Thursday, November 17th, 2016

জাতীয় মানবাধিকার কমিশন এর সাথে জাতীয় কমিটির বৈঠক: সুন্দরবন আন্দোলনে দমনপীড়ন সম্পর্কে তালিকা প্রদান ও শান্তিপূর্ণভাবে ‘চলো চলো ঢাকা চলো’ কর্মসূচি বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ

আজ ১৭ নভেম্বর বিকাল ৪টায় তেল গ্যাস খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির একটি প্রতিনিধিদল জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, বাংলাদেশ-এর সাথে সাক্ষাৎ করেন। অধ্যাপক আনু মুহাম্মদের নেতৃত্বে প্রতিনিধিদলে আরও ছিলেন নৃবিজ্ঞানী রেহনুমা আহমেদ, ঢাকা বিশ্বদ্যিালয়ের শিক্ষক ডক্টর তানজিমউদ্দীন খান ও মোশাহিদা সুলতানা। বৈঠকে মানবাধিকার কমিশনের পক্ষে সার্বক্ষণিক সদস্য মো. নজরুল ইসলামের সভাপতিত্বে আরও উপস্থিত ছিলেন কমিশন সদস্য ডক্টর মেঘনা গুহ ঠাকুরতা, বঞ্চিতা চাকমা, নূরুন নাহার ওসমানী এবং মো. শরীফ উদ্দীন। প্রতিনিধিদল জাতীয় কমিটির আহবায়ক প্রকৌশলী শেখ মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ও আনু মুহাম্মদ স্বাক্ষরিত একটি পত্র ও সুন্দরবন আন্দোলনে গত কয়েক মাসে সরকারি দমনপীড়ন সম্পর্কে তালিকা প্রদান করে শান্তিপূর্ণভাবে আগামী ২৪-২৬ নভেম্বর অনুষ্ঠিতব্য ‘চলো চলো ঢাকা চলো’ কর্মসূচি বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ জানান।

লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, ‘আমরা গত কয়েক বছর ধরে সুন্দরবন রক্ষার জন্য আন্দোলন করে আসছি। আমাদের শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে দেশের বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন সময়ে সরকারী দল ও আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে বিভিন্নভাবে হামলা ও নির্যাতন করা হচ্ছে, মতপ্রকাশে বাধা দেয়া হচ্ছে, হুমকিসহ বিভিন্নভাবে ভয়ভীতি ছড়িয়ে কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত করা হচ্ছে। আগামি দিনগুলিতে দেশের স্বার্থে সুন্দরবন রক্ষায় আমরা যেন শান্তিপূর্ণভাবে আমাদের মতপ্রকাশ করতে পারি, বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করতে পারি সে ব্যাপারে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সার্বিক সহযোগিতা ও সমর্থন কামনা করছি।’
এই সঙ্গে গত কয়েক মাসে সুন্দরবন আন্দোলনে নিপীড়ন হামলা হুমকির তালিকাটি যুক্ত করা হলো।

সুন্দরবন আন্দোলনে দমন-পীড়ন-হুমকির তালিকা : জুলাই থেকে অক্টোবর ২০১৬

২০ জুলাই, শিল্পকলা একাডেমি, ঢাকা
‘কণ্ঠনালীতে সূর্য’ নাটক মঞ্চায়নের আগে ‘বাগ্বিতণ্ডা ও বাহাস’ শিরোনামে তীরন্দাজের একটি আলোচনার আয়োজন শেষ মুহুর্তে বাতিল করে একাডেমি কর্তৃপক্ষ। রামপাল বিদু্যুৎকেন্দ্র নিয়ে ওই আলোচনায় তেল-গ্যাস খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির সদস্য সচিব আনু মুহাম্মদের অংশ নেওয়ার কথা ছিল।

