Tuesday, April 13th, 2010

উন্মুক্ত কয়লা খনন: বৈদেশিক দাওয়াই এর গুণবিচার- জার্মানি, অষ্ট্রেলিয়া, কলম্বিয়ার অভিজ্ঞতা

বারোমেসে রোগীর মতই সারাবছর নানান সংকটে ভুগছে বাংলাদেশ। জ্বালানী সমস্যা এরকমই একটি ক্রনিক সমস্যা। ঝাড়ফুঁক, পানি-পড়া দিয়ে চিকিৎসার মতই রেন্টাল, কুইক রেন্টাল ইত্যাদি নানান দাওয়াই দিয়ে চলেছে সরকার। সর্বশেষ যে দাওয়াইয়ের সিদ্ধান্তের কথা গত ৭ মে, ২০১০ এর প্রথম আলো মারফত জানা যায়, তা হলো উন্মুক্ত খননের মাধ্যমে কয়লা উত্তোলন। অবশ্য এবার ফুলবাড়ি-বড়পুকুরিয়ার উন্মুক্ত অপারেশনের দ্বায়িত্ব এশিয়া এনার্জির মতো কোন ”হাতুড়ের” হাতে নয়, দেয়া হচ্ছে শতবছরের অভিজ্ঞতা সম্পন্ন জার্মান কোম্পানির হাতে। গত ১০ এপ্রিল, ২০১০ জার্মান সংসদীয় দলের ফুলবাড়ি সফর, বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশ থেকে সরকারী-বেসরকারী পর্যায়ে জার্মান উন্মুক্ত খননের অভিজ্ঞতা অর্জনের সফর, সেমিনার এবং পত্রপত্রিকার মাধ্যমে জার্মান কোম্পানি আরডব্লিউই এজি’র প্রধান ভূ-তাত্ত্বিক মাস ভন সোয়ার্জেনবাগ কর্তৃক ফুলবাড়ি-বড়পুকুরিয়ায় একটি অভিন্ন উন্মুক্ত কয়লা খনির পরামর্শ ইত্যাদি ঘটনা এরই আলামত। এদের যুক্তি হলো- জার্মানী যেহেতু নিজেদের দেশে দীর্ঘদিন ধরে সফলতার সাথে উন্মুক্ত খনি থেকে কয়লা উত্তোলন করে আসছে সেহেতু বাংলাদেশ জার্মানির স্মরণাপন্ন হলে তারা ফুলবাড়ি-বড়পুকুরিয়া থেকে পরিবেশ সম্মত ভাবে উন্মুক্ত খননের মাধ্যমে সর্বোচ্চ পরিমাণ কয়লা উত্তোলন করে দিতে পারবে।

সাম্প্রতিক জার্মান তৎপরতা:”উন্মুক্ত খনির ব্যাপারে আমাদের নিজস্ব কোন অর্থনৈতিক স্বার্থ নেই। যতদূর জানি, বাংলাদেশ সরকার যে কোন মূল্যে উন্মুক্ত খনি করবে বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এখন আমাদের কাছে যদি আপনাদের সরকার কারিগরী পরামর্শ সহ অন্যান্য সহযোগীতা চান তাহলে আমরা সানন্দে এ বিষয়ে সরকারকে সহযোগীতা করবো। আমরা জার্মানিতে বেশ সফলতার সাথে উন্মুক্ত খনি খনন এবং এর নানান পরিবেশগত দিক সামাল দিয়েছি। এখন আমরা যদি এই উন্মুক্ত খনি প্রকল্পে অংশ না নেই তাহলে তো সেটা থেমে যাবে না, আর কেউ এসে ঠিকই কাজটি করবে। ধরেন, যদি চীন আসে তাহলে তো তারা আমাদের মতো আপনাদের কাছে কোন মতামত শুনতে আসবে না, তাদের কাছে মুনাফাই মূল।” ১ কথাগুলো বলছিলেন বাংলাদেশে জার্মান দূতাবাসের ফার্স্ট সেক্রেটারি এবং উন্নয়ণ সহায়তা কমিটির প্রধান হানস হাইনরিখ ¯েকèলে ফুলবাড়ীর সড়ক ও জনপদ বিভাগের  ডাকবাংলোতে বসে। সেখানে গত ১০ এপ্রিল ২০১০ তারিখে ৫ সদস্যের একটি জার্মান প্রতিনিধি দলের সাথে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আমিনুল ইসলাম বাবলু সহ স্থানীয় আন্দোলনকারী জনগণের সাথে একটি মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির স্থানীয় নেতৃবৃন্দও সভায় উপস্থিত ছিলেন। সভায় উপস্থিত ফুলবাড়ীবাসীর পক্ষ থেকে জানতে চাওয়া হয়, স্থানীয় জনসাধারণের মতামত উপেক্ষা করে এবং ২০০৬ সালে অনুষ্ঠিত ফুলবাড়ী চুক্তি ভঙ্গ করে যদি সরকার উন্মুক্ত খনি করতে চায় তাহলে তারা এতে অংশ নেবে কি-না। জাবাবে বাংলাদেশে জার্মান রাষ্ট্রদূত বলেন: ”এই মূহূর্তে এই হাইপোথ্যাটিক্যাল প্রশ্নটির উত্তর দেয়া তাদের পক্ষে সম্ভব নয়।” প্রতিনিধি দলে উপস্থিত রক্ষণশীল দলের সংসদ সদস্য জুরগেন ক্লিমকে এবং জার্মান রাষ্ট্রদূত হোলগেন মাইকেল উভয়ই যদিও দাবী করেছেন তারা তাদের দেশে সফল ভাবে উন্মুক্ত খনির মাধ্যমে কয়লা উত্তোলন করেছেন, প্রতিনিধি দলের আরেক সদস্য, জার্মান লেফট পার্টির এমপি, নিইমা মোভাসাত স্বীকার করেছেন, ”জার্মানীতে উন্মুক্ত খনির পরিবেশগত সমস্যা আগেও যেমন ছিল, এখনও এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ প্রতিরোধ অব্যহত আছে।” একই দিনে প্রধানমন্ত্রী শেখহাসিনা জ্বালানী মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সাথে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে বড়পুকুরিয়ায় বাংলাদেশের প্রথম উন্মুক্ত খনি খননের বাসনা ব্যাক্ত করেন। বৈঠকে তিনি কেমন করে উন্মুক্ত খনির পরিবেশগত বিপর্যয়ের বিষয়টিকে মোকাবেলা করা যায় সে বিষয়ে কথাবার্তা বলেন বলে জানা যায়। এর ঠিক তিনদিন পর গত ১৩ এপ্রিল ”দ্য ফাইনান্সিয়াল এক্সপ্রেস” পত্রিকায় জার্মানির আরডব্লিউই এজি কোম্পানির প্রতিনিধি ড.থমাস ভন সোয়ার্জেনবার্গ এর একটি প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়। ”কোল মাইনিং ইন ওপেন পিট: এক্সপেরিয়ান্স ইন জার্মানি চ্যালেঞ্জ ইন বাংলাদেশ” শীর্ষক প্রবন্ধটিতে লেখক জার্মান আরডব্লিউই এজি কোম্পানি কর্তৃক ”পরিবেশ সম্মত ভাবে” ফুলবাড়ি-বড়পুকুরিয়া অঞ্চলে উন্মুক্ত কয়লা খনির সম্ভাবনার কথা বয়ান করেন। বড়পুকুরিয়া এবং ফুলাবাড়ি একই কোল বেড ইউনিটের অর্ন্তভূক্ত বলে মন্তব্য করে এই এলাকার উন্মুক্ত খনির সম্ভাব্য রোড ম্যাপ সম্পর্কে তিনি বলেন:” কয়লা খননে দেরী করতে না চাইলে, প্রথমে ফুলবাড়িকে দিয়েই শুরু করা উচিত যেহেতু ফুলবাড়ি অঞ্চল নিয়ে ইতোমধ্যেই সবচেয়ে ভালো গবেষণাগুলো হয়েছে। উন্মুক্ত খনিটির ডিজাইন এমন হওয়া উচিত যেন ফুলবাড়ি থেকে উন্মুক্ত খনন করতে করতে বড়পুকুরিয়ার দিকে যাওয়া যায়..”। বড়পুকুরিয়া এবং ফুলাবাড়ি অঞ্চলের কয়লার গভীরতা এবং হাইড্রোলজিক্যাল বৈশিষ্ট্যের সাথে তিনি আরডব্লিউই এজির জার্মানিতে করা উন্মুক্ত খনির মিল নির্দেশ করে তিনি বলেন: ”বাংলাদেশের ক্ষেত্রে আরেকটি বড় সমস্যা দাড়াবে পুনর্বাসন। যে পদ্ধতিতে এ কাজটি করা হয় তা জার্মানিতে আরডব্লিউ এজি গত ৫০ বছরেরও বেশি সময় ধরে সম্পন্ন করে আসছে। বাংলাদেশের কয়লার গভীরতাও আরডব্লিউই পরিচালিত কয়লা খনিগুলোর  মতোই ৩০০ মিটারের বেশী গভীর…”।২

