Tuesday, August 16th, 2016

সত্য যেখানে মৃতঃ রামপাল কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র

সম্প্রতি রামপাল কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্রের চুক্তি স্বাক্ষরিত হবার প্রেক্ষিতে দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনা এবং বিতর্কের সুত্রপাত ঘটে। পরিবেশবিদ, সাধারন মানুষ এবং প্রকৌশলীরা যার যার অবস্থান থেকে স্পর্শকাতর সুন্দরবনের পাশে এই প্রকল্পের পক্ষে বিপক্ষে নিজেদের মতামত দিয়েছেন। সাধারনের দুশ্চিন্তায় যে প্রশ্নগুলি বেশী উঠে এসেছে সেগুলোই এই ধারাবাহিকতায় গত ১৭ জুলাই ২০১৬ দৈনিক প্রথম আলো পত্রিকার এক প্রবন্ধে প্রবাসী প্রকৌশলী আরশাদ মনসুরের ভাষ্যে উঠে আসে। ৬ আগস্ট ২০১৬ তারিখে বাংলাদেশ ইন্ডিয়া ফ্রেন্ডশিপ পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেড প্রকৌশলী আরশাদ মনসুরের করা দশটি প্রশ্নের জবাব দেয়। প্রকৌশলী আরশাদ মনসুরের প্রশ্ন এবং বাংলাদেশ ইন্ডিয়া ফ্রেন্ডশিপ পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেডের জবাবের প্রেক্ষিতে আমার কিছু বিশ্লেষণ তুলে ধরা জরুরী মনে হল। এই বিশ্লেষণের প্রয়োজনে প্রকৌশলী আরশাদ মনসুরের প্রশ্ন এবং পরবর্তি উত্তর থেকে এখানে কোট করা হবে।

প্রসঙ্গক্রমে বলে রাখা ভাল যে বড় ধরনের বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মানে প্রচলিত শক্তি যেমন তেল, গ্যাস, কয়লা, পারমাণবিক শক্তির কার্যকর বিকল্প নেই বলা হলেও প্রযুক্তিগত উৎকর্ষতার এই সময়ে বিকল্প শক্তি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের দক্ষতা এবং ব্যবহার প্রতিবছর লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়ে চলছে। যেমন সারা বিশ্বের সম্মিলিত পারমাণবিক বিদ্যুতের ব্যবহার গত কয়েকবছরে নবায়নযোগ্য শক্তির পেছনে পড়ে গেছে। নবায়নযোগ্য শক্তি যেমন সৌর, বায়ু, বর্জ্য, জিও থার্মাল, সমুদ্রের ঢেউ, জোয়ার ভাটা এবং জল বিদ্যুতের ব্যবহার এত দ্রুত গতিতে বেড়ে চলছে যে তা খুব শীঘ্রই সারা বিশ্বের সম্মিলিত জিবাশ্ম জ্বালানী থেকে উৎপাদিত বিদ্যুতের পরিমাণকে পিছনে ফেলে দিবে। বর্তমানে বিশ্বের মোট উৎপাদিত বিদ্যুতের ২৪ ভাগ আসে নবায়নযোগ্য শক্তি থেকে আর ১১ ভাগ পারমানবিক বিদ্যুৎ এবং ৬৫ ভাগ আসে জিবাশ্ম জ্বালানী থেকে।

জলবায়ু পরিবর্তন, পরিবেশ দূষণ এবং বৈশ্বিক উষ্ণতার ভয়াবহতা এরকম পর্যায়ে চলে এসেছে যে আমাদের এখন দূষণ এবং বৈশ্বিক উষ্ণতা বাড়ে এরকম পদক্ষেপ নেয়ার সুযোগ বা সময় কোনটিই নেই। ফলে কস্ট হলেও বেশিরভাগ দেশই বিকল্প জ্বালানী কিংবা শক্তির প্রতি নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। হয়তো এরকম দেখা গেছে যে বিকল্প জ্বালানী দিয়ে বিদ্যুতের চাহিদা মেটানো যাচ্ছেনা, সেক্ষেত্রে সেসব দেশের এনার্জি পলিসিতে এনার্জি এফিসিয়েন্সি, বিদ্যুৎ উৎপাদন, পরিবহন, বিতরন ব্যবস্থার লস কমানো, উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার, সহজলভ্য নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার এবং সবচেয়ে কম দূষণ করে (যেমনঃ প্রাকৃতিক গ্যাস) এরকম শক্তিকে প্রাধান্য দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থা নতুন করে ঢেলে সাজানো হচ্ছে। পাশাপাশি কার্যকর বিকল্প উদ্ভাবনের জন্য গবেষণা এবং শিক্ষায় ব্যাপক বিনিয়োগের মাধ্যমে প্রত্যেক দেশ তার নিজের জন্য উপযুক্ত সমাধান বের করছে। যার ফল দেখতে পাই উরুগুয়ে, পেরু, জার্মানি, সুইডেন, ডেনমার্কের মত দেশগুলোয়। একইসাথে উন্নত দেশগুলোর জিবাশ্ম জ্বালানী থেকে বের হবার সদিচ্ছার প্রমান সরুপ আমরা গত পাঁচ বছরে আমেরিকা, ইংল্যান্ড, জার্মানিতে অনেকগুলো কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ করে দেয়ার ঘটনা দেখেছি। শুধু আমেরিকাই ২০২৫ সালের মধ্যে ৪৬ হাজার মেগাওয়াট কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ করে দিচ্ছে এবং ইংল্যান্ড ঘোষণা দিয়েছে যে ২০২২ সালের মধ্যে তাদের বেশীরভাগ কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ করে দিবে। সেইমত প্রস্তুতিও তারা নিচ্ছেন।