২৮ জুলাই, ঢাকা
তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটি সকাল সাড়ে ১১টায় জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে সমাবেশ শেষে প্রধানমন্ত্রীর কাছে খোলা চিঠি দিতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় অভিমুখে বিক্ষোভ মিছিল শুরু করে। মিছিল বাংলামোটরের মোড়ে যাওয়ার আগে পুলিশ শান্তিপূর্ণ মিছিলে লাঠিচার্জ ও টিয়ার গ্যাস শেল নিক্ষেপ করে। এতে অর্ধশতাধিক নেতাকর্মী আহত হন। পুলিশ ৮ জন নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করে।

২ আগস্ট, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় এবং সূত্রাপুর থানা
সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় এবং সূত্রাপুর থানা শাখার উদ্যোগে গত ২ আগস্ট বাহাদুর শাহ পার্কে আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়। আলোচনা সভার আগের রাতে সূত্রাপুর থানার ওসি রামপাল নিয়ে এই কর্মসূচি বাতিলের জন্য বারবার ভয়ভীাতি ও চাপ দিতে থাকেন। দুপুর ২টার দিকে ব্যাপক পুলিশ মোতায়েন করা হয়। পুলিশ পার্কের ভেতরে অবস্থানরত জনসাধারণকে বের করে দিয়ে গেটে তালা দেয়। এরপর ছাত্র ফ্রন্টের কর্মীরা জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের গেটে জমায়েত হয়ে পার্কের দিকে যেতে থাকলে পার্কের গেটে পুলিশ বাধা দেয় এবং রামপাল ইস্যুতে কোনো ধরনের প্রগ্রাম করা যাবে না বলে জানিয়ে দেয়। পুলিশের বাধা উপেক্ষা করে পার্কের গেটে সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয় এবং এরপর একটি মিছিল পুরান ঢাকার বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ শেষে সূত্রাপুরে গিয়ে শেষ হয়।

৭ আগস্ট, বরিশাল
রামপালে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বাতিল করে সুন্দরবন রক্ষার দাবিতে সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট ও বিজ্ঞান আন্দোলন মঞ্চের উদ্যোগে ১১ আগস্ট অশ্বিনীকুমার হলের সামনে এক ছাত্রসমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। এই সমাবেশে ১৫টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের চার শতাধিক শিক্ষার্থী অংশ নেয়। এই ছাত্রসমাবেশের প্রচারের সময় স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ পরিলক্ষিত হয়। বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে ৭ আগস্ট এই কর্মসূচির ক্লাস ক্যাম্পেইনের সময় প্রক্টর এবং ছাত্রলীগ বাধা দেয়। এখানে সরকারবিরোধী কোনো কাজ করা যাবে না এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসিও বিশ্ববিদ্যালয়কে সরকারি প্রতিষ্ঠান আখ্যায়িত করে রামপাল নিয়ে কথা বলা যাবে না বলে জানিয়ে দেন।

৮ আগস্ট, বাকেরগঞ্জ সরকারি কলেজ, বরিশাল
কলেজের সামনে ৮ আগস্ট রামপালে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বাতিল করে সুন্দরবন রক্ষার দাবিতে কলেজ ক্যাম্পাসের সামনে মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। এই কর্মসূচির প্রচারণার সময় ছাত্রলীগকর্মীরা বাধা দেয় এবং ক্যাম্পাসে এ ধরনের কোনো কর্মসূচি করা যাবে না বলে জানিয়ে দেয়। পরে কলেজ ক্যাম্পাসের বাইরে কলেজ শিক্ষার্থীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে কর্মসূচি পালিত হয়।

২৮ আগস্ট, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
২৭ আগস্ট বঙ্গভবনে প্রেস কনফারেন্স করে রামপালে তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র সুন্দরবনের কোনো ক্ষতি করবে না, তার ‘প্রমাণ’ দিয়ে এই প্রকল্প সরানোর দাবি প্রত্যাখ্যান করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এর পরদিন ফেসবুকে বঙ্গবন্ধু, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগকে নিয়ে ‘কটূক্তিপূর্ণ’ স্ট্যাটাস দেওয়ার অভিযোগে বিপ্লবী ছাত্রমৈত্রীর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (রাবি) শাখার সাধারণ সম্পাদক দিলীপ রায়কে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। ২৮ আগস্ট দুপুর ১২টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। এ ঘটনায় রাবি ছাত্রলীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি রাশেদুল ইসলাম রাঞ্জু বাদী হয়ে নগরীর মতিহার থানায় আইসিটি আইনে মামলা দায়ের করেন।

