Tuesday, December 9th, 2014

লন্ডনে জিসিএমের বার্ষিক সভা ঘেরাও, প্রশ্নবাণে জর্জরিত, কোন সদুত্তরই মেলেনি জিসিএম থেকে

লন্ডনে গ্লোবাল কোল ম্যানেজমেন্টের (জিসিএম) বার্ষিক সাধারণ সভা ঘেরাও হয়েছে ৯ ডিসেম্বর ২০১৪। ব্রিটেনের প্রচণ্ড শীতের সকালে ৩ ডিগ্রী সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রা উপেক্ষা করে সকাল ১০.৩০ মিনিটে অভিজাত এলাকা হাইড পার্ক কর্নারের পাশে ৪ হ্যামিল প্যালেসের সামনে ফুলবাড়ী উন্মুক্ত কয়লা উত্তোলন প্রকল্পের প্রতিবাদে জড়ো হয় দৃঢ়প্রত্যয়ী বিপুলসংখ্যক প্রতিবাদকারী। শ্লোগানে শ্লোগানে জিসিএমের বিরুদ্ধে গগণবিদারী আওয়াজ তোলে বিক্ষোভকারীরা। বাংলাদেশের তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটি, যুক্তরাজ্য শাখার উদ্যোগে আয়োজিত এই প্রতিবাদে অংশ নেয় ওয়াল্ড ডেভেলপমেন্ট মুভমেন্ট, লন্ডন মাইনিং নেটওয়ার্ক, ফুলবাড়ি সলিডারিটি গ্রুপ, ইলিং ট্রেড ইউনিয়িনস্ট এন্ড সোস্যালিস্ট কোয়ালিশন, স্যোস্যলিস্ট পার্টি, ইউরোপিয়ান একশন গ্রুপ অন ক্লাইমেট চেইঞ্জ, স্বাধীনতা ট্রাস্ট্রসহ বিভিন্ন সংগঠন। সভার বাইরে শ্লোগান, বক্তব্য আর ড্রাম পিটিয়ে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হন প্রতিবাদকারীরা। বাইরের প্রতিবাদ সভার আওয়াজ সভার ভেতরের ফুলবাড়ী প্রকল্পে বিনিয়োগকারীদের কর্ণকুহরে প্রবেশ করাতে সক্ষম হন প্রতিবাদকারীরা। প্রায় ৩ ঘন্টা ভবনের মুল ফটক ঘেরাও করে রাখে প্রতিবাদ সমাবেশ। মুল ফটকে কয়লা ফেলে ডার্টি কোল মাইনারদের নোরা চেহারাটা তুলে ধরেন প্রতিবাদকারীরা। এক পর্যায়ে গ্যারি লাইয়ের গাড়ী পেয়ে ঘেরাও করে রাখেন তারা। জিসিএমের কর্মকর্তা ও বিনিয়োগকারী সভা শেষে বের হতে ইতস্তত বোধ করে দেরীতে বের হয়েও বিক্ষোভের মুখে পড়েন।