যাইহোক, এরকম বৈশ্বিক বাস্তবতায় আমাদের দেশের রামপালে সুন্দরবনের কাছে যে কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র হচ্ছে তা পরিবেশ তথা সুন্দরবনের অস্তিত্বের জন্য হুমকি সরূপ। সুন্দরবনের অস্তিত্ব আবার সমগ্র দেশের প্রাকৃতিক পরিবেশ, খাদ্য উৎপাদন, পানি সরবরাহ ব্যবস্থা এবং অভ্যন্তরীণ আবহাওয়ার ভাল থাকার জন্য অপরিহার্য। এখন বিদ্যুৎ কেন্দ্র করা হলে বিভিন্ন প্রযুক্তির সাহায্য নিয়ে চেষ্টা করা হবে দূষণ সর্বনিন্ম মাত্রায় রাখার জন্য। কিন্তু প্রযুক্তির সীমাবদ্ধতার কারনে দূষণ সর্বনিন্ম করাটা সম্ভব কি অসম্ভব তার একটা তুলনামূলক চিত্র জানা থাকা ভাল। প্রকৌশলী আরশাদ মনসুরের প্রথম প্রশ্ন দিয়েই শুরু করা যাক। সহজ বোধগম্যতার জন্য এখানে কিছুকিছু জায়গায় নাইট্রোজেন অক্সাইডকে NOx, সালফার অক্সাইডকে SOx বলা হবে এবং পরবর্তি হিসাবগুলো রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রকে ১৩২০ মেগাওয়াট ক্ষমতার ধরেই করা করা হবে।

প্রশ্ন ১ – রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মানে নাইট্রোজেন অক্সাইড নিঃসরণের হার কমানোর লক্ষে এসসিআর (সিলেক্টিভ ক্যাটালিস্ট রিঅ্যাক্টর) বা এধরণের অন্য কোন প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে কিনা?
কোম্পানির উত্তরঃ সংক্ষেপে – –আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা হবে, বয়লারে উন্নত প্রযুক্তি সংযোজনের কারনে NOx নিঃসরণ অত্যন্ত কম (৫১০ এমজি/ এনএম ৩ মাত্রার হবে)। ষ্টয়কিয়োমেট্রিক এয়ার ফুয়েল ও সল্পমাত্রার কমবাসশন সীমিত NOx তৈরিতে ভুমিকা রাখবে।
বাস্তব অবস্থাঃ এখানে যে চারটি কথা বলা হয়েছে তা বাস্তবে একটি প্রযুক্তির বিভিন্ন বর্ননা। বিভিন্ন জায়গায় NOx এর দূষণ কমানোর জন্য অনেক ধরনের পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। ৬/৭ ধরনের পদ্ধতির একটি হল রিডিউসিং পিক টেম্পারেচার। পিক টেম্পারেচার কমানোর জন্য ১০/১১ রকমের প্রযুক্তি আছে। সবগুলোর মুল কথা হল ঠিক যে রেশিওতে (ষ্টয়কিয়োমেট্রিক রেশিও) রাসায়নিক বিক্রিয়া কিংবা জ্বলন হবার কথা তা কোনভাবে এড়িয়ে গেলে কম তাপমাত্রায় কমবাসশন হয়। তাতে NOx নিঃসরণ কমে যায়। কয়াল বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে নিঃসরিত NOx থেকে অ্যাজমা, ফুসফুস এবং শ্বাসতন্ত্রের জটিল রোগে হবার প্রমান পাওয়া গেছে। ফলে পৃথিবীর বহু দেশেই এই নিঃসরণ কমানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। এসসিআর (সিলেক্টিভ ক্যাটালিস্ট রিঅ্যাক্টর) বা উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার না করলে রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র বাতাসে প্রতিবছর ২৩ হাজার টন NOx নিঃসরণ করবে। আর উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করলে এই নিঃসরণের পরিমান হবে ৭ হাজার টন(সূত্র:১)। যা পরিমানে অনেকবেশী এবং এই ৭ হাজার টনও ভয়ানক পরিবেশ এবং স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি তৈরি করার জন্য যথেষ্ট।