বাংলাদেশের সাথে তুলনা প্রসঙ্গে: থমাস ভন সাহেব গভীরতার মিলের কথা বললেও উল্ল্যেখ করতে ভুলে গেছেন  জনসংখ্যার ঘনত্ব এবং বিভিন্ন ভূ-তাত্ত্বিক ও হাইড্রোলজিক্যাল বৈশিষ্টগত পার্থক্যের কথা, যেগুলো আমলে নিলে দেখা যায় উন্মুক্ত খনন বিষয়ে জার্মানির সাথে বাংলাদেশের কোন তুলনাই হতে পারে না। জার্মানিতে প্রতিবর্গ কিমি এ জনসংখ্যার ঘনত্ব ২৩২ এবং বাংলাদেশে ১০৬৩। জনসংখ্যার এই গড় ঘনত্ব বিবেচনায় নিলে উন্মুক্ত খননে জার্মানির তুলনায় বাংলাদেশে অন্তত: পাঁচ গুনেরও বেশি মানুষকে উচ্ছাদ করতে হবে। থমাস ভন সাহেবের কোম্পানি আরডব্লিউই কর্তৃক পরিচালিত যে হামবাক উন্মুক্ত কয়লা খনিটিকে মডেল হিসেবে ধরে বাংলাদেশের বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যাক্তিবর্গকে ঘুরিয়ে এনে উন্মুক্ত খনির পক্ষে মতামত গঠনের চেষ্টা করা হচ্ছে সেই হামবাক খনিটিতে মাটির ৪৫০ মিটার পর্যন্ত গভীরতায় ২.৩ বিলিয়ন টন লিগনাইট কয়লা সঞ্চিত আছে। এই উন্মুক্ত খনির ফলে মোট ৮৫ বর্গ কিমি এলাকা খনন করা হবে যার ফলে মোট ৫,২০০ স্থানীয় অধিবাসীকে উচ্ছেদ করতে হবে।৩ অন্যদিকে বাংলাদেশের ফুলবাড়িতে উন্মুক্ত খনি করা হলে ৬০ বর্গকি.মি এলাকা থেকে উচ্ছেদ করতে হবে এশিয়া এনার্জির হিসেবেই ৪৯,৪৮৭ জনকে যদিও বাংলাদেশ সরকার গঠিত বিশেষজ্ঞ কমিটির রিপোর্ট অনুসারে এভাবে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্থের সংখ্যা ১,২৯,৪১৭ জন এবং পরোক্ষভাবে পরিবেশ বিপর্যয়কে আমলে নিলে মোট ক্ষতিগ্রস্থের সংখ্যা দাড়ায় ২,২০,০০০ জন! ৪

ভূ-তত্ত্বিক এবং হাইড্রোলজিক্যাল বৈশিষ্ট অনুসারেও বাংলাদেশের ফুলবাড়ি-বড়পুকুরিয়ার সাথে জার্মানির হামবাক খয়লা খনি অঞ্চলের রয়েছে ব্যাপক পার্থক্য। ফুলবাড়ি-বড়পুকুরিয়ার কয়লা স্তরের উপরের পানি ধারণকারী  স্তরটি হলো আপার ডুপিটিলা একুইফার। এই একুইফারের সাথে জার্মানির হামবাখ কয়লাখনির একুইফারের পার্থক্য হলো এটি জার্মানিরটির মতো আবদ্ধ বা কনফাইন্ড নয়, এটি আনকনফাইন্ড অর্থাৎ এর উপরে ওয়াটার টেবিল বা পানির স্তর আছে। আমরা জানি উন্মুক্ত খনি খননের একটি অত্যাবশ্যকীয় শর্ত হলো পাম্পের মাধ্যমে পানি সরিয়ে ওয়াটার টেবিল বা পানির স্তরকে নীচে নামানো যেন খনির কয়লা পানি বিহীন অবস্থায় উত্তোলন করা যায়। ফলে একুইফার ভিন্ন ধরনের হওয়ার কারণে জার্মান অভিজ্ঞতার সাথে বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা মেলানোর কোন যুক্তি নেই। আরেকটি বিষয় হলো ভূ-তাত্ত্বিক কাঠামোর পার্থক্য। হামবাক কয়লা খনি অঞ্চলের ভূ-তাত্ত্বিক কাঠামোয় ফাটলের পরিমাণ কম এবং বিচ্যুতি গুলো ১৫ মি এর বেশি নয় কিন্তু ফুলবাড়ি-বড়পুকুরিয়া অঞ্চলের ফাটলের পরিমাণ বেশি এবং বিচ্যুতি খাড়া ভাবে ১৫০ মিটারেরও বেশি।৫ ফলে জনসংখ্যার ঘনত্ব ছাড়াও জিওলজিক্যাল এবং হাইড্রোলজিক্যাল দিক থেকেও জার্মানির সাথে বাংলাদেশের কোন তুলনা চলে না।

