Thursday, October 6th, 2016

সুন্দরবন রক্ষা আন্দোলনে দমনপীড়ন, গ্যাসসম্পদ নিয়ে আত্মঘাতী তৎপরতা এবং আশু কর্মসূচি বিষয়ে সাংবাদিক সম্মেলন

প্রিয় সাংবাদিক বন্ধুগণ,

শুভেচ্ছা নেবেন।

আপনারা জানেন, সুন্দরবন বিনাশী রামপাল বিদ্যুৎ প্রকল্প বাতিলের জন্য দেশে বিদেশে বিশেষজ্ঞ ও জনমতের দাবি অভূতপূর্ব মাত্রা লাভ করলেও সরকার একদিকে এখনও এই বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে একগুয়েমীর সাথে কালক্ষেপন করছে এবং অন্যদিকে বিজ্ঞাপনী ভাড়াটে মিথ্যাচারের পাশাপাশি সুন্দরবন রক্ষা আন্দোলনের উপর দমনপীড়ন বৃদ্ধি করেছে। গত ২৮ জুলাই প্রধানমন্ত্রীর উদ্দ্যেশ্যে খোলাচিঠি দেবার শান্তিপূর্ণ মিছিলে লাঠি, গুলি, টিয়ার গ্যাস প্রয়োগ করা হয়। এরপর থেকে দেশের বিভিন্ন স্থানে বেশ কয়েকটি শান্তিপূর্ণ সভা সমাবেশ, প্রতিবাদ এমনকি আলোচনা সভাতেও নানাভাবে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা হয়েছে। সুন্দরবনের উপর রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ক্ষতিকর প্রভাব নিয়ে বৈজ্ঞানিক গবেষণায় যুক্ত হবার কারণে গবেষককে হয়রানি করার ঘটনাও ঘটছে। এসব কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে পুলিশ, ছাত্রলীগের সন্ত্রাসী এবং প্রশাসনকে।

এখানে কয়েকটি দৃষ্টান্ত উল্লেখ করছি আপনাদের অবগতির জন্য। গত ২০ আগস্ট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে দিনব্যাপী অবস্থান কর্মসূচি চলাকালে কয়েকটি টিভি সরাসরি সম্প্রচার করতে থাকলে তা সকালেই নির্দেশ দিয়ে বন্ধ করে দেয়া হয়। দুপুরের পর অনুষ্ঠানের বিদ্যুৎ তথা মাইক সংযোগ কেটে দেয়া হয়। ২৫ আগস্ট রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে শহীদ মিনারে প্রথমে সমগীতের সুন্দরবন নিয়ে অনুষ্ঠানের কর্মসূচি ছিলো, চাপের মুখে তা পরিবর্তন করবার পরেও সেই অনুষ্ঠান বন্ধ করে দেয়া হয়। গত ২৯ আগস্ট চট্রগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশনের সম্মেলনে রামপাল প্রসঙ্গে উঠা মাত্র ছাত্রলীগ হামলা করে সভা পন্ড করতে চেষ্টা করে। ১ সেপ্টেম্বর একই বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে সুন্দরবন রক্ষার ব্যানার কেড়ে নেয়। ৩ সেপ্টেম্বর খুলনায় গণতান্ত্রিক বাম মোর্চার সভায় রামপাল প্রসঙ্গে নিয়ে কথা বলার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন। ২৮ সেপ্টেম্বর রংপুরে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং ২৯ সেপ্টেম্বর বগুড়ায় সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্ট সুন্দরবন নিয়ে সভা করতে গেলে, যথাযথ অনুমতি থাকা সত্ত্বেও, তা করতে দেয়া হয়নি। বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে আগের দিন রাতে অনুমতি বাতিল করা হয়। বগুড়ার সাতমাথা মোড়ে অনুমতিপ্রাপ্ত সুন্দরবন নিয়ে আলোচনা সভা বানচাল করবার জন্য জোরজবদস্তি করে সরকারি দলের বিভিন্ন সংগঠনের নামে মঞ্চ স্থাপন করা হয়। কোনো কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার ন্যুনতম শর্ত ভঙ্গ করে রামপাল ও সুন্দরবন নিয়ে আলোচনা করা যাবে না বলে কর্তৃপক্ষ ঘোষণা করেছেন। একমাস পার হয়ে গেলেও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রনেতা দিলীপ রায়কে এখনও আটক রাখা হয়েছে। যেসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের উপাচার্য বা শিক্ষক- কর্মকর্তা ভয় দেখিয়ে প্রশ্ন, আলোচনা, বিশ্লেষণ, যুক্তিতর্ক নিষিদ্ধ করেন, পুলিশ ও ছাত্রলীগকে ব্যবহার করেন এধরনের উদ্যোগ বানচাল করবার জন্য, তাঁরা যে শিক্ষা ও শিক্ষকতা থেকে অনেক দূরে তা বলাই বাহুল্য।

