Wednesday, February 15th, 2012

‘খনিজ সম্পদ রফতানি নিষিদ্ধ করন আইন’ পাশ প্রসঙ্গে স্মারকলিপি

স্মারকলিপি
১৫ ফেব্রুয়ারি ২০১২
মাননীয়
স্পীকার
জাতীয় সংসদ
সংসদ ভবন, ঢাকা।

বিষয়- ‘খনিজ সম্পদ রফতানি নিষিদ্ধ করন আইন’ পাশ প্রসঙ্গে।

জনাব,
আপনি এবং মাননীয় সংসদ সদস্যবৃন্দ নিশ্চয়ই অবগত আছেন যে, দীর্ঘদিন যাবৎ জাতীয় সম্পদ রক্ষা ও জনগণের স্বার্থে তা সর্বোত্তম ব্যবহারের জন্য আমরা ৭ দফা দাবি নিয়ে আন্দোলন করছি। আমরা মনে করি,  জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় বর্তমান ও ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য জাতীয় সম্পদের সুরক্ষা এবং তার সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করতে জাতীয় সংসদই তার দায়িত্ব পালন করতে পারে। আমরা এ বিষয়ে বিভিন্ন সময়ে দাবিও উত্থাপন করেছি। কিন্তু আমাদের উদ্বেগের বিষয় হলো জাতীয় সংসদ এ বিষয়ে সক্রিয় উদ্যোগ গ্রহণ না করার ফলে এ দেশের বিভিন্ন সময়কালীন সরকার জাতীয় সংসদকে পাশ কাটিয়ে এমন সব নীতি ও চুক্তি করেছে, যাতে জ্বালানি নিরাপত্তাসহ জাতীয় নিরাপত্তা এখন হুমকির সম্মুখীন হয়ে পড়েছে। এ বিষয়টি আপনার মাধ্যমে জাতীয় সংসদের সকল সদস্যদের কাছে উপস্থাপন করতে চাই।

প্রথমত: যদিও সংবিধান অনুযায়ী তেল-গ্যাস-কয়লাসহ দেশের সকল খনিজ সম্পদের মালিক জনগণ, এই খনিজ সম্পদ সংক্রান্ত নীতি নিয়ে দেশি-বিদেশি কোম্পানির সাথে চুক্তি প্রণয়নের প্রশ্নে কখনই জনসম্মতি গ্রহণ করা হয় নাই, জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধি দ্বারা গঠিত জাতীয় সংসদে এই প্রশ্নে আলোচনা করা হয় নাই। আপনি নিশ্চয়ই অবগত আছেন যে, জাতীয় স্বার্থ বিরোধী বিভিন্ন চুক্তির কারণে দেশের মানুষ প্রতি বছর বহু হাজার কোটি টাকার ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন। গ্যাস-তেল-বিদ্যুতের দাম ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি করা হচ্ছে। এতে উৎপাদন ব্যয়, পরিবহন ব্যয় ও জনগণের জীবন যাত্রার ব্যয় ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। দেশ কতিপয় বিদেশি কোম্পানি ও তার দেশি কমিশন ভোগীদের হাতে জিম্মি হয়ে পড়েছে। এই অবস্থার পরিবর্তনে জাতীয় সংসদের অগ্রণী ভূমিকা নিতে হবে।

দ্বিতীয়ত : দক্ষতার কথা বলে বিদেশি কোম্পানির সাথে চুক্তি করলেও আর্থিক ক্ষতি ছাড়াও এসব বিদেশি কোম্পানির কারণে আমাদের গ্যাস সম্পদের অপুরণীয় ক্ষতি হয়েছে। মার্কিন কোম্পানি মাগুরছড়ায় ও কানাডীয় কোম্পানি টেংরাটিলায় দুর্ঘটনা ঘটিয়ে যে পরিমান গ্যাস সম্পদ নষ্ট করেছে তা দিয়ে সারা দেশে ২০ মাসের বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব ছিল। এই পরিমাণ গ্যাস এখন বিদেশ থেকে আমদানী করতে হলে ৪০ হাজার কোটি টাকারও বেশি প্রয়োজন হবে, যা চলতি অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচীর চাইতে বেশি। অথচ এই ক্ষতিপূরণ আদায়ের জন্য কোন সরকারই কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করে নাই। এই বিষয়ে আমরা জাতীয় সংসদের কার্যকর উদ্যোগ আশা করি।

