Thursday, October 23rd, 2014

গ্যাসের দাম বৃদ্ধির যৌক্তিকতা কী?

অনেকে নাকি শীতকালে ঘর গরম করতে চুলা জ্বালিয়ে রাখেন। কাপড় শুকাতেও অনেক গ্যাস ‘অপচয়’ হয় বলে গ্যাসের দাম বাড়াতে চায় পেট্রোবাংলা! খুব বিরল দৃশ্য হলেও ঘটনাটা অসম্ভব নয়। গত ১৫ অক্টোবর সমকালে গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধি সংক্রান্ত সংবাদে মূল্য বৃদ্ধির কারণ হিসেবে প্রধাণত এ দুটি যুক্তিই দিয়েছে পেট্রোবাংলা।

কিন্তু পেট্রোবাংলার কাছে কি পরিসংখ্যানগত কোনো হিসাব আছে, এভাবে কত পরিমাণ গ্যাস অপচয় হয় যার ভিত্তিতে তারা বলতে পারে যে গ্যাসের মূল্য বাড়িয়ে দিলে এভাবে অপচয়ের প্রবণতা হ্রাস পাবে? বর্তমান দুই চুলার বিল যদি ৪৫০ টাকার বদলে ১০০০ টাকা করা হয়; কাণ্ডজ্ঞান তো এটিই বলে, সেক্ষেত্রে গ্রাহকের মনে হবে রাতারাতি তার কাছ থেকে বেশি টাকা নেওয়া হচ্ছে, গ্যাসের বাড়তি ব্যবহার করেই হয়তো তাদের কেউ কেউ সেটা উসুল করে নেবেন। সচেতন গ্রাহকরাও হয়তো গ্যাসের অপচয় রোধ বিষয়ে উদাসীন হয়ে পড়বেন। কেননা, গ্রাহক যত গ্যাসই খরচ করুন না কেন, বিল তো ওই ১০০০ টাকাই। অন্যদিকে, মূল্য বৃদ্ধি করে ভোগ কমানো যেতে পারত যদি গ্রাহকরা মাসভিত্তিক মিটারে গ্যাস না কিনে সেটা কিনতেন একক ভিত্তিতে। সে ক্ষেত্রে গ্রাহকরা ব্যবহার যথাসম্ভব কমিয়ে দিতেন খরচা বাঁচানোর জন্য। ফলে কথিত অপচয় কমে আসত। অতি সামান্য সংখ্যক গ্রাহকই এখন পর্যন্ত একক ভিত্তিতে গ্যাস কিনছেন। সব গ্রাহককে এর আওতায় নিয়ে আসার প্রকল্প বাস্তবায়ন হতে বহু বছর লাগবে। অথচ অপচয় বন্ধের নামে বর্তমান পদ্ধতিতে গ্যাসের দাম বাড়িয়ে গ্রাহককে উৎসাহিত করা হচ্ছে গ্যাসের ব্যবহার সম্পর্কে।

অন্যদিকে, আসলে এই অপচয়ের পরিমাণটি কত? গার্হস্থ্য পর্যায়ে মোট গ্যাসের ব্যবহার সমগ্র গ্যাস সরবরাহের মাত্র ১০ ভাগ। বাকি পুরোটাই যায় বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্পাঞ্চলে। যে গৃহস্থরা এই ১০ ভাগ গ্যাস ব্যবহার করেন, কীভাবে আমরা অনুমান করতে পারি তার মাঝে ৯ বা সাড়ে ৯ ভাগ প্রয়োজনীয় রান্নার কাজেই ব্যবহার করা হয় না? কোনো পরিসংখ্যানগত পর্যালোচনা বা অনুসন্ধান কি হয়েছে এ বিষয়ে? বাংলাদেশে দিবারাত্র শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কার্যালয়-বাসগৃহ-পরিবহনে সময় কাটানো সিদ্ধান্তদাতারা যে জনগণ সম্পর্কে কতটা হীন ধারণা পোষণ করেন, তার একটা উৎকট রূপ আমরা দেখতে পেলাম জনগণেরই কথিত অপরাধ আবিষ্কার করে তাদের কাঁধে বাড়তি মূল্যের বোঝা চাপিয়ে দেওয়ার এই বন্দোবস্তে। দশমিক ৫ বা ১ শতাংশ অপচয় রোধ করার নামে লাখ লাখ গ্রাহকের পকেট কাটা কোনোমতেই ন্যায্য হতে পারে না।