গত ৩০ সেপ্টেম্বর ফেসবুকের মাধ্যমে ঢাকা শহরের সাইকেল চালক তরুণেরা ‘বাচাঁও সুন্দরবন’ ব্যানারে রামপাল বিুদ্যৎ প্রকল্প বাতিলের দাবিতে সাইকেল র‌্যালীর কর্মসূচি গ্রহণ করেছিলো। সকাল ১০ টায় কর্মসূচি শুরু করবার জন্য শতাধিক তরুণ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে সমবেত হলে ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা সেখানে হাজির হয়ে অবরোধ সৃষ্টি করে। তাদেরকে যুক্তি তর্কে আসার আহবান জানানো হলেও তারা তাতে সাড়া না দিয়ে নানাভাবে বলপ্রয়োগ ও হয়রানি করে মিছিল আটকে রাখে। এক পর্যায়ে আশিক নামের একজন অংশগ্রহণকারীর ওপর হামলা চালিয়ে তার হাত ভেঙে দেয় সন্ত্রাসীরা। এছাড়া সাইকেল র‌্যালীতে যোগদানের জন্য ঢাকা শহরের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে যারা যোগ দিতে আসছিলেন পথে পথে তাদের উপর হামলা করা হয় এবং সাইকেল ভাংচুরসহ তাদের জখম করা হয়। শহীদ মিনারে অংশগ্রহণকারীরা অবরুদ্ধ অবস্থাতেই গান, কবিতা ও শ্লোগানের মাধ্যমে প্রতিবাদ অব্যাহত রাখেন। কয়েক ঘন্টা ধরে ছাত্রলীগের সন্ত্রাসী তৎপরতা চলাকালে উপস্থিত পুলিশ নীরব ও রহস্যজনক ভূমিকা পালন করে। একপর্যায়ে বেলা ১টার দিকে সকল বাধা অতিক্রম করে সাইকেল র‌্যালী শুরু হয়ে যখন প্রেস ক্লাবের দিকে যাচ্ছিল তখন পুলিশ জলকামান দিয়ে তাদের উপর আক্রমণ করে। পথে পথে পুলিশ ও ছাত্রলীগের সন্ত্রাসী তৎপরতায় ৩০ জনেরও বেশি আহত হয়। এছাড়া পুলিশ আরো ১০জন নিরীহ সাইকেল আরোহীকে আটক করে এবং পথে পথে আরও অনেককে হেনস্তা করা হয়।
বৈজ্ঞানিক তথ্য যুক্তিতে পরাজিত হয়ে, দেশীবিদেশী কতিপয় গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষা করতে গিয়ে, সুন্দরবন বিনাশে সরকার শক্তিপ্রয়োগের পথ গ্রহণ করছে। এটা তাদের শক্তির নয় দুর্বলতার প্রকাশ, তাদের নৈতিক পরাজয়ের লক্ষণ।

প্রিয় সাংবাদিক বন্ধুগণ,
গত ২৭ আগস্ট অনুষ্ঠিত সাংবাদিক সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রামপাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরতে গিয়ে বাংলাদেশে গ্যাস সংকটের ওপর জোর দিয়েছিলেন। ২৯ আগস্ট সাংবাদিক সম্মেলনে আমরা এর উত্তরে বলেছিলাম, “যারা একসময়ে চিৎকার করেছে বাংলাদেশ গ্যাসের ওপর ভাসছে তারাই আজকে গ্যাস সংকট জিইয়ে রেখে তার অজুহাতে দেশবিধ্বংসী বিভিন্ন প্রকল্পকে যুক্তিযুক্ত দেখানোর চেষ্টা করছে। সেসময় জনপ্রতিরোধের মাধ্যমে আমরা গ্যাস রফতানির চক্রান্ত মোকাবিলা করতে পেরেছি বলেই আজ দেশে বিদ্যুৎ, শিল্প কারখানা চলছে। বঙ্গোপসাগরে বিশাল গ্যাস মজুদের সম্ভাবনা। আমাদের প্রস্তাব না মেনে কনকো ফিলিপস-এর সাথে চুক্তি করায় গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনে দেশ পিছিয়ে গেছে। নইলে এতোদিনে আরও বৃহৎ গ্যাস ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন সম্ভব হতো। সরকার এখন বিনা দরপত্রে ‘পারস্পরিক বোঝাপড়া’র ভিত্তিতে সমুদ্রের গ্যাসব্লকগুলো এমনভাবে বিদেশি কোম্পানিকে দেবার পরিকল্পনা করছে যাতে গ্যাসের দাম আমদানি করা গ্যাসের চাইতেও বেশি পড়বে। বিভিন্ন বিদেশি কোম্পানির মধ্যে ভাগবাটোয়ারা না করে আমাদের প্রস্তাব অনুযাযী অগ্রসর হলে কয়েক দশকের বিদ্যুৎ চাহিদা কমদামে পরিবেশ বান্ধব উপায়ে পূরণ করা এখান থেকেই সম্ভব হতো। এটা করলে সুন্দরবন ধ্বংস, রূপপুর মহাবিপদ বা বাঁশখালী হত্যাকান্ড কোনোটিরই দরকার হতো না। কুইক রেন্টালের দুষ্টচক্রেও অর্থনীতিকে ফেলতে হতো না। গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম বাড়াতে হতো না। এই পরিস্থিতির জন্য অতএব সরকারের ভুলনীতি ও দুর্নীতিই দায়ী। এখনও সঠিক নীতি ও ব্যবস্থা গ্রহণ করলে এসব ফাঁদ থেকে বের হওয়া সম্ভব।”

কিন্তু সরকার এই পথে না গিয়ে, দায়মুক্তি আইন ব্যবহার করে, বঙ্গোপসাগরের বিশাল সম্পদ নিয়ে জাতীয় স্বার্থবিরোধী আরও চুক্তির পথে অগ্রসর হচ্ছে। জনস্বার্থ বিবেচনা না করে বিভিন্ন বহুজাতিক কোম্পানির দাবি অনুযায়ি পিএসসি-২০১২ সংশোধন করে কোম্পানিগুলোর কর্তৃত্ব বাড়ানো হচ্ছে। বিদেশি কোম্পানির কর মওকূফ করা হচ্ছে। গ্যাসের উপর তাদের কর্তৃত্বের অনুপাতও বাড়ানো হচ্ছে। কস্ট রিকভারি হিসেবে তাদের মালিকানা শতকরা ৫৫ ভাগের স্থলে করা হচ্ছে ৭০ ভাগ। সরকার কনকো ফিলিপসের সাথে চুক্তির সময় জাতীয় কমিটির আন্দোলনের মুখে রফতানির ধারা বাদ দিয়া পিএসসি সংশোধন করেছিল। কিন্তু আবারও এই ধারা যোগ করে চুক্তির পক্ষে যাচ্ছে সরকার। একেদিকে গ্যাসের সংকটের কথা বলে সুন্দরবনবিনাশী দেশধ্বংসী নানা প্রকল্প জায়েজ করবার চেষ্টা অন্যদিকে নিজেদের গ্যাস সম্পদ বিদেশ থেকে আমদানি দামের চাইতেও বেশি দামে ক্রয় এবং রফতানির লক্ষ্যে চুক্তি এককথায় অবিশ্বাস্য মাত্রায় জনগণের সাথে প্রতারণা ও বিশ্বাসঘাতকতা ছাড়া আর কিছু নয়।

শুধু তাই নয়, স্থলভাগে গ্যাস অনুসন্ধানে বাপেক্স বারবার সক্ষমতা প্রমাণ করা সত্ত্বেও নানা ফাঁক ফোকড় তৈরি করে, যুক্তি তথ্যের তোয়াক্কা না করে বিদেশী কোম্পানির আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা চলছে। সংবাদপত্রে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, বাপেক্স ২০২১ সালের মধ্যে প্রায় ১০০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রীডে সরবরাহের লক্ষ্যে ১০৮ টি কূপ খননের একটি কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। মন্ত্রণালয় তাদের কাজে বাধা দিয়ে বেশি খরচে ঝুঁকিপূর্ণভাবে এসব কাজ রাশিয়ার কোম্পানি গাজপ্রমের হাতে তুলে দিচ্ছে। বাপেক্স কর্তৃক প্রতিটি কূপখননের ব্যয় ভূমি অধিগ্রহণ ও উন্নয়নসহ আনুমানিক ৭০-৮০ কোটি টাকা, পক্ষান্তরে গাজপ্রম কর্তৃক কূপ খনন করলে প্রতিটি কূপের আনুমানিক ব্যয় তিনগুণেরও বেশি, ২৫০ কোটি টাকা। বিদেশি কোম্পানির স্বার্থ দেখতে গিয়ে জিম্মি হচ্ছে বাংলাদেশ, বারবার বাড়ছে গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম, পুরো দেশ ও অর্থনীতির ওপর দীর্ঘমেয়াদে বোঝা বাড়ছে।
আমরা বারবার সরকারকে এই ধরনের চুক্তি স্বাক্ষর থেকে বিরত হয়ে পরিবর্তে জাতীয় সংস্থার সক্ষমতা বৃদ্ধি করে জাতীয় স্বার্থ সমুন্নত রেখে গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলন কার্যক্রম গ্রহণের দাবি জানিয়েছি। কিন্তু সরকার যাচ্ছে উল্টোপথে। রূপপুরেও সরকার বিপুল ঋণ নির্ভরতায় দেশকে আটকে এক মহাবিপদের দিকে ঠেলে দিচ্ছে সরকার। পারমাণবিক বর্জ্য ফেরত নেয়া এবং পরিশোধনের বিষয়ে কোন স্পষ্ট বিধান না রেখে সরকার রাশিয়ার সাথে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনে সাধারণ চুক্তি স্বাক্ষর করেছে বলে গতকাল সংবাদপত্রে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী তেজষ্ক্রিয় বর্জ্য ফেরত নেয়ার বিষয়ে রাশিয়া তার অবস্থান পরিবর্তন করায় সাধারণ চুক্তির পরবর্তী ৪টি চুক্তি জুন মাসের মধ্যে স্বাক্ষর করার কথা থাকলেও তা হয়নি। এমন সংবাদ পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিষয়ে সম্পূর্ণ অনভিজ্ঞ এবং জনবহুল এ দেশের ১৬ কোটি মানুষের জন্য আরও বিপদের বার্তা দিচ্ছে।

