Sunday, June 15th, 2008

জাতীয় স্বার্থ ও জ্বালানি নীতি

[জাতীয় কমিটি গত ৩ জুন, ২০০৭ ইং তারিখে জাতীয় প্রেসক্লাবে একটি গোলটেবিল বৈঠকের আয়োজন করে। বৈঠকে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান এবং সাবেক অতিরিক্ত সচিব জনাব নুরুদ্দীন মাহমুদ কামাল। উপস্থাপিত প্রবন্ধটি পাঠকের সুবিধার্থে নীচে হুবহু তুলে ধরা হলো]

গোড়ার কথা

১। আমাদের জাতীয় জীবনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দলিল হচ্ছে সংবিধান, যা ৪টা নভেম্বর ১৯৭২ সালে গণপরিষদে গৃহীত হয় এবং একই বছরের ১৬ই ডিসেম্বর তা বলবৎ হয়। এর পরের বছর অর্থাৎ ১৯৭৩ সালে দেশে প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা প্রণীত হয়। সে বছরেই বিশ্বব্যাপী রাতারাতি তেলের দাম চার গুণ বেড়ে যাওয়ার পর এনার্জি ক্রাইসিস নামক একটি নতুন শব্দের সংযোজন হয় মানুষের ডিকশনারিতে। তখন থেকে মানুষ বুঝতে থাকে জ্বালানির নতুন গুরুত্ব। সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশে তেল আমদানির জন্য পাঁচ বছরের জন্য বরাদ্দ অর্থ এক বছরেই শেষ হয়ে যায়। ফলে, দেশের অর্থনীতিতে প্রচণ্ড আঘাত লাগে। সে সময়কার রাজনৈতিক সরকার জ্বালানী সমস্যা মোকাবেলার জন্য দূরদৃষ্টিসম্পন্ন কতগুলি যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, যা এ খাতে পথিকৃত হিসাবে গণ্য। পেট্রোবাংলা নামক একটি শক্তিশালী রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ছাড়াও পেট্রোলিয়াম এ্যাক্ট ১৯৭৪, তেল ও গ্যাস অনুসন্ধান নীতিমালা তথা প্রোডাকশন শেয়ারিং কন্ট্রাক্ট (পিএসসি), দেশের ৫টি প্রধান গ্যাস ক্ষেত্র নাম মাত্র মূল্যে শেল অয়েল কোম্পানি থেকে কিনে নেওয়া এবং আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন তিনটি বিদেশী কোম্পানির সহযোগিতায় বাংলাদেশ এনার্জি স্টাডি (বিইএস) কার্যক্রম ইত্যাদি বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য। সেসব ছিল ঐতিহাসিক কার্যক্রম। তাতে সাধারণ মানুষের আস্থা স্থাপিত হয়। কিন্তু পরবর্তীতে আমলাতন্ত্রের দৌরাত্ম্যে দেশের প্রশাসন, নীতি নির্ধারণ ও নীতি বাস্তবায়ন সবকিছু এলোমেলো হয়ে যায়।

এখনকার কিছু কথা                

২। বিগত দেড় যুগে জ্বালানী খাতে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্রমাগত ব্যর্থতা এতদূর গড়িয়েছে যে, এদের বিধি ব্যবস্থায় জনসাধারণের আস্থা নষ্ট হতে থাকে। মাত্রাতিরিক্ত আমলাতান্ত্রিকতা এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। জ্বালানী খাত ব্যবস্থাপনায় গৃহীত নীতিমালার প্রতি অবহেলা বিগত তিনটি সরকারের অস্বচ্ছ ও অপরিপক্ক কর্মকাণ্ড এবং সর্বব্যাপী দুর্নীতির প্রভাবে পথভ্রষ্ট হতে চলেছিল তারা ।

৩। একথা হয়ত সত্যি যে, নব্বই দশকের পূর্বে কোন স্বয়ংসম্পূর্ণ জ্বালানী নীতি ছিল না। এক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত গ্রহণ ছিল অনেকটা এডহক ভিত্তিতে। ১৯৯৫ সালে একটি স্বচ্ছ এবং সমন্বিত জ্বালানী নীতি প্রণীত হয়। কিন্তু, রাজনৈতিক সরকারগুলোর কিছু কিছু আচরণ ও প্রক্রিয়া নীতি বাস্তবায়নে বাধা সৃষ্টি করতে থাকে। যেমন বিগত আশি ও নব্বই এর দশকে দেশে জৈব জ্বালানীর (সনাতনী জ্বালানী) তথা কাঠ, খড়, গোবর ইত্যাদির ব্যবহার মোট জ্বালানী ব্যবহারের দুই তৃতীয়াংশের বেশী থেকে কমে আসতে থাকে এবং দেশীয় জ্বালানী প্রাকৃতিক গ্যাসের ব্যবহার খুব উচ্চহারে বাড়তে থাকে। এতে জ্বালানী আমদানিতে বিরাট সাশ্রয় হয়। যদি দেশে গ্যাস আবিষ্কৃত না হতো তাহলে তেল আমদানি খাতে বর্তমান ১.৮ (এক দশমিক আট) বিলিয়নের স্থলে অন্তত: ১৩.৩ মিলিয়ন টন বাবদ ৭.৩ (সাত দশমিক তিন) বিলিয়ন মার্কিন ডলারে উন্নীত হতো ২০০৬ সালে।

