Saturday, February 14th, 2009

বড়পুকুরিয়া ঘোষণা

বড়পুকুরিয়া কয়লা খনি
১৯৮৫ সালের এপ্রিল মাসে বাংলাদেশ জিওলজিক্যাল সার্ভে বড়পুকুরিয়া কয়লা খনি আবিষ্কার করে। ১৯৮৬-৮৭ সাল জুড়ে এই সংস্থা অঞ্চলে আরও কারিগরি অনুসন্ধান সফলভাবে সম্পন্ন করে। ৬.৬৮ বর্গ কিলোমিটার জুড়ে, ১১৮ থেকে ৫০৯ মিটার গভীরে, অতিউন্নত মানের ৩৯ কোটি টন কয়লা এবং অন্যান্য খনিজসম্পদের মজুত নিশ্চিত করা হয়। পরে পেট্রোবাংলার উদ্যোগে ব্রিটিশ কনসালট্যান্ট ফার্ম ওয়ার্ডেল আর্মস্ট্রং অধিকতর অনুসন্ধান করে ১৯৯১ সালে তাদের রিপোর্ট জমা দেয়। খনন পদ্ধতি সম্পর্কেও তাদের সুপারিশ ছিল, তারা মাটির গঠন, কয়লার গভীরতা ও পানির স্তর বিবেচনা করে বাংলাদেশে উন্মুক্ত খনন পদ্ধতি সম্পূর্ণ অনুপযোগী বলে জানিয়েছেন,  মাল্টিস্লাইস লংওয়াল পদ্ধতি অনুসরণই ছিল তাদের সুপারিশ।

একনেক এই প্রকল্প অনুমোদন করে ১৯৯২ সালের ১১ মার্চ। চীনা কোম্পানি সিএমসির সঙ্গে ১৯৯৪ সালে চুক্তি স্বাক্ষরের পর তারা কাজ শুরু করে ১৯৯৬ সালের ১ জুন। ২০০১ সালের মধ্যে এর কাজ শেষ হবার কথা থাকলেও কয়লা উত্তোলন পূর্ণমাত্রায় শুরু হয় ২০০৫ সালের ১৪ ডিসেম্বর। প্রাথমিক খরচ হিসাব করা হয়েছিল ৮৮৭ কোটি টাকা, কিন্তু খনির কাজ শুরু হতে হতে এই খরচ অনেক বৃদ্ধি পায়। ২০০৪ সালে একনেক ব্যয় অনুমোদেন করে ১৪৩১ কোটি টাকা। গত ৫ বছরে এটি প্রায ৩০ লাখ টন কয়লা উত্তোলন করেছে। গত অর্থবছরে প্রতিটন কয়লা উত্তোলনের খরচ ৬০.২৩ মার্কিন ডলার। পিডিবির কাছে তা বিক্রি হয়েছে ৮৫.৫ মার্কিন ডলার। ২০০৯-১০ অর্থবছরে কোম্পানি লাভ করে ১০০ কোটি টাকা।