গত ১৫ থেকে ২৪ এপ্রিল  তারিখে জার্মানির রাইনল্যান্ডে আরডব্লিউই পরিচালিত ইনডেন উন্মুক্ত কয়লা  খনি পরিদর্শন করে আসা ফুলবাড়ির উপজেলা চেয়ারম্যান আমিনুল ইসলাম বাবলু জানান সেখানকার মাটি পাথুরে, জনসংখ্যার ঘনত্ব খুবই কম ফলে কেবল ৪,৫০০ মানুষকে উচ্ছেদ করতে হয়েছে। ফলে সেখানকার পাথুরে মাটি, আবহাওয়া, কৃষিজমি ও কৃষিকাজের উপর নির্ভরশীলতা ইত্যাদি বিবেচনায় নিলে বাংলাদেশের সাথে জার্মানির তুলনাই চলেনা। তাছাড়া সেখানেও উন্মুক্ত খননের প্রতিক্রিয়ায় আশপাশের ৬ কিমি এলাকায় কোন জনবসতি নেই, কাছেপিঠে কোন কৃষিজমিও তাঁর চোখে পড়েনি। ফলে যারা বলছেন জার্মানিতে সফলতার সাথে উন্মুক্ত খনি করা হয়েছে , ফলে বাংলাদেশেও সম্ভব, তিনি তাদের সাথে একমত না।

অথচ বারবার এই কথাগুলো বিভিন্ন ভাবে পরিস্কার করার পরও যেহেতু এখনও জার্মানিকে উন্মুক্ত কয়লা খনির আদর্শ মডেল হিসেবে হাজির করার প্রচেষ্টাটি জারি রয়েছে সেকারণেই আমরা উন্মুক্ত পদ্ধতির ”আদর্শ” খোদ জার্মানির জনগণ ও পরিবেশের উপর উন্মুক্ত খনন পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলনের ফলাফলটুকু একটু যাচাই বাছাই করে দেখা জরুরী বলে মনে করছি।

জার্মান উন্মুক্ত কয়লা খনি৬  :ফেডারেল মাইনিং এক্টের  মাধ্যমে জার্মানিতে উন্মুক্ত খনন পদ্ধতিতে লিগনাইট কয়লা উত্তোলন করা হয়। এই মাইনিং এক্টের আওতায় প্রায় ৩০০’রও বেশি স¤প্রদায়কে উচ্ছেদ করা হয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ এবং পরবর্তীতে ১৯৭৯-৮০ সালের সময়কার তেল সংকটকে কাজে লাগিয়ে বিকল্প জ্বালানি হিসেবে কয়লা উত্তোলন বেগবান করার অযুহাতে এ আইনের আওতায় উন্মুক্ত কয়লা খনি জায়েজ করা হয়েছে। পূর্ব জার্মানির লুসিটিয়াতে ওপেনপিট লিগনাইট মাইনিং করছে ভ্যাটেনফল, পশ্চিম জার্মানির রাইনল্যান্ডে করছে আরডব্লিউই এজি এবং জার্মানির মধ্যাঞ্চলে কাজ করছে মিবরাগ কর্পোরেশন।ভ্যাটেনফল কর্পোরেশনটির মালিক সুইডেনের রাষ্ট্রীয় কোম্পানি ভ্যাটেনফল ইউরোপ এজি এবং মিবরাগ কর্পোরেশনের মালিক ন্যাদারল্যান্ডের মিবরাগ বিভি নামের হোল্ডিং কোম্পানির মাধ্যমে আসলে যুক্তরাষ্ট্র। আর আরডব্লিউই এজি হলো জার্মান কোম্পানি।
উচ্ছেদ: উন্মুক্ত খনির ফলে ভূ-পৃষ্টের গঠন পাল্টে যায় এবং ভূ-পৃষ্টে বসবাসরত মানুষের জীবন ও সংস্কৃতি ধবংস হয়। উন্মুক্ত খনির ফলে জার্মানিতে এ যাবত কতগুলো গ্রাম ধবংস হয়েছে তার কোন পূর্ণাঙ্গ হিসাব করা হয়নি,  এ কাজটি করার জন্য জর্মান সরকারেরও কোন মাথা ব্যাথা নেই। বেসরকারী ভাবে গ্রীন লীগ নামের পরিবেশবাদী সংগঠনের হিসেবে দেখা যায় উন্মুক্ত কয়লা খনির ফলে শুধু লুসাটিনিয়ান মাইনিং এলাকা থেকেই এ পর্যন্ত ১৩৬ টি স¤প্রদায়ের ২৫,০০০ মানুষকে স্থানান্তরিত করতে হয়েছে, যার মধ্যে ৮১ টি স¤প্রদায় একেবারেই নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। সোর্ব সাংস্কৃতিক সংগঠন ’দমোভিনা’র হিসেবে ১৯২৪ সাল থেকে লুসাটিনিয়া অঞ্চলে উন্মুক্ত খনির ফলে মোট ১২৩ টি গ্রাম ধবংস হয়েছে।

মধ্য জার্মানিতে উন্মুক্ত খননের মাধ্যমে ১২০ টি স¤প্রদায় ধবংস করা হয়েছে এবং মোট ৪৭,০০০ এর বেশি মানুষকে বাস্তুচ্যুত করা হয়েছে। কেবল লিপজিগ এর দক্ষিণ দিকেই ১৯২৪ সাল থেকে মোট ৬৬ টি গ্রাম ধবংস করা হয়েছে এবং ২৩,০০০ এর ও বেশি মানুষকে বাস্তুচ্যূত করা হয়েছে।

ফ্রেন্ডস অব দ্য আর্থ এর জার্মান শাখা বুন্দ(BUND) হিসেব করেছে রাইন ল্যান্ডে ১৯৮৫ সালের আগেই ৫০টিরও বেশি
গ্রাম ধবংস করা হয়েছে এবং ৩০,০০০ এরও বেশি মানুষকে উচ্ছেদ করা হয়েছে। বুন্দ এর হিসেবে জার্মান লিগানাইট মাইনিং এর মাধ্যমে  ৩০০ এর বেশি স¤প্রদায়ের ১ লক্ষরও বেশি মানুষকে উচ্ছেদ করা হয়েছে।