প্রশ্ন ২ – রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রে কি এফজিডি (ফুয়েল-গ্যাস ডিসালফারাইজেশন) অথবা সালফার অক্সাইড নিঃসরণ কমানোর অন্য কোন প্রযুক্তি ব্যবহার করা হবে?
কোম্পানির উত্তরঃ সংক্ষেপে – হ্যাঁ, এফজিডি (ফুয়েল-গ্যাস ডিসালফারাইজেশন) এবং সালফার অক্সাইড নিঃসরণ কমানোর জন্য উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করা হবে, সালফারের পরিমান কম এরকম কয়লা ব্যবহার করা হবে, জাপানি আধুনিক প্রযুক্তির ফ্লু গ্যাস ডিসালফারাইজেশন সিস্টেম ব্যাবহার করা হবে, ওয়েট লাইমস্টোন, ফোর্সড অক্সিডেশন ব্যবহার করা হবে, ডাবল ফ্লো কন্ট্যাক্ট স্ক্র্যাবার টাইপ এফজিডি ব্যবহার করা হবে, যার কার্যকারিতা ৯৬ শতাংশের বেশী, অত্যন্ত বিশুদ্ধ চুনাপাথর ব্যবহার করা হবে।
বাস্তব অবস্থাঃ সালফার ডাই অক্সাইড ফুসফুসের ভয়ানক ক্ষতি করে, এসিড বৃষ্টি হয়ে ফসল নষ্ট হয়, বন ধ্বংস হয়, মাটি, পানি বিষাক্ত করে তোলে, জলাভুমির মাছ মরে যায়। একারনে কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্রে খুবই সাবধানতার সাথে সালফার নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করা হয় দুইভাবে। প্রথমতঃ সালফারের পরিমান কম এরকম কয়লা ব্যবহার করা হয়। দ্বিতীয়তঃ ফ্লু গ্যাস ডিসালফারাইজেশন বা স্ক্র্যাবিং করা হয়। স্ক্র্যাবিং এর ৫/৬ রকমের পদ্ধতি থাকলেও সবগুলোর মুল কাজ একটাই। সালফার স্ক্র্যাব করা। সবচেয়ে উন্নত প্রযুক্তির ফ্লু গ্যাস ডিসালফারাইজেশন হল ওয়েট লাইমস্টোন ফোর্সড অক্সিডেশন। যেখানে স্ক্র্যাব করার জন্য খুবই উন্নত মানের চুনাপাথর ব্যবহার করা হয়। রামপালে সম্পূর্ণ এফজিডি ব্যবস্থাটি স্থাপন করতে আড়াই থেকে তিন বছর এবং কিলোওয়াট প্রতি ৩০০ থেকে ৫০০ ডলার বাড়তি খরচ হবে (সূত্র:২)। অর্থাৎ পুরো বিদ্যুৎকেন্দ্রে ৬৬ কোটি ডলার বা ৫ হাজার কোটি টাকার বেশী খরচ হবে। এফজিডি বা স্ক্র্যাবার ব্যবহার না করা হলে এই বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে বছরে ৩১ হাজার টনের বেশী সালফার ডাই অক্সাইড নির্গত হবে। আর উন্নত প্রযুক্তির সংযোজনে সালফার নির্গমনের পরিমান হবে বছরে ১৫ হাজার ৪০০ টন। এই বিষ এক টনও পরিবেশ, মানুষ, জীব-জন্তু, মাছ বন, ফসলের জন্য ভয়ঙ্কর পরিনতি নিয়ে আসতে পারে।

প্রশ্ন ৩ – রামপাল প্রকল্পে মানুষের চুলের ১০০ ভাগের এক ভাগেরও কম প্রস্থের পার্টিকুলেট ম্যাটার্স (যা মানুষের ফুসফুসের স্বাভাবিক সুরক্ষা ভেঙ্গে ফেলে) মাত্রা কমানোর জন্য কি ব্যাগহাউস বা ইএসপি (ইলেক্ট্রো স্ট্যাটিক প্রিসিপিট্যাটর) বা অন্য কোন যথাযথ প্রযুক্তি ব্যবহার করা হবে?
কোম্পানির উত্তরঃ সংক্ষেপে – হ্যাঁ, অত্যন্ত দক্ষতা সম্পন্ন ও পরীক্ষিত প্রযুক্তির ইএসপি ব্যবহার করা হবে।
বাস্তব অবস্থাঃ ফ্লাই অ্যাশ বা সুট বা পার্টিকুলেট ম্যাটার মানুষ সহ বিভিন্ন প্রাণীর ব্রংকাইটিস, অ্যাজমা এবং অপ্রাপ্ত বয়সে মৃত্যুর জন্য দায়ী। কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্রে ফ্লাই অ্যাশ নিয়ন্ত্রণ করার জন্য ইএসপি এবং বাগহাউস দুটিই ব্যবহার করা হয়ে থাকে। ইএসপিতে বৈদ্যুতিক ক্ষেত্রের মধ্যে বৈদ্যুতিক চার্জ বা আধানকে ব্যবহার করে ফ্লাই অ্যাশের বিভিন্ন পার্টিক্যাল আলাদা করা হয়। আর বাগহাউসে কাপড় বা ওরকম সুক্ষ বস্তুর সাহায্যে তরি করা হয়। দুটিই মোটামুটি কার্যকর। প্রথমে বাগহাউসের ভেতর দিয়ে ফ্লাই অ্যাশকে প্রবাহিত করে ইএসপিতে দেয়া হয়। এই দুই প্রক্রিয়ায় বেশীরভাগ পার্টিকুলেট ম্যাটার শোষণ করে নেয়া যায়। কিন্তু সালফার দূষণ কমানোর জন্য যদি উন্নতমানের (লো সালফার কোল) কয়লা ব্যবহার করা হয়, তাহলে প্রজ্বলনের পর এত ক্ষুদ্র কনা তৈরি হয় যে ইএসপি এবং বাগহাউসের কার্যকারিতা কমে যায়(সূত্র:৩)।