প্রতিবাদ সমাবেশে বক্তারা বলেন, বাংলাদেশে জিসিএম এর কোন ভবিষ্যৎ নেই, গণপ্রতিরোধের মুখে তারা আর কখনই ফুলবাড়ীতে প্রবেশ করতে পারবে না। সম্প্রতি জিসিএমের গ্যরি লাই সস্ত্রীক ফুলবাড়ী গিয়ে পুলিশ প্রহায় পলিয়ে রক্ষা পান। তারা জিসিএমকে পুনরায় ফুলবাড়ীতে প্রবেশ করার বিষয়ে হুশিয়ার করে দেন। তারা বলেন, জিসিএমকে ফুলবাড়ীতে মানব বসতি, প্রকৃতি ও পরিবেশ বিধ্বংসী  উন্মুক্ত  পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলন করতে দেয়া হবে না। তারা আরো বলেন,  ফুলবাড়ীতে উর্বরতম ১৪,৬৬৬ একর কৃষি জমি স্থায়ীভাবে ধ্বংস করে, ২ লক্ষ মানুষকে বাস্তুচ্যুত করে, ৩৫ বছরব্যাপী অবিরাম পানি উত্তোলনের মাধ্যমে ঐ  অঞ্চলের পানির স্তর ২০-২৫ মিটার নামিয়ে ফেলে, ২২০,০০০ মানুষের পানির উৎস ধ্বংস করে বাংলাদেশের জন্য মাত্র ৬ শতাংশ উৎপাদন অংশীদারিত্বে উন্মুক্ত পদ্ধতির কয়লা উত্তোলন বাংলাদেশের জন্য কোন সুফল বয়ে আনবে না। বক্তারা জিসিএমকে একটি প্রতারক কোম্পানি হিসেবে আখ্যায়িত করে বলেন, জিসিএম বংলাদেশ সরকারের সাথে কোন চুক্তি বা আইনগত ভিত্তি ছাড়াই ফুলবাড়ীর কয়লা খনি দেখিয়ে লন্ডন শেয়ারবাজার থেকে অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে। বক্তরা ব্রিটিশ সরকারকে প্রতারক কোম্পানি জিসিএমকে লন্ডন শেয়ার মার্কেটে নিষিদ্ধ করার দাবি তোলেন।

সমাবেশে বক্তব্য রাখেন, তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির যুক্তরাজ্য শাখার আহবায়ক ও  সদস্য সচিব ডা. মুখলিছুর রহমান ও ড. আখতার সোবহান মাসরুর। ওয়ার্কার্স পার্টির ইসহাক কাজল, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের মোস্তফা ফারুক, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সৈয়দ এনাম, আবিদ আলী, শাহরিয়ার বিন আলী, লেখক ওয়ালি রহমান, ফুলবাড়ী সলিডারি গ্রুপের রুমান হাশেম। আরো বক্তব্য রাখেন, শাহ এনাম, আহমেদ জামান, গোলাম আকবর মুক্তা, নুরুল ইসলাম, মেহজাবীন, সোস্যালিস্ট পার্টির পিটার মেসন, ওয়াল্ড ডেভেলপমেন্ট মুভমেন্টের এফি জর্ডন, ইলিং ট্রেড ইউনিয়িনস্ট এন্ড সোস্যালিস্ট কোয়ালিশনের ক্রিস, ইউরোপিয়ান একশন গ্রুপ অন ক্লাইমেট চেইঞ্জের আনছার আহমেদ উল্লাহ, স্বাধীনতা ট্রাস্ট্রের জুলি বেগম প্রমুখ।

অপরদিকে, সাধারণ সভায় প্রক্সি হিসেবে অংশগ্রহণকারীদের একাংশ প্রশ্নবাণে জর্জরিত করে তোলেন জিসিএমের সিইও মাইকেল ট্যাং ও ফুলবাড়ীতে কয়েকদিন আগে প্রতিরোধের মুখে পড়া বাংলাদেশে নির্বাহী প্রধান গ্যরি লাইকে। সাধারণ সভার শুরুতেই কোন আলোচনা না করে প্রস্তাব পাশ করিয়ে নিতে চাইলে লন্ডন মাইনিং নেটওয়ার্কের রিচার্ড সলি তাতে বাধা দিয়ে আলোচনার দাবি করেন। এর পর জাহানারা রহমান গ্যারি লাইয়ের কাছে জানতে চান তিনি কেন প্রতিরোধকারীদের সন্ত্রাসী বলে আখ্যায়িত করেছেন? জবাবে, গ্যরি প্রথমে বিষয়টি অস্বীকার করেল জাহানারা রহমান স্বাক্ষ্য হিসেবে পত্রিকায় ছাপা বক্তব্য তুলে ধরলে গ্যরি চুপ মেরে যান। গোলাম মোস্তফা জানতে চান, ফুলবাড়ী প্রকল্প নিয়ে বাংলাদেশ সরকারের সাথে জিসিএমের কোন চুক্তি আছে কি? কোন আইনগত ভিত্তিতে জিসিএম বাংলাদেশে কাজ করছে? জিসিএম এর কোন উত্তর দিতে পারে নি। দশ বছর কেটে গেলেও প্রকল্প বাস্তবায়ন না হওয়ায় তিনি প্রকল্পের কোন ভবিষ্যৎ নেই বলে সভায় অংশগ্রহণকারীদের জানান। জিসিএমের বাংলাদেশ কাজ করার কোন আইনগত ভিত্তি নেই- বাংলাদেশের জ্বালানি সচিবের এ বক্তব্য সম্পর্কে জানতে চাইলে গ্যারি বলেন, জ্বালানি সচিব এ বিষয়ে অবগত নন।  