খনি থেকে প্রতিবছর ১০ লাখ টন উত্তোলন করে তার শতকরা ৬৫ ভাগ ব্যবহারের মাধ্যমে ২৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব। কিন্তু ২৫০ মেগাওয়াটের বিদ্যুৎ প্লান্ট নির্মাণ করলেও বেশিরভাগ সময় তার বৃহদাংশ অচল থাকায় প্রায়ই কয়লা উদ্বৃত্ত হয়। বিদ্যুৎ সংকট থাকা অবস্থায় এই প্লান্টগুলো কার্যকর না রাখায় এই কয়লা রফতানিতেও উদ্যোগ নিয়েছিল পেট্রোবাংলা। চীনা কোম্পানির সঙ্গে বড়পুকুরিয়া চুক্তির মেয়াদ শেষ হবে ২০১১ সালের আগষ্ট মাসে। সরকার জাতীয় সংস্থা গঠন করে জাতীয় স্বার্থ রক্ষার উদ্যোগ নিলে আরও দক্ষতার সঙ্গে নিরাপদে আরও বেশি কয়লা উত্তোলন সম্ভব। সরকার এইপথে না গিয়ে ৬৪৬ একর জমি অধিগ্রহণ করে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে খনি পরিচালনার চেষ্টা করছে। এখানে সফল হলে তারা অন্যত্র সর্বনাশা উদ্যোগ নেবে।  ইতিমধ্যে জোরপূর্বক ভূমি অধিগ্রহণের বিরোধিতা করবার কারণে দ্রুত বিচার আইনে মামলাসহ এলাকায় ত্রাস সৃষ্টি করা হচ্ছে।
গত কিছুদিন ধরে বড়পুকুরিয়া অঞ্চলে সরকারী তৎপরতায় আমরা উদ্বিগ্ন। এই তৎপরতা যে শুধু বড়পুকুরিয়া অঞ্চলের মানুষের জন্য বিপজ্জনক তাই নয়, তা বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তা, জ্বালানী নিরাপত্তা ও পানি সম্পদের জন্যও হুমকিস্বরূপ। পুলিশ নিয়ে জরীপ, মামলা হামলাসহ এলাকায় সংঘাত সৃষ্টি, ক্ষতিপূরণ বন্ধ করে প্রতারণামূলক বিভিন্ন প্রচারণা, ভূমি অধিগ্রহণের তোড়জোড়, কয়লা নীতি চূড়ান্ত হবার আগেই উন্মুক্ত খনির সপক্ষে এলাকায় ভূমি প্রতিমন্ত্রীর অব্যাহত প্রচারণা এবং এলাকাবাসীকে হুমকি প্রদান, ফুলবাড়ী থেকে বিতাড়িত এশিয়া এনার্জির (জিসিএম) পক্ষ থেকে বড়পুকুরিয়ায় উন্মুক্ত খনি করবার নতুন প্রস্তাব ও অপতৎপরতা, বিদেশি কোম্পানির আতিথ্যে জার্মানী সফরের পর সংসদীয় দলের উন্মুক্ত খনির পক্ষে তদ্বির ইত্যাদি এসব তৎপরতার অংশ।

সংসদীয় কমিটির তৎপরতা
এক মাসের মধ্যে দ্বিতীয়বারের মত বড়পুকুরিয়া ও ফুলবাড়ীতে উন্মুক্ত কয়লা খনি করার পক্ষে জ্বালানি বিষয়ক সংসদীয় কমিটির সুপারিশ সংবাদপত্রের মাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। গত ৫ ফেব্রুয়ারি এইমর্মে সংবাদপত্রে খবর প্রকাশিত হয় যে, জ্বালানী বিষয়ক সংসদীয় কমিটির একটি প্রতিনিধিদল জার্মানির উন্মুক্ত পদ্ধতির কয়লাখনি পরিদর্শন করে এসে অন্তত দুটি ক্ষেত্রে এই পদ্ধতিতে কয়লা তোলার সুপারিশ করে ২৫ জানুয়ারি তাদের প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। এই ‘প্রতিনিধিদলে মন্ত্রণালয়ের পাঁচ কর্মকর্তাও ছিলেন’। তাঁদের প্রতিবেদনের সুপারিশে ‘বড়পুকুরিয়া ও ফুলবাড়ীতে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলন’ এর বিষয়ে ‘সরকারকে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরামর্শ’ দিয়েছেন  (প্রথম আলো, ৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১১)।

গত ৩০ ডিসেম্বর ২০১০ এ অনুষ্ঠিত সাংবাদিক সম্মেলনে আমরা আপনাদের জানিয়েছিলাম, উইকিলিকসের মাধ্যমে বাংলাদেশের সম্পদ লুন্ঠনে বিদেশি লুটেরাদের লবিষ্ট হিসেবে মার্কিন রাষ্ট্রদূতের তৎপরতার কথা। উইকিলিকসের মাধ্যমে ফাঁস হওয়া তথ্যে দেখা গেছে যে, মার্কিন রাষ্ট্রদূতের সাথে বৈঠকে প্রধানমন্ত্রীর জ্বালানী বিষয়ক উপদেষ্টা তাঁকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন কনোকো ফিলিপসকে রপ্তানীমুখি চুক্তির মাধ্যমে সাগরের গ্যাসব্লক দেওয়া হবে। আরেক মার্কিন কোম্পানি শেভ্রনকে অনেক বেশি দামে পুরনো কমপ্রেশার কেনাসহ নানা সুবিধা প্রদানের কথাও দেয়া হয়েছে। সেই কাজগুলোই যে একান্ত বাধ্যগত কর্মচারীর মতো তারা করে গেছেন, গত বছরের এই সংক্রান্ত ঘটনাবলী থেকে তার স্পষ্ট প্রমাণ। একদিকে বাংলাদেশের গ্যাস সংকট সমাধানের জন্য সমুদ্রের গ্যাস চুক্তির কথা প্রচার করা হচ্ছে, অন্যদিকে শতকরা ৮০ ভাগ রপ্তানীর বিধান রেখে গ্যাস ব্লক তুলে দেওয়া হচ্ছে মার্কিন কোম্পানির হাতে। যে কোম্পানির হাতে এগুলো তুলে দেওয়ার অপচেষ্টা চলছে সেটি এমন একটি কোম্পানি যেটি কিছুদিন আগে ভেনেজুয়েলা থেকে বিতাড়িত হয়েছে, লিবিয়ায় তারা জনবিক্ষোভের মুখে এবং যে কোম্পানির প্রধান ব্যক্তি ইরাকে গণহত্যার সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত।

