Thursday, July 28th, 2011

বিদ্যুতের মূলবৃদ্ধি প্রসঙ্গে অধ্যাপক শামসুল আলমের সাক্ষাতকার

[অধ্যাপক এম শামসুল আলম। প্রাক্তন অধ্যাপক, চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়। বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতকে পর্যবেক্ষণ করছেন দীর্ঘদিন যাবৎ। জ্বালানি বিশেষজ্ঞ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেছেন নানা ধরনের গবেষণা ও কর্মতৎপরতার মধ্য দিয়ে। জ্বালানি খাতে যুদ্ধাপরাধী রয়েছে এমন মন্তব্য করে খ্যাতি অর্জন করেছেন তিনি। সাম্প্রতিক সময়ের বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির সরকারি ঘোষণা নিয়ে সাপ্তাহিক-এর কাছে ব্যক্ত করেছেন নিজস্ব মতামত। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আনিস রায়হান।]

সাপ্তাহিক : সম্প্রতি সরকার বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির ঘোষণা দিয়েছে। দাম বাড়ার পেছনের কারণগুলো কী কী?
শামসুল আলম : দাম বাড়ার অনেক কারণ রয়েছে। প্রথমত, ২০২৫ সাল লক্ষ্য করে বিদ্যুৎ খাতে যে মহাপরিকল্পনা (মাস্টার প্ল্যান) গ্রহণ করা হয়েছিল তাতে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা দেখানো হয়। পরবর্তীতে দেখা গেল যে, গ্যাসই নেই। এর মধ্যে ব্যক্তি খাতে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য আবার গ্যাস দেবার কথা বলা হয়েছিল। গ্যাস না পাওয়া গেলে কি করা হবে তা তখন ভাবা হয়নি। দ্বিতীয়ত, ব্যক্তিখাত থেকে অপরিকল্পিতভাবে সরকারকে বিদ্যুৎ কিনতে হয়েছে। কতটা বিদ্যুৎ ব্যক্তি খাতে উৎপাদিত হবে, কতটা সরকারি খাতে হবে–এসব বিষয়ে সরকারের কোনো সুস্পষ্ট নীতিমালা ছিল না।
সরকারের মূলনীতি ছিল ঢালাওভাবে ব্যক্তিমালিকানায় বিদ্যুৎ খাতকে ছেড়ে দেয়া। বিদেশি দাতাদের চাপে বিদ্যুৎ খাত সংস্কারের যে উদ্যোগ নেয়া হয় তারই ফসল হচ্ছে এই ব্যক্তিমালিকানাকরণ। এরপর নানা সময়ে বিদ্যুৎ সঙ্কটের অজুহাত দেখিয়ে ক্ষুদ্র বিদ্যুৎ, ভাড়াভিত্তিক বিদ্যুৎ এগুলোকে ঘিরে অনেকগুলো চুক্তি করল সরকার। এরপর যখন গ্যাসের সংস্থান হলো না তখন সরকারি খাতের বিদ্যুৎ উৎপাদন বন্ধ রেখে ব্যক্তি খাতে গ্যাস সরবরাহ করা হলো। সরকারি খাতের ৬০০ থেকে ৮০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন বন্ধ রেখে বেসরকারি খাতে গ্যাস দেয়া হয়েছে। বর্তমানে শোনা যাচ্ছে, এজন্য ৭০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন বন্ধ আছে। আমরা দেখেছি, সরকারি খাতে বিদ্যুৎ উৎপাদন হলে ব্যয় কম হয়। বেসরকারি খাতে উৎপাদন ব্যয়টা অনেক বেশি হয়। এখন সরকারি বিদ্যুৎ কেন্দ্র বন্ধ রেখে যদি বেসরকারি খাতে