Saturday, March 21st, 2009

মন্ত্রণালয়ের অপতৎপরতা: প্রেক্ষিত বিদ্যুৎ ও জ্বালানী সংকট

বড়পুকুরিয়াতে উত্তোলিত কয়লা দিয়ে ২৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়। গত বছর সেখানে ৩ লাখ টন কয়লা উদ্বৃত্ত ছিল। এই কয়লা রপ্তানির জন্য বড়পুকুরিয়া কর্তৃপক্ষ সরকারের কাছে অনুমতি চেয়েছেন। সরকার অনুমতি দেয়নি। অর্থাৎ বড়পুকুরিয়ার কয়লা কাজে লাগানোর মতো চাহিদাও আমাদের নেই। সেখানে ১২৫ মেগাওয়াটের আরো একটি প্ল্যান্ট বসানোর কথা। সেটি হচ্ছে না। কয়লা উৎপাদন করা হবে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য, অথচ বিদ্যুৎ কেন্দ্রই স্থাপন করা হচ্ছে না। কিন্তু উন্মুক্ত পদ্ধতিতে আরো বেশী করে কয়লা উত্তোলনের কথা বলা হচ্ছে। এর মানেটা কী? খুবই পরিষ্কার, উত্তোলিত কয়লা যখন কাজে লাগবে না, তখন রপ্তানির জন্য চাপ দেয়া হবে সরকারকে। সরকার কয়লা রপ্তানির পথ উন্মুক্ত করে দিতে বাধ্য হবে।

বলা হচ্ছে, বিদ্যুৎ প্ল্যান্ট তৈরি করার টাকা নেই সরকারের। বিদ্যুতের ক্ষেত্রে এমন ধারণা তৈরি হচ্ছে যে, বিদেশীরা বিদ্যুৎ তৈরি করবে, আমরা তা ব্যবহার করবো। এই ধারণা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। বুঝতে হবে, উন্মুক্ত পদ্ধতিতে যে পরিমাণ কয়লা উত্তোলন হবে, তার ব্যবহার আগামী ১০ বছরেও বাংলাদেশ নিশ্চিত করতে পারবে না। কারণ উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লাখনি যদি লাভজনক হতে হয়, তাহলে কমপক্ষে ৬০ লক্ষ টন কয়লা বছরে উৎপাদন হতে হবে। তাছাড়া বিদেশীরা বাংলাদেশকে কখনোই বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করার জন্য কোন টাকা দেবে না। সেই টাকা দিয়ে তারা নিজেরাই বিদ্যুৎ কেন্দ্র বানাবে। সে কেন্দ্রের উৎপাদিত বিদ্যুৎ ক্রস-বর্ডার বিদ্যুৎ ব্যবসায় পণ্য হয়ে অন্য দেশের ব্যবহারে লাগবে। তখন অবস্থাটা আজকের নেপালের মতোই হবে। যেখানে প্রতিদিন বেশীরভাগ সময় লোডশেডিং হচ্ছে।

ফলে আপাতত আমাদের পদক্ষেপ নেয়া উচিত, বর্তমানে যেভাবে কয়লা উঠছে সেই ভিত্তিতে বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করে বিদ্যুতকে একটি স্থিতিবস্থার দিকে নিয়ে যাওয়া। তবে বড়পুকুরিয়া এলাকায় ক্ষতিপূরণ নিয়ে যে সমস্যা তৈরি হয়েছে, সরকারের জন্য তার সমাধান মোটেই কঠিন নয়, যদি মন্ত্রণালয় আন্তরিক হয়। একটা বিষয় ঠিক, বিগত দিনগুলোতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানী মন্ত্রণালয় সরকারের নিয়ন্ত্রণে ছিল না, এখনো নেই। সবসময়ই সরকারের বাইরের একটি অদৃশ্য শক্তি দ্বারা এ মন্ত্রণালয় পরিচালিত হযে আসছে সেই ১৯৮৬ সাল থেকে। ভাবটা এমন যে, বিদ্যুৎ ও জ্বালানী মন্ত্রণালয় চালানোর মতো দক্ষ ও অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদ দেশে নেই। ফলে এই মন্ত্রণালয় চলেছে অদৃশ্য শক্তির প্রতিনিধিত্বকারী প্রেতাত্মাদের হুকুমে বা কলকাঠিতে। সেই রকমই একজন প্রেতাত্মা হচ্ছেন ড. তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী। তিনি জ্বালানী খাতের সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগগুলোর সঙ্গে জড়িত। তারপরও তিনি বিদ্যুৎ ও জ্বালানী মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে। এ দায়িত্ব তিনি পেয়েছেন, নাকি জবরদখল করেছেন, তাও অস্পষ্ট। তিনি ড. খন্দকার মোশারফ হোসেন, এ. কে. এম মোশারফ হোসেন, প্রকৌশলী মাহমুদুর রহমান, ড. ম. তামিমদেরই একজন। তাদের জনগণ বা সরকারের সাথে কোন সম্পর্ক নেই। সম্পর্ক আছে বিদেশী কোম্পানিগুলোর সাথে। তাঁরা প্রত্যেকেই বিদেশী প্রভুদের মন যুগিয়ে চলেছেন এবং তাদের স্বার্থ রক্ষায় নিবেদিত ছিলেন। দেশের স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে “উইন-উইন” তত্ত্ব প্রচার করেছেন। এসব বুঝতে এবং প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা নিতে সরকারের যত দেরি হবে, বিদ্যুৎ ও জ্বালানী খাতের তত বেশী সর্বনাশ হবে। সরকারের উপর মানুষের আস্থা হারাতে থাকবে। আমাদের বিশ্বাস সরকার সে ভুল করবে না। যদি সে ভুল হয়, তাহলে জনগণ প্রতিরোধ ও প্রতিকারের জন্য এগিয়ে আসবে এবং ড. তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরীদের প্রয়োজনে গণআদালতে বিচার করবে। পরিশেষে বিদ্যুৎ ও জ্বালানী খাতের সংকট নিরসনের জন্য প্রাথমিকভাবে নিম্নরূপ জরুরী পদক্ষেপ নেয়ার জন্য সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হল:

১. ফুলবাড়ী চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়ন;

২. কয়লা কিংবা গ্যাস বা তা থেকে উৎপাদিত পণ্য বিদেশে রপ্তানি আইন করে নিষিদ্ধ;

৩. গ্যাসের অভাবে পিডিবির বন্ধ থাকা বিদ্যুৎ কেন্দ্রে গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত না করা পর্যন্ত আর কোন নতুন সংযোগ নয়;

৪. পিএসসি মডেল ২০০৮ সংসদে তোলা, এলএনজি হিসেবে গ্যাস রপ্তানির বিধানসহ তাতে থাকা গণবিরোধী শর্তগুলো বাতিল এবং

৫. ড. তৌফিক-ই-ইলাহীকে বিদ্যুৎ ও জ্বালানী মন্ত্রণালয় থেকে অপসারণ এবং তাঁর বিরুদ্ধে আনিত অভিযোগের দ্রুত বিচার।

এই ৫টি সুপারিশ যথাযথ বাস্তবায়িত হলে জ্বালানী খাত ষড়যন্ত্রমুক্ত হবে এবং সরকার চক্রান্তের বেড়াজাল থেকে বেরিয়ে আসতে পারবে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানী খাতের উন্নয়ন বেগবান হবে।

[২১ মার্চ ২০০৯, সকাল ১১.০০টায় মুক্তি ভবনের মৈত্রী হলে তেল-গ্যাস, খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটি কর্তৃক আয়োজিত মতবিনিময় সভায় অধ্যাপক এম. শামসুল আলম কর্তৃক রচিত এবং উপস্থাপিত ধারণাপত্রের একাংশ]