Thursday, November 11th, 2010

প্রস্তাবিত খসড়া কয়লানীতি ২০১০: লীজ দিয়ে জাতীয় অক্ষমতা অর্জনের নীতি

প্রস্তাবিত খসড়া কয়লা নীতি ২০১০ জনগণের মতামত সংগ্রহের জন্য জ্বালানী মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে দেয়ার খবর পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হয় গত ২৫ অক্টোবর, ২০১০। ২৭ অক্টোবর লন্ডনের একটি নামকরা ফাইনান্সিয়াল ম্যাগাজিন মানিউইক লন্ডন ভিত্তিক কোম্পানি জিসিএম(গ্লোবাল কোল ম্যানেজমেন্ট) এর বাংলাদেশী সাবসিডিয়ারি এশিয়া এনার্জি বাংলাদেশ লিমিটেড ফুলবাড়িতে উন্মুক্ত কয়লা খনি প্রজেক্টের ব্যাপারে গ্রীণ সিগনাল পেতে যাচ্ছে বলে লন্ডনের শেয়ার বাজার গরম করা এক খবর প্রকাশ করে।

শুধু তাই নয়, এই সংবাদের ব্যাপারে মানিউইক এর ওয়েবসাইটে কয়েকজন বাংলাদেশী প্রতিবাদ জানালে সেখানে এক পাল্টা মন্তব্যে এশিয়া এনার্জির এক দালাল  খসড়া কয়লা নীতি ২০১০ এর কথা উল্ল্যেখ করে ”অবশেষে চাকা ঘুরতে শুরু করেছে” বলে উচ্ছাস প্রকাশ করে। প্রস্তাবিত কয়লা নীতিটি পড়লে বোঝা শক্ত নয় এশিয়া এনার্জি এবং তার  দালালরা কেন এটি নিয়ে উচ্ছ্বসিত!

জাতীয় সক্ষমতার প্রশ্ন:
প্রস্তাবিত কয়লা নীতিতে ”প্রধানত: দেশের অভ্যন্তরে ব্যাবহারের লক্ষ্যে কয়লা সম্পদ উন্নয়ণের জন্য জাতীয় সক্ষমতা সৃষ্টির” প্রয়োজনীয়তার কথা স্বীকার করা হলেও খসড়াটির মোট ২৭ টি আর্টিক্যালের কোথাও জাতীয় সক্ষমতা অর্জনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ ”কয়লা উত্তোলন/উন্নয়ণ”-এর সক্ষমতা কি ভাবে, কোন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে, কত দিনে অর্জিত হবে তার কোন উল্ল্যেখই নেই, স্বল্প-মধ্য-দীর্ঘ মেয়াদি পরিকল্পনা তো দূরের কথা।

আর্টিক্যাল ১.২ এ খনিজ সম্পদ উন্নয়ণ ব্যুরো, ভূ-তাত্ত্বিক জরীপ অধিদপ্তরকে শক্তিশালী করা এবং ”প্রয়োজনবোধে” কয়লা ”ব্যাবস্থাপনার জন্য” নতুন প্রতিষ্ঠান গঠনের কথা বলা হয়েছে। আর্টিক্যাল ৯.০ থেকে দেখা যায়, ভূ-তাত্ত্বিক অধিদপ্তরকে শক্তিশালী করা হবে নতুন কয়লা ক্ষেত্র আবিস্কারের লক্ষ্যে এবং খনিজ সম্পদ উন্নয়ণ ব্যুরোকে শক্তিশালী করা হবে আবিস্কৃত কয়লা ক্ষেত্রের কয়লা উত্তোলণের জন্য লাইসেন্সী/লীজি নিয়োগ এবং কয়লা আবিস্কার ও উন্নয়ণ কার্যক্রম ”সুষ্ঠুভাবে তদারকীর জন্য।  আর্টিক্যাল ২১.০ এ এই অনুসন্ধান ও তদারকীর কাজে দক্ষতা বাড়ানোর জন্য প্রয়োজনীয় তহবিল সরকার ও লীজি’র কাছ থেকে সংগ্রহ করার কথা আছে কিন্তু উত্তোলণ কাজের জন্য কোন তহবিল এর কথা নেই। নতুন নতুন কয়লা ক্ষেত্র অনুসন্ধানে সক্ষমতা অর্জন জরুরী সন্দেহ নেই, কিন্তু আবিস্কৃত কয়লা ক্ষেত্র থেকে কয়লা উত্তোলণের জন্য প্রতিষ্ঠান স্থাপন না করে, কয়লা উত্তোলণের জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষ জনবল সৃষ্টির জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন নতুন ডিপাটমেন্ট স্থাপন ও কয়লা উত্তোলণ কার্যক্রম নিয়ে গবেষণার জন্য প্রয়োজনীয় তহবিলের ব্যাবস্থা না করে স্রেফ কয়লা ক্ষেত্র লীজ দেয়ার এবং তা তদারকী /ব্যাবস্থাপনার দক্ষতা অর্জনের পরিকল্পনা তো প্রকৃত পক্ষে জাতীয় অক্ষমতা সৃষ্টি ও জারি রাখারই পরিকল্পনা।

