Wednesday, September 6th, 2017

দেশের জ্বালানি খাত কি ‘রেন্ট সিকিং’-এর উর্বর ক্ষেত্র?

ভুঁইফোড় কোম্পানি ‘এশিয়া এনার্জি’ প্রস্তাবিত দিনাজপুরের ‘ফুলবাড়ী কয়লা খনি প্রকল্প’ প্রতিরোধের নিমিত্তে গড়ে ওঠা গণআন্দোলনের এক ভয়াল মুহূর্ত স্মরণে স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ের আন্দোলনকারীরা প্রতি বছর ২৬ আগস্ট ‘ফুলবাড়ী দিবস’ পালন করে আসছেন। ২০০৬ সালের ওই দিনে ফুলবাড়ী শহরের নিমতলা মোড়ের কাছে ছোট যমুনা নদীর পাড়ে আন্দোলনকারীদের ওপর রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বাহিনীর আক্রমণে তিনজন নিহত হন। আরো শতাধিক আহত হন। এ হত্যাকাণ্ড খনিবিরোধী আন্দোলনকে নতুন মাত্রা এনে দেয়। বাংলাদেশের ‘শত্রুভাবাপন্ন ও সংঘর্ষপূর্ণ রাজনৈতিক সংস্কৃতি’র প্রেক্ষাপটে এবং স্থানীয় গণমানুষের জীবিকা, ভিটেমাটি হারানোর উদ্বেগজনিত আশঙ্কা সৃষ্ট ব্যাপকমাত্রায় অংশগ্রহণের ফলে ওই আন্দোলন (যা স্থানীয় পরিপ্রেক্ষিতে গড়ে উঠলেও) কেন্দ্রের শক্তিশালী আমলা ও রাজনৈতিক এলিটদের ক্ষমতাকে ‘আপ সাইড ডাউন’ করতে সমর্থ হয়। ২৬ আগস্টের হত্যাকাণ্ডের পর রাজনৈতিক ক্ষমতার ভরকেন্দ্র ক্ষণিকের জন্য হলেও নড়ে যায়— এটি ‘ওপর’ থেকে ‘নিচু’ তলায় নেমে যায়। ‘নিচু’ তলার মানুষ এ সুযোগে কোনো ছাড় না দিয়ে আমলা ও রাজনৈতিক এলিটদের থেকে পুরো পাওনা আদায় করে নেয়। এর সাক্ষী ৩০ আগস্টের আন্দোলনকারী ও সরকারের প্রতিনিধির মধ্যে স্বাক্ষরিত ‘তাত্পর্যপূর্ণ’ সমঝোতা স্মারক, যা এর আগে বাংলাদেশে কোথাও হয়েছে বলে শোনা যায়নি।

বাংলাদেশের আমলা ও রাজনৈতিক এলিটরা এ সমঝোতা স্মারককে একটি ‘ফরমাল চুক্তি’র মর্যাদা দিয়ে পরিপূর্ণভাবে বাস্তবায়ন করতে অনীহা প্রকাশ করায় ওই আন্দোলন অদ্যাবধি নানা ফর্মে অব্যাহত আছে। কেন এ অবস্থা সৃষ্টি হলো, তার জবাব খুঁজতেই শিরোনামের এ প্রশ্ন। এ প্রশ্নের জবাব খোঁজার জন্য আমি বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে সিদ্ধান্ত গ্রহণের রাজনীতি ও সাধারণ অর্থনীতির ব্যবস্থাপনায় দুর্নীতি— এ দুই ক্ষেত্রে প্রথিতযশা স্কলারদের— কেএএস মুরশিদ (বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান), মুশতাক খান (লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়), মোজাফফর আহমাদ (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়) কাজের ওপর ভর করেছি। এদের গবেষণা থেকে দেখা যায়— ১. জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশের আমলা ও রাজনৈতিক এলিটরা নিজেদের লাভের আশায় ব্যাপকভাবে নানা উপায়ে প্রভাব বিস্তার করেন, যা এ খাতে প্রকল্পের ঝুঁকি ও ব্যয় বাড়িয়ে তোলে; ২. রাজনৈতিকভাবে সংশ্লিষ্ট অনেক ব্যবসায়ী বিদেশী কোম্পানির স্থানীয় এজেন্টের ভূমিকা পালন করার নামে এ সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় বিধিবহির্ভূত প্রভাব বিস্তার করেন; ৩. এতে আইনকানুনের তোয়াক্কা করা অনেক সময় বাধা হিসেবে কাজ করে, ফলে তা এড়িয়ে যাওয়ার চাপ সৃষ্টি হয় নীতিনির্ধারকদের ওপর; ৪. এ সবকিছুর নিট ফল দাঁড়ায়— এ খাতের কর্মকাণ্ডে ব্যাপক মাত্রায় দুর্নীতির ছাপ। ফলে জনস্বার্থের বদলে আমলা, রাজনৈতিক এলিট ও স্থানীয় ও অস্থানীয় মুত্সুদ্দিগোষ্ঠীর স্বার্থ বড় হয়ে ওঠে। ফুলবাড়ী কয়লা খনি তার এক জ্বলন্ত উদাহরণ।