২৯ আগস্ট, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
সকালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংস্কৃতিক জোট সুন্দরবন রক্ষা সমাবেশের আয়োজন করে। প্যারিস রোডে সমাবেশটি হওয়ার কথা থাকলেও শেষ পর্যন্ত আয়োজকরা তা করতে বাধ্য হয় লাইব্রেরির পেছনে। তাদের শর্ত বেঁধে দেওয়া হয়েছিল, যেন তারা গ্রেপ্তার হওয়া রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও সুন্দরবন আন্দোলনের অ্যাক্টিভিস্ট দিলীপ রায়ের মুক্তির কোনো দাবি না তোলে! শুধু তা-ই নয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর এবং ক্ষমতাসীন ছাত্রসংগঠনের পক্ষ থেকে মৌখিকভাবে শিক্ষার্থীদের নিষেধ করা হয়েছে, যেন তারা রামপালবিরোধী কোনো কিছু উচ্চারণও না করে। কেননা রামপালের বিরোধিতা মানে সরকারবিরোধিতা! ক্যাম্পাসে প্রধানমন্ত্রী, বঙ্গবন্ধু নিয়ে প্রশংসাবাক্য ছাড়া অন্য কোনো কিছু আলোচনা করা যাবে না! শিক্ষার্থীদের এও জানানো হয় যে আইনমন্ত্রীকে নিয়ে ফেসবুকে সমালোচনা করায় ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের একজন শিক্ষককে তাঁদের সিন্ডিকেট ইতোমধ্যে চাকরি থেকে বরখাস্ত করেছে!
একই দিন বিকেলে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীরা সমগীতের পক্ষ থেকে একটি অনুষ্ঠানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মোহাম্মদ তানজিমুদ্দীন খানকে বক্তৃতার জন্য আমন্ত্রণ জানায়। বক্তৃতা শুরুর এক-দুই মিনিট পরই তাঁকে বক্তব্য সংক্ষিপ্ত করার জন্য চিরকুট দেওয়া হয়েছিল! কেননা বক্তৃতায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রেপ্তার হওয়া ছাত্র দিলীপ রায়ের মুক্তির দাবি ছিল এবং তার সাথে ছিল কেন সুন্দরবন রক্ষার আন্দোলন ন্যায়সংগত, তার যৌক্তিক ব্যাখ্যা।

২৯ আগস্ট, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
ছাত্র ফেডারেশন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মেলনের উদ্ভোধনী অনুষ্ঠানে গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক জোনায়েদ সাকি বক্তৃতা দেওয়ার সময় চবি ছাত্রলীগের ক্যাডাররা ‘শিবির শিবির’ ধ্বনি দিয়ে সম্মেলন মঞ্চের ব্যানার খুলে নেয় এবং বিশ্রী ভাষায় গালাগাল করে ও কর্মসূচি বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দেয়।

১ সেপ্টেম্বর, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
ছাত্র ফেডারেশন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় শাখার কমিটি ঘোষণা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান কর্মসূচিতেও ছাত্রলীগের মাস্তানরা বাধা দিয়ে পণ্ড করে দেওয়ার চেষ্টা চালায়।

৩ সেপ্টেম্বর, খুলনা
গণতান্ত্রিক বাম মোর্চার খুলনা বিভাগীয় সমাবেশ মোর্চার মাসব্যাপী ‘রাষ্ট্রীয় ফ্যাসিবাদ ও মৌলবাদী সন্ত্রাস রুখে দাঁড়াও’ শিরোনামের কর্মসূচি পালনের অনুমতি নিতে গেলেই প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়, আপনারা সুন্দরবন ইস্যুতে কোনো বক্তব্য দিতে পারবেন না। তাদের কথা না শুনলে মাইক বন্ধ করে দেওয়া ও মঞ্চ ভেঙে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়েছিল প্রশাসনের পক্ষ থেকে।