কয়লা উত্তোলণে সক্ষম জাতীয় প্রতিষ্ঠান সৃষ্টি ও তার জন্য প্রয়োজনীয় তহবিলের কোন ব্যাবস্থা না রাখা হলেও আর্টিক্যাল ২২ এ কয়লা উত্তোলণে লাইসেন্স প্রাপ্ত বেসরকারী/বিদেশী বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান কর্তৃক ”আমদানী যন্ত্রপাতি, মালামাল, খুচরা যন্ত্রাংশের উপর ১০% ও পুন:রপ্তানিযোগ্য মালামাল ইত্যাদি আমদানির ক্ষেত্রে শুল্ক, কর ও ভ্যাট অব্যাহতি প্রদান”, ৭ বছরের জন্য ট্যাক্স হলিডে সুবিধা প্রদান, ”প্রয়োজনের নিরীখে বিভিন্ন আর্থিক সুবিধাদি প্রদান” কিংবা শিল্পনীতির আওতায় ” শিল্প খাতে দেশী/বিদেশী বিনিয়োগের জন্য প্রযোজ্য আর্থিক ও অন্যান্য সুবিধাদি কয়লা  উন্নয়ণে বিনিয়োগেরর ক্ষেত্রে লীজিকে প্রদান করা”র কথা সুনির্দিষ্ট ভাবে উল্ল্যেখ করতে কিন্তু একটুও ভুল হয়নি !

কয়লা উত্তোলণের মতো কয়লা ব্যাবহারের বেলাতেও বিদেশী/বেসরকারী প্রতিষ্ঠানের কথা বলা হয়েছে প্রস্তাবিত কয়লা নীতিতে। উত্তোলিত কয়লা ব্যাবহার করে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদনের বদলে আর্টিক্যাল ১৫ তে কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য কয়লা উত্তোলণকারী লীজিকে অগ্রাধিকার দেয়া  হয়েছে। শুধু তাই নয়, স¤প্রতি বহুজাতিক কেয়ার্ন কোম্পানিকে যেমন জনস্বার্থের কথা বলে পেট্রবাংলাকে পাশ কাটিয়ে তৃতীয় পক্ষের কাছে গ্যাস বিক্রির অনুমোদন দেয়া হয়েছে তেমনি ভাবে ”প্রয়োজন বোধে” লীজিকে সরকারি  প্রতিষ্ঠানকে পাশ কাটিয়ে তৃতীয় পক্ষ অর্থাৎ বেসরকারী বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান বা আইপিপি’র নিকট কয়লা বিক্রির আগাম অনুমোদন দিয়ে রাখা হয়েছে। সরকারের কাজ কেবল ”লীজি কর্তৃক উৎপাদিত বিদ্যুৎ ক্রয় করার নিশ্চয়তা প্রদান”। ফলে প্রস্তাবিত কয়লা নীতি বাস্তবায়ন হলে গ্যাস ক্ষেত্রের মতোই কয়লা ক্ষেত্রেও জাতীয় প্রতিষ্ঠানের অবস্থা হবে সেই কৃষকের মতো যে সারা বছর জমি চাষ করে, বীজ বুনে, নিড়ানি দেয় আর ফসল তোলার সময় এলে মহাজনের লোক এসে সে ফসল কেটে নিয়ে যায়।