উইকিলিকসের দলিল থেকে আরও জানা গেছে যে, মার্কিন রাষ্ট্রদূত প্রধানমন্ত্রীর জ্বালানী উপদেষ্টাকে চাপ দিচ্ছেন বিদেশি কোম্পানির মালিকানায় উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলন করবার লক্ষ্যে যাবতীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে। জ্বালানী উপদেষ্টা সে অনুযায়ী প্রতিশ্র“তি দিয়ে বলেছেন, জনগণের প্রতিরোধের কারণে সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে বলে উন্মুক্ত খনির পক্ষে জনমত গঠনে তারা আরও সচেষ্ট হবেন এবং সংসদীয় কমিটির মাধ্যমে তারা অগ্রসর হবেন। তাছাড়া আদিবাসী উচ্ছদের দরুণ সমস্যাও সামলাতে হবে। ২০১০ সালে এধরনেরই ‘কৌশলগত ব্যবস্থার’ কিছু কিছু চিত্র আমরা পেয়েছি। সংসদীয় কমিটির উপরে বর্ণিত সফর এবং সরকারি নানা তৎপরতা যে এই পরিকল্পনারই অংশ তা বুঝতে কারও অসুবিধা হবার কথা নয়।

এই সংসদীয় কমিটি উন্মুক্ত খনির পক্ষে ‘সিদ্ধান্তে এসেছেন’ জার্মানী সফর করার পর। যে সফরের আয়োজক ছিল এশিয়া এনার্জি বা জিসিএম এবং জার্মানির আরডব্লিউই কোম্পানি। এই কমিটির সদস্যবৃন্দ ফুলবাড়ী ও বড়পুকুরিয়া অঞ্চল সফর করেননি, উন্মুক্ত খনি বিষয়ে সরকার গঠিত বিশেষজ্ঞ কমিটির নেতিবাচক সিদ্ধান্তও তারা আমলে নেননি, দেশের স্বাধীন বিশেষজ্ঞদের সিদ্ধান্তও তারা পর্যালোচনা করেননি, জনগণের রায়ও তাদের ধর্তব্যের মধ্যে নেই, এমনকি উন্মুক্ত খনি নিষিদ্ধ ও এশিয়া এনার্জি বহিষ্কার সহ ৬ দফা চুক্তির প্রতি প্রধানমন্ত্রীর অঙ্গীকারকেও তাঁরা অগ্রাহ্য করেছেন। স্পষ্টতই এই সফর ও তৈরি করা সিদ্ধান্ত বিদেশি কোম্পানির স্বার্থ দ্বারা পরিচালিত। বিদেশি স্বার্থের বিরুদ্ধে যাবে বলে উন্মক্ত খনির বিরুদ্ধে জার্মানীর যেসব সংগঠন ও বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন আন্দোলন করছেন তাদের কোন বক্তব্য তাঁরা বিবেচনা করেননি।

সংসদীয় কমিটির এই ভূমিকা এশিয়া এনার্জির বেআইনী ও প্রতারণামূলকভাবে বাংলাদেশের কয়লা দেখিয়ে শেয়ার বাণিজ্যের জন্য খুব সুবিধাজনক, এবং তদুপরি দেশের কৃষি, পানি ও মানুষের সর্বনাশ করে কয়লা উত্তোলন ও পাচারে আগ্রহী দেশি বিদেশি মহলের স্বার্থরক্ষায় নিয়োজিত। বিদেশি কোম্পানি দ্বারা পরিচালিত হয়ে জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থী এই কাজ করে সংসদ সদস্যরা তাঁদের প্রতি জনগণের বিশ্বাস ও আস্থাভঙ্গ করেছেন।