৪। তবুও ২০০৬ সালে দেশে ব্যবহƒত মোট জ্বালানীর প্রায় ৫৫% নবায়নযোগ্য জ্বালানীর সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করতে সরকার সুনির্দিষ্ট কোন পরিকল্পনা তো হাতে নেয়নি, বরং কোন প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তিও সৃষ্টি করেনি। ধরে নিয়েছে এর দায়িত্ব বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোই বহন করবে। অবশিষ্ট ৪৫% বাণিজ্যিক জ্বালানীর জন্য অর্থাৎ অনবায়নযোগ্য/জ্বালানী আহরণ ও ব্যবহারের জন্য (আমদানিসহ) প্রাতিষ্ঠানিক সংস্থাসমূহের কলেবর বৃদ্ধি হয়েছে এবং ততোধিক দুর্নীতির প্রকোপ বেড়েছে। অনাবয়নযোগ্য জ্বালানীর ক্ষেত্রে সরকারি প্রতিষ্ঠান শক্তিশালীকরণ এবং নীতিমালা প্রণয়নে যে আগ্রহ দেখা দেয় তার ক্ষুদ্রাংশও দেখা যায় না জৈব জ্বালানী সর্ম্পকিত নীতিমালা প্রণয়নে ও প্রাতিষ্ঠানিক অবকাঠামো তৈরীতে।

৫। আরও পরিলক্ষিত হয় যে, বাণিজ্যিক জ্বালানী (অনবায়নযোগ্য) ব্যবহার ও উন্নয়নের ক্ষেত্রে বর্তমান নীতি, পরিকল্পনা, প্রতিষ্ঠান শক্তিশালীকরণ ও অবকাঠামো উন্নয়নের বিষয়গুলো জ্বালানী, বিদ্যুৎ ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের অবাঞ্ছিত হস্তক্ষেপের কারণে বাধাগ্রস্থ হচ্ছে। পক্ষান্তরে, মন্ত্রণালয়টি একাধারে নীতিনির্ধারক, তদারকি, পরিচালক ও নিয়ন্ত্রকের ভূমিকা পালন করে চলেছে অবাধে। অন্যদিকে, বিভিন্ন জ্বালানী সংস্থাসমূহের অদক্ষ কার্যক্রম অসহনীয় হয়ে উঠছে। সব মিলিয়ে সার্বিকভাবে সুশাসনের অভাব দেখা দিয়েছে। একই সঙ্গে সংস্কার কার্যক্রম প্রলম্বিত হয়ে চলছে, এমনকি কোথাও কোথাও স্থবির হয়ে গেছে।

৬। একটু পেছনে তাকালেই আরও দেখা যাবে যে, বিগত দু দুটো সরকারের অধীনে জ্বালানী মন্ত্রণালয় প্রচলিত আইন ও বিধি বাস্তবায়নে যতটা আগ্রহী ছিল ততটাই অনাগ্রহী ছিল ১৯৯৫ সালে প্রণীত/গৃহীত জ্বালানী নীতির বাস্তবায়নে। কোথাও কোথাও আবার আইনের ব্যত্যয় ঘটিয়ে পদ্ধতির (?) আবিষ্কারের মাধ্যমে বিদেশী কোম্পানিকে আবিষ্কৃত ও কিছুকাল উৎপাদনরত গ্যাস ক্ষেত্রও (ফেনী ও ছাতক) ইজারা দিয়েছিল ; এ সবই ছিল আমলাতন্ত্রের দৌরাত্ম্য, তবে রাজনৈতিক সরকারও এর আর্থিক সুবিধা নিতে কাপর্ণ্য করেনি।

৭। উক্ত জ্বালানী নীতিতে বর্ণিত বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া উপেক্ষা করে ২০০৩ সালের রাজনৈতিক সরকার একটি সংশোধন প্রক্রিয়া শুরু করে ২০০৪ সালে। কিন্তু কোন এক অজ্ঞাত কারণে তা প্রকাশ করেনি। ২০০৭ সালে বর্তমান তত্ত্বাবধায়ক সরকার নতুন একটি জ্বালানী নীতি প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে ১৯৯৫ সালের নীতির সার্বিক সমালোচনা বিশ্লেষণ না করেই। শোনা যায় আগামী দু এক সপ্তাহের মধ্যে নতুন জ্বালানী নীতির আঙ্গিক ঘোষণা করা হবে।

বর্তমান বাস্তবতা

৮। বাংলাদেশ একটি স্বল্প জ্বালানী ব্যবহারকারী দেশ। মাথাপিছু জ্বালানী ব্যবহারের ক্ষেত্রে বিশ্বের সর্বনিম্ন পর্যায়ের দেশগুলোর মধ্যে একটি। কাজেই দেশের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য প্রয়োজন উল্লেখযোগ্য হারে জ্বালানীর ব্যবহার বৃদ্ধি। কিন্তু সে লক্ষ্যে নানা বাধা বিপত্তি দেখা দিচ্ছে।