কয়লার অনুল্লেখিত দেশীয় চাহিদা ও রপ্তানির বিধান
জাতীয় জ্বালানী নীতির সাথে সম্পর্ক রেখেই একটি দেশের কয়লা নীতি প্রণয়ন করা প্রয়োজন। বর্তমানে কয়লার চাহিদা কতটুকু এবং পাওয়ার সিস্টেম মাস্টার প্ল্যান, শিল্পে বিদ্যূৎ এর চাহিদা ও সম্ভাব্য গ্যস সর্বরাহ ইত্যাদি বিবেচনা করে ভবিষ্যতে চাহিদা কেমন হবে তার কোন প্রজেকশান কয়লা নীতিতে করা হয়নি। সুর্নির্দিষ্ট চাহিদার প্রজেকশান ছাড়া স্রেফ ”দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদার সাথে সংগতি রেখে লীজিকে কয়লা উত্তোলণ করতে হবে”(আর্টিক্যাল ২.০)  কিংবা ”দেশর ভবিষ্যৎ জ্বালানি নিরাপত্তা, বিদ্যুৎ উৎপাদনে কয়লার ক্রমবর্ধমান ব্যাবহার ও কয়লার দীর্ঘ মেয়াদী চাহিদা ইত্যাদি বিবেচনায় রেখে জনস্বার্থে প্রয়োজন না হলে কয়লা রপ্তানি করা যাবেনা”(আর্টিক্যাল ৬.০) জাতীয় কথা বাস্তবে কয়লার দেশীয় প্রয়োজন সম্পর্কে বিভ্রান্তি তৈরী ও সেই বিভ্রান্তি কাজে লাগিয়ে কয়লা রপ্তানিরই সুুযোগ তৈরী করবে। তাছাড়া আর্টিক্যাল ২.০ এবং আর্টিক্যাল ৬.০ পরস্পর সাংঘর্ষিক। দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদার সাথে সংগতি রেখে যদি কয়লা উত্তোলণ করা হয় তাহলে তো রপ্তানির জন্য বাড়তি কয়লা থাকার কোন সুযোগ নেই। ২০০৮ সালে পাটোয়ারি কমিটি প্রণীত খসড়া কয়লা নীতিতে বলা হয়েছিল, জিডিপি বৃদ্ধির হার ৫.৫% হলে ২০২৫ সাল নাগাদ মোট ১৩৬ মিলিয়ন টন কয়লার প্রয়োজন হবে এবং যদি জিডিপি বৃদ্ধির হার ৮% হয় তাহলে কয়লার প্রয়োজন হবে ৪৫০ মিলিয়ন টন কয়লা এবং এ যাবত আবিস্কৃত কয়লা ক্ষেত্রগুলো ২০৩০ সালের বেশি দেশের জন্য কয়লার এই চাহিদা মেটাতে সক্ষম হবে না। এ বিবেচনায় দেশের জ্বালানী নিরাপত্তার স্বার্থে কয়লা নীতিতে জনস্বার্থ বা কোন অযুহাতেই রপ্তানির বিধান রাখার কোন যুক্তি নেই।

জনগণের মালিকানা বনাম বিদেশী/বেসরকারী বিনিয়োগ ও রয়্যালিটি
প্রস্তাবিত কয়লা নীতি’র আর্টিক্যাল ১.২ এ  ”কয়লা ক্ষেত্র আবিস্কার ও উন্নয়ণের নিমিত্তে ষ্ট্র্যাটেজিক পার্টনার/যৌথ বিনিয়োগকারী নিয়োগ করা” এবং ” দেশী/বিদেশী বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার নিমিত্ত লাইসেন্সী/লীজিকে বিভিন্ন আর্থিক প্রণোদনা ও সুবিধাদি প্রণয়ন করা”র কথা বলা হয়েছে। আর্টিক্যাল ১০.০ এবং ১০.১ এ কয়লা অনুসন্ধান, উত্তোলণ, বাজারজাত  করণ সহ সকল ক্ষেত্রেই সরকারী ও বেসরকারী যৌথ বিনিয়োগ এবং প্রত্যক্ষ দেশী/বিদেশী বিনিয়োগকে স্বাগত জানানোর কথা বলা হয়েছে। এর আগের কয়লা নীতির খসড়া গুলোতেও একই ভাবে বিদেশী/বেসরকারী বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা মূল ফোকাস থাকলেও কমবেশী যাই হোক অন্তত: রয়্যালিটির হারটি নির্ধারণ করে দেয়া কিংবা রয়্যালিটি নির্ধারণের দিক নির্দেশনা উল্ল্যেখ করা হতো। এবারের খসড়ায় বিনিয়োগকারীকে আকৃষ্ট করার জন্য ট্যাক্স-ভ্যাট মৌকুফসহ বিভিন্ন আর্থিক সুবিধা দেয়ার প্রতিশ্র“তির পাশাপাশি খনিমুখে আন্তর্জাতিক মূল্যের ৭০% হারে বিক্রির নিশ্চয়তা(আর্টিক্যাল১৬.০) এবং যে কোন হারে, জনগণের মতামত বা কারো কাছে জবাবদিহিতা ছাড়াই ”সময়ে সময়ে গেজেট বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের মাধ্যমে” রয়্যালিটি নির্ধারণের সুযোগ রেখে দেয়া হয়েছে(আর্টিক্যাল ১৭.০)।