উৎপাদন করা হয় তাহলে বন্ধ ওই কেন্দ্রগুলোর ব্যয়ও টানতে হয়, আবার বেসরকারি খাত থেকে বেশি দামে বিদ্যুৎটা কিনতে হয়। এভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় কয়েকগুণ বেড়ে যাচ্ছে। আবার গ্যাস না পেয়ে অনেক বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রে জ্বালানি হিসেবে তেল ব্যবহার করা হচ্ছে। তেলের দাম বেশি। এতে করেও বিদ্যুতের দাম দ্রুত বেড়ে যাচ্ছে।
গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রে উৎপাদিত বিদ্যুৎ তৈরিতে যে খরচ পড়ে তেলচালিত কেন্দ্রে উৎপাদিত হলে তার ব্যয় প্রায় ৭-৮ গুণ বেড়ে যায়। সরকারের নিজস্ব প্রায় ৩৯০ মেগাওয়াট তেলচালিত বিদ্যুৎ কেন্দ্র রয়েছে। সেগুলোর অবস্থা একেবারেই অন্যরকম। আমরা জানি, ব্যক্তি খাতে উৎপাদন ব্যয় বেশি। সরকারি খাতে তেলচালিত এ কেন্দ্রগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায় এদের উৎপাদন তার থেকেও বেশি। এরা অদক্ষ এবং এখানে অব্যবস্থাপনা এতই তীব্র যে ব্যক্তি খাতের চেয়েও এদের গড় উৎপাদন ব্যয় বেশি। এগুলো ঠিকমতো রক্ষণাবেক্ষণ করা হয় না। নিয়মানুযায়ী দেখাশোনা করা হয় না। কিছু নষ্ট হলে তা মেরামতে দিনের পর দিন সময় নষ্ট করা হয়েছে। এসব করে করে যা হবার তাই হয়েছে। এই কেন্দ্রগুলো একেবারেই যা তা হয়ে গেছে। যে কোনো সময় বন্ধ হয়ে যায়। বন্ধ হয়ে গেলে আবার চালু হয় না। আবার এগুলোর ব্যবস্থাপনাতেও অস্বচ্ছতা আছে। এসব নানাবিধ কারণে এ কেন্দ্রগুলোর উৎপাদন ব্যয় অনেক বেড়ে গেছে। দাম বাড়ার এ রকম আরো নানা করণ রয়েছে।
সাপ্তাহিক : আপনি বলছেন ব্যক্তিগত মালিকানায় বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে গিয়ে আমাদের ক্ষতি হয়েছে। অথচ অনেকেই মনে করেন সুষ্ঠু বাজার ব্যবস্থাপনার জন্য ব্যক্তি খাতের উপস্থিতি অপরিহার্য।
শামসুল আলম : এটা ঠিক যে, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে ব্যক্তি খাতকে সম্পৃক্ত করার একটা ভালো দিক আছে। সরকারি খাতের যা খুশি তাই করা অর্থাৎ যাতে তাদের প্রভাব একচেটিয়া না হয়ে উঠতে পারে সে জন্য ব্যক্তি খাতের অংশগ্রহণটা ইতিবাচকভাবে দেখা যায়। দুটো পক্ষ থাকলে প্রতিযোগিতা দেখা যাবে। কারা ব্যয় কম করছে বোঝা যাবে–এ ধরনের প্রত্যাশা থেকেই ব্যক্তি খাতকে প্রতিষ্ঠার যৌক্তিকতা আমরা মেনে নেই। তবে ব্যক্তি খাত থেকে বিদ্যুৎ কেনার সময় যাতে ভোক্তা ও প্রতিষ্ঠান উভয়ের স্বার্থ সমানভাবে রক্ষা করা যায় তা নিশ্চিত করতে হবে। কিন্তু সেই জিনিসটা নিশ্চিত করা যায়নি।
সাপ্তাহিক : তাহলে আপনি বলছেন ব্যক্তি খাতে উৎপাদন শুরু হওয়ার পরও কোনো ধরনের প্রতিযোগিতা সৃষ্টি হয়নি?