একটি অমীমাংসিত প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৯৪ সালে বাংলাদেশের তত্কালীন বিএনপি সরকার নানা পর্যায়ে ব্যাপক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে অস্ট্রেলীয় কোম্পানি, বিএইচপির সঙ্গে (যা দুনিয়াজুড়ে একটা বড় খনি কোম্পানি হিসেবে সুনাম ও দুর্নাম— দুটোই কুড়িয়েছে) তখনকার প্রচলিত খনি বিধিমালার ‘রয়্যালটি-সংক্রান্ত’ বিধি লঙ্ঘন করে দেশের উত্তরাঞ্চলে কয়লা খনি অনুসন্ধান ও উন্নয়ন চুক্তি স্বাক্ষর করে। বলা দরকার যে, খনিবিধি অনুযায়ী এ চুক্তি সম্পর্কে অনতিবিলম্বে সরকারি প্রজ্ঞাপন জারি করার বিধান থাকলেও তা করা হয়নি। বিএইচপি ১৯৯৭ সালে ফুলবাড়ী কয়লা খনি আবিষ্কার করে এবং খনি উন্নয়নে আগ্রহ হারায়। জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের একজন সিনিয়র অফিসার (যিনি এতে সম্পৃক্ত ছিলেন) জানালেন যে, ফুলবাড়ীতে কয়লার গভীরতা উন্মুক্ত খনি করার ক্ষেত্রে উপযোগী না হওয়ায় (বিএইচপি উন্মুক্ত খনি করাটাই লাভজনক মনে করেছিল) এ খনি উন্নয়নে আগ্রহ হারায় এবং বাংলাদেশ ছেড়ে চলে যায়। এর মধ্যে বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ সরকার ২১ বছর পর বিপুল বিজয় অর্জন করে ক্ষমতায় আসে।
বিএইচপি চলে যাওয়ার প্রাক্কালে জ্বালানি মন্ত্রণালয়কে অনুরোধ করে যেন ওই খনি-বিষয়ক চুক্তি বাংলাদেশের খনিবিধি অনুযায়ী তারা আরেকটি কোম্পানির কাছে হস্তান্তর করতে পারে। আওয়ামী লীগ সরকার এতে আইনমাফিক সায় দেয় এবং ১৯৯৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে ‘এশিয়া এনার্জি’ নামের আরেক অস্ট্রেলীয় কোম্পানির কাছে চুক্তি হস্তান্তর করা হয় (পরবর্তীতে ‘এশিয়া এনার্জি পিএলসি’ নামের এক বিলেতি কোম্পানি একে অধিগ্রহণ করে এবং লন্ডন স্টক একচেঞ্জে ২০০৪ সালে তালিকাভুক্ত হয়; দুবার নাম পাল্টিয়ে এখন ওই কোম্পানির নাম জিসিএম রিসোর্সেস; তবে মূল কোম্পানি, যার সঙ্গে বাংলাদেশ সরকারের চুক্তি, তার নাম অপরিবর্তিত আছে)। এ বিষয়ে সরকার প্রায় আট বছর পরে ২০০৬ সালের জুনে একটি প্রজ্ঞাপন জারি করে। হয়তো জ্বালানি মন্ত্রণালয় এটি সময়মতো প্রকাশের প্রয়োজনই বোধ করেনি। উল্লেখ করা দরকার, বিএইচপির বিশাল খনি কোম্পানি হিসেবে কাজের অভিজ্ঞতা থাকা সত্ত্বেও বিএনপি সরকার সময় নিয়ে (এমনকি জাতিসংঘের এক বিশেষজ্ঞের মতামত নিয়ে) ১৯৯৪ সালে চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। অথচ আওয়ামী লীগ সরকার ১৯৯৮ সালে কোনো পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেনি যে, এশিয়া এনার্জি কেমন ধরনের কোম্পানি। এরূপ একটি ভুঁইফোড় কোম্পানির হাতে সরকার বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় খনির দায়িত্ব হস্তান্তর করল! শুধু ফুলবাড়ী কয়লা খনির চুক্তি পাওয়ার লক্ষ্যেই বিএইচপির দুজন সিনিয়র ম্যানেজার অস্ট্রেলীয় ছোট একটি খনি-বিষয়ক ইনভেস্টমেন্ট কোম্পানির ওপর ভর করে এ কোম্পানি তৈরি করেছে এবং ‘ম্যানেজমেন্ট বাই-আউট’ পদ্ধতিতে বাংলাদেশের সরকারের অনুমোদনে বিএইচপি থেকে এ খনি-সংক্রান্ত মালিকানা পেয়েছে। অনলাইনের এ যুগে একজন সাধারণ মানুষ এটি বের করতে পারে, অথচ জ্বালানি মন্ত্রণালয় পারেনি— এমনটি ভাবা ঠিক হবে না।