বড়পুকুরিয়ায় উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলন করা সম্ভব নয় বলে সাম্ভাব্যতা যাচাই প্রতিবেদন দেয়া হয়েছে, সেখানে ফুলবাড়ীর মতো ঘণবসতিপূর্ণ এলাকায়  কি করে উন্মুক্ত পদ্ধতি অনুসরণ করা সম্ভব? মতিন সরকারের এ প্রশ্নের কোন সদুত্তর না দিয়ে গ্যারি বলেন, বাংলাদেশের চাহিদা মেটানোর জন্য উন্মুক্ত পদ্ধতি দরকার।

এ পর্যায়ে আবারে গ্যারি লাইকে জাহানারা রহমান প্রশ্ন করেন, আপনি ফুলবাড়ীতে স্ত্রীকে নিয়ে গিয়ে প্রতিরোধের মুখে পুলিশ প্রহরায় এলাকা ছেড়েছেন, তাকে একটা ব্রিবতকর পরিস্থিতিতে ফেলেছেন। আপনার স্ত্রীর জন্যে আমার দুঃখ হয়।

ওয়ার্ল্ড ডেভেলপমেন্ট মুভমেন্টের ক্রিস্টি রাইট ওইসিডি প্রকাশিত প্রতিবেদন তুলে ধরে বলেন, জিসিএম ওইসিডি নীতিমালা লঙ্ঘণ করেছে।

ওয়ার্ল্ড ডেভেলপমেন্ট মুভমেন্টের স্যাম ব্রাউন বলেন, ২০১২ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি জাতিসংঘ স্পেশাল রিপোর্টিয়ার্সগণ এক বিবৃতিতে লক্ষ লক্ষ মানুষকে বাস্তুচ্যুত করে মৌলিক মানবাধিকার লঙ্ঘন, পরিবেশ ও প্রকৃতি ধ্বংসর অভিযোগ তুলে অবিলম্বে ফুলবাড়ী কয়লা প্রকল্প বাতিলের জোর সুপারিশ করেন। অথচ এ বিষয়ে জিসিএমের কোন সদুত্তর নেই।একজন লন্ডনার হিসেবে অপতৎপরতায় লিপ্ত থাকার দায়ে জিসিএমকে লন্ডন শহর থেকে চলে যেতে বলেন তিনি। স্যাম ব্রাউন জিসিএম ও সাধারণ সভাকে অবৈধ বলে মন্তব্য করলে উত্তেজনার মধ্য দিয়ে অনানুষ্ঠানিকভাবেই সাধারণ সভা ভেঙ্গে যায়, বিফল মনোরথে ফিরে যান বিনিয়োগকারীরা।

সাধারণ সভার পুরো সময়টাই মাইকেল ট্যাং ও গ্যারি লাই প্রশ্নবাণে জর্জরিত হন, তর্কবিতর্ক আর উত্তর দিতে দিতেই অধিকাংশ সময় কেটে যায় তাদের। সভায় জিসিএম কর্মকর্তারা ফুলবাড়ী প্রকল্পের কাজ পেতে বাংলাদেশ সরকারের কাছে প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখেবেন বলে জানান।

লন্ডন মাইনিং নেটওয়ার্কের রিচার্ড সলি সাধারণ সভা নিয়ে তার প্রতিবেদনে বলেছেন, আরো কোন জিসিএমের সাধারণ সভায় আমাদের যেন আসতে না হয়, আগামী বছর ডিসেম্বরে  জিসিএম ও ফুলবাড়ী কয়লা প্রকল্প যেন একটা খারাপ স্মৃতি হয়ে বিদায় নেয়।

 – তেলগ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটি, যুক্তরাজ্যশাখা