শামসুল আলম : নিজের উৎপাদন ব্যাহত করে সরকার ব্যক্তি খাতে গ্যাস দিচ্ছে, এটা স্বচ্ছ প্রতিযোগিতার কোনো উদাহরণ হতে পারে না। আবার ব্যক্তি খাতের মালিকরা মোট ব্যয়ের ৩০ ভাগ বিনিয়োগ করলেই ৭০ ভাগ ব্যাংক ঋণ পেতে সক্ষম হয়। অন্যদিকে সরকারি খাতে অর্থ বরাদ্দ একটা জটিল বিষয়। আবার প্রয়োজনীয় অর্থ সবসময় পাওয়া যায় না। এখানেও প্রতিযোগিতা অসম হবার লক্ষণই প্রকাশ পাচ্ছে। এসব কারণে সরকারি খাতকে যে ইচ্ছাকৃতভাবে পিছিয়ে রাখার চেষ্টা করা হয়েছে তা স্পষ্টভাবে বোঝা যায়। অথচ সরকারি খাত স্বাভাবিক গতিতে চললে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় কম হতো। এখন প্রতিযোগিতা তো তৈরি হয়ইনি বরং বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় অনেক বেড়ে গেছে। এসব বিচার করলে দেখা যাবে, বেসরকারি খাত কোনো ইতিবাচক ফলাফল বয়ে আনতে পারেনি। বরং তাদের উপস্থিতি বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি ঘটিয়েছে। যা শেষ বিবেচনায় মানুষের জন্য অকল্যাণ বয়ে এনেছে।
আমি মনে করি দিনে দিনে ব্যক্তি খাত একচেটিয়া হয়ে উঠেছে। জ্বালানি খরচ বাদ দিলে মুনাফা দিয়েও যেখানে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম ৭০ পয়সার ওপরে ওঠে না সেখানে ব্যক্তি খাতকে ২ টাকা থেকে ২ টাকা ১১ পয়সা দাম দেয়া হচ্ছে। সুতরাং বোঝা যাচ্ছে যে, সঙ্কটের ধোঁয়া তুলে ব্যক্তি খাতকে মুনাফা লোটার সুযোগ করে দেয়া হচ্ছে। প্রতিযোগিতার বাজার অন্ধকারে খাবি খাচ্ছে।
আমদানিকৃত সয়াবিন তেলের বাজারের যে অবস্থা বিদ্যুতেরও সেই অবস্থা। ব্যক্তি খাতের দৌরাত্ম্য কোনোটাই সরকার নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারছে না। বিদ্যুৎ খাতকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে চাইলে ব্যক্তি খাতের উৎপাদন কোনোক্রমেই ২৫ ভাগের বেশি হতে দেয়া যাবে না। বিশ্বব্যাংক তাদের সংস্থা। সেই বিশ্বব্যাংকের মূল্যায়নই হচ্ছে, বাংলাদেশে বিদ্যুতে ব্যক্তিখাত ব্যর্থ হয়েছে। সরকারি খাত দক্ষ ছিল না বলে বেসরকারি খাতকে আনা হয়েছিল। কিন্ত তারাও ব্যর্থ হয়েছে। এটা তাদের মূল্যায়ন।
সাপ্তাহিক : ব্যক্তি খাতকে না ডেকে সরকারের কি করার ছিল বলে আপনি মনে করেন?
শামসুল আলম : জরুরিভিত্তিতে সংকট সমাধানের জন্য সরকার বেসরকারি খাতকে উৎসাহ দিয়েছে। প্রচুর পরিমাণে ক্ষুদ্র বিদ্যুৎ, ভাড়াভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র চালু হয়েছে। তাড়াহুড়োর সুযোগে অদক্ষ সব ব্যক্তি খাত এখানে এসে উৎপাদন শুরু করেছে। এতে করে প্রত্যাশিত পরিমাণে উৎপাদন বাড়েনি, বরং ব্যয় বেড়ে গেছে। ভাড়াভিত্তিক এবং ক্ষুদ্র বিদ্যুতের যেসব অনুমোদন দেয়া হয়েছে তাতে পর্যবেক্ষণের (মনিটরিং) কাজটিও সঠিকভাবে করা হয়নি। তারা পুরনো বাতিল কোনো যন্ত্রপাতি কিনে আনছে কি না বা সেগুলোর অন্য কোনো সমস্যা আছে কি না, ঠিকমতো তারা উৎপাদনে যেতে পারবে কি না তার ঠিক নাই। তারা যাতে নতুন যন্ত্রপাতি আনে, তাদের দক্ষতা এবং কার্যকারিতা যেন বেশি হয় এ জিনিসগুলোর দিকে নজর দেয়া হয়নি। এগুলো নিয়ন্ত্রণ করা যায়নি।
আমার মনে হয় এসব না করে পিডিবিকে যদি প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ দেয়া যেত, তাদের দক্ষ জনশক্তিকে যদি কাজে লাগানো যেত, তবে তারা তাদের উৎপাদন বাড়াতে পারত। এই জায়গাগুলোতে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সরকার ব্যর্থ হয়েছে। যে কারণে তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে যে, তারা ইচ্ছে করে সঙ্কট জিইয়ে রাখছে। কিংবা ব্যক্তিবিশেষকে সুবিধা প্রদানে তাদের আগ্রহ বেশি।
সাপ্তাহিক : সরকার তো স্বল্প, মধ্য, দীর্ঘ নানা ধরনের মেয়াদের পরিকল্পনার কথা বলছে। তাদের পরিকল্পনার ফাঁকটা কোথায়?