তৃতীয়ত : জাতীয় সংসদে খনিজ সম্পদ নিয়ে জাতীয় স্বার্থ রক্ষা ও জাতীয় সম্পদের ব্যপারে সর্বোত্তম ব্যবহার সংক্রান্ত কোন নীতি নির্ধারক আলোচনা না হলেও, মার্কিন রাষ্ট্রদূত এর চাপে ও জ্বালানি উপদেষ্টার পরিকল্পনা অনুযায়ী, জ্বালানি বিষয়ক সংসদীয় স্থায়ী কমিটি যা করছেন তা কেবল বিদেশি কোম্পানির লবিষ্ট হিসেবে জাতীয় স্বার্থবিরোধী তৎপরতায় লিপ্ত ব্যক্তিদের পক্ষে মানায়। জনগণের নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা যাতে জাতীয় ও জনস্বার্থ বিরোধী তৎপরতায় লিপ্ত না থাকেন সে জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য আপনার দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।

চতুর্থত : বাংলাদেশের সীমিত ও অনবায়নযোগ্য গ্যাস ও কয়লা সম্পদ রফতানি করবার জন্য গত এক দশক ধরে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন কায়েমী গোষ্ঠী চেষ্টা করে চলেছে। জনগণ এই অপচেষ্টা প্রতিরোধ করে চলেছে বলে এ যাবৎ দেশকে ভয়াবহ সর্বনাশের হাত থেকে রক্ষা পেয়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত এই অপচেষ্টা অব্যাহত আছে। গত ১৬ জুন ২০১১ তারিখে বঙ্গোপসাগরের ২টি তেল-গ্যাস ব্লক নিয়ে মার্কিন কোম্পানি কনোকো-ফিলিপস্ এর সাথে  যে চুক্তি করা হয়েছে তাতে শতভাগ তেল-গ্যাস রফতানি হয়ে যাওয়ার সমুহ সম্ভাবনা আছে।

উপরোক্ত পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের খনিজ সম্পদ রফতানির উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে আইন প্রণয়ন করা জাতীয় সম্পদ স্থায়ীভাবে সুরক্ষার জন্য অপরিহার্য। এই পরিপ্রেক্ষিতে জাতীয় কমিটি গত ১৫ অক্টোবর ২০০৯ জ্বালানী বিষয়ক সংসদীয় কমিটির কাছে ‘খনিজ সম্পদ রফতানি নিষিদ্ধকরন আইন’ এর একটি খসড়া জমা দেন। পরে জাতীয় সংসদের মাননীয় সংসদ সদস্য রাশেদ খান মেনন খনিজ সম্পদ রফতানি নিষিদ্ধ করন এর জন্য একটি বিল প্রায় দেড় বছরের অধিক আগে উপস্থাপন করেন। কিন্তু তা পাশ করার জন্য সংসদে এযাবৎ কোন উদ্যোগ গৃহিত হয় নাই। আমরা অনুরোধ করছি যেন জাতীয় সংসদের এই অধিবেশনেই এই বিলটি পাশের ব্যাপারে যথাযথ উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। আমরা আশা করি, আপনি এ ব্যাপারে জাতীয় স্বার্থে বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করবেন।

ধন্যবাদান্তে,

(প্রকৌশলী শেখ মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ)                                                                                                         (অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ)
আহ্বায়ক                                                                                                                                          সদস্য সচিব