২০০৪ সালে পোলিশ সীমান্তের কাছে পূর্ব জার্মানির ঐতিহ্যবাহী হর্নো গ্রামের সোর্ব আদিবাসীদের নৃতাত্তিক ঐতিহ্য এবং ঐতিহাসিক স্থাপনা সংরক্ষণের ধারে কাছে না গিয়ে ভ্যাটেনফল সেখানে উন্মুক্ত খনি করে। লাকোমা সেটেলমেন্টের নিকটবর্তী অঞ্চলটি ইউরোপীয় ইউনিয়ন ঘোষিত সংরক্ষিত জলাভূমি এবং গুরুত্বপূর্ণ পাখি-অঞ্চল বলে বিবেচিত হলেও ভ্যাটেনফল উন্মুক্ত খনি খনের প্রস্তুতি হিসেবে সে অঞ্চলের ভূ-গর্ভ থেকে পানি উত্তোলন করে। একই ভাবে মিবরাগ কর্পোরেশন স্যাক্সোনির হিউয়েরসডরফ এর মতো প্রাচীন গ্রাম ধবংস করেছে। আর আরডব্লিউই কোম্পানি ২০৪৫ সাল নাগাদ গর্জভইলার-২ খনির বিস্তারের জন্য মোট ১৮ টি স¤প্রদায়ের ৮০০০ অধিবাসীকে  উচ্ছেদ করার পরিকল্পনা করেছে।

বর্তমানে আরডব্লিউই পরিচালিত রাইনল্যান্ডের হামবাখ কোয়ারিকে কিছু দিন আগ পর্যন্তও বলা হতো ”দুনিয়ার সবচেয়ে বড় মানব নির্মিত গর্ত।”বর্তমানে অবশ্য কলম্বিয়ার কেরেজন মাইন তার দখল করেছে। হামবাখ কোয়ারিতে মাটির ৪৫০ মিটার পর্যন্ত গভীরতায় ২.৩ বিলিয়ন টন লিগনাইট কয়লা সঞ্চিত আছে। একেকটি ১৩,০০০ টন ক্ষমতার  মোট ৮টি খনন যন্ত্র সেখানে কাজ করছে। এই উন্মুক্ত খনির ফলে মোট ৮৫ বর্গ কিমি এলাকা খনন করা হবে যার মধ্যে ৪০ বর্গ কিমি জুড়ে হামবাখ বনভূমিও রয়েছে। এই বনভূমির মাত্র ১৫ কিমি এলাকা খননের হাত থেকে রক্ষা পাবে। এই খনির জন্য ৪৫ বিলিয়ন ঘনমিটার পানি মাটির নীচ থেকে উত্তোলন করা হবে এবং মোট ৫,২০০ স্থানীয় অধিবাসীকে সরানো হবে। এই উন্মুক্ত খনি থেকে কয়লা উত্তোলন করা হচ্ছে ৩,৮৬৪ মেগাওয়াট ক্ষমতার জার্মানির সর্ববৃহৎ কয়লা-বিদ্যুৎ কেন্দ্র চালানোর জন্য।

বেকারত্ব: উন্মক্ত খনন পদ্ধতি অধিকতর ভরি যন্ত্রপাতি নির্ভর হওয়ায় এ পদ্ধতিতে কর্মসংস্থান নষ্ট হওয়ার তুলনায় নতুন কর্ম সংস্থান তৈরী হওয়ার হার সামান্য। ফলে জার্মানি, যুক্তরাষ্ট্র , অষ্ট্রেলিয়া সহ যে সব দেশেই উন্মুক্ত খনি হয়েছে সেখানে খনি অঞ্চলে বেকারত্ব বৃদ্ধি পেয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের খনি এলাকা গুলোতে দেশের গড় বেকারত্বের হারের চেয়ে বেশি বেকারত্ব লক্ষ করা গেছে। জার্মানির পূর্ব দিকে ভ্যাটেনফল পরিচালিত চারটি অঞ্চলেই বেকারত্বের অভিশাপ জার্মানির অন্যান্য এলাকার চেয়ে বেশি। যন্ত্রপাতির আধুনিকায়ন ও কর্মদক্ষতা বৃদ্ধির ফলে এই হার বেড়েই চলেছে। ১৯৯০ সালের পর পূর্ব জার্মানিতে উন্মুক্ত খয়লা খনির উৎপাদনশীলতা ৪ গুণ বৃদ্ধি পাওয়ায় বেকারত্বের হারও বেড়েছে। ১৯৮০ সালে খনিগুলোতে যেখানে ১ লক্ষ ৪০ হাজার লোকের কর্মসংস্থান ছিল, বর্তমানে কর্পোরেট উন্মুক্ত খনিগুলোতে স্রেফ ১০/১২ হাজার লোকের কর্মসংস্থান হচ্ছে। ২০০৪ সালের জুন মাসে ভ্যাটেনফল এর কর্মী সংখ্যা ছিল ৮,৪৯০ জন। ২০০৬ সালে এসে সে সংখ্যা দাড়ায় ৭.৮৬০ জন। অন্যদিকে মিবরাগ কর্পোরেশনের কর্মী সংখ্যা ২০০৪ এর মার্চ নাগাদ ছিল ২,১৪৮ জন।

মরুকরণ ও পরিবেশ বিপর্যয়: উন্মুক্ত খনি খননের একটি অত্যাবশ্যকীয় শর্ত হলো ওয়াটার টেবিল বা পানির স্তরকে নীচে নামানো যেন খনির কয়লা পানি বিহীন অবস্থায় উত্তোলন করা যায়। আর ওয়াটার টেবিল নীচে নামানোর জন্য খনি এলাকা থেকে পাম্পের মাধ্যমে পানি তুলে অনত্র সরিয়ে ফেলা হয়। জার্মানিতে এরকম হাজার হাজার পাম্পের মাধ্যমে এই পানি উত্তোলন ও মরুকরণ চলছে।

জার্মানিতে প্রতি একটন কয়লা/ওভার বার্ডেন উত্তোলনের জন্য মাটির নীচ থেকে এক ঘর্নমিটার পানি সরিয়ে ফেলতে হয়। এভাবে উন্মুক্ত খনির মাধ্যমে প্রতিবছর ৬৫০ মিলিয়ন ঘনমিটার পানি মাটির নীচ থেকে সরিয়ে ফেলা হচ্ছে। এই পানিকে পাইপের মাধ্যমে জলাভূমিতে সঞ্চলাতি করে পরবর্তীতে আবার কয়লা তোলা শেষে উন্মুক্ত খনি এলাকায় ফেরত আনা হলেও ফলাফল অনিশ্চিত। খনন কাজ শেষে খনি এলাকায় একটা কৃত্রিম ভূমি জেগে উঠে যার উর্বরতা, জৈব-অজৈব বৈশিষ্ট ফিরে পেতে হয়তো হাজার বছরেরও বেশি সময় লাগবে। ব্য্রান্ডেনবার্গ এর পরিবেশ সংস্থার সভাপতি ম্যাথিয়াস ফ্রিউয়েড ২০০৪ সালে রাজ্য সভা বা স্টেট এসেম্বলিকে জানিয়েছিলেন গত সত্তর বছরে রাজ্যটির ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর গড়ে ১ মিটার নেমে গিয়েছে অর্থাৎ ২৯,৪৭৭ বর্গ কিমি এলাকা থেকে প্রায় ৩০ বিলিয়ন ঘনমিটার পানি সরিয়ে নেয়া হয়েছে। তিনি কারণ হিসেবে উন্মুক্ত খনি ছাড়াও চাষাবাদ, শিল্পায়নকেও নির্দেশ করেছিলেন। এভাবে গোটা জার্মানিতে ৮০ বিলিয়ন ঘনমিটার সমপরিমাণ পানির স্তর নিচে নেমে গেছে।