৯। এ প্রেক্ষাপটে তেল-গ্যাস, খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা কমিটি দেশের জ্বালানী নীতিমালা সংক্রান্ত বিষয়াদি পর্যালোচনার উদ্যোগ নিয়েছে। ফুলবাড়ীতে প্রস্তাবিত উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলনে সম্ভাব্য পরিবেশগত, আর্থ-সামাজিক এবং মানবিক বিপর্যয় এড়াতে এলাকাবাসীর সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেছে। এছাড়াও নিম্নে বর্ণিত কিছু মৌলিক বিষয়াদির উপর গুরুত্বারোপ করেছে:

* বাংলাদেশের খনিজ সম্পদকে একমাত্র দেশের অভ্যন্তরে ব্যবহারের অগ্রাধিকার দেয়া,

* জ্বালানী সম্পদের অনুসন্ধান ও উত্তোলনে প্রয়োজনীয় দেশীয় সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে দেশীয় সংস্থার উপর নির্ভরশীলতা বৃদ্ধি এবং স্বচ্ছ ও সুষ্ঠু নীতিমালার আওতায় ব্যবস্থাদি পরিচালনা,

* আধুনিক জ্বালানী সম্পদের প্রাপ্তি, বণ্টন, ব্যবহারের ক্ষেত্রে আঞ্চলিক এবং সামাজিক পক্ষপাতিত্ব নিরসন করে সাধারণ মানুষকে অধিকতর লাভবান করার দিকে লক্ষ্য রেখে নীতি নির্ধারণে জোর দেয়া,

* জ্বালানী সম্পদ আহরণ/উত্তোলন ও ব্যবহারের ক্ষেত্রে যে সকল ক্ষয়-ক্ষতির সম্ভাবনা থাকে সেগুলো থেকে মানুষ ও পরিবেশকে রক্ষা করা, এবং নবায়নযোগ্য এবং পরিবেশ বান্ধব জ্বালানী উৎস ব্যবহারে অধিকতর মনোযোগী হওয়া ইত্যাদি।

১০। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পরিচালিত জ্বালানী নীতিমালার আলোকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে বাংলাদেশে প্রচলিত জ্বালানী নীতিমালা সম্পর্কিত বাস্তবতা উপলব্ধি করতে হলে অবশ্যই বুঝতে হবে যে,

* জ্বালানী সম্পদ দেশের অর্থনৈতিক ও পরিবেশ উন্নয়নের জন্য একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান,

* প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী জনসংখ্যার তুলনায় বাংলাদেশের সীমিত জীবাশ্ম জ্বালানী যথা: গ্যাস ও কয়লা এবং জৈব জ্বালানীর পরিমাণ যথেষ্ট নয়,

* তবে উন্নয়ন অর্থনীতিতে সফল কটি দেশ যথা জাপান, কোরিয়া, তাইওয়ান, হংকং ও সিঙ্গাপুরের অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায় যে, উন্নয়নের জন্য একটি দেশে প্রচুর পরিমাণ খনিজ সম্পদ থাকার আবশ্যকতা না ও থাকতে পারে। তবে সঠিক ও বাস্তবায়নযোগ্য জ্বালানী নীতিমালা থাকা আবশ্যক,

* অন্যদিকে, প্রচুর খনিজ সম্পদে সমৃদ্ধ  দেশ যেমন নাইজেরিয়া বা বলিভিয়া তাদের দেশের আর্থ সামাজিক উন্নয়নে সফল হতে পারেনি একটা সময় পর্যন্ত তাদের ভ্রান্ত নীতিমালা এবং/অথবা খনিজ সম্পদ ব্যবহারে দুর্বল নীতি ও বাস্তবায়নের কারণে,

* আবার কিছু দেশ, যেমন নরওয়ে এবং সুইডেন তাদের নিজস্ব জ্বালানী সম্পদকে সঠিক নীতিমালা এবং তা সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে লাভবান এবং সফল হয়েছে,

* কাজেই বাংলাদেশ যদি জ্বালানী বিষয়ে গৃহীত নীতিমালা বাস্তবায়ন না করে তবে দেশ সীমিত জ্বালানী সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার থেকে লাভবান নাও হতে পারে। ফলে, বাংলাদেশের পরিণতি নরওয়ের মত না হয়ে নাইজেরিয়ার মত হতে পারে। আমরা মনে করি, গ্যাস ও কয়লা সম্পদ দেশের অভ্যন্তরে উন্নয়নের জন্য ব্যবহার করাই হবে একমাত্র যুক্তিযুক্ত ব্যবস্থা এবং কোনভাবেই রপ্তানি নয়।

জ্বালান সম্পদ ও সংশ্লিষ্ট নীতিমালার স্বরূপঃ

১১। পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, বাংলাদেশে জ্বালানী ব্যবহারের হার খুব কম। তবুও কিছু বিষয়াদি লক্ষ্য করলে দেখা যায় যে:

* গুণগত মান এবং ব্যবহারিক বিবেচনায় জৈব জ্বালানী (কাঠ, খড়, গোবর ইত্যাদি) বাণিজ্যিক জ্বালানীর (গ্যাস, কয়লা ও পানি বিদ্যুৎ) তুলনায় নিম্নমানের। এ ধরণের নিম্নমানের জ্বালানী ব্যবহার করে গ্রামাঞ্চলে বেঁচে থাকার প্রয়োজন মিটানো যায় তবে আলো জ্বালাবার জন্য এখনও কেরোসিনের ব্যবহার সন্ধ্যাকালীন সীমিত সময়ে করতেই হয়। কাজেই, অথনৈতিক উন্নয়নের জন্য উন্নত মানের বাণিজ্যিক জ্বালানী (গ্যাস, তেল) ব্যবহার আবশ্যক। দেশে সীমিত গ্যাস ও কয়লার মজুদ বিবেচনায় উৎপাদন ও ব্যবহারেও স্বচ্ছ নীতিমালা অবলম্বনই যুক্তিযুক্ত।