জার্মানীর সঙ্গে কেন বাংলাদেশ তুলনীয় নয়?
জার্মানীর উন্মক্ত খনি দেখিয়ে সংসদীয় কমিটি বাংলাদেশে মার্কিন দূতাবাস ও বিভিন্ন বিদেশি সরকারি বেসরকারি কোম্পানির ইচ্ছাপূরণে কাজ করছেন। কিন্তু এই কী কী কারণে বাংলাদেশের সঙ্গে জার্মানী তুলনীয় নয় তা নিয়ে বাংলাদেশের ভূতাত্ত্বিক, প্রকৌশলীসহ বিশেষজ্ঞরা অনেকবার ব্যাখ্যা করেছেন। এগুলো সংক্ষেপে নিম্নরূপঃ

(১)   বাংলাদেশের মাটির গঠন, পানির আপেক্ষিক অবস্থান ও গভীরতা, বৃষ্টি ও বন্যার ধরন সবকিছুই জার্মানী থেকে ভিন্ন এবং তা কোনভাবেই উন্মক্ত খনন পদ্ধতির উপযোগী নয়।
(২)  বাংলাদেশের জনবসতির ঘনত্ব জার্মানীর তুলনায় এতগুন বেশি যে তা কোনভাবেই তুলনীয় হতে পারে না। বাংলাদেশের গড় জনঘনত্ব প্রতি র্বগ কলিোমটিারে ১০৭৯, জার্মানীর তুলনায় প্রায় ৫ গুণ বেশি। জার্মানীর হামবাক খনি এলাকার তুলনায় বড়পুকুরিয়া ও ফুলবাড়ী অঞ্চলে তা আরও অনেক বেশি।
(৩) জার্মানীতে যেমন এক অঞ্চলের মানুষদের সরিয়ে অন্যত্র নতুন জনবসতি স্থাপন করা গেলেও বাংলাদেশে তা কোনভাবেইসম্ভব নয়। সারাদেশে জনঘনত্ব অনেকবেশি থাকবার ফলে এক অঞ্চল থেকে সরিয়ে বসতি এবং সমাজ জীবন প্রতস্থিাপন একবোরইে অসম্ভব
(৪) বিষয়টা শুধু ফুলবাড়ী বা বড়পুকুরিয়া অঞ্চলের নয়। সমগ্র উত্তরবঙ্গে যদি কৃষি আবাদ, পানি ব্যবস্থা বিপর্যস্ত হয় তাহলে এই পুরো অঞ্চলই মানুষের বসবাস ও আবাদের অযোগ্য হয়ে যাবে। তাদের সবার জন্যই ভিন্ন আবাস, কৃষি আবাদ আর সমাজজীবন প্রতিস্থাপন করতে হবে। সেটা কোথায়? আর অবিরাম খাদ্য উৎপাদনের এলাকা ধ্বংস হয়ে খাদ্য উৎপাদনের যে ঘাটতি হবে তার সমাধান কী হবে?
(৫)  বাংলাদেশের নদনদী খালবিল জালের মতো ছড়ানো যা জার্মানীতে নয়। একজায়গায় দূষণ ঘটলে তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। বন্যায় যার তীব্রতা আরও বৃদ্ধি পায়। উন্মক্ত খনন পদ্ধতিতে দূষণ তাই বাংলাদেশে যেভাবে ছড়াবে জার্মানীতে ততটা হয় না। ভূগর্ভস্ত পানি প্রত্যাহারের যে প্রয়োজন বাংলাদেশে আছে তাতে মরুকরণের যে বিস্তার ঘটবে জার্মানীতে তার মাত্রা কম। মাটির গঠনের কারণে বাংলাদেশে মাটির ধস যেভাবে ঘটে, জার্মানীতে তার সম্ভাবনা কম।
(৬)  জার্মানীর যেসব কোম্পানী এই পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলন করছে সেগুলো জার্মান কোম্পানি। তারপরও এখানে মালিকানা ঐসব কোম্পানির হাতে কেন্দ্রীভূত নয়। বাংলাদেশে সামান্য কিছু রয়ালটির বিনিময়ে পুরো খনি বিদেশি কোম্পানির হাতে তুলে দেয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল, এখনো হচ্ছে।
(৭)  জার্মানীতে উন্মক্ত খনন পদ্ধতি ব্যবহার করে কয়লা উত্তোলন করা হয়েছিল অভ্যন্তরীণ বিপুল চাহিদা পূরণের তাগিদ থেকেই। কোম্পানির মুনাফার লক্ষ্যে বিদেশে রপ্তানির জন্য নয় যেমনটি বাংলাদেশে প্রস্তাব করা হয়েছে।