আর এভাবে পানির স্তর নীচে নেমে যাওয়ার ফলাফল হয়েছে মারাত্মক। জার্মান-ন্যাদারল্যান্ড জলাভূমির Maas-Schwalm-Nette এর প্রাকৃতিক পানি চক্র ইতোমধ্যেই ধবংস হয়ে গেছে। ফলে চাষাবাদ পুরোটাই কৃত্রিম জলসেচের উপর নির্ভরশীল। এলাকার বাস্তুসংস্থান এবং তার সাথে সম্পর্কিত প্রাণী ও গাছপালার অস্তিত্ব হুমকীর মুখে। ভূগর্ভস্থ পানির অভাবে অনেক ঝর্না শুকিয়ে গেছে, অনেক আদ্র অঞ্চল শুকনো হয়ে গেছে। শত বছরেও এ অবস্থার অবসান হবে কিনা সন্দেহ আছে। ১০০০ বছরেরও পুরোনো ১০ হাজার একরের হামাবাখ বনভূমি ২০২০ সাল নাগাদ পুরোপুরি ধবংস হয়ে যাবে। অথচ ইউরোপীয় ইউনিয়নের ডিরেক্টিভ 92/ 43/EEC অনুসারে Maas-Schwalm-Nette জলাভূমি এবং হামবাখ বনভূমি উভয়ই হলো সংরক্ষিত অঞ্চল।

জার্মানির  উন্মুক্ত খনির পরিত্যক্ত খাতকে কৃত্রিম লেক এ পরিণত করার জন্য প্রয়োজনীয় পানির ৮৫% ই সংগ্রহ করা হয় হয় ¯িপ্র নদী থেকে পানি টেনে নিয়ে। পশ্চিম বার্লিন উপকুলের হাভেল নদীর সাথে মেশার আগ পর্যন্ত স্প্রি নদী ৩৮২ কিমি পথ অতিক্রম করে। পরিত্যাক্ত খনির দিকে ক্রমাগত পানি টেনে নেয়ার প্রতিক্রিয়ায় ২০০৩ সালের গ্রীষ্মে দেখা গেল সেই স্প্রি নদী উল্টো পথে লিগনাইট উন্মুক্ত খনির দিকে যাত্রা করে বসেছে!

এই স্প্রি নদীর হাইড্রোলজিক্যাল ভারসাম্য পুনপ্রতিষ্ঠার জন্য আগামী  দশ বছরে ব্র্যান্ডেনবার্গ রাজ্যকে ৩০ মিলিয়ন ইউরো খরচ করতে হবে। নদীর গতিবেগ বৃদ্ধি করার জন্য কৃত্রিমভাবে নদী পথও পরিবর্তন করতে হবে। বর্তমানে নদীর গতি এরকম শ্লথ যে বাষ্পীভবনের ফলে যে পরিমাণ পানি নদী থেকে উড়ে যায় বৃষ্টিপাত এবং শাখা-উপনদীর মাধ্যমে তা আর পূরণ হতে পারে না।

প্রাক্তন লুসাটিয়ান খনি এলাকার পানির অম্লত্ব স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি। উন্মুক্ত কয়লা খনি থেকে উত্তোলিত আয়রন পাইরাইটসই(FeS2) এর জন্য দায়ী। এই অধিক অম্লত্বের পানিতে মাছ কিংবা জলজ উদ্ভিদ কোনটিই ভালো হয় না। এমনকি এই মরা পানি অঞ্চলে পর্যটন শিল্পও গড়ে তোলা যায় নি। শুধু তাই নয়, আবর্জনা ও কয়লা খনির অবশেষ ফেলে খনি এলাকা পুনারায় ভরাট করে সেখানে চাষাবাদ বা বসতি নির্মাণের চেষ্টাও সফল হয় নি, যে কারণে ইদানিং পরিত্যাক্ত উন্মুক্ত খনি এলাকায় সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদনের কাজ শুরু হয়েছে।

হর্নো গ্রামের কথা: ১৯৯৩ সালে পোলিশ সীমান্তের নিকটবর্তী হর্নো গ্রামের ঐতিহাসিক গুরুত্ব এবং সেখানে বসবাসকারী সোর্ব নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীকে রক্ষার জন্য গ্রামটিকে সংরক্ষিত এলাকা বলে ঘোষণা করা হয়। ব্রান্ডের বার্গ রাজ্যের সংবিধান সোর্ব সংলঘু জনগোষ্ঠীর অস্তিত্ব রক্ষার জন্য সেগ্রামের বসতি এলাকা সংরক্ষণের প্রতিশ্রুতিও দিয়েছিল । হর্ন গ্রাম এবং সে গ্রামে বসবাসকারী ৩৮০ সোর্ব জনগণের দুর্ভাগ্য গ্রামটি ভ্যাটেনফল উন্মুক্ত খনির খনন পথে পড়ে গিয়েছিল। ফলে ১৯৯৭ সালে ব্র্যান্ডেনবার্গ স্টেট এসেম্বলির পাশ করা ”ব্রাউন কোল এক্ট”-এর মাধ্যমে জশভালদ( `( Jänschwalde) বিদ্যুৎ কেন্দ্রে দ্রুত জ্বালানী সর্বরাহের মাধ্যমে পুরো অঞ্চলের বিদ্যুৎ সর্বরাহের স্বার্থে হর্নো গ্রামটিকে ধবংস হতে হয়, উচ্ছেদ হতে হয় সেখানকার আদিবাসী অধিবাসীদের।

আর এ কাজটি সফল করার জন্য গুজব ছড়িয়ে এমন একটি অবস্থা তৈরী করা হয় যেন হর্নো গ্রামটিকে ধবংস না করলে ৩০ হাজার শ্রমিকের কর্মসংস্থান রক্ষা হবে না। এটা ছিল ১৯৯৩ সালের কথা। এক বছর পর বেসরকারীকরণ সম্পন্ন হওয়ার পর বলা হতে লাগলো ”হর্নো গ্রাম অথবা ১২ হাজার চাকুরি” আর ১৯৯৭ সালে যখন  ব্রাউন কোল এক্ট পাশ করা হচ্ছে তখন বলা হচ্ছিল ”হর্নো গ্রাম অথবা ৪ হাজার চাকুরি”! হর্নো গ্রামের বিনিময়ে ৪ হাজার চাকুরির কথা বলা হচ্ছিল অথচ ৯০ এর দশকে শুধু মাত্র খরচ যৌক্তিকরণের নামে এ এলাকার ল্যসিজ(Lausitz) কয়লা খনির ৯০ শতাংশ শ্রমিক ছাটাই করা হয়েছিল। ৫৭ হাজার কর্মসংস্থানের মধ্যে ২০০৫/৬ সাল নাগাদ অবশিষ্ট ছিল মাত্র ২,২০০-২,৪০০ কর্মসংস্থান!