প্রশ্ন ৪ – রামপাল প্রকল্পে কি স্নায়বিক রোগের জন্য দায়ী মারকারী রিমুভাল (পারদ দূরীকরণ) প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে?
কোম্পানির উত্তরঃ হ্যাঁ, এই প্রযুক্তি ব্যবহার করা হবে। এফজিডির সঙ্গে ওয়েট লাইম স্টোন প্রযুক্তি এবং বটম অ্যাশ, ফ্লাই অ্যাশ সংগ্রহের মাধ্যমে পারদ নিয়ন্ত্রণ করা হবে।
বাস্তব অবস্থাঃ কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্রের নিঃসরিত পারদ শারীরিক ও বুদ্ধি প্রতিবন্ধি শিশুর জন্ম দেয়, স্নায়বিক রোগ, মানুষ সহ বিভিন্ন প্রাণীর প্রজনন ক্ষমতা হ্রাস করে এবং স্বাভাবিকভাবে জন্মানো শিশুদের মেধা বিকাশে বাধা দেয়। এক টেবিল চামচের ৭০ ভাগের একভাগ পারদ ২৫ একর আয়তনের একটি জলাশয়য়ের সমস্ত মাছকে বিষাক্ত করে তোলার জন্য যথেষ্ট। শুরুতে কয়লা পানিতে ধোয়ার ফলে বেশ খানিকটা পারদ দূর হয়। তারপরের স্তরে পারদ নিঃসরণ নিয়ন্ত্রণের জন্য এফজিডি এবং বাগহাউস দুটি প্রযুক্তিই ব্যবহার করা হয়। সব প্রযুক্তি মিলে রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে বছরে উৎপাদিত ৬৫২ কেজি পারদের ৯০ ভাগ অপসারন করা সম্ভব। কিন্তু অবশিষ্ট ৬৫ কেজি পারদ বাতাসের সাথে মিশে গিয়ে ৭৫ লক্ষ ৮৩ হাজার একরের সমান জমিকে বিষাক্ত করতে সক্ষম (সূত্র:৪)।

প্রশ্ন ৫ – রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রে কি পানি পরিশোধন প্রযুক্তির মাধ্যমে দুষিত তরল নির্গমন কমানো হবে?… পানি যথাযথভাবে পরিশোধন করে ছাড়া না হলে সুন্দরবনের মত বাস্তুতান্ত্রিকভাবে সংবেদনশীল একটি এলাকা মারাত্বকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

প্রশ্ন ৮ – রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রে কি পার্শ্ববর্তী সামুদ্রিক প্রাণীর উপর তাপীয় প্রভাব কমানোর প্রযুক্তি ব্যবহার করা হবে?
কোম্পানির উত্তরঃ ৫ – সংক্ষেপে – হ্যাঁ, অত্যাধুনিক পানি পরিশোধন প্রযুক্তির মাধ্যমে দুষিত তরল নির্গমন কমানো হবে। আধুনিক ও বহুস্তরিক পরিশোধন প্ল্যান্টের ব্যবস্থা করা হবে। বেশীরভাগ পানিই কুলিং ওয়াটার রিসার্কুলেশান ব্যবস্থার ব্লো ডাউনের পানি, পশুর নদে নির্গত করার আগে সেন্ট্রাল ইফ্লুয়েন্ট মনিটরিঙের মাধ্যমে পিএইচ পর্যবেক্ষন ও পরিশোধন করা হবে।
কোম্পানির উত্তরঃ ৮ – সংক্ষেপে- হ্যাঁ রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রে পার্শ্ববর্তী সামুদ্রিক প্রাণীর উপর তাপীয় প্রভাব কমানোর প্রযুক্তি ব্যবহার করা হবে, এ বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রয়োজনে পশুর নদের শুকনো মৌসুমের পানি প্রবাহের অতি সামান্য পরিমান (০.০৫ শতাংশ) ব্যবহার করা হবে এবং ব্যবহারের পর অবশিষ্ট নগণ্য পানি পরিশোধন করে পশুর নদের পানির তাপমাত্রার সঙ্গে সমন্বয় করে ছাড়া হবে।… আইএফসির কঠোর নিয়ম অনুযায়ী পানির তাপমাত্রা ২ ডিগ্রী সেন্টিগ্রেডের চেয়ে বেশী হবেনা।
বাস্তব অবস্থাঃ ৫ ও ৮ নং প্রশ্ন পরস্পর সম্পর্কিত। একারনে একত্রে বিশ্লেষণ করা হল। কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্রে পানি ব্যবহারের জন্য উত্তোলন এবং নির্গমনের পরিমান নির্ভর করে প্রধানত কি ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে তার উপর। সাধারনত কয়লা বিদ্যুৎ ৩৩% যান্ত্রিক দক্ষতায় চলে। তবে ইদানিংকালে পালভারাইজড কোল সুপার ক্রিটিক্যাল টেকনোলজি ব্যবহার করে ৪৫% পর্যন্ত যান্ত্রিক দক্ষতা পাওয়া যায়। যান্ত্রিক দক্ষতা যত কম হবে, বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য কয়লার প্রয়োজন তত বেশী, কার্বনডাইঅক্সাইড সহ সকল দূষণের পরিমান সেই মাত্রায় বেড়ে যায়। স্টিম তৈরি, কুলিং সিস্টেমে পানির উত্তোলন বেশী কিন্তু খরচও কম। ফলে বেশীরভাগ পানি আবার উৎসে ফেরত যায়। আবার উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করলে পানির উত্তোলন অনেক কম কিন্তু খরচ আগের তুলনায় বেশী। ক্লোজড লুপ স্টিম সাইকেল হলে স্টিম লস খুবই কম হবে। তার বাইরে স্টিম কন্ডেনসেশান, কয়লা ধোয়া, এমিশন কন্ট্রোল, স্লারি তৈরি করার জন্য ফ্লু গ্যাস ডিসালফারাইজেশনে চুনাপাথরের সাথে, ফ্লাই অ্যাশ, ডাস্ট কন্ট্রোলে পানি ব্যবহার করা হয়। স্টিম কনডেনসেশানের জন্য ক্লোজড সাইকেল কুলিং ওয়াটার সিস্টেম ব্যবহার করা হলে ঠান্ডা পানির মধ্য দিয়ে টারবাইন পার হওয়া স্টিমকে পাইপের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত করা হবে। এতে কিছু পানি বাষ্প হয়ে উড়ে যাবে এবং এই প্রক্রিয়া কয়কবার (দুইবার) চালানোর পর ঠান্ডা করনের জন্য যে পানি নেয়া হয়েছিল তা গরম হয়ে যাবে। বাষ্প হয়ে উড়ে এবং গরম হয়ে যাওয়া এই দুইয়ের কারনে পানি বদলাতে হবে। এই গরম পানি পশুর নদে ছেড়ে দিয়ে আবার ঠান্ডা পানি তুলে কনডেনসার হিসেবে ব্যবহার করা হবে। এই প্রক্রিয়ায় যে পরিমান পানিই উত্তোলন করা হোকনা কেন, এই বিদ্যুৎকেন্দ্রে কিলোওয়াট প্রতি ১.৫ লিটার অর্থাৎ দিন শেষে ৪ কোটি ৭৫ লাখ লিটার পানি বাষ্প হয়ে উড়ে যাবে(সূত্র:৫)। তার সাথে যখন পশুর নদ থেকে পানি উত্তোলন করা হচ্ছে তখন পানির সাথে কোটি কোটি মাছের ডিম, পোনা, ছোট মাছ চলে আসবে এবং মারা যাবে। শেষে যখন গরম পানি ছেড়ে দেয়া হবে এবং তা যদি ২ ডিগ্রী সেন্টিগ্রেডও বেশী হয়, তা ওই এলাকায় পশুর নদের পানিতে অক্সিজেনের পরিমান কমিয়ে দিবে, মাছের প্রজনন ব্যাপকভাবে বাধাগ্রস্থ করবে(সূত্র:৬)। যার প্রভাবে ওই এলাকায় সমগ্র বাস্তুসংস্থানকেই হুমকির মুখে পড়ে যাবে। আবার শুরুতেই কয়লা ধোয়ার কারনে ৩৩ থেকে ৩৫ ভাগ পারদ কয়লা থেকে চলে যাবে। পরিশোধন করা না হলে বছর শেষে ২২৮ কেজি পারদ এই কয়লা ধোয়া পানির সাথেই পরিবেশে চলে আসবে।

প্রশ্ন ৬- রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রে কি কয়লা থেকে উৎপন্ন ছাই শুকনো অবস্থায় ফেলার প্রযুক্তি ব্যবহার করা হবে?
কোম্পানির উত্তরঃ রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রে কয়লা থেকে উৎপন্ন ১০০ শতাংশ বটম ও ফ্লাই অ্যাশ উভয়ই শুকনো অবস্থায় সংগ্রহ করার প্রযুক্তি ব্যবহার করা হবে। এই ছাই কেনার জন্য সিমেন্ট কোম্পানিরা আগ্রহ প্রকাশ করেছে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের চাহিদা রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের মোট উৎপাদিত ছাইয়ের পরিমানের চেয়ে বেশী। কোন ব্যতিক্রমী কারনে শতভাগ ছাই কোন নির্দিষ্ট সময়ে বিক্রি করা সম্ভব না হলে উন্নত প্রযুক্তি যেমনঃ হাই কনসেন্ট্রেশন স্লারি ডিসপোজাল (এইচসিএসডি) সিস্টেমের মাধ্যমে সংরক্ষন করা হবে। এই অত্যাধুনিক প্রযুক্তির বৈশিষ্ট হল, আনুমানিক দুই দিনের মধ্যে অ্যাশ স্লারি অ্যাশ স্টোনে পরিনত করে। ফলে নিকটবর্তি জলাধারে ছাই মিশ্রনের সুযোগ নেই।
বাস্তব অবস্থাঃ কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্রে কয়লা প্রজ্বলনের পর কয়েক রকমের ছাই তৈরি হয়। ফ্লাই অ্যাশ, বটম অ্যাশ, বয়লার স্লারি, ফ্লু গ্যাস ডিসালফারাইজেশন ম্যাটেরিয়াল। এসব ছাইয়ের মধ্যে থাকে সিসা, তামা, আর্সেনিক, পারদ, নিকেল, থ্যালিয়াম, ক্রোমিয়াম, ক্যাডমিয়াম, বেরিয়াম ইত্যাদি। এগুলো সবই পরিবেশ এবং মানব স্বাস্থ্যের জন্য উচ্চমাত্রার বিষ এবং তেজস্ক্রিয় পদার্থ। কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্রে ছাই সংগ্রহ করা হয় দুইভাবে। লিন কনসেনট্রেশন স্লারি ডিসপোজাল বা এনসিএসডি (পানি ও জায়গা বেশী লাগে) এবং হাই কনসেনট্রেশন স্লারি ডিসপোজাল বা এইচসিএসডি (পানি ও যায়গা কম লাগে)। স্লারি ডিসপোজাল সাইট থেকে বন্যা, বৃষ্টি, জলোচ্ছ্বাস, ভূমিকম্পের কারনে আশেপাশের লোকালয়, বন, নদীতে ছড়িয়ে পড়া, অ্যাশ পন্ডের মাটির নিচ দিয়ে ভূগর্ভস্থ পানির সাথে মিশে যাওয়া এরকম বহু ঘটনা পৃথিবীর প্রায় সব কয়লা বিদ্যুৎ ব্যবহারকারী দেশে ঘটেছে। ফল হয়েছে পরিবেশ প্রকৃতি, বন, লোকালয়, নদী, পুকুরের বাস্তু সংস্থান সম্পূর্ন ধ্বংস হওয়া।স্লারির মধ্যে এতগুলি বিষাক্ত পদার্থ এরকম জটিল মিশ্রনের মধ্যে থাকে যে একে অনেকটা তরল বোমার সাথে তুলনা করা যায়। কয়েকবছর আগে পর্যন্ত স্লারি ম্যানেজম্যান্টের জন্য এনসিএসডি পদ্ধতি ব্যবহার করা হত। এতে সংগৃহীত ছাইকে পানির সাথে মিশিয়ে প্ল্যান্ট থেকে দুরবর্তি একটি পুকুরে জমা করা হত। এখনো বহু জায়গায় এনসিএসডি পদ্ধতিই চলছে। সেই হিসেবে এইচসিএসডি তুলনামূলক আধুনিক। এতে ৬০ ভাগ ফ্লাই ও বটম অ্যাশের সঠিক অনুপাতকে ৪০ ভাগ পানির সাথে ভালভাবে মিশিয়ে পাম্পের সাহায্যে ডিসপোজাল সাইটে পাঠানো হয়। ভিন্ন অনুপাতে মেশানোর ফলে পুরো মিশ্রণটির ঘনত্ব কিছুটা বেড়ে গিয়ে আগের চেয়ে কিছুটা শক্ত আকার ধারন করে। একারনে সহজে মাটির ভেতর দিয়ে চুইয়ে কিংবা আগের মত ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা কিছুটা কমে যায়। তার অর্থ এই না যে নতুন এই প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে এই মিশ্র বোমার পরিবেশগত বিপদের মাত্রা কিছুটাও কমেছে। বরং এই মিশ্রনে আগের চেয়ে বিষের ঘনত্ব এবং বড় ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগে তা থেকে বিপদের আশংকা বেড়েছেই বলা চলে। হয়তো আমরা এখনো ভয়ঙ্করতম প্রাকৃতিক দুর্যোগটি দেখিইনি। তবে কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ছাই বিভিন্ন কাজে ব্যবহার করা যায়। পর্যাপ্ত ব্যবহার উপযোগিতা বের করা গেলে এই স্লারি রিসাইকেল করা সম্ভব। পরিবেশ দূষণের ভয়ঙ্কর ঝুঁকির কারনে নেদারল্যান্ড, জার্মানিতে কোন ধরনের স্লারি ল্যান্ডফিল করা নিষেধ এবং তারা প্রায় ১০০ ভাগ স্লারি সিমেন্ট কারখানা, রাস্তা তৈরি সহ কোন না কোন কাজে লাগিয়ে ফেলে। ইংল্যান্ডে স্লারি দিয়ে সিমেন্ট ব্লক তৈরি করা হয়। যেসব দেশে সিমেন্ট ব্লক জনপ্রিয় নয় সেসব জায়গায় কংক্রিট তৈরির কাজে স্লারি ব্যবহার করা হয়। আমাদের দেশ ছোট। মোট বাজার চাহিদাও কম। ফলে এখানে সিমেন্ট কোম্পানিদের চাহিদার কথা যা বলা হয়েছে, বাস্তবে বিষয়টা সেরকম নয়। পরিবেশবান্ধবতার নিরিখে আমাদের দেশের অনেক সিমেন্ট ফ্যাক্টরিই ফ্লাই অ্যাশ ব্যবহার করেনা। যারা করে তাদের সম্মিলিত চাহিদাও রামপালের উৎপাদিত ছাইয়ের পরিমানের চেয়ে অনেক কম।

প্রশ্ন ৭ – রামপাল প্রকল্পে কি কার্যকর অনলাইন মনিটরিং ব্যবস্থা থাকবে?
কোম্পানির উত্তরঃ হ্যাঁ, রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রে অত্যাধুনিক অনলাইন মনিটরিং ব্যবস্থা থাকবে। এ প্রকল্পে ফ্লু গ্যাস টেম্পারেচার, নাইট্রাস অক্সাইড, সালফার অক্সাইড, অক্সিজেন, কার্বন ডাই অক্সাইড, কার্বন মনোক্সাইড পর্যবেক্ষণের জন্য কন্টিনিউয়াস এমিশন মনিটরিং সিস্টেমের (সিইএমএস) ব্যবস্থা করা হবে। এর মাধ্যমে প্রকৃত সময়ে সিইএমএস পদ্ধতিতে বয়লারের প্রকৃত চলমান অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে পরজবেক্ষন ও বিদ্যুৎকেন্দ্রের বায়ু নিঃসরণজনিত তথ্য চিহ্নিত ও বিশ্লেষণ করা হবে। বিদ্যুৎকেন্দ্রের আশেপাশের এলাকার বায়ুর মান পর্যবেক্ষনের জন্য এমবিয়েন্ট এয়ার কোয়ালিটি মনিটরিং সিস্টেমের (এএকিউএমএস) ব্যবস্থা করা হবে।
বাস্তব অবস্থাঃ যত ধরনের শিল্পে ফ্লু গ্যাস, নাইট্রাস অক্সাইড, সালফার অক্সাইড, অক্সিজেন, কার্বন ডাই অক্সাইড, কার্বন মনোক্সাইড, হাইড্রোজেন ক্লোরাইড, এয়ারবর্ন পার্টিকুলেট ম্যাটার, পারদ নিঃসরণ হয়, তার সবগুলোতে সিইএমএস এবং এএকিউএমএস ব্যবহার করা হয়। যেহেতু কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্রে দূষণের সম্ভাবনা এবং পরিমান পৃথিবীর সকল শিল্প কলকারখানার চেয়ে বেশী তাই এখানে সিইএমএস ও এএকিউএমএস রাখা বাধ্যতামূলক।