* দেশের জ্বালানী উন্নয়নের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ  বিষয় হচ্ছে সার্বক্ষনিক স্বল্প, মধ্যম ও দীর্ঘ মেয়াদী জ্বালানী নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। জ্বালানী নিরাপত্তা হচ্ছে জ্বালানীর চাহিদা অনুসারে সরবরাহ নিশ্চিত করা, যা কোন কারণে বিঘিœত হলে অর্থাৎ চাহিদার চেয়ে সরবরাহ কম হলে জ্বালানী নিরাপত্তাহীনতার সৃষ্টি হয় এবং জ্বালানী সংকট দেখা দেয়, যা বর্তমানে বাংলাদেশে অব্যাহতভাবে বেড়েই চলেছে। মানুষ তাই উৎকণ্ঠিত। দুঃখজনক হলেও সত্যি যে, বাংলাদেশ সরকার বর্তমান নীতিমালার আওতায় কোন জ্বালানী নিরাপত্তা কৌশল প্রণয়ন করেনি এবং করার কোন প্রচেষ্টাও নেয়নি।

গৃহীত নীতিমালা :

১২। ১৯৭৪ সাল থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত, সময়কালে (৩৪ বছর) বিভিন্ন সেক্টর ভিত্তিক নীতি গৃহীত হয়েছে। জ্বালানী সেক্টরে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আইন ও নীতি প্রণীত হয় পেট্রোলিয়াম সেক্টরে, যা Petroleum Act 1974 Gas Oil and gas exploration policy নামে পরিচিত। এ প্রসঙ্গে উল্লেখ্য যে:

* Concession / Royalty’র নীতি পরিবর্তনের পর দেশে সীমিত আকারে Production-Sharing নীতির প্রচলন এক নতুন যুগের সৃষ্টি করে। উক্ত নীতির আওতায় দেশকে মোট ১৬টি ভাগে বিভক্ত করে সমুদ্রাঞ্চলের জন্য নিদিষ্ট ৬ (ছয়) ব্লক  বিদেশী কোম্পানির হাতে দেয়া হয় কেননা এতে ঝুঁকি এবং বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল অত্যধিক, যা ছিল তৎকালীন সরকারের ক্ষমতার বাইরে। তবে, অবশিষ্ট ১০ (দশ) টি ব্লক শুধুমাত্র পেট্রোবাংলার জন্যই নির্ধারিত ছিল এবং এও বলা হয়েছিল যে দেশের অভ্যন্তরে কোন ব্লক বিদেশী কোম্পানির সঙ্গে চুক্তির আওতায় নেয়া হবে না। ১৯৮০’র দশকে প্রথম ও নব্বই দশকে ভূ-অভ্যন্তরে ও বিদেশী কোম্পানি (আইওসি) সমূহকে ব্লক বরাদ্ধ চলতে থাকে অব্যাহতভাবে। পক্ষান্তরে, exploration right বিদেশী কোম্পানিকে হস্তান্তরের দু’যুগের মধ্যে নানা জটিলতার সৃষ্টি তো হয়েছেই, দেশ আর্থিকভাবে প্রচুর লোকসানের সম্মুখীন হয়েছে। পেট্রোবাংলা/বাপেক্সকে নীতিমালার আওতায় প্রদত্ত দায়িত্ব থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে প্রচণ্ডভাবে। আমলা রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন/ দুর্নীতির কারণে ক্রমশঃ বাপেক্সকে ঠুঁটো জগন্নাথে পরিণত করেছে সরকার।

* ১৯৯৩ সালে পেট্রোলিয়াম পলিসিকে ন্যাশনাল এনার্জি পলিসি’তে অন্তর্ভুক্ত/সমন্বয় করার ব্যবস্থা সরকার অনুমোদন করেছিল (১৯৯৬ সালে উক্ত নীতিমালা গেজেট আকারে প্রকাশ করা হয়)। উক্ত নীতিমালায় পাইপ লাইনের মাধ্যমে গ্যাস রপ্তানির বিষয়টি ¯পষ্টভাবে নাকচ করা হলেও ২০০১/২০০২ সালে ভারতে পাইপ লাইনের মাধ্যমেই গ্যাস রপ্তানির বিষয়টি সরকার তাদের চাঁইদের প্ররোচনায় পুনঃ পর্যালোচনা শুরু করে। রপ্তানির পক্ষে জোর লবিং শুরু করেন বুয়েটের দুজন অধ্যাপক, এফবিসিসিআই এর তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ও একজন সাবেক পররাষ্ট্র সচিব। তাঁদের বক্তব্য ছিল দেশে ৮০-১০০ ট্রিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস রয়েছে। কাজেই গ্যাস রপ্তানি করায় কোন অসুবিধা হবে না। কিন্তু, শেষ অবধি সাধারণ মানুষের প্রতিরোধের মুখে সে অপচেষ্টা বাদ পড়ে। তবুও মনে হচ্ছে সে প্রচেষ্টা শেষ হয়নি যদিও সম্প্রতি Sector Master Plan, ২০০৬ এ দেশের অবশিষ্ট গ্যাসের পরিমাণ মাত্র ৮-৯ ট্রিলিয়ন ঘনফুট উল্লেখ করেছে। (বিগত ৫ মার্চ, ২০০৭ এ আমি Energy Round Table Conference এ আমন্ত্রিত অতিথি হিসাবে একই ধরণের অসত্য তথ্যের সম্মুখীন হয়েছিলাম)। আমার মনে হয় বাংলাদেশ সরকারের জ্বালানী মন্ত্রণালয় ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তথ্য বিকৃতি বিষয়টি সম্পর্কে উদাসীন।