বাংলাদেশের সংবিধানের আর্টিক্যাল ১৪৩(১) অনুসারে গ্যাস, কয়লা সহ সকল খনিজ সম্পদের মালিক বাংলাদেশের জনগণ। প্রস্তাবিত কয়লা নীতি অনুসারে নিজস্ব কয়লা এখন জনগণকে বিদেশী/বেসরকারি কোম্পানির কাছ থেকে খনি মুখে আন্তর্জাতিক মূল্যের ৭০% দরে ক্রয় করতে হবে। বিনিময়ে জনগণ পাবে সামান্য রয়্যালিটি যার পরিমাণ আবার অনির্ধারিত! কাজেই বিষয়টা পরিস্কার যে, রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন কোন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কয়লা উত্তোলণের কোন ব্যাবস্থা না করে, জাতীয় সক্ষমতার ফাঁপা কথা বলে কার্যত বিদেশী/বেসরকারী বিনিয়োগকারীর কাছে রয়্যালিটি/ফি ইত্যাদির বিনিময়ে বিভিন্ন কয়লা ক্ষেত্র লীজ বা ইজারা দেয়ার ব্যাবস্থা রেখে জ্বালানী খাতে বিদ্যমান লুটপাট ও বহুজাতিক তোষণের অলিখিত নীতিরই আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে এই খসড়া কয়লা নীতি ২০১০ এ।

কয়লা উত্তোলণের পদ্ধতি: উন্মুক্ত খননের নীতি
প্রস্তাবিতে কয়লা নীতিতে কয়লা উত্তোলণের পদ্ধতি সম্পর্কে আর্টিক্যাল ২.০ এ বলা হয়েছে ”ভূগর্ভস্থ পদ্ধতি/উন্মুক্ত পদ্ধতি অথবা একই সাথে ভূগর্ভস্থ এবং উন্মুক্ত পদ্ধতি প্রয়োগের মাধ্যমে খনি উন্নয়ণ করা হবে।” এই পদ্ধতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে বিবেচ্য বিষয় হলো ”ভূতাত্ত্বিক কাঠামো, ভূ-ঠন ও প্রকৃতি”। এগুলোকে বিবেচনা করে যদি দেখা যায় কোন পদ্ধতি ”কারিগরী এবং অর্থনৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য” তাহলেই সেই পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলণ করা যাবে। পদ্ধতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে স্থানীয় জনগণের মতামত প্রদান বা অংশগ্রহণের কোন বিধান রাখা হয়নি। বিনিয়োগকারী এভাবে স্থানীয় জনগণের মতামত ব্যাতিরেকে স্রেফ কারিগরি এবং অর্থনৈতিক ভাবে তার কাছে গ্রহণযোগ্য অর্থাৎ লাভজনক পদ্ধতি নির্ধারণ করে একটি পরিবেশগত সমীক্ষা করবে এবং সেই সমীক্ষা দেখে সরকার অনুমোদন দিলে সেই অনুযায়ী খনি ব্যাবস্থাপনা  করে সে কয়লা উত্তোলণ শুরু করবে। পদ্ধতি নির্ধারণের পর সেই পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলণের পরিবেশগত প্রভাব হ্রাস করার উপযুক্ত ব্যাবস্থাপনা নির্ধারণের জন্য পরিবেশগত সমীক্ষার কথা বলা হলেও পদ্ধতি নির্ধারণের আগে পরিবেশগত বিবেচনা কিংবা স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণের সুযোগ রাখা হয়নি, স্রেফ কারগরি ও অর্থনৈতিক ভাবে গ্রহণযোগ্য হওয়াই কোন পদ্ধতি নির্ধারণের যথেষ্ট।