২৮ সেপ্টেম্বর, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়
সুন্দরবন রক্ষা আন্দোলনের অংশ হিসেবে সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় শাখার উদ্যোগে ‘বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সুন্দরবনের ভবিষ্যৎ’ শীর্ষক আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়। প্রধান আলোচক ছিলেন তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির সদস্য সচিব অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ। ক্যাম্পাসে সভার অনুমতি প্রসঙ্গে ছাত্র ফ্রন্ট নেতৃবৃন্দ বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে মৌখিকভাবে জানানোর পর ২০ সেপ্টেম্বর একটি লিখিত আবেদন করেন। প্রশাসন সভা করার অনুমোদন দিলে ছাত্র ফ্রন্টের নেতাকর্মীরা ব্যাপকভাবে ক্লাস ক্যাম্পেইন করে লিফলেটিং, সুন্দরবন রক্ষার বই বিক্রিসহ কর্মসূচির পোস্টার, দেয়ালিকা করেন। এতে দেখা যায়, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক-কর্মচারী-কর্মকর্তারা রামপালে নিয়ে আলোচনা শুনতে বেশ আগ্রহী। এভাবে ৬ দিন ব্যাপক প্রচারণার পর ছাত্র যোগাযোগের মাধ্যমে সভা সম্পন্ন করার প্রস্তুতি নেওয়া হয়। কিন্তু কর্মসূচির আগের দিন দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন প্রক্টরের বাসা থেকে সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের নেতৃবৃন্দকে ডাকেন। এ সময় তিনি ছাত্রলীগের কর্মসূচির ভয় দেখিয়ে কর্মসূচি বন্ধ রাখতে এবং ক্যাম্পাসের ভেতরে এ ধরনের প্রগ্রাম করা যাবে না বলে লিখিতভাবে জানিয়ে দেন। বিকেল সাড়ে ৩টায় উপাচার্যের নির্দেশক্রমে আলোচনা সভা বাতিলের একটি চিঠি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ছাত্র ফ্রন্ট নেতৃবৃন্দকে দেয়। পরে ২৮ সেপ্টেম্বর বিকেল ৪টায় শহরের একটি মিলনায়তনে আলোচনা সভাটি অনুষ্ঠিত হয়।

২৯ সেপ্টেম্বর, বগুড়া
সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট বগুড়া জেলা শাখার চতুর্থ সম্মেলন শহরের কেন্দ্রস্থল সাতমাথায় অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। সুন্দরবন রক্ষার দাবি সামনে এনে এই সম্মেলনের প্রধান অতিথি ছিলেন অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ। সম্মেলনের বক্তাদের নাম নির্বাচন হওয়ার পর থেকে দেয়াললিখন, লিফলেটিং, পোস্টারিং, বিভিন্ন রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক- সামাজিক সংগঠনকে কার্ড বিতরণ, ব্যানার টানানো, অর্থ সংগ্রহ, ছাত্র সংযোগ, গণসংযোগ করা হয়। কর্মসূচির ১০ দিন আগে পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে লিখিত জানিয়ে রিসিভ কপি নিয়ে আসা হয়। সাংবাদিকদের জানানো, স্কুল-কলেজের ছাত্রদের রেজিস্ট্রেশনসহ সকল কাজ যখন সম্পন্ন, ঠিক সেই সময় সম্মেলনের এক দিন আগে ২৭ তারিখ সকাল থেকেই শ্রমিক লীগ মঞ্চ তৈরির কাজ শুরু করে। এ বিষয়ে শ্রমিক লীগের সাথে কথা বললে তারা তাদের কর্মসূচিতে অনড় থাকবে বলে জানিয়ে দেয় এবং পুলিশও তাদের বিরুদ্ধে কোনো কথা না বলে উল্টো প্রগ্রাম করা যাবে না বলে জানিয়ে দেয়।এ ধরনের বাধার ফলে দিনব্যাপী এই প্রগ্রাম এক বেলা শহীদ খোকন পার্কে অনুষ্ঠিত হয়। এত হুমকি ও বাধা উপেক্ষা করেও পাঁচ শতাধিক শিক্ষার্থী সুন্দরবন রক্ষার দাবি নিয়ে শহরে মিছিল করে এবং সমাবেশে অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র বাতিলের যুক্তিগুলো ছাত্রসমাজের সামনে তুলে ধরেন।