এই হর্নো গ্রাম থেকে শুরু করে অপেক্ষাকৃত কম ঘনবসতিপূর্ণ গোটা জার্মান দেশে উন্মুক্ত কয়লা খনির আখ্যান যে ভয়াবহ চিত্র হাজির করে, সেই চিত্র দেখে, জেনে-শুনে ফুলবাড়ি কিংবা বড় পুকুরিয়া কিংবা বাংলাদেশের যে কোন অঞ্চলে উন্মুক্ত খনি স্থাপনের জন্য স্রেফ খায়েশ পোষণ করাটাই মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে গণ্য হওয়ার জন্য যথেষ্ট।

অষ্ট্রেলিয়ায় উন্মুক্ত খননের অভিজ্ঞতা

২০০৫ এর এপ্রিল মাসে অষ্ট্রেলিয়ার নিউ সাউথ ওয়েলস প্রদেশের পার্লামেন্ট হাউসের সদস্য লি রায়ানন কয়লা খনির কতগুলো পরিবেশগত প্রতিক্রিয়া তুলে ধরেন, উন্মুক্ত কয়লাখনি অঞ্চলে বসবাসকারীগণ যার নিয়মিত ভুক্তভোগী:

–  ভূগর্ভস্থ পনি দূষণ, শব্দ দূষণ ও বায়ু দূষণ

–  স্থানীয় জাতের উদ্ভিদ এবং প্রাণ বৈচিত্র ধবংস

–  খনি অঞ্চলের সাব ষ্ট্যান্ডার্ড পুনবার্সন

–  পরিবেশগত প্রতিক্রিয়া যাচাইয়ের নিম্নমান

–  খনি-কার্যক্রমের উপর যথাযথ পর্যবেক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণের অভাবের কারণে স্বাস্থ্য সমস্যা, মাটির গুণাগুণ নাশ, ভূমিধ্বস, পানিদূষণ

ইত্যাদি সমস্যার সৃষ্টি।৭

অষ্ট্রেলিয়ার পোর্ট অব হান্টার বিশ্বের সবচেয়ে বেশি কয়লা রপ্তানিকারী অঞ্চল। হান্টার ভ্যালীর  মোট এলাকার এক পঞ্চমাংশ অর্থাৎ প্রায় ৫২০ বর্গ কি.মি এলাকা জুড়ে রয়েছে ৪০টির মতো উন্মুক্ত কয়লা খনি। আমাদেরকে বলা হচ্ছে অষ্ট্রেলিয়ার সব উন্মুক্ত খনি নাকি পরিবেশ সম্মত অথচ এ জনবিরল হান্টার ভ্যাালি অঞ্চলে উন্মুক্ত খননের ফলে খুব বেশী মানুষকে উচ্ছেদ হতে না হলেও, পরিবেশ দূষণ কিংবা বসবাসকারী মানুষের উপর তার প্রতিক্রিয়া কম নয়।

হান্টার ভ্যালির উন্মুক্ত খনির ফলে এ অঞ্চলের ভূগর্ভস্থ পানি ও বোর ওয়াটার কমে গেছে এবং কুয়া উধাও হয়ে গিয়েছে। মাটির পানি ধারণকারী স্তর বা অ্যাকুইফার এ হস্তক্ষেপ করা হচ্ছে, নদীর স্রোতের সাথে ভুগর্ভস্থ পানির সংযোগ নষ্ট হচ্ছে এবং এসিড মাইন ড্রেনেজ এর মতো ঘটনা ঘটছে। আর ভু-পৃষ্টের পানিও দূষিত হচ্ছে, দূষিত পানি ভূ-অভ্যন্তরে ঢুকছে ও নদীর স্রোত ধারার সাথে মিশে যাচ্ছে। এমনকি হান্টার ভ্যালী এলাকায় এসিড বৃষ্টিও হয়েছে। নিউসাউথ ওয়েলস এর সরকারি ওয়েবসাইটেই স্বীকার করা হয়েছে খনি কার্যক্রমের ফলে হান্টার ভ্যালীর নদ-নদীর লবনাক্ততা বেড়ে যাওয়ার কথা। ৮ খনি কোম্পানিগুলো বর্জ্যপরিস্কারের কাজও ঠিক ঠাক মতো করছে না- অথচ কাগজে কলমে এই কাজগুলো ঠিক ঠাক করবে বলেই তারা উন্মুক্ত খননের অনুমোদন পেয়েছিল।


ছবি: উন্মুক্ত খননের ফলে চন্দ্র পৃষ্ঠে পরিণত হওয়া অষ্ট্রেলিয়ার হান্টার ভ্যালি

সূত্র: http://nonewcoal.greens.org.au/home-news/coal/techniques/toxicity/open-cut-mines

খনি এলাকার আশপাশের মানুষকে ২৪ ঘন্টা ধরেই বিষ্ফোরণ, নিম্ন ফ্রিকোয়েন্সির যন্ত্রপাতির কম্পন, খনন যন্ত্র ইত্যাদি নানান সমস্যা ভোগকরতে হয় বছরের পর বছর ধরে। খনি কার্যক্রমের সাথে সম্পর্কযুক্ত এসব শব্দ এবং কম্পনের ব্যাপারে কোন নির্দিষ্ট মানদণ্ড বা ষ্ট্যান্ডার্ড মেনে চলা হয় না। তাছাড়া স্বাভাবিক অবস্থার চেয়ে বায়ুতে ধুলো বালির পরিমাণ অনেক বেশি থাকে। মাঝে মাঝে বিষ্ফোরণের ফলে ২০০-৩০০ মিটার উচ্চতা পর্যন্ত বায়ুস্তর ধূলায় ঢেকে যায়। এরকমই এক ঘটনায় ২০০৫ এর মার্চ মাসে মুসওয়েলব্র“ক এর কাছে ওয়াইবং রোড একেবারে বন্ধ করে দিতে হয়েছিল।৯

