Friday, July 12th, 2019

দেশের উন্নয়ন নয়, কতিপয় গোষ্ঠীর দীর্ঘমেয়াদী লাভের জন্য গ্যাসের দাম বাড়ানো হয়েছে

তেল-গ্যাস খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির আহ্বায়ক প্রকৌশলী শেখ মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ্ ও সদস্য সচিব অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ আজ এক বিবৃতিতে বলেছেন- আমরা উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ্য করছি যে, যখন দেশের বিশেষজ্ঞসহ বিভিন্ন পর্যায়ের মানুষেরা গ্যাসের মুল্যবৃদ্ধি কেন দেশের জন্য ক্ষতিকর, কেন অযৌক্তিক এবং কেন উন্নয়ন বিরোধী তার বিস্তারিত যুক্তি বিভিন্ন মাধ্যমে তুলে ধরছেন তখন সেসব যুক্তি ও দাবির প্রতি কোনো গুরুত্ব না দিয়ে প্রধানমন্ত্রী গতকালও জাতীয় সংসদে গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধিকে যৌক্তিক ও উন্নয়নের জন্য অপরিহার্য বলেছেন। 

এই সরকারের কয়েক পর্বে গত ১০ বছরে গ্যাসের দাম বেড়েছে সাতবার। সেইসাথে বেড়েছে বিদ্যুতের দাম। গ্যাসের অযৌক্তিকভাবে দাম বাড়ালে শুধু যে গ্যাস ব্যবহারকারীদের ওপর চাপ বাড়ে তাই নয়, পরিবহন-শিল্পপণ্য-বিদ্যুৎ-বাসাভাড়া বৃদ্ধির মাধ্যমে সকল পর্যায়ের মানুষের উপর চাপ পড়ে। উৎপাদনশীল খাত ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তার প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমে। সমগ্র অর্থনীতিই এভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। উল্লেখযোগ্য যে, বিশ্ববাজারে গ্যাসের দাম যখন কমেছে ৫০ শতাংশ, তখনই বাংলাদেশে বাড়ানো হল প্রায় ৩৩ শতাংশ। 

জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রী আরও বলেছেন, ‘আমাদের ৭৫ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধি করার প্রয়োজন ছিল। কিন্তু সেটা করা হয়নি। আমাদের প্রতি ঘনমিটারের এলএনজি আমদানির মূল্য পড়ছে ৬১ দশমিক ১২ টাকা। কিন্তু সেখানে আমরা নিচ্ছি ৯ দশমিক ৮০ টাকা।’ তিনি এও বলেছেন যে, ‘দেশের নিজস্ব প্রাকৃতিক গ্যাস প্রতি ঘনমিটারে উৎপাদন খরচ হয় ৭ দশমিক ৫০ টাকা।’ আমাদের প্রশ্ন যেখানে দেশের প্রাকৃতিক গ্যাস উত্তোলন করলে বর্তমানের চাইতেও খরচ কমে যাবার কথা সেখানে ৭ টাকার জায়গায় কেন ৬১ টাকা খরচ করা হচ্ছে? শুধু তাই নয়, কেন সেই এলএনজিও বিশ্ববাজারের দামের চাইতে অনেক বেশি দামে কিনছে বাংলাদেশ? প্রতি ইউনিট এলএনজি স্পট মার্কেটে যেখানে ৬ থেকে সাড়ে ৬ ডলারের মধ্যে, সেখানে গড়ে সাড়ে ৯ ডলারে কিনছে সরকার। কেন? দায়মুক্তি আইন দিয়ে উন্মুক্ত প্রতিযোগিতা বা দরপত্রের বদলে সরাসরি চুক্তির মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি এসব এলএনজি কেনার চুক্তির কারণে দেশের বাড়তি টাকা খরচ হচ্ছে। কেন ‘এ জন্য প্রতি বছর ৩০ হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত দিতে’ হচ্ছে দেশের মানুষকে? 

প্রকৃতপক্ষে গত দশ বছরে দেশের নিজস্ব গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনে কোনো কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়নি। সমুদ্রের গ্যাস অনুসন্ধানে বিদেশি কোম্পানি নির্ভরতার কারণে জাতীয় সক্ষমতা বৃদ্ধির বদলে দেশের সক্ষমতার পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা হয়েছে। এমনকি স্থলভাগে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বাপেক্স বহু বছর ধরে গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনে সাফল্য দেখালেও গত কয়েকবছরে গ্যাসকূপ খননের কাজ করানো হচ্ছে রাশিয়ার গাজপ্রম, আজারবাইজানের সোকারের মতো বিদেশি কোম্পানিকে দিয়ে। যেখানে বাপেক্সের প্রতিটি কূপ খননে লাগে ৬০ থেকে ৮০ কোটি টাকা, সেখানে বিদেশি কোম্পানি বাংলাদেশ থেকে নিচ্ছে ২৫০ থেকে ৩০০ কোটি টাকা। সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী সারা দেশের স্থলভাগে কূপ যদি গাজপ্রম ও অন্যান্য বিদেশি কোম্পানিকে দিয়ে করা হয়, তাহলে দেশের আর্থিক ক্ষতি হবে ১০ হাজার কোটি টাকার বেশি। কেন আমরা এই নীতি মানবো? 