* লক্ষ্যনীয় যে, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রাজনৈতিক সরকারের পরিবর্তন হলেও গৃহীত জ্বালানী নীতি চলমান ও অপরিবর্তনীয় থাকে। কিন্তু, বাংলাদেশ সরকার (২০০১-২০০৬ পর্বে) অনুমোদিত জ্বালানী নীতিমালা হালনাগাদের নামে নানা পরিবর্তন/সংশোধন প্রচেষ্টা চালাতে থাকে। ২০০৫ সালে একজন জ্বালান উপদেষ্টা (মাহমুদুর রহমান) নিয়োগের পর থেকে জ্বালানী নীতির অবমূল্যায়ন শুরু হয়।

* ১৯৯৫ সালে অনুমোদিত জাতীয় জ্বালানী নীতিতে যে দশটি উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য বর্ণিত ছিল তা কি যথাযথভাবে বিশ্লেষণ বা সংশোধন করা হয়েছে? আমার জানা মতে হয়নি। তবুও, একটি নতুন জ্বালানী নীতির আশ্রয়ে ও প্রশ্রয়ে কী দেশের কয়লা ক্ষেত্রগুলো রপ্তানির জন্য বিভিন্ন বিদেশী/দেশী কোম্পানিকে বরাদ্দ দেয়ার গোপন প্রচেষ্টাকে হালাল করার উদ্দেশ্যে করা হচ্ছে? ছয়টি ভার্সানে প্রণীত কয়লা নীতিতে (সর্বশেষ মার্চ-২০০৭) কয়লার মোট মজুদ ১৪০০ মিলিয়ন টন থেকে ২৭০০ মিলিয়ন টন বলা হয়েছে। সর্বনিম্ন ১৪০০ মিলিয়ন টনের মূল্য বর্তমান আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি টন ৬০ মার্কিন ডলার হিসাবে ৮৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। “প্রস্তাবিত কয়লানীতি ২০০৭” অনুযায়ী উৎপাদিত কয়লার প্রায় ৮০% বিদেশে রপ্তানি করা হবে। পক্ষান্তরে, বর্ণিত কয়লা নীতির এটাই প্রধান ও একমাত্র উদ্দেশ্য। শুধু বিদেশী কোম্পানির স্বার্থে বা বিদেশের স্বার্থে কয়লা নীতি প্রণয়নের তো প্রয়োজন নেই। সরকার একটি সিদ্ধান্তের মাধ্যমেই তো তা করতে সক্ষম। সরকার নিজেকে এত দুর্বল মনে করে কেন? সেই নীতিতে আরও বলা হয়েছে ৬% (ছয় শতাংশ) রয়্যালটির বিপরীতে কোম্পানির হাতে কয়লার মালিকানা হস্তান্তরিত হবে এবং কোম্পানিই এর উৎপাদন নিয়ন্ত্রণ করবে এবং রপ্তানি মূল্যও নির্ধারণ করবে। এ সকল অস্বচ্ছ ও উদ্দেশ্য প্রণোদিত কয়লা নীতিমালার ‘ড্রাইভিং সিটে’ বসেছেন বর্তমান জ্বালানী সচিব। তিনি প্রচার মাধ্যমে দেশবাসীকে জানিয়েছেন চলতি জুন, ২০০৭ সালের মধ্যে প্রস্তাবিত কয়লানীতি সরকারের নীতি নির্ধারকদের কাছে পেশ করবেন। তিনি মনে করেন নীতিটি তাঁরা অনুমোদন করবেন। কি অদ্ভুত দেশে আমরা বাস করি। জনস্বার্থের প্রতি এ ধরণের পরিহাস এর প্রতি আমরা জোর প্রতিবাদ করছি।

জ্বালানি নীতি বাস্তবায়নে সীমাবদ্ধতা, প্রতিবন্ধকতা:

১৩। বিগত ১৯৯৮ সাল থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত একজন পূর্ণকালীন জ্বালানী মন্ত্রীর দায়িত্বে কেউ না থাকায় এবং পর পর দু’জন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জ্বালানী মন্ত্রীর দায়িত্বে থাকার ফলে সৃষ্ট পরিস্থিতি সম্পর্কে দেশবাসী অবহিত আছেন। সর্বোপরি জ্বালানী প্রতিমন্ত্রী ও একজন বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী এবং সাবেক একজন জ্বালানী উপদেষ্টা বেআইনীভাবে এবং গোপনীয়তার মাধ্যমে যে সকল কর্মকাণ্ড পরিচালনা করেছিলেন তা অব্যাহত থাকলে এতদিনের দেশের গ্যাস ও কয়লা সম্পদ এক চরম অবস্থার সম্মুখীন হতো। তাতে জনস্বার্থ অবশ্যই ক্ষুন্ন হতো। এ বিষয়টি বিস্তারিত আলোচনা আবশ্যক। তবে, সংক্ষেপে বলা যায় যে:

* নিজস্ব জ্বালানী উৎস (গ্যাস ও কয়লা) ব্যবহারের মাধ্যমে জ্বালানী নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যাবে কিনা এ বিষয়ে বিতর্ক আছে। এরই মধ্যে বিদেশী কোম্পানিসমূহ এবং দেশীয় দালালদের প্ররোচনায় কয়লা রপ্তানির যে নতুন চক্রান্ত চলছে সেটা জনসম্মুখে তুলে ধরতে হবে কেননা প্রস্তাবিত কয়লা নীতিটি জনস্বার্থে বিবর্জিত।

* দেশে ভবিষ্যৎ জ্বালানী চাহিদার প্রতি দৃষ্টি রেখে তেল/গ্যাস অনুসন্ধান ত্বরান্বিত করার লক্ষ্যে গভীর সমুদ্রাঞ্চলে যে কার্যক্রম হাতে নেয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে বর্তমান সরকার সে সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা আছে কি না বা এর বাস্তবায়ন কৌশল পদ্ধতিতে কোন গলদ আছে কি না তা কী খোঁজ খবর নিয়েছে? না নিয়ে থাকলে প্রথম রাউন্ড বিডিং এর মত বর্তমান চতুর্থ রাউন্ডের (২০০৭) পরিণতিও একই ধরণের হতে পারে। কাজেই, বিষয়টিতে আরও অনেক সাবধানতার সঙ্গে পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে বিচার বিশ্লেষণের মাধমে এগুতে হবে। অবশ্যই বিষয়টি প্রচার মাধ্যমে জনগণকে জানাতে হবে এবং স্পষ্টভাবে উল্লেখ করতে হবে যে এতে ভারত বা মায়ানমারের কোন আপত্তি রয়েছে কি না? তাছাড়া, পূর্ববর্তী (১৯৭৪-১৯৭৮) প্রথম রাউন্ডে ও সাঙ্গু গ্যাস ক্ষেত্র থেকে আহরিত তথ্য/বিশ্লেষণ কি ঈঙ্গিত দেয় তাও জনগণকে জানাতে হবে, কেননা সংবিধান অনুযায়ী দেশের অভ্যন্তরে এবং সমুদ্রাঞ্চলের সকল সম্পদের মালিক দেশের জনগণ এবং তাদের স্বার্থেই এ কাজ করতে হচ্ছে কি না তাও জনগণ জানতে চায়। পক্ষান্তরে, প্রস্তাবিত চতুর্থ রাউন্ড (২০০৭) এর একটি সুস্পষ্ট গাইড লাইন প্রণয়নের মাধ্যমে এবং দেশের সর্বোচ্চ মতামতপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান জাতীয় সংসদ এর অনুমোদনের মাধ্যমেই বাস্তবায়ন হবে যুক্তিযুক্ত।

* ২০০৩ সালের এক ঘটনা থেকে জানা যায় যে, গোপন চক্রান্তের মাধ্যমে সাবেক জ্বালানী উপদেষ্টা দেশীয় সংস্থা বাপেক্স/বিজিএফসিলকে একপাশে সরিয়ে রেখে ইউনোক্যাল/শেভ্রনকে বিবিয়ানা গ্যাসক্ষেত্র উন্নয়নের অনুমতি দেয়, সম্ভবত: দেশে গ্যাস ও অর্থ সংকটের দোহাই দিয়ে। সে সময়ে, এমনকি এখনও, বাংলাদেশ গ্যাসফিল্ড কোম্পানির (বিজিএফসিএল) হাতে অন্তত: ১০টি গ্যাসকূপ খননের অর্থ ব্যাংকে গচ্ছিত আছে বলে জানা যায়। দ্বিতীয়ত, পিএসসি’র আওতায় ১২ নম্বর ব্লকে অবস্থিত ইউনোক্যাল/শেভ্রন পরিচালিত বিবিয়ানা গ্যাসক্ষেত্র থেকে সে মুহূর্তে গ্যাস ক্রয়ের কোন বাধ্যবাধকতা ছিল না। বরং বাপেক্সকে তিতাস/হবিগঞ্জ/রশিদপুর গ্যাসক্ষেত্রসমূহে প্রয়োজনীয় সংখ্যক গ্যাসকূপ খনন করতে নির্দেশ দিলে পেট্রোবাংলা/সরকারের আর্থিক সুবিধা হতো এবং অধিক মূল্যে এবং বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময়ে শেভ্রন থেকে (বিবিয়ানার) গ্যাস কিনতে হতো না; জনস্বার্থও ক্ষুন্ন হতো না। তাহলে কি কারণে শেভ্রনকে বিবিয়ানা থেকে গ্যাস উত্তোলনে সাবেক জ্বালানী উপদেষ্টা তাগিদ দিয়েছিলেন?