সংযুক্তি: জাতীয় কমিটির ৭ দফা দাবী।

জাতীয় কমিটির ৭ দফা দাবী

বর্তমান ও ভবিষ্যতের জন্য বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা বিধান, দ্রুত বিদ্যুৎ সংকট দূর করে কৃষি ও শিল্প প্রতিষ্ঠানসহ ঘরে ঘরে বিদ্যুতের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ এবং জাতীয় সম্পদের উপর জনগণের কর্তৃত্ব নিশ্চিত করবার জন্য আমরা নিম্নস্বাক্ষরকারীগণ অবিলম্বে নীচের দাবিগুলো মেনে নেবার জন্য সরকারের কাছে জোর দাবী জানাচ্ছিঃ
১। যেহেতু আগামী কয়েক দশকের জ্বালানি চাহিদার তুলনায় বাংলাদেশের স্থলভাগে ও সমুদ্রে তেল-গ্যাস-কয়লা মজুদ অনেক কম, সেহেতু কোনভাবেই তেল গ্যাস কয়লা খনিজদ্রব্য নিয়ে কোন রফতানিমুখী চুক্তি করা যাবে না। কোন চুক্তি হয়ে থাকলে তা বাতিল করতে হবে। জাতীয় কমিটি প্রস্তাবিত ও জাতীয় সংসদে উত্থাপিত ‘খনিজ সম্পদ রফতানি নিষিদ্ধকরণ আইন’ অবিলম্বে পাশ করতে হবে।
২। রফতানিমুখী ‘মডেল পিএসসি ২০০৮’ বাতিল করে শতভাগ জাতীয় মালিকানার শর্ত রেখে নতুন নীতিমালার ভিত্তিতে তেল-গ্যাস উত্তোলনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। কনোকো ফিলিপস এর সঙ্গে চুক্তি বাতিল করতে হবে। সমুদ্রে বাংলাদেশের ন্যায্য সীমানা নির্দিষ্টকরণ ও এই এলাকায় সার্বভৌম কর্তৃত্ব নিশ্চিত করবার প্রয়োজনীয় উদ্যোগ জরুরীভাবে নিতে হবে। পিএসসি ২০১১-র কার্যক্রম বন্ধ করে বাপেক্স-এর কাজের সুযোগ বাড়াতে হবে।
৩। আবাদি জমি-পানি সম্পদ-খাদ্য নিরাপত্তা ও পরিবেশ বিধ্বংসী কয়লা উত্তোলনের উন্মুক্ত খনন পদ্ধতি বাতিল এবং এই পদ্ধতির পক্ষে দুর্নীতি, জালিয়াতি এবং প্রতারণামূলক অপতৎপরতার সঙ্গে যুক্ত বহুজাতিক কোম্পানি এশিয়া এনার্জিকে অবিলম্বে  বহিষ্কারসহ জনগণের সঙ্গে সরকারের স্বাক্ষরিত ৬ দফা ফুলবাড়ী চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়ন করতে হবে। উন্মুক্ত পদ্ধতি অনুমোদনের কু-উদ্দেশ্যে কয়লানীতি ঝুলিয়ে না রেখে ‘উন্মুক্ত না, রপ্তানি না, বিদেশি না’ নীতিমালার ভিত্তিতে পরিবেশ-অনুকূল পদ্ধতি গ্রহণ করে দ্রুত কয়লা উত্তোলন ও বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে হবে।
৪। স্থলভাগের ১২টি সমৃদ্ধ গ্যাস ব্লকে গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনের জন্য চুক্তি করার পর বহুজাতিক কোম্পানিগুলি কর্তৃক অনুসৃত নীতি তথা বর্তমান তীব্র গ্যাস সংকটের সুযোগে দেশকে জিম্মি করে দীর্ঘসূত্রিতা, প্রতারণা ও অনিয়ম অবলম্বনের নীতির বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে। সকল অসম পিএসসিসহ জাতীয় স্বার্থ পরিপন্থী সকল চুক্তি বাতিল করে রাষ্ট্রীয় ও দেশীয় সংস্থার কর্তৃত্বে খনিজ উত্তোলনের ব্যবস্থা করতে হবে। মাগুড়ছড়া ও টেংরাটিলার দুর্ঘটনার জন্য দায়ী বহুজাতিক কোম্পানির কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ হিসেবে বাংলাদেশের প্রাপ্য অন্ততঃ ৪০ হাজার কোটি টাকা আদায় করে বিদ্যুৎ সংকট নিরসনে ব্যয় করতে হবে।
৫। পেট্রোবাংলা, বাপেক্স, জিওলজিক্যাল সার্ভে, আনবিক শক্তি কমিশনসহ জ্বালানিখাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জাতীয় প্রতিষ্ঠানগুলো পরিকল্পিতভাবে পঙ্গু করবার নীতি ত্যাগ করে, এই খাতকে দুর্নীতিবাজ ও বিদেশি কোম্পানির রাহুমুক্ত করতে হবে এবং জাতীয় সক্ষমতা বিকাশে প্রয়োজনীয় পৃষ্ঠপোষকতা দিতে হবে।
৬। জ্বালানি সম্পদ নিয়ে এ যাবতকালে বিভিন্ন সরকারের আমলে যে সব জাতীয় স্বার্থবিরোধী চুক্তি করা হয়েছে, সেগুলো প্রকাশ করতে হবে এবং এগুলোসহ যেসব অপতৎপরতার কারণে বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা বিপর্যস্ত ও ভয়াবহ বিদ্যুৎ সংকটের সৃষ্টি হয়েছে, সেগুলোর জন্য দায়ী দুর্নীতিবাজ জাতীয় স্বার্থবিরোধী ব্যক্তি ও গোষ্ঠীকে চিহ্নিত করে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে।
৭। ২ সেপ্টেম্বর ২০০৯ জাতীয় সম্পদ রক্ষায় সংগঠিত জাতীয় কমিটির শান্তিপূর্ণ মিছিল, ৩ জুলাই ২০১১ শান্তিপূর্ণ হরতাল কর্মসূচিতে পুলিশী হামলার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে।