Saturday, March 11th, 2017

গ্যাসের দামবৃদ্ধি এবং রফতানিমুখি গ্যাস চুক্তির আয়োজন বন্ধ করে সুন্দরবনবিনাশী রামপাল প্রকল্প বাতিলসহ জাতীয় কমিটির ৭ দফা বাস্তবায়নের দাবি

আজ সকালে মুক্তিভবনের প্রগতি সম্মেলন কক্ষে ভূতত্ত্ববিদ, অর্থনীতিবিদ ও প্রকৌশলীদের সমন্বয়ে ‘বাংলাদেশের গ্যাসসম্পদ, জাতীয় সক্ষমতা ও জ্বালানী খাতে সরকারি নীতি’ শীর্ষক মতবিনিময় অনুষ্ঠিত হয়। প্রকৌশলী শেখ মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ’র সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মোশাহিদা সুলতানা। সভায় আরও বক্তব্য রাখেন জাতীয় কমিটির সদস্য সচিব অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডক্টর বদরুল ইমাম, ডক্টর এমএম আকাশ, গবেষক নুর মোহাম্মদ, মাহা মির্জা, মাহবুব সুমন এবং সাংবাদিক আরিফুজ্জামান তুহিন। সভায় আরও উপস্থিত ছিলেন বজলুর রশিদ ফিরোজ, মোশারফ হোসেন নান্নু, জোনায়েদ সাকি, ফখরুদ্দীন কবির আতিক, শহীদুল ইসলাম সবুজ, সুবল সরকার, মাসুদ খান প্রমুখ।

অনুষ্ঠানে একটি পাওয়ার পয়েন্ট প্রেজেন্টেশানের মাধ্যমে মূল আলোচনা উত্থাপন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মোশাহিদা সুলতানা। তিনি গত ৩০ বছরে সরকারের বিভিন্ন নীতি কাঠামো পর্যালোচনা করে বলেন সরকার মূলত বেসরকারি খাত এবং বিদেশী কোম্পানিকে সুবিধা করে দেয়ার জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে, তাদের স্বার্থেই গ্যাসের দাম বাড়িয়েছে। গত ১০ বছরে সরকার কোন ধরনের গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলন না করে গ্যাসের কৃত্রিম সংকট তৈরি করেছে। তার প্রেক্ষিতে ব্যবসায়ীদের সুবিধা করে দেয়ার জন্য আগামীতে দেশজ কোন গ্যাস পাওয়া যাবেনা এরকম ধারনা সমাজে পাকাপোক্ত করার চেষ্টায় রত এবং সেই প্রেক্ষিতে জ্বালানী মহাপরিকল্পনা তৈরি করেছেন।

press-conf-11march2017

অনুষ্ঠানে আরো বক্তব্য প্রদান করেন বিশিষ্ট ভূতত্ত্ববিদ অধ্যাপক বদরুল ইমাম। তিনি বলেন গ্যাস সংকট আছে তবে সরকার যেভাবে একে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে দেখাচ্ছে সেরকম নয়। গ্যাস বিষয়ক যেকোন পরিকল্পনাই হওয়া উচিৎ বাপেক্সকে কেন্দ্র করে। একে শক্তিশালী করে আন্তর্জাতিক মানের তেল, গ্যাস অনুসন্ধানকারী কোম্পানিতে রূপান্তর করা আমাদের রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব। সে দায়িত্ব পালন না করে ৯০ এর দশক থেকে বাপেক্সকে দুর্বল করার সরকারী প্রক্রিয়া শুরু হয়। মাঝে বাপেক্স নতুন করে মাথা তুলে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে। বেশ কয়েকটি স্থানে বাপেক্স গ্যাস অনুসন্ধান এবং উত্তোলনে সফল হয়। অথচ সেসব সফলতাকে চাপা দিয়ে বাপেক্সের অনুসন্ধান করা গ্যাস ক্ষেত্র সমুহ রাশিয়ান কোম্পানি গ্যাজপ্রমকে দিয়ে দেয়া হয়েছে। এমনও দেখা গেছে গ্যাজপ্রম কিছু কিছু জায়গায় প্রযুক্তিগত সংকটে পড়ে গ্যাস উত্তোলন করতে পারছিল না, সেখানে বাপেক্সের প্রকৌশলীরা গিয়ে সমস্যার সমাধান করে দিয়েছেন। ফলে সক্ষমতা নাই বলে যে বাপেক্সকে ছোট করা হয় তা পুরোপুরি সত্য নয়।

অর্থনীতিবিদ এম এম আকাশ তার বক্তব্যে বলেন গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধির কোন বাস্তব ভিত্তি নেই। তিনি এডিবির করা Bangladesh Tariff Reform and Inter-sectorial Allocation of Natural Gas, September 2013 এর তথ্য সুত্রে উল্লেখ করেন এখানে সরকার নিয়ন্ত্রিত সকল প্রতিষ্ঠান লাভজনক অবস্থায় থাকলেও শুধুমাত্র দাতাদের প্রেসকিপশানে ক্রমাগত জ্বালানী ও বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হচ্ছে। যার ঋণাত্বক চাপে অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ তার বক্তব্যে বলেন, ‘দেশের গ্যাসখাত জাতীয় মালিকানায় বিকাশ করলে সুন্দরবিনাশী প্রকল্প, দেশধ্বংসী রূপপুর প্রকল্প, এলএনজি কোনোকিছুই দরকার হবে না। সরকারের নীতিমালা জনগণ বা দেশের স্বার্থ চিন্তা করে নয়, বরং কতিপয় দেশি ও বিদেশি ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর স্বার্থ পরিকল্পনাকে গ্রহণযোগ্য করবার জন্য দাঁড় করানো হচ্ছে। বাপেক্সকে পঙ্গু করে এখানে শেভরন, কেয়ার্ন, শেল, ইউনাকল, সান্তোস, কনকো ফিলিপস-এর স্বার্থ দেখা হয়েছে। সম্প্রতি চীন, ভারত, রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবসায়িক স্বার্থ উর্ধ্বে রেখে রফতানিমুখি চুক্তি সহ নানা সিদ্ধান্ত নেয়া হচ্ছে। এর ফলে দেশের মানুষ স্থল, জলভাগের গ্যাসের কোন সুবিধাই পাবেনা। ২০৪০ নাগাত দেশের মূল জ্বালানী হিসেবে আমদানিকৃত এলএনজি, এলপিজি এবং কয়লাকে প্রাধান্য দিয়ে জ্বালানী মহাপরিকল্পনা ২০১৬ প্রকাশ করা হয়েছে। যা ভুল তথ্য ও স্ববিরোধিতায় ভরা, জাতীয় স্বার্থবিরোধী।’ তিনি জানান, অচিরেই জাতীয় কমিটি এর বিকল্প মহাপরিকল্পনা উপস্থাপন করবে।

সভাপতির বক্তব্যে প্রকৌশলী শেখ মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ বলেন, ‘চুরি আর লুটপাটকে বৈধতা দেবার জন্য গ্যাসের দাম বাড়ানো হচ্ছে, মহাপরিকল্পনা করা হচ্ছে। দেশের স্বার্থবিরোধী কোনোকিছুই গ্রহণযোগ্য নয়। সভায় অযৌক্তিভাবে গ্যাসের দামবৃদ্ধি এবং রফতানিমুখি গ্যাস চুক্তির আয়োজন বন্ধ করে সুন্দরবনবিনাশী রামপাল প্রকল্প বাতিলসহ জাতীয় কমিটির ৭ দফা বাস্তবায়নের দাবি জানানো হয়।