৩০ সেপ্টেম্বর, ঢাকা
সকাল ৯টা থেকে যখন শত শত সাইক্লিস্ট শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে এসে জড়ো হয়ে সাইকেল মিছিল শুরু করার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, তখন পূর্বঘোষণা ছাড়াই ছাত্রলীগের গুণ্ডাবাহিনী শহীদ মিনারে এসে সাইকেল মিছিলে আগত সকলকে মানববন্ধন করার নাম করে পুরো শহীদ মিনারকেই অবরুদ্ধ করে ফেলে। ‘বাঁচাও সুন্দরবন’ সাইকেল মিছিলে দফায় দফায় ছাত্রলীগ ও পুলিশ হামলা চালিয়েছে। এই হামলায় আহত হয়েছেন অর্ধশতাধিক। এর মধ্যে একজন ঢাবির ইসলামের ইতিহাস বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র হাসিব মোহাম্মদ আশিকের ডান হাত ভেঙে দেওয়া হয়েছে। দুজনকে গ্রেপ্তার করে শাহবাগ থানায় নেওয়া হয়েছে। তেজগাঁও থানায় গ্রেপ্তার করা হয়েছিল ১৫ জনকে।অন্যদিকে একই সময়ে শাহবাগ, ধানমণ্ডি, নীলক্ষেত, পলাশীসহ বিভিন্ন জায়গা থেকে সাইকেল মিছিলে আগত সাইক্লিস্টদের পুলিশ আটকে দেয়। ঢাকা কলেজের সামনে সাইকেল মিছিল আসছে শুনে ছাত্রলীগের ছাত্ররা একজন সাইক্লিস্টকে প্রহার করে এবং তাঁর সাইকেল ভেঙে দেয়। শহীদ মিনার থেকে সাইকেল ছিনিয়ে নেওয়া হয়। দোয়েল চত্বর থেকে পুলিশ অতর্কিতে নিরীহ সাইক্লিস্টদের ওপর ব্যাপক হারে পেছন থেকে জলকামান নিয়ে আক্রমণ করতে করতে সাইকেল মিছিলটিকে হাইকোর্ট মোড়ে ছত্রভঙ্গ করে দিতে চেষ্টা করে। পরে অংশগ্রহণকারীরা প্রেসক্লাবে এসে রামপাল প্রল্পকে লালকার্ড দেখায়।

৬ অক্টোবর, ইডেন কলেজ, ঢাকা
সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট ইডেন কলেজ শাখার উদ্যোগে সকাল ১১টায় মিছিল ক্যাম্পাস প্রদক্ষিণ করে সমাবেশ শুরু হওয়ার কিছুক্ষণ পরই ছাত্রলীগ ইডেন কলেজ শাখার সংগঠকরা ব্যানার কেড়ে নেয়। হাঙ্গামা শুরু করলে সমাবেশস্থলে দাঁড়িয়ে যে শিক্ষকরা বক্তব্য শুনছিলেন তাঁরা এগিয়ে আসেন। ছাত্রলীগ সমাবেশ শেষ করতে দেবে না বলে হুঁশিয়ারি দিলেও সেটি উপেক্ষা করে সমাবেশ করা হয়।

১৩ অক্টোবর, ঢাকা
রাত ১টার দিকে ০১৬২৯৯৬৭৫৫১ নম্বর থেকে অধ্যাপক আনু মুহাম্মদকে হত্যার হুমকি দিয়ে এসএমএস পাঠানো হয়। এসএমএসে লেখা ছিল : “Death keeps no calendar, and Ansarullah knows no time!” এরপর রামপুরা থানায় জিডি করার সময় রাত ৮টা ৪৩ মিনিটে একই নম্বর থেকে হত্যার হুমকি দিয়ে আরেকটি এসএমএস পাঠানো হয়, যেখানে লেখা ছিল : “Say ‘yes’ to Rampal, otherwise you must will be hacked to death incredibly by us!”

