ সাঙ্গু ও মগনামা স্ট্রাকচারে গ্যাস প্রাপ্তির ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়ার পর এখন বলছে তৃতীয় পক্ষের কাছে  বিক্রি করার অনুমোদন না দেয়া হলে তাদের জন্য লাভজনক হবে না ফলে তারা আর গ্যাস উত্তোলণ করবে না। সরকারও অযুহাত দিয়েছে এই গ্যাস সংকটের কালে সান্তোসকে যদি বেশি দামে গ্যাস বিক্রির সুযোগ দেয়া না হয় তাহলে তারা গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য পরবর্তী যে কাজগুলো করা দরকার অর্থাৎ অনুসন্ধান কূপ খনন, উন্নয়ণ কূপ খনন ইত্যাদি করতে উৎসাহ দেখাবে না ফলে গ্যাস সংকট সহসাই কাটবে না। কি হাস্যকর যুক্তি! সান্তোস এতদিনে এই ক্ষেত্রটিতে ১০০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করে ফেলেছে এবং গ্যাস প্রাপ্তি সম্পর্কে নিশ্চিতও হয়ে গিয়েছে। এরকম একটা অবস্থায় এতগুলো ডলার বিনিয়োগ করার পর এবং নিশ্চিত গ্যাসপ্রাপ্তি ও মুনাফার সুযোগ ফেলে দিয়ে কেয়ার্ন দেশ ছেড়ে চলে যাবে এটা কেবল বহুজাতিকের দালালি করলেই বিশ্বাস করা সম্ভব! তাছাড়া একবার চুক্তি হওয়ার পর চুক্তি স্বাক্ষর কারী কোম্পানিটি বাধ্য চুক্তি অনুযায়ী গ্যাস বিক্রির জন্য। সরকার তাদেরকে সেই চুক্তি অনুযায়ী কেবল পেট্রোবাংলার কাছেই গ্যাস বিক্রিতে বাধ্য করার বদলে উল্টো তাদের ব্ল্যাক মেলের সামনে নতজানু ভূমিকা পালন করছে। অথচ এই সুযোগে সরকারের উচিত ছিলো এদের কাছ থেকে গ্যাস ব্লক কেড়ে নিয়ে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বাপেক্সের মাধ্যমে গ্যাস উত্তোলণের ব্যাবস্থা করা।

আরেকটা প্রশ্ন জরুরী- গ্যাসের সংকট লাঘবের কথা বলে তৃতীয় পক্ষের কাছে বিক্রি করার অনুমতি দেয়ার যুক্তি কি? সান্তোসের ত্রিমাত্রিক জরিপ থেকে দেখা গেছে মগনামা এবং দক্ষিণ সাঙ্গু ক্ষেত্রে ৫ থেকে ৬ টি গ্যাসের স্তর আছে যার প্রতিটিতে ৬২ থেকে ৭০ বিসিএফ(বিলিয়ন কিউবিক ফুট) গ্যাস আছে , এমনকি একটিতে ১৩০ বিসিএফ গ্যাসও পাওয়া যেতে পারে। এইসব গ্যাস ক্ষেত্র থেকে দৈনিক ৪০ থেকে ৫০ মিলিয়ন ঘন ফুট গ্যাস উত্তোলণ করা সম্ভব হবে। বাংলাদেশের বর্তমান গ্যাস ঘাটতি দৈনিক ২৫০ মিলিয়ন ঘন ফুট। অর্থাৎ এই ব্লক থেকে বাংলাদেশের বর্তমান ঘাটতির প্রায় এক পঞ্চমাংশ মেটানো সম্ভব হতো যদি রাষ্ট্রীয় তদারকিতে জনগণের জন্য প্রয়োজনীয় খাতে গ্যাসটুকু বরাদ্দ করা সম্ভব হতো। কিন্তু এখন এই চুক্তি স্বাক্ষরের পর পেট্রবাংলা তথা জনগণ আর এই গ্যাসের ৮০% পাবে না কারণ এই চুক্তির ফলে সান্তোস আর তার ভাগের অংশ ২.৯ ডলার মূল্যে পেট্রবাংলার কাছে গ্যাস বিক্রি করতে বাধ্য নয়, সে বাজারের যেসব কোম্পানির কাছ থেকে বেশী দাম পাবে তাদের কাছেই গ্যাস বিক্রি করবে। ইতোমধ্যেই  কাফকো, কোরিয় ইপিজেড ইত্যাদি বিদেশী মালিকানাধীন কোম্পানি  ৭ ডলার এরও বেশি মূল্যে গ্যাস কেনার আগ্রহ প্রকাশ করেছে। এর আগে একসময় রাষ্ট্রীয় সংস্থা বাখরাবাদ গ্যাস কোম্পানির কাছ থেকে কাফকো ১২ ডলার মূল্যেও প্রতি ইউনিট গ্যাস ক্রয় করেছে। এখন কাফকো কিংবা কেইপিজেড এর মতো বিদেশী বিনিয়োগকারীরা বেশি দামে গ্যাস কিনে নিয়ে গেলে জ্বালানি খাতে জনগণের যে সংকট সেটা কিভাবে লাঘব হবে? জনগণ কি প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ পাবে, রাষ্ট্রীয় সার বা বিদ্যূৎ কারখানা কি এর ফলে বাড়তি গ্যাস পাবে? ফলে এটা পরিস্কার এই চুক্তির ফলে বহুজাতিক সান্তোস বাংলাদেশের জনগণের সম্পদ গ্যাস বিক্রি করে বিপুল মুনাফা অর্জন করলেও বাংলাদেশের জাতীয় প্রতিষ্ঠানগুলো প্রয়োজনীয় গ্যাসটুকু পাবে না। যখন গ্যাসের অভাবে সরকারি গ্যাস কারখানা কিংবা বিদ্যুৎ কেন্দ্র বন্ধ থাকবে, তখনও অর্থের জোরে বেসরকারী কিংবা বিদেশী কোম্পানি সান্তোসের কাছ থেকে গ্যাস কিনে নেবে।

এভাবে এই চুক্তির মাধ্যমে পেট্রোবাংলা তথা সরকার শুধু নিজের পায়ে (এবং জনগণের গায়ে) কুড়ালই মারলো না সাথে সাথে বলা যায় খাল কেটে কুমিরও ডেকে আনল। কারণ একবার সান্তোসকে বেসরকারি দেশি-বিদেশী কোম্পানির কাছে বেশি মূল্যে গ্যাস বিক্রি করার অনুমতি দেয়ার পর শেভরন কিংবা নাইকোর মতো অন্যান্য বহুজাতিক কোম্পানিগুলোও পেট্রোবাংলাকে পাশকাটিয়ে তৃতীয় পক্ষের কাছে বিক্রি করার আবদার শুরু করবে। ফলে দেখা যাচ্ছে জনগণের চাপে শাসক শ্রেণী বহুজাতিক কোম্পানির স্বার্থে গ্যাস এখন পর্যন্ত বিদেশে রপ্তানির সাহস না পেলেও কৌশলে দেশের ভেতরেই বিদেশী কোম্পানির কাছে বিক্রির সুযোগ করে দিয়ে পরোক্ষভাবে রপ্তানী মূল্য হাসিল অর্থাৎ দুধের স্বাদ তাদেরকে ঘোলে মেটানোর  ব্যাবস্থা করে দিলো যার ফলাফলস্বরূপ জনগণ তার সম্পদ তার নিজের প্রয়োজনে ব্যাবহার করা থেকে বঞ্চিত হবে।