এ অঞ্চলে এক্সট্রাটার মালিকানাধীন উলান উন্মুক্ত কয়লা খনির কাছেই রয়েছে গলবার্ন রিভার জাতীয় উদ্যান যার পাশদিয়ে বয়ে গেছে গলবার্ন নদী। নদীর তলদেশে উন্মুক্ত খননের জন্য মোট ৮ কিমি নদীর গতিপথ পরিবর্তন করতে হয়েছে। আর এই ডাইভারসন ডিজাইন এ সমস্যা থাকার কারণে নদী-তীর স্থিত হচ্ছে না, তীর ভাঙছে। খননের শুরুতে নদীর বেইস লাইন স্টাডিও করা হয়েছিল সীমিত আকারে। গত ১৫ বছর ধরে খনি থেকে তরল বর্জ্য চুইয়ে চুইয়ে নদীতে মেশার কারণে নদীতে সল্ট ব্যাংক(ংধষঃ নধহশং) তৈরী হয়েছে। এসব সমস্যা সমাধানের জন্য দূষিত পানি অন্যত্র সঞ্চিত করে সেচের মাধ্যমে নদীপথে ভালো পানি সর্বরাহ করা কিংবা খনির দূষিত পানি যন্ত্রের মাধ্যমে বাতাসে ¯েপ্র করে দুষিত পানি কমিয়ে ফেলা ইত্যাদি চেষ্টা করা হয়েছে কিন্তু সমস্যার পুরোপুরি সমাধান পাওয়া যায়নি। কারণ খনি থেকে প্রতিদিন ১১ মেগা লিটার দুষিত পানি নির্গত হলেও সেচ ক্ষমতা মাত্র ৫-৬ মেগালিটার, আবার দুষিত পানি ¯েপ্র করলে বাস্পীভবনের ফলে পানির পরিমাণ কিছু কমলেও অবশিষ্ট পানিটুকুর দুষণমুক্ত হচ্ছে না। গলবার্ন নদী এখন প্রতিবছর গ্রীষ্মে একেবারে শুকিয়ে যায়, যা আগে কখনই ঘটতো না।১০

কলম্বিয়ায় উন্মুক্ত খননের অভিজ্ঞতা

কলম্বিয়ার কেরেজন উন্মুক্ত কয়লা খনি চালু হয় ১৯৮৩ সালে, এরপর প্রতিবছর ১,৪৮২ একর করে ভূমি উন্মুক্ত খনন করা হয়েছে যার ফলে আদিবাসী ওয়েউ এবং আফ্রো-কলম্বিয়ান স¤প্রদায়ের অধিবাসীদেরকে ভূমি থেকে উচ্ছেদ করা হয়েছে। ওয়েউরা কলম্বিয়ার সবচেয়ে বড় আদিবাসী স¤প্রদায় হলেও রাজনৈতিক কর্তৃত্ব না থাকায় তারা বাইরের চাপ সামাল দিতে পারেননি। প্রথমে তারা ভেবেছিলেন এই কয়লা খনি প্রতিশ্র“তি অনুসারে আসলেই তাদের জীবনযাত্রার উন্নয়ণ সাধন করবে কিন্তু একসময় তারা দেখলেন উন্নয়ন তো দূরের কথা তারা তাদের আবাসস্থল থেকে উচ্ছেদ হয়ে যাচ্ছেন এবং বায়ুদূষণ, পানিদূষণ, শব্দদূষণ ধবংস হয়ে যাচ্ছে তাদের সাধের গ্রাম শহর ।১১

শুরুতে উত্তর কলম্বিয়ার লা গুয়াজিরা প্রদেশের কেরেজেন উন্মুক্ত কয়লা খনিটির ৫০ ভাগ মালিকানা ছিল কলম্বিয়া সরকার এবং বাকি ৫০ ভাগ ছিল মার্কিন বহুজাতিক অ্যাকসন এর সাবসিডিয়ারি ইন্টারকর। খনিটি পরিচালনার দ্বায়িত্বে ছিল ইন্টারকর। বলা হয়, মার্গারেট থেচারের আমলে বৃটিশ কোল মাইনিং ইন্ডাস্ট্রি ধ্বংসের জন্য কলম্বিয়ার এই সস্তা কয়লা দায়ি। খনি থেকে পুয়ের্তো বলিভার বন্দরে কয়লা পরিবহনের সুবিধার জন্য বৃটিশ স্টীল কোম্পানি রেলপথও স্থাপন করে কলম্বিয়ায়।

২০০১ এর শুরুর দিকে কলম্বিয়া সরকারের মালিকানাধিন অংশটি কিনে নেয় অ্যাংগলো আমেরিকান(ব্রিটিশ), বিএইচপিবিলিয়ন(অস্ট্রেলিয়) এবং গ্লেনস্কোর(বেসরকারী সুইস কোম্পানি) নামের তিনটি কোম্পানির একটি কনসোর্টিয়াম। ২০০১ সালের অগাষ্ট মাসের মধ্যেই কোন ধরণের নোটিশ ছাড়াই সামরিক বাহিনীর সহায়তায় টাবাকো গ্রামবাসীকে উচ্ছেদ করা হয় এবং গ্রামের বেশিরভাগ অংশই ধবংশ করা হয়। অবশিষ্ট অংশ ধবংস করা হয় ২০০২ এর জানুয়ারি মাসে। ২০০২ এর ফেব্র“য়ারিতে তিন কোম্পানির কনসর্টোয়িম ইন্টারকরের শেয়ার কিনে নেয় এবং কেরেজন কোল কোম্পানি নামে কয়লা খনিটি পরিচালনা করতে থাকে।

২০০২ সালের মে মাসে কলম্বিয়ার সুপ্রিম কোর্ট স্থানিয় মিউনিপ্যালিটিকে(সঁহরপরঢ়ধষরঃু ড়ভ ঐধঃড়হঁবাড়) টাবাকো গ্রাম থেকে উচ্ছেদকৃত অধিবাসীদেরকে গ্রামবাসীর পছন্দ মত স্থানে পুনর্বাসিত করার নির্দেশ দেয় । এই নির্দেশ কখনই বাস্তবায়িত হয় নি। মেয়র সাহেব পরিস্কার জানিয়ে দিয়েছেন কোর্টের আদেশ মেনে গ্রামবাসীদের পুনর্বাসন করার মতো অর্থকড়ি মিউনিসিপ্যালিটির নেই। সরকার কিংবা কয়লা খনি কোম্পানিরও পুনর্বাসন নিয়ে কোন মাথাব্যাথা নেই। অ্যাঙ্গলো আমেরিকান এবং বিএইচপি বিলিটন এর বক্তব্য হলো তারা ২০০১ সালের গ্রাম ধ্বংসের কোন দায় তাদের নেই যদিও সেই সময় খনির ৫০% শেয়ারের মালিক ছিল তারা। কোম্পানি গ্রামবাসীদেরকে ব্যাক্তিপর্যায়ে ক্ষতিপূরণ দিতে রাজী থাকলেও গ্রাম বা সম্পদ্রায়গত পুনর্বাসনের পক্ষপাতি নয়। কোম্পানির বক্তব্য অনুসারে ৯৫% গ্রামবাসীই নাকি ব্যাক্তিপর্যায়ের ক্ষতিপূরণের পক্ষে। কোম্পানি যেটা বলছে না তা হলো দীর্ঘ অনিশ্চয়তার সুযোগ নিয়ে কোম্পানির প্রতিনিধিরা গ্রামবাসীদের ভয়ভীতি দেখাচ্ছিল যে, যদি তারা ব্যাক্তি পর্যায়ের ক্ষতিপূরণ গ্রহণ না করে তাহলে আখেরে কিছুই পাবে না।