দেশে এলপিজি বা সিলিন্ডার ব্যবসার প্রসার ঘটছে। এই ব্যবসার সাথে জড়িত আছে প্রভাবশালী ঋণখেলাপিরা। গ্যাসের দাম বাড়ালে এলএনজি আমদানিকারকসহ তাদেরও ব্যবসার প্রসার ঘটবে। এছাড়া গ্যাসের অবিরাম দামবৃদ্ধির আর কোনো যুক্তি নেই। 

সরকার দেশের বিদ্যুৎ চাহিদা মেটানোর জন্য জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে দামবৃদ্ধিসহ বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিচ্ছে বলে দাবি করে। সরকার যে নীতি দ্বারা জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাত পরিচালনা করছে তাতে গ্যাস ও বিদ্যুতের দামবৃদ্ধির পর্ব সহজে শেষ হবে না, বারবার বাড়াতেই হবে। শুধু তাই নয় বিদ্যুৎ উৎপাদনের নামে ঋণ নির্ভর প্রাণপৃকতি বিনাশী বিপজ্জনক সব প্রকল্প গ্রহণ করা হচ্ছে। বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণ করেও উদ্বৃত্ত উৎপাদনের অনেক ভালো পথ অবশ্যই আছে। আমরা এসব বিষয়ে বারবার সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছি, বিকল্প প্রস্তাবনাও দিয়েছি। সর্বজনের সম্পদে শতভাগ জাতীয় মালিকানা ও শতভাগ সম্পদ দেশের কাজে ব্যবহার, দুর্নীতি করবার দায়মুক্তি আইন বাতিল করে ‘খনিজসম্পদ রফতানি নিষিদ্ধকরণ আইন’ প্রণয়ন, পিএসসি প্রক্রিয়া বাতিল করে স্থলভাগে ও সমুদ্রে নতুন নতুন গ্যাস ক্ষেত্র অনুসন্ধানে জাতীয় সংস্থাকে প্রয়োজনীয় সুযোগ, ক্ষমতা ও বরাদ্দ প্রদান, রাষ্ট্রীয় বিদ্যুৎ প্ল্যান্ট মেরামত ও নবায়ন, উন্মুক্ত খনন পদ্ধতি নিষিদ্ধসহ ফুলবাড়ী চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়ন, জাতীয় সক্ষমতার বিকাশ, নবায়নযোগ্য ও অনবায়নযোগ্য জ্বালানি সম্পদের সর্বোত্তম মিশ্রণ ঘটিয়ে একটি জ্বালানি নীতি প্রণয়ন, দীর্ঘমেয়াদে নবায়নযোগ্য জ্বালানি মূলধারায় নিয়ে আসা ইত্যাদিই যথাযথ পথ। এর মাধ্যমেই দীর্ঘমেয়াদে টেকসই, সুলভ, নিরাপদ এবং জনবান্ধব উন্নয়ন ধারা তৈরি করা সম্ভব। প্রস্তাবিত বিকল্প খসড়া পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করলে কদিন পরপর গ্যাস আর বিদ্যুতের দাম বাড়াতে হয় না, রামপাল, পায়রা, মাতারবাড়ী আর রূপপুরের মতো প্রকল্প দিয়ে বাংলাদেশকে বিপদগ্রস্ত করতে হয় না। বরং সুলভে পরিবেশবান্ধব উপায়ে দেশের শতভাগ জ্বালানি ও বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণ সম্ভব হবে। 

আমরা সরকারকে ব্যয়বহুল, ঝুঁকিপূর্ণ, বন-পানি-মানুষ-পরিবেশবিধ্বংসী এবং ঋণনির্ভর পথ থেকে সরে আসার দাবি জানাচ্ছি। কেননা এতে কিছু দেশি বিদেশি গোষ্ঠীর লাভ হলেও দেশের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ, প্রজন্মের পর প্রজন্মকে ঠেলে দেয়া হচ্ছে ভয়াবহ অনিশ্চয়তা, বিপদ ও বিপন্নতার দিকে।