প্রশ্ন ৯ – এই প্রকল্পে কি স্থানীয় প্রতিবেশের ওপর কয়লা আনা-নেওয়া ও ব্যবহারের প্রভাব কমানোর ব্যবস্থা করা হবে?
কোম্পানির উত্তরঃ হ্যাঁ, এটা করা হবে। কয়লা আমদানির বন্দর থেকে সমুদ্র পথে বৃহৎ আকারের জাহাজে সম্পূর্ণ আবৃত অবস্থায় কয়লা পরিবহন করা হবে এবং আবহাওয়া ও নদীর গভীরতা বিবেচনা করে উপযুক্ত স্থানে অপেক্ষাকৃত ছোট জাহাজে কয়লা স্থানান্তর করে মোংলা বন্দর কতৃপক্ষের নির্ধারিত নদীপথে বিদ্যুৎকেন্দ্রে পরিবহন করা হবে। এ জাহাজ থেকে কোন পদার্থ নিঃসৃত হবেনা, সালফার অক্সাইড নিয়ন্ত্রিত থাকবে, শব্দদূষণ কম হবে। এ ছাড়া কয়লা পরিবহনের ক্ষেত্রে সবরকম জাহাজ চলাচলে নির্ধারিত আইএমও কনভেনশন অনুসৃত হবে এবং সম্পূর্ণ আবৃত অবস্থায় সংরক্ষণ করা হবে।
বাস্তব অবস্থাঃ অন্য সব দূষণের সরাসরি প্রতিক্রিয়া ছয় আট মাস পর থেকে দেখা গেলেও, এই নয় নম্বর প্রশ্নে কোম্পানির যে পরিকল্পনা তার ফলে সুন্দরবন বিদ্যুৎকেন্দ্র তৈরি হবার সময় থেকেই ধ্বংসের ঝুঁকির মধ্যে পড়ে যায়। কারন কয়লা পরিবহনের যে রুট ঠিক করা হয়েছে তা সুন্দরবনের পেটের ভেতর দিয়ে পশুর নদী পার হয়ে বিদ্যুৎকেন্দ্র সাইট পর্যন্ত। বনের ভেতর দিয়ে লক্ষ লক্ষ টন কয়লা আলো না জ্বালিয়ে, নিঃশব্দে নেয়া অসম্ভব। এইসব জাহাজ চলাচলের কারনে এখানে যে শব্দ দূষণ, আলোক দূষণ, দুর্ঘটনা না ঘটলেও জাহাজ থেকে ছিটেফোটা তেল গড়িয়ে পড়া, জাহাজ চলাচলের জন্য নদীপথকে নিয়মিত ড্রেজিং করে জলজ পরিবেশ ধ্বংস করা নিয়মিত কাজের অংশ হবে। যা বনের স্বাভাবিক পরিবেশ সম্পূর্ণ নষ্ট করে দিবে। তাছাড়া যদি কোন একটি দুর্ঘটনা ঘটেই যায়, যা ইতিমধ্যে দুই তিনবার হয়েছে, তাহলে হাতে ধরে সুন্দরবনকে ধ্বংস করা হবে। কারন এই পথে আছে ডলফিনের অভয়াশ্রম। সুন্দরবন পৃথিবীর সবচেয়ে বড় প্রাকৃতিক আঁতুড়ঘর। এখানে বিরল প্রজাতির ইরাবতী, গাঙ্গেয়, হাম্পবাক, বটলনোজ, স্পটার ডলফিনের বাস। আরো আছে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় লোনা পানির কুমির, অত্যন্ত বিরল বাটাগুড় বক্সা কাছিম, বহু ধরনের সাপ, হরিন, বানর, আমাদের গর্ব রয়েল বেঙ্গল টাইগার, এশিয়ার সবচেয়ে বড় বুনো মৌমাছি, ১৬০০ র বেশী প্রজাতির বৃক্ষ, ২৪৮ প্রজাতির পাখি, ১২০ প্রজাতির মাছ। যে বিষয়গুলি হবেনা বা দুর্ঘটনা হবেনা বলে আশ্বাস দেয়া হচ্ছে, সেসব ব্যাপারে পৃথিবীর কেউ গ্যারান্টি দিতে পারেনা। দুর্ঘটনা যেকোন সময় যেকোনভাবে হয়ে যেতে পারে।

প্রশ্ন ১০ – রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের জন্য কি এর পুর্ণাঙ্গ পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন (এনভায়রনমেন্টাল ইমপ্যাক্ট অ্যাসেসম্যান্ট – ইআইএ) করে তা জনগনের সামনে হাজির করা হয়েছে?
কোম্পানির জবাবঃ হ্যাঁ, প্রকল্পের পুর্ণাঙ্গ পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন (এনভায়রনমেন্টাল ইমপ্যাক্ট অ্যাসেসম্যান্ট – ইআইএ) করে তা জনগনের সামনে হাজির করা হয়েছে। ২০১৩ সালের ৫ আগস্ট পরিবেশ অধিদপ্তর পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন প্রতিবেদনে অনুমোদন দেয়। যা বিআইএফপিসিএলের ওয়েবসাইটে জনগনের জন্য উম্মুক্ত করে রাখা আছে। ……………
বাস্তব অবস্থাঃ হ্যাঁ, এই প্রকল্পের জন্য ৬৩টি পরিবেশ সমীক্ষা করার কথা থাকলেও একটি করা হয়েছে। সেই একটির মধ্যে বর্ণিত ফ্যাক্ট এবং ঝুঁকির কথা বিবেচনায় আনলেও রামপালে কোন বিদ্যুৎকেন্দ্র হতে পারেনা। যার প্রমান পাওয়া যায় পরিবেশ অধিদপ্তরের প্রকল্পটি কয়েকবার বাতিলের ঘটনায়।

তথ্যসূত্র:

১। https://www3.epa.gov/ttncatc1/dir1/fnoxdoc.pdf

২। Control Technologies to Reduce Conventional and Hazardous Air Pollutants from Coal-Fired Power Plants, March 31, 2011, NESCAUM Report

৩। STAPPA-ALAPCO. “Controlling Fine Particulate Matter under the Clean Air Act: A Menu of Options.” March 2006, http://www.4cleanair.org/PM25Menu-Final.pdf

৪। https://www.purdue.edu/discoverypark/energy/assets/pdfs/cctr/outreach/Basics2-Mercury-Mar07.pdf

৫। http://www.nrel.gov/docs/fy04osti/33905.pdf

৬। Goel, P.K. (2006). Water Pollution – Causes, Effects and Control. New Delhi: New Age International. ISBN 978-81-224-1839-2.