শুধু টাবাকো গ্রামবাসীরাই উচ্ছেদের স্বীকার হয়েছে এমন নয়, পুয়ের্তো বলিভারের আশপাশের ওয়েউ স¤প্রদায় এবং অনেকগুলো আফ্রোকলম্বীয় স¤প্রদায়কে এভাবে উচ্ছেদ করা হয়েছে। এবং খনি বড় হওয়ার সাথে সাথে এই উচ্ছেদ হওয়া সম্প্রদায়ের সংখ্যাও বাড়ছে। এখনও একের পর এক পরিবারকে স¤প্রদায়গত পুনর্বাসনের বদলে ব্যাক্তিপর্যায়ে কিছু অর্থ হাতে ধরিয়ে দিয়ে উচ্ছেদ করা হচ্ছে,  কর্মসংস্থানের প্রতিশ্র“তি স্বত্ত্বেও বেকারত্ব বাড়ছে।১২

একদিকে স্থানীয় জনগণের দুর্দশা, অন্যদিকে চলছে তখন সেই দুর্দশার কেনা-বেচা। ২০০৬ সালের মার্চ মাসে লাভজনক এই কয়লা খনির সুইস কোম্পানি গ্লেনকোর শেয়ার কিনে নিয়েছে আরেকটি সুইস কোম্পানি এক্সট্রাটা।

একই ভাবে দ্রামন্ড উন্মুক্ত খনির বেলাতেও স¤প্রদায়গত স্থানান্তর করা হয় নি। সিজার প্রদেশের এই খনিটি চালু হয় নব্বই এর দশকে। এই উন্মুক্ত খননের ফলে ক্ষতিপূরণ আদায়ের সংগ্রাম প্রতিহত করতে ২০০০ সাল থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত সময়ে বার্মিংহাম ভিত্তিক ড্রামন্ড কয়লা খনি কর্তৃপক্ষ নিয়োজিত প্যারামিলিটারি বাহিনী শতাধিক হত্যাকান্ড ঘটিয়েছে।১৩

শেষ কথা:

কাজেই, সারা দুনিয়ায় উন্মুক্ত কয়লা খননের যে অভিজ্ঞতা তা থেকে শিক্ষা নিলে এমনকি পরীক্ষা মূলক ভাবেও বাংলাদেশে উন্মুক্ত খননের কোন যুক্তি নেই। বরং মাটির নীচের কয়লা নিরাপদে উত্তোলনের জন্য অন্যান্য যেসব পদ্ধতি নিয়ে বিভিন্ন দেশে পরীক্ষা নিরীক্ষা এমনকি প্রয়োগ হচ্ছে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সেগুলোর প্রাসঙ্গিকতা যাচাই করা যেতে পারে। যেমন: কোল গ্যাসিফিকেশান কিংবা কোল বেড মিথেন পদ্ধতি। অথচ এসব বিষয় বিবেচনা না করেই জাতীয় স্বার্থের কথা বলে উন্মুক্ত খননের সিদ্ধান্ত নিল সরকার। প্রশ্ন তোলা যায়, জাতীয় স্বার্থ বিষয়টা আসলে কি, জাতীয় স্বাথর্ কি স্থানীয় মানুষের স্বার্থের বিপরীত কিছু? জাতীয় স্বার্থের নামে তো অনেক কিছুই হলো। জাতীয় স্বার্থের কথা বলেই তো ইউনিকল, শেভরন, কেয়ার্ন, নাইকো ইত্যাদি বহুজাতিক কোম্পানীর সাথে এমন প্রোডাকশন শেয়ারিং কনট্রাক্ট (পিএসসি) করা হয়েছে যেখানে আশি ভাগ গ্যাসের মালিক বহুজাতিক কোম্পানী । আবার জাতীয় স¡ার্থ কি স্রেফ টাকার অংকে মাপা যায় নাকি অর্থনৈতিক বিবেচনার পাশাপাশি সামাজিক ও পরিবেশগত বিষয়গুলোও বিবেচ্য? আজকে সুন্দরবন এলাকায় যদি কয়লা বা গ্যাসের খনি পাওয়া যায় এবং তা উত্তোলন করতে গিয়ে যদি সুন্দরবন ধ্বংস করে ফেলতে হয় তাহলেও কি আমরা ভবিষ্যতের বিবেচনা মাথায় না রেখে ”জাতীয় স্বার্থে” তা-ই করে ফেলব নাকি নিরাপদ প্রযুক্তি হাতে না আসা পর্যন্ত প্রয়োজনে জ্বালানী আমদানী করে হলেও তাৎক্ষনিক সংকট মেটাবো?

আরও দেরি হয়ে যাওয়ার আগেই এসব প্রসঙ্গের মীমাংসা করে জ্বালানী নীতিটা চূড়ান্ত করা এবং তার আলোকেই কয়লা/গ্যাস উত্তোলনে যাওয়া দরকার।

তথ্যসূত্র:

১)      লেখকের ব্যাক্তিগত অভিজ্ঞতা

২)      দ্য ফাইনান্সিয়াল এক্সপ্রেস, ১৩ এপ্রিল, ২০১০

৩)      Status and Impacts of German Lignite Industry by Jeffrey H. Michel

৪)      Phulbari Coal Project- Studies on Displacement, Resettlement, Rnvoronmental and Social Impact by Jennifer Kalafut & Roger Moody

৫)      Problems for open pit coal mining in northwest Bangladesh by Dr Md Rafiqul Islam, New Age, sixth anniversary special.

৬)   জার্মানির উন্মুক্ত খননের অভিজ্ঞাতার জন্য আমরা Jeffrey H. Michel লিখিত গবেষণা পত্র Status and Impacts of German Lignite Industry , পরিবেশবাদী সংগঠন গ্রীন লিগ, ফ্রেন্ডস অব দ্য আর্থ এর জার্মান শাখা বুন্দ(BUND), এর ওয়েবসাইটের সাহায্য নিয়েছি।

৭)  An overview of communities affected by coal issues, as presented at the Greens NSW Coal Issues Forum held at Parliament House, April 2005  http://archive.lee.greens.org.au/CoalCommunities.pdf

৮)  http://waterinfo.nsw.gov.au/hunter/trading.shtml

৯)   http://nonewcoal.greens.org.au/coal/coal-communities/coal-affected-communities/coal-affected-communities/mines-by-region/hunter

১০)  An overview of communities affected by coal issues, as presented at the Greens NSW Coal Issues Forum held at Parliament House, April 2005

১১)  Human Cost Of Colombian Coal Revealed

http://www.sciencedaily.com/releases/2007/10/071012100630.htm

১২) Coal mining and forced displacement in Colombia: the British connection  

        http://www.colombiasolidarity.org.uk/index.php?option=com_content&task=view&id=106&Itemid=31

১৩)  Appalachia and Colombia: The People Behind the Coal

http://upsidedownworld.org/main/colombia-archives-61/1908–appalachia-and-colombia-the-people-behind-the-coal