শামসুল আলম : এটা সবাই জানে যে, বললেই বিদ্যুৎ সমস্যার সমাধান হয়ে যায় না। এটা একটা দীর্ঘমেয়াদি ব্যাপার। সরকারের উচিত ছিল, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় জ্বালানি জোগানের বিষয়টি সবচেয়ে স্পষ্টভাবে বিবেচনা রাখা। তাদের জানা উচিত ছিল আমাদের গ্যাসের প্রমাণিত যে, মজুদ রয়েছে তাতে বেশিদিন চলবে না। কয়লা একটা বিকল্প হতে পারত। কয়লা নিয়ে তাদের সুস্পষ্ট পরিকল্পনা থাকা উচিত ছিল। পরিকল্পনা না থাকার ফলেই সরকার হাতের কাছে যা পেল তাই দিয়ে কাজ চালাতে লাগল। অর্থাৎ আমদানিকৃত তেলের ওপর সরকার নির্ভর হয়ে পড়ল। এটা হচ্ছে সরকারের বড় একটা ভুল।
আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ওঠা-নামাটা সবচেয়ে অস্থিতিশীল একটি বিষয়। সরকার তেলের যে দাম মাথায় রেখে বিদ্যুতের দাম হিসেব করেছে তেলের সেই দাম এখনই বেড়ে গেছে। আমার কথা হচ্ছে, সঙ্কটটা তো আজকের না। গত ৮-৯ বছর ধরে সঙ্কট চলছে। তাহলে শুরুতে কেন সুষ্ঠু পরিকল্পনা গ্রহণ করা হলো না। শুরুতেই যদি আমরা সুস্পষ্ট যৌক্তিক পরিকল্পনার দিকে হাঁটতাম তাহলে জ্বালানি আমাদের কোনো সমস্যা করতে পারত না। এতদিনে কয়লাকে আমরা কাজে লাগাতে পারতাম।

সাপ্তাহিক : সরকার তো বলছে তারা কয়লা উত্তোলনে আগ্রহী। সরকারের কয়লা নীতিকে কিভাবে দেখছেন?

শামসুল আলম : সরকারের এই আগ্রহের কথা সবাই জানে। তারা প্রায়ই এও বলছে যে, কয়লা তুলতে পারছি না বলেই বিদ্যুৎ উৎপাদনে কয়লা ব্যবহার করা যাচ্ছে না। আমি এটাকে যৌক্তিক মনে করি না। কারণ সরকার যদি মনে করে, উন্মুক্ত পদ্ধতিতেই কয়লা তুলবে আর আন্দোলনকারীদের জন্য তা সম্ভব হচ্ছে না, তাহলে খালাসপুর ও দীঘিপাড়ার কী হলো? ওখানে তো কখনোই উন্মুক্ত পদ্ধতিতে খনন করা যাবে না। সরকার কেন ওখানকার কয়লা উত্তোলনের কাজ হাতে নিল না। ওখানে তো কোনো আন্দোলন নেই। আমি জানি, এর কোনো সদুত্তর তাদের কাছে নেই।
আরেকটি ব্যাপার হচ্ছে, বেসরকারি খাতে কয়লা তুলতে হলে উন্মুক্ত খনন পদ্ধতিতে না তূললে তা লাভজনক হবে না। আর লাভজনক না হলে বিদেশি বিনিয়োগ আসবে না। অর্থাৎ ভূগর্ভস্থ খনন পদ্ধতিতে কয়লা তুলতে হলে সরকারি বিনিয়োগেই তুলতে হবে।