১৮ অক্টোবর, ঢাকা
সকাল ১১টায় জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে এক সমাবেশে জাতীয় কমিটির পক্ষ থেকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির কাছে লেখা খোলা চিঠি পাঠ করা হয়। এরপর ঐ খোলা চিঠি ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশনে পৌঁছে দিতে গিয়ে মৌচাক মোড়ে পুলিশের বাধার মুখে পড়েন আন্দোলনকারীরা। এরপর মালিবাগ রেলগেটের কাছে সুন্দরবন রক্ষায় আন্দোলনকারীদের ভারতীয় দূতাবাস অভিমুখী মিছিল ছত্রভঙ্গ করতে জলকামান, টিয়ার গ্যাস শেল ব্যবহার করে পুলিশ। এতে আহত হন ৩০ জন। পুলিশী আক্রমণ চলাকালে আশেপাশের ভবন থেকে শিশু সহ বহু মানুষ আন্দোলনের সাথে সংহতি প্রকাশ করে। পরে একটি প্রতিনিধিদল ভারতীয় হাইকমিশনে চিঠিটি পৌঁছে দেয়।

২১ অক্টোবর, ময়মনসিংহ
সুন্দরবন রক্ষা ও রামপাল বিদ্যুৎ প্রকল্প নিয়ে বিকেলে ময়মনসিংহের স্থানীয় মুসলিম ইনস্টিটিউট মিলনায়তনে যুক্তিতর্কের একটি অনুষ্ঠান হওয়ার কথা ছিল। ‘আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সমুন্নত রাখার’ অজুহাতে আলোচনা সভার অনুমতি বাতিল করা হয়। গণসংহতি আন্দোলন আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখার কথা ছিলো আনু মুহাম্মদ, সামিনা লুৎফা নিত্রা ও আবুল হাসান রুবেলের। পরে ময়মনসিংহ প্রেসক্লাবে এক সাংবাদিক সম্মেলনে তাঁরা প্রশাসনের এই আচরণের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানান।

২৫ অক্টোবর, মদন মোহন কলেজ, সিলেট
ক্যাম্পাসের উন্মুক্ত স্থানে সকাল পৌনে ১০টার দিকে সুন্দরবন ইস্যুতে সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট মদন মোহন কলেজ শাখা আয়োজিত একটি তথ্য প্রদর্শনী শুরু হয়। শুরু থেকেই আশপাশ থেকে বিভিন্নভাবে কটাক্ষ করে আসছিল কলেজ শাখা ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। একপর্যায়ে তারা আচমকা প্রদর্শনীতে হামলা চালায়। হামলাকারীরা প্রদর্শনীস্থলে থাকা বেঞ্চ ও আয়োজনসংশ্লিষ্ট জিনিসপত্র ভাঙচুর করে এবং প্রদর্শনী পণ্ড করে দেয়। হামলায় ছাত্রফ্রন্টের ৫-৬ জন কর্মী আহত হন।

১৫ নভেম্বর পর্যন্ত..
২৪ থেকে ২৬ নভেম্বর সুন্দরবন রক্ষার দাবিতে আহুত ‘চলো চলো ঢাকা চলো’ ও মহাসমাবেশ কর্মসূচি সামনে রেখে দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রচারমূলক তৎপরতায় নানাবিধ বাধা, হুমকি, আক্রমণ করা হচ্ছে। রাজশাহীতে ১৯ নভেম্বর অনুষ্ঠিতব্য সমাবেশের অনুমতি দেয়া হয়নি। যশোরে বিভিন্নভাবে চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে। ১৫ নভেম্বর পঞ্চগড়ে সুন্দরবন রক্ষায় আহুত জাতীয় পতাকা মিছিলে পুলিশ ও ছাত্রলীগ হামলা করেছে।