দুটো প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই জাগে— ১. কেন ১৯৯৪ সালে বিএনপি সরকার খনিবিধি মানেনি? ২. কেন আওয়ামী লীগ সরকার ১৯৯৮ সালে তলিয়ে দেখেনি এশিয়া এনার্জি আদতে কোনো খনি কোম্পানি কিনা। উল্লিখিত গুরুত্বপূর্ণ একাডেমিক গবেষণাকর্মের পরিপ্রেক্ষিতে আমি অনুমান করছি, জনস্বার্থের বদলে আমলা, রাজনৈতিক এলিট, স্থানীয় ও অস্থানীয় মুত্সুদ্দিগোষ্ঠীর স্বার্থ বড় হয়ে ওঠায় এমনটি করা সম্ভব হয়েছে। ২০০৬ সালে জ্বালানি মন্ত্রণালয় গঠিত এক বিশেষজ্ঞ কমিটি এশিয়া এনার্জির খনি উন্নয়ন প্রস্তাবনা পর্যালোচনা করে বলেছে যে, এটি আইনি, অর্থনৈতিক, কারিগরি ও পরিবেশগত দিক থেকে অগ্রহণযোগ্য একটি প্রকল্প। ২০১২ সালে গঠিত আরেকটি বিশেষজ্ঞ কমিটিও এতে ব্যাপক ত্রুটি চিহ্নিত করেন। অথচ এ প্রকল্পের শুভানুধ্যায়ী হিসেবে আমলা, রাজনৈতিক এলিট, বিদেশী কূটনীতিক, ব্যবসায়ী ও খনি কোম্পানির নানা মাপের লবিস্টরা (যাতে সাংবাদিক থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকও আছেন) ২০০৫-১৩ পর্যন্ত এর পক্ষে সাফাই গেয়ে মুখে ফেনা তুলেছেন। উল্লেখ করা দরকার, বাংলাদেশের সরকার এ নিয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো প্রতিবেদন প্রকাশ করেনি, এমনকি ফুলবাড়ী অঞ্চলে এ বিষয়ে সরকারের কোনো তত্পরতা সে সময় ছিল না; আজো নেই। আরো দুটো বিষয়ে আলোকপাত করতে চাই শিরোনামের প্রশ্নের জবাব পাওয়ার জন্য।