* বাংলাদেশে ম্যানুফ্যাকচারিং খাতে সরাসরি বিদেশী বিনিয়োগ (FDI) ও জ্বালানী খাতে FDI সম্পর্কে যে পার্থক্য রয়েছে তা জনগণ জানলেও সরকারের ধারণা মানুষ বোঝে না। প্রথমটির ব্যাপারে যতটা আগ্রহ থাকা উচিৎ দ্বিতীয়টির ব্যাপারে ততটা সতর্কতা আবশ্যক। প্রথমটিতে দেশের শ্রমিক দ্বারা মূল্য সংযোজন হয় এবং দ্বিতীয়টিতে থাকে লুণ্ঠন ও দুর্নীতি। সে কারণেই দ্বিতীয়টিতে বিদেশী কোম্পানি উৎসুক থাকে। তারা রপ্তানির জন্য খনিজ সম্পদ উত্তোলনে উদ্যোগী হয়। অরূপান্তরিত বা গ্যাস/কয়লা কাঁচামাল অবস্থায় অথবা রূপান্তরিত অবস্থায় (সার/স্টিল) সেগুলো রপ্তানি সৃষ্টির মাধ্যমে লুণ্ঠন প্রবৃত্তিতে তারা প্রলুব্ধ হয়, তাতে সহযোগীরাও অবশ্য যথেষ্ট উৎসাহবোধ করে। ফলে, দেশের সীমিত সম্পদের ভাণ্ডার শূন্য হয়ে যেতে সময় লাগে না। তবুও, জনস্বার্থবিরোধী সরকার আমলাদের প্ররোচণায় গ্যাস বা গ্যাসজাত পদার্থ (সার/স্টিল) এবং কয়লা ও কয়লাজাত পদার্থ রপ্তানিতে উৎসাহে ভাটা পড়ে না। এশিয়া এনার্জি কোম্পানি ও টাটা’র তথাকথিত বিনিয়োগ নিয়ে দেশের বহু বিজ্ঞ ব্যক্তিরা লবিং করে চলেছেন। তারা জনস্বার্থ বিষয়টি একবারেই বুঝতে চান না এবং দেশের জ্বালানী ভবিষ্যত নিয়ে একেবারেই চিন্তিত কি না তা নিশ্চিত করে বলা যায় না।

সৎ চিন্তা, সৎ বুদ্ধি ও সৎ প্রচেষ্টা মনে হয় বাংলাদেশের জ্বালানী উন্নয়ন কর্মকাণ্ড থেকে উঠে যাচ্ছে। দুর্নীতিগ্রস্থ জ্বালানী ও বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয়ের কিছু সাবেক আমলা (এককালে জ্বালানী প্রতিমন্ত্রী/উপদেষ্টা এবং বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রীর অতি ঘনিষ্টজনরা) এখনও সক্রিয়। সম্ভবতঃ তারাই বর্তমান জ্বালানী উপদেষ্টা মহোদয়ের কাছ থেকে তাদের দুষ্কর্ম লুকিয়ে রাখা বা একই ধারা অব্যাহত রাখার প্রচেষ্টায় জনস্বার্থবিরোধী তথ্য ও পরামর্শ ক্রমাগত সরবরাহ করে চলেছেন। ইতোমধ্যে বিদ্যুৎ খাতে বহুকাল থেকেই বিতর্কিত প্রকল্প (বিশেষ করে মেঘনাঘাট ৪৫০ মেগাওয়াট ও চাঁদপুর ১৫০ মেগাওয়াট) নিয়ে বর্তমান সরকারকে বিপথে পরিচালনার প্রচেষ্টায় রয়েছে। একইভাবে, জনস্বার্থবিরোধী খসড়া কয়লা নীতি অনুমোদনের মাধ্যমে এশিয়া এনার্জি কোম্পানির ফুলবাড়ী কয়লা প্রকল্পটি (প্রতিবছর ১৫ মিলিয়ন টন উৎপাদন এবং ১২ মিলিয়ন টন রপ্তানি প্রস্তাব) অনুমোদন করার ক্ষেত্রে প্রবল চাপ সৃষ্টি করে চলেছে।

* শোনা যায় বর্তমানে বিতর্কিত  কর্মকর্তারা অক্টোবর ১৯৯৬ সালে প্রণীত  ”Private sector power generation policy of Bangladesh’র ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে ইতোপূর্বে জ্বালানী প্রতিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদকে যেভাবে প্ররোচিত করেছিল, একই ভাবে solicited vs unsolicited bid সম্পর্কে বর্তমান সরকারকেও কু-পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। প্রকারান্তরে unsolicited bid সাধারণভাবে জনস্বার্থ বিরোধী। তবুও কেন একই ধরণের কর্মকাণ্ড চলছে ?

