Friday, August 9th, 2019

উল্টো সর্বনাশা পথে হেঁটে সরকার ‘জ্বালানি নিরাপত্তা দিবস’ পালন করে

তেল-গ্যাস খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির আহ্বায়ক প্রকৌশলী শেখ মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ্ ও সদস্য সচিব অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ আজ এক বিবৃতিতে বলেছেন- সরকার ২০১০ সাল থেকে প্রতিবছর ৯ আগস্ট ‘জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তা দিবস’ হিসেবে পালন করছে। বাংলাদেশের ইতিহাসে দিবসটির বিশেষ গুরুত্ব আছে। ১৯৭৫ সালের এই দিনে শেল অয়েল কোম্পানির কাছ থেকে ৪৫ লাখ পাউন্ড স্টার্লিংয়ে (তখনকার ১৭ কোটি ৮৬ লাখ টাকা) পাঁচটি গ্যাসক্ষেত্র কিনে নিয়েছিল সরকার। এই ক্ষেত্রগুলো হচ্ছে: তিতাস, বাখরাবাদ, রশিদপুর, হবিগঞ্জ ও কৈলাসটিলা। এই গ্যাসক্ষেত্রগুলো এখনও দেশের জ্বালানি ও বিদ্যুতের প্রধান যোগানদাতা। এই সিদ্ধান্তের পেছনে যে দর্শন কাজ করেছিল তা হল দেশের তেলগ্যাস সহ প্রাকৃতিক সম্পদ দেশের মালিকানায় রাখা, জাতীয় সক্ষমতার বিকাশ ঘটিয়ে জাতীয় সংস্থার মাধ্যমে, দেশি বিদেশি গোষ্ঠীর মুনাফার জন্য নয়, দেশের স্বার্থে সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার। আমরা উন্নয়নের এই দর্শনকে জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য অপরিহার্য মনে করি। কিন্তু আমরা ক্ষোভের সঙ্গে লক্ষ্য করছি যে, সরকার একদিকে বছর বছর ‘জ্বালানি নিরাপত্তা দিবস’ পালন করছে অন্যদিকে তার উল্টো দর্শন দিয়ে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতকে ঋণনির্ভর, পরিবেশবিধ্বংসী ও নিরাপত্তাহীন করে তুলছে।

বস্তুত জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতকে ক্রমে দেশি বিদেশি বৃহৎ কোম্পানির ব্যবসার বা মুনাফাভিত্তিক ব্যক্তি মালিকানার খাতে পরিণত করবার নীতি বাস্তবায়নের কাজ চলছে গত তিন দশক ধরে। বর্তমান সরকারের সময় তা সর্বোচ্চ গতি পেয়েছে। কোনো অর্থনৈতিক যুক্তিতে নয়, দেশের স্বার্থ রক্ষার জন্য নয়, টেকসই উন্নয়নের জন্যও নয় কিছু গোষ্ঠীস্বার্থ রক্ষায় সরকার ‘আমাদের সক্ষমতা নাই’ বলে বলে ভারত, চীন, রাশিয়া, মার্কিন সহ বিভিন্ন দেশিবিদেশি কোম্পানির হাতে এই জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাত ছেড়ে দিয়েছে। স্থলভাগে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বাপেক্স বহু বছর ধরে গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনে সাফল্য দেখালেও গত কয়েকবছরে গ্যাসকূপ খননের কাজ করানো হচ্ছে রাশিয়ার গাজপ্রম, আজারবাইজানের সোকারের মতো বিদেশি কোম্পানিকে দিয়ে।

বঙ্গোপসাগরে বিপুল পরিমাণ গ্যাস থাকা সত্ত্বেও তার অনুসন্ধানে নিজেদের জাতীয় সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ না নিয়ে সরকার একদিকে সাগরের গ্যাস রপ্তানির বিধান রেখে মার্কিন, ভারত, কোরীয়সহ বিদেশি কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি করেছে, অন্যদিকে গ্যাস সঙ্কটের অজুহাতে সুন্দরবন বিনাশী প্রকল্প, ভয়ংকর ঝুঁকি ও বিপুল ঋণের রূপপুর প্রকল্পের কাজ করছে। একই অজুহাতে আন্তর্জাতিক বাজার দরের চাইতে বেশি দামে বিদেশি কোম্পানির কাছ থেকে এলএনজি আমদানি করা হচ্ছে। সরকার যে নীতি দ্বারা জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাত পরিচালনা করছে তাতে গ্যাস ও বিদ্যুতের দামবৃদ্ধির পর্ব শেষ হবে না, বারবার বাড়াতেই হবে;একইসাথে বিদ্যুৎ উৎপাদনের নামে ঋণনির্ভর প্রাণপ্রকৃতি বিনাশী বিপজ্জনক সব প্রকল্প গ্রহণ করা হতেই থাকবে।এই দেশবিরোধী নীতি ও দুর্নীতির রাস্তা তাই কেবল গ্যাস বিদ্যুতের দামইবাড়াচ্ছে না, দেশের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ, প্রজন্মের পর প্রজন্মকে ঠেলে দিচ্ছে ভয়াবহ অনিশ্চয়তা, বিপদ ও বিপন্নতার দিকে।

জ্বালানি নিরাপত্তা দিবসের মূল দর্শন অনুযায়ী কাজ করতে হলে সর্বজনের সম্পদে শতভাগ জাতীয় মালিকানা ও শতভাগ সম্পদ দেশের কাজে ব্যবহার, দুর্নীতি করবার দায়মুক্তি আইন বাতিল করে ‘খনিজসম্পদ রফতানি নিষিদ্ধকরণ আইন’ প্রণয়ন, পিএসসি প্রক্রিয়া বাতিল করে স্থলভাগে ও সমুদ্রে নতুন নতুন গ্যাস ক্ষেত্র অনুসন্ধানে জাতীয় সংস্থাকে প্রয়োজনীয় সুযোগ, ক্ষমতা ও বরাদ্দ প্রদান, উন্মুক্ত খনন পদ্ধতি নিষিদ্ধ সহ ফুলবাড়ী চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়ন, জাতীয় সক্ষমতার বিকাশ, নবায়নযোগ্য ও অনবায়নযোগ্য জ্বালানী সম্পদের সর্বোত্তম মিশ্রণ ঘটিয়ে একটি জ্বালানী নীতি প্রণয়ন, দীর্ঘমেয়াদে নবায়নযোগ্য জ্বালানী মূলধারায় নিয়ে আসা ইত্যাদি গ্রহণই যথাযথ পথ। এই পথে গেলে কদিন পরপর গ্যাস আর বিদ্যুতের দাম বাড়াতে হবে না; রামপাল, পায়রা, মাতারবাড়ী আর রূপপুরের মতো প্রকল্প দিয়ে বাংলাদেশকে বিপদগ্রস্ত করতে হবে না; বরং জাতীয় সক্ষমতা বিকাশের মাধ্যমে সুলভে পরিবেশবান্ধব উপায়ে দেশের শতভাগ জ্বালানি ও বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণ সম্ভব হবে।

তাই ‘জ্বালানি নিরাপত্তা দিবস’ নিয়ে কপটতা ও প্রতারণা বাদ দিলে সরকারকে ব্যয়বহুল, ঝুঁকিপূর্ণ, বন-পানি-মানুষ-পরিবেশবিধ্বংসী এবং ঋণনির্ভর পথ থেকে সরে জাতীয় কমিটি প্রস্তাবিত মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে হাত দিতে হবে।