প্রস্তাবিত কয়লানীতিতে পরিবেশগত ব্যাবস্থাপনার জন্য যেসব আর্টিক্যাল এর উপস্থিতি রয়েছে সেগুলো বিশেষত উন্মুক্ত খনন পদ্ধতির বেলাতে প্রযোজ্য। যেমন:আর্টিক্যাল ৭.২(পানি ব্যাবস্থাপনা) এবং আর্টিক্যাল ৮.০(ভূমি পুনরুদ্ধার, পুনর্বাস ও ব্যাবহার) । এই আর্টিক্যালগুলোর বিষয়বস্তুও কেবল উন্মুক্ত খননের কথা মাথায় রেখে লেখা হয়েছে । যেমন: পানি ব্যাবস্থাপনা বিষয়ে আর্টিক্যাল ৭.২ এ বলা হয়েছে ”উন্মুক্ত খনির ক্ষেত্রে খনি হতে উত্তোলিত পানি ভূ-গর্ভে রি-ইনজেকশান পদ্ধতি প্রয়োগ ও সন্নিহিত এলাকার কৃষি, গার্হস্থ্য ব্যবহার, ভূমি, বন-জঙ্গল, প্রাণীকুল, ভূ-গর্ভস্থ পানি স্তরের উপর সম্ভাব্য প্রতিকূল অবস্থা প্রশমন ও নিয়ন্ত্রণের জন্য একটি টেকসই সুসমন্বিত পানি-ব্যাবস্থাপনা কার্যক্রম বাস্তবায়ন করতে হবে।” কিন্তু পানি ব্যাবস্থাপনা তো কেবল উন্মুক্ত খননের জন্যই নয়, আন্ডারগ্রাউন্ড বা কোল গ্যাসীকরণ প্রকৃয়ার জন্যও প্রযোজ্য কিন্তু সেসব ক্ষেত্রে পানি ব্যাবস্থাপনার বিশেষ বিশেষ দিক নিয়ে কোন কথা নেই। একই ভাবে মূলত উন্মুক্ত খননের জন্য প্রযোজ্য পর্যায়ক্রমিক খনন ও পূর্নবাসন বিষয় কথা বার্তা থাকলেও ভূ-গর্ভস্থ পদ্ধতির বেলায় প্রযোজ্য ভূমিধ্বস, ভূমিকম্প কিংবা বালুভরাট বা রুম-এন্ড পিলার পদ্ধতি ইত্যাদি বিষয়ে কোন শর্ত বা সাবধানতার কথা এই প্রস্তাবিত কয়লা নীতিতে নেই। ফলে বিদেশী বিনিয়োগকারী সহ যিনি-ই এই কয়লা নীতি পড়বেন তিনিই স্পষ্ট বুঝে যাবেন, এই কয়লা নীতিটি স্রেফ উন্মুক্ত কয়লা খননের গ্রীণ সিগনাল।

উন্মুক্ত পদ্ধতিতে যেহেতু অন্য যেকোন পদ্ধতির তুলনায় একবারে অধিক পরিমাণে কয়লা উত্তোলণ করা যায়, তাই বিনিয়োগকারীর চোখ দিয়ে দেখলে দ্রুত মুনাফা তুলে নেয়ার জন্য উন্মুক্ত পদ্ধতি নি:সন্দেহে ”কারিগরী ও অর্থনৈতিক” বিবেচনায় গ্রহণযোগ্য বিবেচিত হবে। কিন্তু উন্মুক্ত খননের ফলে কৃষিজমি, জলাভূমি, ও গোটা পরিবেশের ধবংসসাধন, ঘনবসতি উচ্ছেদ, ভূ-প্রকৃতি ও হাইড্রোলজিক্যাল বৈশিষ্ট, বিভিন্ন ধরণের পানি ও ভূমি ব্যাবস্থাপনার পরও মরুকরণ ও এসিড মাইন ড্রেনেজের অবশ্যম্ভাব্যতা ইত্যাদি বিষয় যদি মাথায় রাখি এবং জার্মানি, অষ্ট্রেলিয়া, কলম্বিয়া ইত্যাদি দেশে উন্মুক্ত খননের দীর্ঘমেয়াদি বিপর্যয়ের উদাহরণগুলো বিবেচনা করি, তাহলে বাংলাদেশে কোন ভাবেই উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলণের জন্য গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। ফলে কয়লানীতিতে উন্মুক্ত খনন নিষিদ্ধ ঘোষণা করে তারপর বাদবাকি পদ্ধতির মধ্যে কোন পদ্ধতি নির্দিষ্ট ভূ-প্রকৃতি, ঘনবসতি, পরিবেশ, হাইড্রোলজিক্যাল বৈশিষ্ট ইত্যাদি বিবেচনা করে জনগণের মতামত ও অংশগ্রহণের মাধ্যমে কয়লা উত্তোলণের উপযুক্ত পদ্ধতি নির্ধারণের ব্যাবস্থা থাকতে হবে।