সুপারিশ:

১। জৈব জ্বালানী সংগ্রহ (সাধারণত মহিলা ও শিশুরা সম্পৃক্ত) ও তার অরাজনৈতিক ব্যবহারের ফলে যে লক্ষ লক্ষ নারী ও শিশু প্রতিনিয়ত পরিবেশ দূষণের শিকার হয় এবং তাদের স্বাস্থ্যের মারাত্মক অবনতি ঘটে চলেছে। এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণের লক্ষ্যে বিকল্প জ্বালানী অন্বেষণ আবশ্যক Ñ সেটাই হবে জনস্বার্থের পক্ষের কাজ। সৌর ও বায়ু বিদ্যুৎ ব্যবস্থা জোরদার করার ফলে গ্রামাঞ্চলের মহিলা/শিশুরা উন্নত জীবন যাপন করতে পারে। কাজেই, এর উন্নয়নে প্রচেষ্টা চালানো যায়।

২। প্রত্যেকটি (৭০ টি বর্তমানে) পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির আওতায় আনুমানিক ২০ মেগাওয়াট সম্পন্ন বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন (distributed generation policy ‘র আওতায়) করার ফলে দেশে মোট ১৪০০ মেগাওয়াট নতুন বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন আগামী ২ (দুই) বছরের মধ্যেই সম্ভব। সেক্ষেত্রে গ্রীড সে পরিমাণ বিদ্যুৎ অন্যত্র বিতরণ করতে সক্ষম হবে।

৩। দেশের পূর্বাঞ্চল (৮৫%) ও পশ্চিমাঞ্চলে (১৫%) স্থাপিত বিদ্যুৎ কেন্দ্র পরিচালনার ফলে দেশব্যাপী বিদ্যুৎ বিতরণে ব্যাপক বৈষম্য সৃষ্টি হয়েছে। আগামী পাঁচ বছরের জন্য একটি “বাধ্যতামুলক সিদ্ধান্তের” মাধ্যমে দেশের পশ্চিমাঞ্চলে ৩০০০ থেকে ৩৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন এবং পূর্বাঞ্চলে নুন্যতম কেন্দ্র স্থাপন বিদ্যুৎ ক্ষেত্রে এক নতুন দিগন্তের সৃষ্টি করতে পারে।

৪। কাফকো এবং লাফার্জের মত জনস্বার্থবিরোধী প্রকল্পে যে সকল রাজনীতিবিদ, আমলা ও কর্মকর্তা সম্পৃক্ত ছিল তাদের বিষয়ে তদন্ত করে ও বিচারের আওতায় আনা যুক্তিযুক্ত।

৫। উৎপাদন বণ্টন নীতিমালার আওতায় যে সকল কোম্পানি নব্বই দশক থেকে স্থবির হয়ে রয়েছে (অর্থাৎ কোন কাজকর্ম করছে না) তাদের চুক্তি অবিলম্বে বাতিল করে ব্যাপেক্সকে সেগুলো বরাদ্দ দেয়া যায়।

৬। বিদেশী কোম্পানির আবিষ্কৃত গ্যাসক্ষেত্রসমুহের “আন্তর্জাতিক সার্টিফিকেশন” প্রাপ্তির পূর্বে উৎপাদন নির্দেশ দেয়া যাবে না এবং প্রমাণিত মজুদের ভিত্তিতে উৎপাদন অর্থাৎ বছরে বর্তমান সর্বোচ্চ ৭.৫% স্থলে হ্রাসকৃত হারে নির্ধারণের ব্যবস্থা নেয়া যায়। সেক্ষেত্রে পিএসসি থেকে দেশে দীর্ঘ সময়ে গ্যাস প্রাপ্তি নিশ্চিত করা যায়।

৭। আইওসিগুলোর একমাত্র লক্ষ্য মুনাফা অর্জন করা। তাদের বিতর্কিত বিনিয়োগ (গোল্ড  প্লেটিং এর মাধ্যমে উচ্চ পর্যায়ে দেখানো হয়) থেকে কস্ট রিকভারির (cost recovery) কাজটি তারা অতি দ্রুততার সঙ্গে করতে সব সময়ে সচেষ্ট থাকে। অভিযোগ রয়েছে, এ কাজে তারা পেট্রোবাংলার কিছু সংখ্যক দুর্নীতিপরায়ণ কর্মকর্তার সহায়তা পেয়ে থাকে। বিষয়টি তদন্ত করে সংশোধনী আনা আবশ্যক।

৮। বাপেক্স এর প্রযুক্তিগত ও প্রশাসনিক ক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমে ভবিষ্যতে দেশের স্থলভাগে সকল অনুসন্ধান ও উন্নয়ন কূপ খনন ও সাইসমিক সার্ভে ইত্যাদির কাজে নিয়োজিত থাকার মধ্যেই জনস্বার্থ রক্ষা হবে।

৯। প্রস্তাবিত কয়লা নীতি মূলত: বিদেশী কোম্পানির মাধ্যমে কয়লা রপ্তানিরই নামান্তর। তাছাড়া এতে সংবিধানবিরোধী ৬% রয়্যালটির মাধ্যমে মালিকানা হস্তান্তরের ব্যবস্থা রয়েছে। আমলাতন্ত্রের যারা এ বিষয়ে অতি উৎসাহী হয়ে উঠেছেন তাদের কর্মকাণ্ড তদন্ত এবং খসড়া কয়লা নীতি বাতিল করাই একমাত্র জনস্বার্থ সম্পর্কিত কাজ হবে।

১০। জ্বালানি, খনিজ ও বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয়ে বিগত পাঁচ বছরের বিতর্কিত ও দুর্নীতিপুর্ণ কর্মকাণ্ড সম্পর্কে যথাসম্ভব দ্রুত একটি ‘White Paper ‘ প্রকাশ করতে হবে।