১. বিশ্বব্যাপী কয়লা খনি উন্নয়নে সরকারি-বেসরকারি কোম্পানির অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে সরকার খনিজ সম্পদের ওপর মালিকানা হেতু রয়্যালটি ধার্য করে। এ রয়্যালটির হার স্থির থাকে না, সময়ে সময়ে সরকার প্রজ্ঞাপন জারি করে এটি হালনাগাদ করে, বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এটি বাড়ানো হয়। যেমন— ২০১২ সালে ভারত কয়লার রয়্যালটি বাড়িয়েছে, ২০১৬ সাল থেকে এটি আবারো বাড়ানোর জন্য কাজকর্ম শুরু হয়েছে, কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ভিন্ন চিত্র দেখা যায়। এশিয়া এনার্জির দলিলমতে, খনির জীবনকালীন (৩৫ থেকে ৩৮ বছর বা তারও বেশি) রয়্যালটির হার অপরিবর্তিত থাকবে, সে নিশ্চয়তা বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকরা তাদের দিয়েছেন। ২০০৬ সালের কয়লানীতির এক খসড়া সংস্করণে রয়্যালটির হার বাড়ানোর ক্ষেত্রে স্থানীয় কাজে ব্যবহূত কয়লা ও রফতানির জন্য নির্ধারিত কয়লার জন্য কয়লার মূল্যের পরিপ্রেক্ষিতে আলাদা আলাদা রয়্যালটি নির্ধারণের জন্য একটি ফর্মুলা অন্তর্ভুক্ত করায় খনি কোম্পানি আপত্তি জানিয়েছে, সে কয়লানীতি ১২ বছর ধরে ঝুলে আছে। কার স্বার্থে এটি ঝুলে আছে? উত্তর নিহিত আছে উল্লিখিত গবেষণার কয়েকটি অনুসিদ্ধান্তে।

২. বিএনপি সরকার ক্ষমতায় এলে এশিয়া এনার্জি ২০০৫ সালের অক্টোবরে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে ফুলবাড়ীতে কয়লা খনি নির্মাণে সরকারের কাছে খনি ইজারা পাওয়ার জন্য আবেদন করে। আগেই উল্লেখ করেছি, বিএইচপি ফুলবাড়ীর কয়লার গভীরতা উন্মুক্ত খনি করার উপযোগী নয় বলে খনি উন্নয়নে আগ্রহী হয়নি। অথচ তত্কালীন সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে ‘সবুজ সংকেত’ পেয়ে (দেখুন ডেইলি স্টার, সেপ্টেম্বর ১, ২০০৬) এশিয়া এনার্জি পরিবেশবিধ্বংসী উন্মুক্ত খনি করার কাজে ঝাঁপিয়ে পড়ল। খনির ইজারা নিতে করা আবেদনে খনিবিধি মোতাবেক খনির প্রস্তাবিত মূল্যের ৩ শতাংশ অর্থ ব্যাংক গ্যারান্টি হিসাবে প্রদান করতে হবে। এ অর্থ সরকার খনিবিধি মোতাবেক রয়্যালটি, বার্ষিক নানা ফি ও অন্যান্য বকেয়া নিশ্চিত করার জন্য নিয়ে থাকে। এশিয়া এনার্জির দলিলমতে, তারা খনির প্রথম দু-তিন বছরে ৫০০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করবে; পরবর্তী সময় (৩৫-৩৮ বছর) তারা আরো ১ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করবে (মোট ২ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ); পাশাপাশি খনিমুখে ৫০০ মেগাওয়াটের একটি বিদ্যুেকন্দ্রের জন্য ৫০০ মিলিয়ন ডলার খরচ করবে। এসব অংকের পরিপ্রেক্ষিতে খনির একটা প্রাক্কলিত মূল্য কত হতে পারে? তার আলোকে সরকারের কোষাগারে ৩ শতাংশ হারে ব্যাংক গ্যারান্টি কত হতে পারে? নিশ্চয় এ ব্যাংক গ্যারান্টির পরিমাণ একটা বিশাল অংকের হবে। এশিয়া এনার্জি খনি ইজারা নেয়ার জন্য করা আবেদনে ১ ডলারও ব্যাংক গ্যারান্টি হিসেবে জমা দেয়নি বলে জ্বালানি মন্ত্রণালয় গঠিত পর্যালোচনা কমিটি চিহ্নিত করেছে। খনিবিধি অনুযায়ী ব্যাংক গ্যারান্টি ছাড়া খনি ইজারার আবেদন অসম্পূর্ণ ও অগ্রহণযোগ্য হওয়ার কথা। এক্ষেত্রে তা হয়নি। কেন হয়নি? তার উত্তর নিহিত আছে আগের একাডেমিক গবেষণার অনুসিদ্ধান্তে। ২০০৭ সালে সেনানিয়ন্ত্রিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে কয়লানীতি তৈরির জন্য গঠিত পরামর্শক কমিটির সঙ্গে মত বিনিময়কালে এশিয়া এনার্জির নির্বাহী কর্মকর্তাকে কমিটির এক সদস্য খনিবিধি মোতাবেক ব্যাংক গ্যারান্টি জমা না দেয়ার ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলে তিনি জানান যে, সরকারের উচ্চপর্যায়ের রাজনৈতিক নেতৃত্বের সঙ্গে পরামর্শ করেই তারা ব্যাংক গ্যারান্টি জমা দেননি। এ থেকে বোঝা যায়, সরকারের উচ্চপর্যায়ের রাজনৈতিক নেতৃত্ব চাইলেই বাংলাদেশের প্রচলিত আইনকানুনের প্রয়োগ উল্টিয়ে দেয়া যায়। কেন যায়, তার উত্তর বোধহয় বলার প্রয়োজন নেই।

এহেন পরিস্থিতিতে অত্যন্ত আশার কথা যে, খনিজ সম্পদ নিয়ে এরূপ দুর্নীতির বিরুদ্ধে খনি অঞ্চলের জনগণ দারুণ এক প্রতিরোধ রচনা করেছে ২০০৫ সালের শুরুতে, যখন কয়লা খনি বিষয়ে বাংলাদেশের সচেতন নাগরিকদেরই (যারা নানা বিষয়ে সঙ্গতভাবেই সোচ্চার হন) কোনো ধারণা ছিল না। স্থানীয় পর্যায়ে এ প্রতিরোধ ধীরে ধীরে এতই তীব্র হয়ে ওঠে যে, ২০০৬ সালের মার্চে সরকারের এক গোয়েন্দা সংস্থা প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরকে জানিয়েছিল যে, স্থানীয় জনগণের মতামত আমলে না নিয়ে খনি বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করা ঠিক হবে না। ২৬ আগস্ট তীব্র গণঅসন্তোষের প্রকাশ ঘটে। গত ১০ বছরে এর কোনো পরিবর্তন যে হয়নি, তা ২০১০ সালের অক্টোবরে, ২০১২ সালের নভেম্বরে এবং ২০১৪ সালের নভেম্বরে স্থানীয় মানুষ জানিয়ে দিয়েছে। এ সম্পর্কে ঢাকার নানা এলিট মহলের ধারণা অত্যন্ত ভ্রান্ত। ফুলবাড়ী অঞ্চলের নানা প্রান্তে এর প্রমাণ পাওয়া যায়। বর্তমান সরকার এটি দেরিতে হলেও বুঝতে পেরেছে। ফলে ২০১৪ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের নানা সিদ্ধান্ত খনিবিরোধী আন্দোলনের ২০০৫ সালের শুরু থেকে উত্থাপিত দাবিগুলোকে সঠিক বলে মেনে নিচ্ছে। তবে বাংলাদেশের আমলা ও রাজনৈতিক এলিটদের ‘রেন্ট সিকিং’ চরিত্রের পরিপ্রেক্ষিতে খনিবিরোধী আন্দোলন নিভে যায়নি। কেননা জ্বালানি মন্ত্রণালয় এশিয়া এনার্জির সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তি বাতিল করেনি, যদিও ২০০৬ সালের বিশেষজ্ঞ কমিটি এ চুক্তিকে বেআইনি বলে মত দিয়েছে। তাদের মতে, বিএইচপির সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তি খনি বিধিমালা অনুযায়ী তামাদি হয়ে যাওয়ায় এশিয়া এনার্জির কাছে হস্তান্তর করার কোনো এখতিয়ার ছিল না। খনি কোম্পানি উত্তরাঞ্চলের খনি এলাকা থেকে বিতাড়িত হলেও ঢাকা ছাড়েনি। আশায় অপেক্ষা করছে। সবুরে মেওয়া ফলে!

বাংলাদেশের জ্বালানি খাতের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় জনস্বার্থ প্রাধান্য পেলে এশিয়া এনার্জির আশায় গুড়ে বালি হবে, তা প্রতিষ্ঠিত করতেই প্রতি বছর ‘ফুলবাড়ী দিবস’ আন্দোলনকারীদের নতুন শক্তি জোগায়।

লেখক: টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের পিএইচডি গবেষক