সরকার বিনিয়োগে এগিয়ে আসেনি বলেই কয়লা তোলা হয়নি। আমি মনে করি না এটা সরকারের আর্থিক সীমাবদ্ধতা। বরং এটা তাদের নীতিগত সমস্যা। অন্যদিকে আমদানিকৃত কয়লায় বিদ্যুৎ উৎপাদনের বিষয়টিও সরকার তার পরিকল্পনায় আনেনি। এখন শোনা যাচ্ছে যে, কয়লা থেকে ১২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা সরকার হাতে নিয়েছে। কোথা থেকে এ কয়লা আসবে তাও সুস্পষ্ট নয়। বিদ্যুতের মূল্যহার বৃদ্ধিতে সরকারের পাঁচ বছরের যে পরিকল্পনা দেখানো হয়েছে সেখানেও কয়লা বিদ্যুৎ নেই। সুতরাং তেলের দামের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বিদ্যুতের দামও বাড়তে থাকবে। আর বিদ্যুতের দাম যত বাড়বে এই সঙ্কট সামধান তত কঠিন হয়ে পড়বে। অর্থাৎ সরকারের বর্তমান পরিকল্পনাও বিদ্যুৎ সমস্যার সমাধান করতে পারবে না।
সাপ্তাহিক : আন্তর্জাতিক বাজারে বিদ্যুতের দামের বর্তমান অবস্থা কী?
শামসুল আলম : আন্তর্জাতিক বাজারের বিদ্যুতের যে মূল্য তা আমাদের সঙ্গে তুলনীয় নয়। কারণ জ্বালানি সম্পদের মালিক জনগণ। জনগণ যদি তার নিজের মালিকানায় সেই সম্পদ গ্যাস বা কয়লা উত্তোলন করে তাহলে তার দাম অনেক কম হয়। সেই জ্বালানি দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হলে বিদ্যুতের ব্যয়ও কম হবে। এখানে মূল বিষয়টি হচ্ছে, মুনাফার উদ্দেশ্যে সরকার নিজের জনগণের ওপর উচ্চমূল্য আরোপ করতে পারে না।

আমাদের জনবল ব্যয় অনেক কম। এখন কেউ যদি বলে, আন্তর্জাতিক বাজারের তুলনায় এখানে দাম কম হওয়াটার অর্থ হচ্ছে সরকার ভর্তুকি দিচ্ছে এটা একেবারেই মিথ্যে কথা। যেমন গ্যাসের ক্ষেত্রে আমরা জানি, ভোক্তা পর্যায়ে প্রতি ১ হাজার সিএফটি গ্যাস সরবরাহের ব্যয় ১০৯ টাকা। আর সরকার তা বিক্রি করে ১১১.৩৬ টাকায়। এখানে তো সরকার লাভ করছে। তাহলে ভর্তুকির প্রশ্ন তো আসেই না। এখন আন্তর্জাতিক বাজারের দোহাই তুলে কি এর মূল্য বাড়িয়ে সরকার লাভ করবে আর জনগণ পস্তাবে? এটা হচ্ছে জনবিচ্ছিন্ন, স্বৈর সরকারবাদীদের ভাবনা। জনগণের সরকার এটা কোনোদিনও করতে পারে না।
বিদ্যুৎ খাতের ক্ষেত্রে ভর্তুকি দেয়া হচ্ছে, তাদের লোকজনের অব্যবস্থাপনা, দুর্নীতি ও অস্বচ্ছতার কারণে । পরিকল্পনায় দূরদর্শী হলে, দক্ষতা দেখাতে পারলে বিদ্যুৎ খাত আজ এ দুরবস্থায় পড়ত না। যারা পরিকল্পনা করে তাদের তো না জানার কথা নয় যে, গ্যাস নেই। তারা কেন বিকল্প চিন্তা করল না। এটা তাদের ব্যর্থতা। উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে তাদের ব্যর্থতার কারণে। সুতরাং দাম বাড়িয়ে জনগণের মাথায় সঙ্কট চাপিয়ে দেয়াটা কোনোক্রমেই গ্রহণযোগ্য নয়।
সাপ্তাহিক : দাম না বাড়িয়ে সরকার কি বিকল্প কোনো পথে হাঁটতে পারত?