উল্লেখ যে, জার্মানীর এই উন্মক্ত খনন পদ্ধতি তারপরও প্রশ্নের উর্র্ধ্বে নয়। এর ক্ষয়ক্ষতির তালিকা দীর্ঘ। জার্মানীতে এই খনির জন্য ‘২৪৪টি গ্রাম নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। পানি চিরদিনের জন্য টলটলে দেখালেও বিষাক্ত।’ জার্মান রাষ্ট্রের অনেক দক্ষ তত্ত্বাবধান ও পরিবেশ দূৃষণ রোধে ব্যয়বহুল ব্যবস্থা গ্রহণের পরও বিষাক্ত পানি, চাষের অনুপযোগী মাটির তথ্য সর্বজনবিদিত। তাহলে বাংলাদেশের কী অবস্থা ঘটতে পারে?

পৃথিবীর যেসব দেশে উন্মুক্ত খনন পদ্ধতি প্রচলিত তার মধ্যে অস্ট্রেলিয়া অন্যতম। সেখানকার কয়লা স্তরের গভীরতা খুবই কম। ভূগর্ভে সর্বোচ্চ ১২০ মি. পর্যন্ত বিবেচনা করা হয় উন্মুক্ত খনন পদ্ধতির জন্য। অস্ট্রেলিয়া অতিকম ঘনবসতিপূর্ণ দেশ হওয়া সত্ত্বেও আবাদি জায়গায় উন্মুক্ত পদ্ধতিতে খনন করার বিরুদ্ধে সে দেশের মানুষ খুবই সোচ্চার। বিহার রাজ্য তথা সমগ্র ভারতের অন্যতম বৃহৎ কয়লাখনি হলো যারিয়া কয়লাখনি, যেখানে ৭০মি. পর্যন্ত উন্মুক্ত পদ্ধতিতে এবং এরপর থেকে নিচের দিকে ভূগর্ভস্থ পদ্ধতিতে খনন করা হয়েছে। জার্মানী, ভারত, অস্ট্রেলিয়া, চীনসহ যেসব দেশে উন্মুক্ত খনন পদ্ধতি নেওয়া হয়েছে তার সবগুলোই পাহাড় বা মরুভূমিতে এবং দেশীয় সংস্থার মালিকানায়। তাদের জনসংখ্যার ঘনত্ব বাংলাদেশের চাইতে অনেক কম। মাটির উপরের সম্পদ নষ্টের অনুপাত কম। রাষ্ট্রীয় আইন ও তদারকি তুলনামূলক অনেক বেশী। তারপরও এসব দেশে নতুন করে আর এই পদ্ধতি গ্রহণ করছে না।

আর্জেন্টিনা, পেরু, কোস্টারিকা, ইকুয়েডর এমনকি যুক্তরাষ্ট্র গত কয়েককবছরে উন্মুক্ত খনন পদ্ধতির বিরুদ্ধে নানামাত্রার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। গুয়েতেমালা, হন্ডুরাস, যুক্তরাজ্যের ওয়েলসসহ বিভিন্ন দেশে উন্মুক্ত খনন পদ্ধতি বাতিলের দাবীতে বিভিন্ন ধরণের আন্দোলন-সংগ্রাম পরিচালিত হচ্ছে। কয়েক বছর আগে মার্কিন সরকার মন্টানা সীমান্তের কাছে কানাডার একটি উন্মুক্ত খনির উদ্যোগের বিরুদ্ধে প্রবল আপত্তি জানিয়েছিল। আপত্তির কারণ হিসেবে বলা হয়েছিল, মার্কিন সীমান্ত থেকে ২৫ মাইল উত্তরে পাহাড়ী অঞ্চলে এই উন্মুক্ত খনি করলে তাতে তাদের সীমানায় গ্লেসিয়ার ন্যাশনাল পার্ক, ঝর্না ও পশ্চিমাঞ্চলের বৃহত্তম প্রাকৃতিক লেকের অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে যাবে।