বিদ্যুৎ সংকট সমাধানের নামে সরকারের এসব তৎপরতা স্পষ্টতই দেখায় যে, সরকারের এসব প্রকল্প দেশের বিদ্যুৎ সংকট সমাধানের জন্য নয় বরং দেশকে মহাবিপদে নিক্ষেপ করে ভারত, চীন, রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশ ও কোম্পানির স্বার্থরক্ষা করাই লক্ষ্য।
আমরা সরকারকে আবারও এসব আত্মঘাতী তৎপরতা বন্ধ করে জাতীয় কমিটির ৭ দফা বাস্তবায়নের মাধ্যমে নিরবচ্ছিন্ন সুলভ বিদ্যুৎ সরবরাহে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানাচ্ছি।

প্রিয় সাংবাদিক বন্ধুগণ,
আমরা সবসময়ই যুক্তি তথ্য ও আলোচনার মাধ্যমে সংকট থেকে উত্তরণের পথে ভূমিকা পালন করছি। সেজন্য একবার বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয় এবং দ্বিতীয়বার বিদ্যুৎ জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রনালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির আমন্ত্রণে সুন্দরবনবিনাশী রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র নিয়ে আলোচনায় যোগ দিয়েছি।

আমরা আমাদের বক্তব্যে বৈজ্ঞানিক তথ্য-উপাত্ত ও যুক্তি উপস্থাপন করে বারবার দেখিয়েছি কীভাবে এই বিদ্যুৎ কেন্দ্র সুন্দরবনবিনাশী। কীভাবে বাংলাদেশের জন্য অতুলনীয় সম্পদ সুন্দরবন এই কয়লাভিত্তিক প্রকল্প এবং এর দ্বারা আকৃষ্ট হয়ে আরো বাণিজ্যিক এবং ভূমি ও বনগ্রাসী তৎপরতায় ধ্বংসপ্রাপ্ত হবে। আমরা দেখিয়েছি যে, কোম্পানি যে দূষণ দূর করার কাহিনী বলছে তার কোনো গ্রহণযোগ্য দৃষ্টান্ত নেই। এসব প্রযুক্তি ব্যবহার দরপত্র ও অন্যান্য দলিলের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। আর বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ থেকেই দেখা যায় যে, এতে দূষণ বিপদমুুক্ত মাত্রায় দূর হবে না, অনেকক্ষেত্রে স্থানান্তরিত হবে মাত্র। তাছাড়া এগুলো ব্যবহার করলে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যয় ও দাম বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে যে তথ্য গোপন করা হচ্ছে, এতে বিদ্যুৎ কেন্দ্র হিসেবেও তা আর্থিকভাবে খুবই অযৌক্তিক হবে।

ভারতের এনটিপিসি খোদ ভারতেই বিদ্যুৎকেন্দ্রে অব্যবস্থাপনা ও দূষণ সৃষ্টির জন্য অভিযুক্ত। দূষণ ও প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের জন্য এনটিপিসির বিরুদ্ধে ভারতেই বহু জনবিক্ষোভ তৈরি হয়েছে। সর্বশেষ গত ২ অক্টোবর ঝাড়খন্ডে তাদের একটি প্রকল্পে প্রতিবাদী গ্রামবাসীর ওপর পুলিশের গুলিতে চারজন নিহত হয়েছেন। এছাড়া এনটিপিসির একাধিক প্রস্তাব ভারতে পরিবেশ মন্ত্রণালয় ও গ্রীন ট্রাইব্যুনাল প্রত্যাখ্যান করেছে। গতমাসে শ্রীলঙ্কা ভারতের এনটিপিসির সাথে তার উপক’লীয় অঞ্চলে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য একইরকম একটি চুক্তি বাতিল করবার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়েছে।

গত মার্চে ইউনেস্কো টিম বাংলাদেশে এসে সুন্দরবন এলাকা পরিদর্শন করে বৈজ্ঞানিক তথ্য উপাত্ত বিশ্লেষণ করে সম্প্রতি সরকারকে প্রদত্ত রিপোর্টে দেখিয়েছে, রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র হলে সুন্দরবন কীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাঁরা রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র সহ সুন্দরবনের জন্য হুমকিস্বরূপ সব বাণিজ্যিক তৎপরতা বন্ধ করতে বলেছেন। ইউনেস্কো টিম যখন বাংলাদেশ সফর করে তখন তাঁদের পরিকল্পনা ছিলো, দুইপক্ষের কথাই তাঁরা শুনবেন। কিন্তু সরকার নানা বাহানা সৃষ্টি করে আমাদের সাথে কোনো সভা করবার সময় রাখেনি। তারপরও তাঁরা স্বাধীনভাবে তথ্য সংগ্রহ করে যথাযথ সিদ্ধান্তে এসেছেন। কোম্পানি, ভ’মিগ্রাসী ও বনগ্রাসী গোষ্ঠী দ্বারা পরিচালিত না হলে, নির্মোহ বিচার বিশ্লেষণ করলে সরকারও যে একই সিদ্ধান্তে আসবে সেটা আমরা নিশ্চিতভাবেই বলতে পারি।

ইউনেস্কোর সর্বশেষ রিপোর্টের তাগিদ থেকে পরিষ্কার বার্তা পাওয়া যাচ্ছে যে, সরকার যদি আগের মতোই এসব গুরুতর বিষয় উপেক্ষা করে তাহলে সুন্দরবন ‘বিশ্ব ঐতিহ্য’ তালিকা থেকে বাদ পড়ে যাবে। বিশ্বজুড়ে বিষয়টি এভাবে উপস্থিত হবে যে, বাংলাদেশ এমন একটি দেশ যারা প্রকৃতিপ্রদত্ত এক অসাধারণ সম্পদ ধরে রাখার যোগ্যতা রাখে না, এদেশের মানুষের সেই সক্ষমতা বা পরিপক্কতা নেই। সুন্দরবিনাশী বিদ্যুৎ প্রকল্প তাই শুধু দেশকে বিপর্যস্ত করবে না, বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশকে কলঙ্কিতও করবে। কাজেই সরকারের উচিৎ হবে একগুঁয়েমী ত্যাগ করে বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ, বিশেষজ্ঞ মত ও ক্রমবর্ধমান জনমতের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে অবিলম্বে রামপাল চুক্তি বাতিলসহ সুন্দরবনবিনাশী বনগ্রাসী সব তৎপরতা বন্ধ করা। আর সেইসঙ্গে ‘সুন্দরবন নীতিমালা’ গ্রহণ করে এর বিকাশে সবধরনের উদ্যোগ গ্রহণ। একাজে সরকার যতো বিলম্ব করবে ততোই ক্ষতি বাড়তে থাকবে।

একদিকে কালক্ষেপন অন্যদিকে দমনপীড়ন, সরকারের এই ন্যাক্কারজনক ভূমিকা সুন্দরবন রক্ষার আন্দোলনের ন্যায্যতা আরও জোরালোভাবে প্রমাণ করছে। যুক্তির জোরে, নৈতিক সাহসে এবং সুন্দরবন রক্ষা তথা দেশ রক্ষার দায়বোধ থেকে আন্দোলনের যে স্বতস্ফুর্ত জোয়ার তৈরি হয়েছে তাকে দমনপীড়ন, ভয়ভীতি এবং বিজ্ঞাপনী প্রচার দিয়ে থামানো যাবে না। আমরা সরকারের কাছে আবারও দাবী জানাই অবিলম্বে সারা দেশে আন্দোলনের উপর দমনপীড়ন বন্ধ করুন, দিলীপ রায়কে মুক্তি দিন, জনগণের পক্ষে দাঁড়ান- রামপাল চুক্তি বাতিল করুন-সুন্দরবনকে বাঁচতে দিন। কালক্ষেপন, মিথ্যা প্রচার এবং সুন্দরবন আন্দোলনের উপর ন্যাক্কারজনক হামলা করে নিজেদের মুখে আর চুনকালি লাগাবেন না।
প্রিয় সাংবাদিক বন্ধুগণ,

আশু কর্মসূচি

সরকার যদি সকল বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ এবং জনমত সর্বোপরি সুন্দরবন তথা বাংলাদেশের জীবনমরণ প্রশ্ন তুচ্ছ করে এই প্রকল্প নিয়ে অগ্রসর হতেই থাকে তাহলে জনগণের দিক থেকেও প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ কর্মসূচি শুধু অব্যাহত থাকবে না, তা আরও বিস্তৃত হবে। আগামী ২৪-২৬ নভেম্বর ‘চলো চলো ঢাকা চলো’ কর্মসূচি সামনে রেখে শারদীয় দুর্গাপূজা ও মুহাররমের পর থেকে বিভিন্ন বিভাগীয় প্রতিনিধি সভা শুরু হবে। এগুলোর সময়সূচি নিম্নরূপ-
১৩ অক্টোবর: বরিশাল, ১৪ অক্টোবর: সিলেট ও রংপুর, ১৯ অক্টোবর: চট্টগ্রাম ও রাজশাহী, ২১ অক্টোবর: ময়মনসিংহ, ২২ অক্টোবর: খুলনা। এছাড়া ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলা উপজেলায় সভা সমাবেশ ও পদযাত্রাসহ বিভিন্ন কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে।

আপনারা জানেন, গত ২৮ জুলাই বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশ্যে আমরা একটি খোলা চিঠি দিয়েছিলাম। এরপর দেশের ও ইউনেস্কোসহ স্বাধীন বিশেষজ্ঞদের আরও স্পষ্ট মত প্রকাশিত হয়েছে, এই বিদ্যুৎ কেন্দ্র বাতিলে জনমতের বিস্তার ঘটেছে। তারপরও সরকারের দিক থেকে কোন ইতিবাচক সাড়া পাওয়া যায়নি। এই প্রকল্পের প্রধান অংশীদার ভারত। সেকারণে ভারতের সরকারকে লক্ষ্য করে কর্মসুচি নেয়াও আমরা জরুরী মনে করছি। এর পেছনে প্রধানত দুটো কারণ। প্রথমত, এই প্রকল্পের মুখ্য ভূমিকা ভারতের রাষ্ট্রীয় বিদ্যুৎ প্রতিষ্ঠান এনটিসি, ভারতের রাষ্ট্রীয় নির্মাণ কোম্পানী ভেল, ভারতের রাষ্ট্রীয় ব্যাংক এক্সিম ব্যাংক, ভারতের কয়লা সরাবরাহকারী প্রতিষ্ঠান কোল ইন্ডিয়ার। রামপাল বিদ্যুৎ প্রকল্পে এসব প্রতিষ্ঠান লাভবান হবে সুন্দরবনের বিনিময়ে। দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশ অংশের সুন্দরবন আক্রান্ত হলে ভারতের দিকের সুন্দরবনও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। সুতরাং আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর পর এবারে বাংলাদেশের নাগরিকদের পক্ষ থেকে এই প্রকল্প বাতিলে উদ্যোগ নেবার জন্য ভারতের প্রধানমন্ত্রীকে ‘খোলা চিঠি’ দেবো। এজন্য আগামী ১৮ অক্টোবর মঙ্গলবার জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে সমবেত হয়ে আমরা মিছিল করে বাংলাদেশে ভারতীয় রাষ্টদূতের কাছে এই চিঠি হস্তান্তরের কর্মসূচি নিয়েছি।

সুন্দরবন রক্ষার আন্দোলন বাংলাদেশ ও ভারতের সজাগ মানুষের অংশগ্রহণে অবশ্যই জয়যুক্ত হবে।
ধন্যবাদ।
তেল-গ্যাস খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটি
মুক্তিভবন, ৬ অক্টোবর, ২০১৬।
ওয়েব: ncbd.org