শামসুল আলম : আমরা বলে এসেছি খাদ্যে যখন সঙ্কট দেখা দেয়, দুর্ভিক্ষ যখন নেমে আসে তখন জনগণকে বাঁচানোর জন্য ভর্তুকি দিয়ে সরকার খাদ্য সরবরাহ করে। দুর্ভিক্ষ কেটে গেলে আবার স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে আসে। বিদ্যুতের এই যে সঙ্কট এটাকে আমরা বিদ্যুতের দুর্ভিক্ষ বলি। এ অবস্থায় সরকার যদি মনে করে তেল বিদ্যুৎ দিয়ে চলতি পরিস্থিতি মোকাবিলা করা হবে এবং এর মধ্যে বিকল্প জ্বালানি কয়লার সংস্থান হবে। এরপর আবার দাম কমিয়ে আনা যাবে। তাহলে এর মধ্যে যে তিন বা চার বছর সরকার আপৎকালীন সময় হিসেবে উল্লেখ করছে এ সময়ের জন্য বিশেষ তহবিল গঠন করা হোক। সেই তহবিল থেকে টাকা দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে সরবরাহ করা হোক। যাতে ভোক্তা পর্যায়ে কোনো চাপ না পড়ে। এটা ছিল আমাদের পরামর্শ। কিন্তু আপৎকালীন ব্যয়টা দাম বাড়িয়ে জনগণের কাছে থেকে তুলে এনে সঙ্কট মোকাবিলার চিন্তাটা বাস্তবসম্মত নয়। এভাবে এ খাতের সমস্যা সমাধান করা যাবে না। বরং বিদ্যুতের বর্তমান ব্যবস্থা অব্যাহত থাকলে ভোক্তা পর্যায়ে সরকার ক্রমশ অপ্রিয় হবে এবং এ অর্থেরও সংকুলান হবে না। গোটা ব্যবস্থা যে অব্যবস্থাপনার মধ্যে ছিল সেখানেই থেকে যাবে।
সাপ্তাহিক : অনেকেই বলছেন বিশ্বের কোথাও বিদ্যুতের পেছনে ভর্তুকি দেয়া হয় না…
শামসুল আলম : আমরা দরিদ্র দেশ। দারিদ্র্য বিমোচনের জন্য জনগণকে বিদ্যুৎ ব্যবহারের সুযোগ দিতে হবে। এতে তার সক্ষমতা বাড়বে। সে উৎপাদনে অংশগ্রহণ করবে। তার আয়ও বাড়বে। পরবর্তীতে বেশি দামে বিদ্যুৎ কিনতেও সে সক্ষম হবে। এতে করে বিদ্যুতের ব্যবহার বাড়বে। এ খাত থেকে আয়ের সূত্র ধরে উৎপাদনও বাড়বে। অর্থাৎ পুরো ব্যবস্থাটাই উন্নত হবে।
আর যদি সরকার তার পছন্দের পথে হাঁটে তাহলে বিদ্যুতের ব্যবহার বাড়বে না, মানুষ আরো দরিদ্র হবে, সরকারের ক্ষতির রাস্তা তৈরি হবে, জিডিপি কমবে। রাষ্ট্র পেছনের দিকে ধাবিত হবে। আমি মনে করি, সরকারের কাজ হচ্ছে দারিদ্র্য বিমোচন। সে জন্য অবশ্যই তাকে উৎপাদন ব্যয় নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। ভোক্তা পর্যায়ে বিদ্যুতের মূল্য নাগালের মধ্যে রাখতে হবে। এ জন্য প্রয়োজনে একটা সময় পর্যন্ত ভর্তুকি দিয়ে যেতে হবে।
এখন আমরা যদি আমাদের প্রেক্ষাপটকে গুরুত্ব না দিয়ে বিদেশের মডেল অনুসরণ করতে গিয়ে বলি, বিদেশে বিদ্যুতে ভর্তুকি দেয়া হয় না, তাই দাম বাড়াতে হবে, তাহলে এটা হবে খুবই ঝুঁকিপূর্ণ এবং অযৌক্তিক সিদ্ধান্ত।
সাপ্তাহিক : এখন তো সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের কথা বলা হচ্ছে। এর মাধ্যমে কি উৎপাদন ও বাজার ব্যবস্থা স্থীতিশীলতার মধ্যে আসতে পারবে?
শামসুল আলম : এখন যারা সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের (পিপিপি) কথা বলছে, তারা কি করে মনে করছে যে, দুটো ব্যর্থ প্রতিষ্ঠানকে যোগ করলে তারা সফল হবে। আমি মনে করি না, এটা যৌক্তিক। নাইকো’র ক্ষেত্রে পিপিপি অনুসরণ করা হয়েছিল। সেখানে আমরা প্রমাণ পেয়েছি, তারা পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে। কোনো ভূমিকাই তারা রাখতে পারেনি। কোনো একটা কাজও তারা ঠিকমতো করতে পারে নাই। এ অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি পিপিপি দিয়ে সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা ও স্বচ্ছতা আসবে এটা মনে করার কোনো সুযোগ নেই। সংবিধানের ১৩ বিধি অনুযায়ী উৎপাদন যন্ত্র নিজের মালিকানায় রেখে সরকার জনগণের পক্ষে রাষ্ট্র পরিচালনা করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এর জন্য অন্য কোনো অজুহাত খুঁজবার সুযোগ নেই।
সাপ্তাহিক : আপনি কি বলতে চাচ্ছেন সরকার জনগণের না হয়ে অন্য কারো পক্ষ হয়ে এসব কাজ করছে?
শামসুল আলম : সরকার জনগণের। আমরা যে কথাগুলো বলছি তাও জনগণের পক্ষ হয়ে। যখন সরকারের কার্যক্রমের মধ্যে আমরা এই কথাগুলো খুঁজে পাই না, তখন স্বাভাবিকভাবেই মনে হয়, সরকার অন্য কারো দ্বারা বিভ্রান্ত হচ্ছে। কে কিভাবে এটা করছে সেটা অনুসন্ধান, বিশ্লেষণ, তদন্তের ব্যাপার। আমি সেদিকে যাব না। আমি মনে করছি যে, সরকার বিভ্রান্ত হচ্ছে। আমরা যেহেতু জনগণকে রক্ষা করতে চাই সেহেতু সরকারকেও রক্ষা করতে চাই। সরকার যদি বিভ্রান্তি থেকে বেরিয়ে আসতে না পারে তাহলে জনস্বার্থ রক্ষা হবে না।
সাপ্তাহিক : সরকারের প্রতি আপনার পরামর্শ কি?
শামসুল আলম : বিদ্যুৎ উৎপাদন, জ্বালানি, উত্তোলন, সরবরাহ এগুলো ব্যক্তি খাতে যাবে এ সিদ্ধান্ত থেকে সরকারকে বেরিয়ে আসতে হবে। কয়েকটি মৌলিক নীতিগত জায়গায় সরকারকে সুস্পষ্ট অবস্থান নিতে হবে। প্রথমত জ্বালানি রপ্তানি নিষিদ্ধ করতে হবে। জনগণের মালিকানা অক্ষুণœ রাখতে হবে। জ্বালানি উত্তোলন সরকার নিজে করবে। প্রয়োজনে ব্যক্তি খাতকে কাজে লাগাবে। কিন্তু তাদের মালিকানার জায়গায় আনা যাবে না। অন্তত ২০২৫ সাল পর্যন্ত এ খাতের যে কোনো ধরনের উৎপাদনের মালিকানা সরকারের হাতে রাখতে হবে। ব্যক্তি খাতকে প্রাধান্য না দিয়ে সরকারি খাতকে প্রাধান্য দিতে হবে। সরকারের অংশীদারিত্ব ৭৫ ভাগে উন্নতি করতে হবে। তাহলে এই এক যুগের মধ্যে আমাদের বিদ্যুৎ খাত এমন একটা পর্যায়ে পৌঁছে যাবে যে, চাইলেও খুব সহজে এটাকে কোনো সমস্যায় ফেলা যাবে না।