দিনাজপুরের বড়পুকুরিয়া কয়লাখনি নিয়ে আবারো চক্রান্ত শুরু হয়েছে। বর্তমান সরকারের মধ্যে বিদেশি কোম্পানির স্বার্থ রক্ষাকারি একটি মহল সক্রিয় হয়ে উঠেছে। গত ২৭ জানুয়ারি সরকারের এক উপদেষ্টা ও দুই প্রতিমন্ত্রী বড়পুকুরিয়া কয়লাখনি এলাকা পরিদর্শন করেছেন। তাঁরা এলাকার দেবে যাওয়া জমি ও ফাটল ধরা বাড়িঘরের মালিকদেও উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ প্রদানের বিনিময়ে পূণর্বাসনের নামে অন্যত্র সরিয়ে নেয়ার কথা বলেছেন। এ ধরনের তৎপরতা প্রতারণামূলক ও অঞ্চলটিকে উন্মুক্ত পদ্ধতির অধীনে নিয়ে যাবার চক্রান্তেও অংশ বলে আমরা মনে করি। আমরা স্মরণ করছি যে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০০৬ সালের ৪ সেপ্টেম্বর ফুলবাড়ী সফরকালে তৎকালীন সরকারের সাথে জনগণের স্বাক্ষরিত ফুলবাড়ী চুক্তির ৬ দফার প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানিয়েছিলেন এবং এশিয়া এনার্জি বহিষ্কার ও উন্মুক্ত পদ্ধতি নিষিদ্ধ সহ এই ৬ দফা বাস্তবায়নে অঙ্গীকার করেছিলেন।

আমরা বড়পুকুরিয়া খনি কর্তৃপক্ষের সকল অনিয়ম, দূর্নীতি উদঘাটন করা, মাঠের জমি দেবে যাওয়া ও বাড়িঘরের ফাটল ধরার আসল কারণ উদঘাটন কওে তা নিরসনের জন্য সরকার উদ্যোগ নেবেন সেটাই আশা করি। এলাকার জনগণ বারবার দাবি করেছে বিশ্বে প্রচলিত বালু ভরাট পদ্ধতিতে বড়পুকুরিয়া কয়লাখনি থেকে কয়লা উত্তোলন করার জন্য। জনগণের এসব দাবির প্রতি খনি কর্তৃপক্ষ এবং কোন সরকার ভ্র“ক্ষেপ করেন নাই। এ ছাড়াও বড়পুকুরিয়া তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রে বিদ্যুৎ উৎপাদন কাজে ভূগর্ভ থেকে পানি তোলা হচ্ছে। যা এলাকায় পানি শুন্যতার কারণ হিসেবে দেখা দিয়েছে। অপরদিকে বড়পুকুরিয়ায় উৎপাদিত বিদ্যুৎ অত্র এলাকায় অগ্রাধিকারভিত্তিতে সরবরাহের কথা থাকলেও তা করা হয়নি।

তাই আজকের জনসভায় আমাদের ঘোষণা, (১) পূনর্বাসনের নামে জনগণকে অন্যত্র সরিয়ে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে খনি করার চক্রান্ত বন্ধ করতে হবে, (২) ক্ষতিগ্রস্ত সকল মানুষকে যথেষ্ট ক্ষতিপূরণ দিতে হবে, (৩) বড়পুকুরিয়া কয়লাখনির সকল অনিয়ম দূর্নীতি দুর করতে হবে, (৪) বালু ভরাট পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলনের উদ্যোগ নিতে হবে, (৫) তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রে ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবহার না করে তিস্তা ব্যারেজ থেকে ক্যানেল কওে ছোট যমুনা নদীতে পানি সংরক্ষণ করে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যবস্থা করতে হবে, (৬) বড়পুকুরিয়ায় উৎপাদিত বিদ্যুৎ অগ্রাধিকারভিত্তিতে দিনাজপুর জেলায় নিরবিচ্ছিন্নভাবে সরবরাহ করতে হবে। এবং (৭) ২৬ আগষ্ট ২০০৬ জনগণের সাথে সরকারের স্বাক্ষরিত ৬ দফা চুক্তি অবিলম্বে বাস্তবায়ন করতে হবে।

তারিখ-  ১৪/০২/২০০৯ ইং
স্থান- বড়পুকুরিয়া কালূপাড়া প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রাঙ্গণ।