বাসাবাড়িতে চুলায় গ্যাসের যে তথাকথিত ‘অপচয়’ ঘটে, তার চেয়ে বহু গুণ অপচয় ঘটে সস্তা সিএনজি গ্যাসের কল্যাণে ব্যক্তিগত গাড়ির প্রয়োজনাতিরিক্ত ঘোরাফেরায়। অথচ সিএনজিতে প্রতি হাজার ঘনফুট ৮৪৯ টাকা ৫০ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ১১৩২ টাকা ৬৭ পয়সা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, যেটা হওয়া উচিত তার থেকে বহু গুণ কম। সমকালের ওই সংবাদে দেখা গেল, বিদেশ থেকে কবে যেন গ্যাস আমদানি করা হবে, আন্তর্জাতিক মূল্যের সঙ্গে সমন্বয় করার জন্যও গ্যাসের এই মূল্যবৃদ্ধি। আমাদের প্রস্তাব হোক, অবিলম্বে জিপ, মাইক্রোবাসসহ সব রকম ব্যক্তিগত গাড়িতে ব্যবহৃত সিএনজির দাম আন্তর্জাতিক স্তরের জ্বালানির মূল্যের সঙ্গে সমন্বিত করে রাখা হোক কিংবা তার কাছাকাছি রাখা হোক। অন্যদিকে গণপরিবহন, যেমন বাস ইত্যাদিতে মোট ব্যবহৃত সিএনজির ওপর ভর্তুর্কির ব্যবস্থা করা হোক। বহু নগরেই ব্যক্তিগত গাড়ি ও জ্বালানি ব্যবহারের ওপর বাড়তি দাম বসিয়ে গণপরিবহনে ভর্তুর্কি দেওয়া হয়। এতে উঠতি টাকাওয়ালাদের গাড়িবিলাসের দরুন ঢাকা শহরের যানজট বিপুলাংসে হ্রাস পাবে এবং গ্যাসেরও সত্যিকারের যে ফুর্তিজনিত ‘অপচয়’ ঘটে, সেটা কমে আসবে।
সমকালের ওই সংবাদে এটাও পরিষ্কার, গ্যাস বাবদ সরকারের আদতে কোনো লোকসান নেই। গ্যাসের দাম বৃদ্ধি মূলত সরকারের আয় বৃদ্ধির লক্ষ্যে। অন্যদিকে সাম্প্রতিক হলমার্কসহ

নানা রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে যে বিপুল হারে কেলেঙ্কারির ঘটনাগুলো ঘটছে, কুইক রেন্টালের নামে যে দুর্নীতি হয়েছে, সেই টাকাগুলো এসেছে কোথা থেকে? সেগুলো আসলে এইভাবে নানা খাতে কর বাবদ জনগণের কাছ থেকে আসা অর্থ, যা ব্যয়িত হওয়ার কথা ছিল জনগণের শিক্ষা-স্বাস্থ্য-রাস্তাঘাটসহ কল্যাণকর খাতগুলোতে। কোনো দুর্নীতিই আজ হাজার কোটি টাকার নিচে নয়। অথচ সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নেই, রাস্তাঘাট ভাঙাচোরা, সরকারি বিদ্যালয়গুলোর বেহাল দশা। শিক্ষকদের বেতন এমন যে, কোনো শিক্ষিত মানুষই শিক্ষকতায় আগ্রহী নন। গ্যাসের বর্ধিত আয় যদি এসব খাতে ব্যয়িত হতো, কেউই আপত্তি করত না। কিন্তু চোখের সামনেই যখন দেখা যাচ্ছে জনগণের দেওয়া খাজনা নিয়ে কেমন হরিলুট চলছে, তারই খোরাক হতে মানুষের আপত্তিই বরং অনেক বেশি সঙ্গত।

আমাদের কি স্মরণে আছে, একদা গ্যাসের সম্পূর্ণটা সরবরাহ করত পেট্রোবাংলা, আজকে যেখানে গ্যাসের সিংহভাগ সরবরাহ করে বহুজাতিক কোম্পানিগুলো। ১৯৯৩ সালে খালেদা জিয়া যখন দেশটাকে ২৩টি বল্গকে বিভক্ত করে প্রথম কয়েকটি বহুজাতিক কোম্পানিকে ডেকে আনেন, তার আগ পর্যন্ত পেট্রোবাংলা ৩৩ টাকা প্রতি ঘনফুট গ্যাস সরকারের কাছে বিক্রি করত এবং নিজেরা বিপুল মুনাফা করত। তারা সেই সময়ে সবচেয়ে বড় করদাতা প্রতিষ্ঠানও ছিল। সেই সময়ে বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে নিজের দেশের গ্যাস আন্তর্জাতিক দরে প্রতি ঘনফুট গ্যাস কেনার চুক্তি করা হয় তখনকার দুই ডলারে, প্রায় ৮০ টাকায়। গ্যাস নিয়ে বিপুল অঙ্কের দুর্নীতির সেই শুরু। অচিরেই শেখ হাসিনা সরকার এসে ‘৯৭ সালে অবশিষ্ট গ্যাস বল্গকগুলোকেও তুলে দেওয়া শুরু করল বিদেশি কোম্পানির কাছে। গ্যাস কেনার দর ডলারের মূল্য বৃদ্ধিতে ১২০ টাকায় ঠেকে। পেট্রোবাংলা এর আগ পর্যন্ত অনেক বেশি দক্ষতার সঙ্গে (দক্ষতার মাত্রাটা এমন যে, পেট্রোবাংলা একটা সফল গ্যাসক্ষেত্র উন্নয়নের জন্য মাত্র তিনটি কূপ খুঁড়ত, বহুজাতিকরা খুঁড়ত অন্তত পাঁচটি কূপ। পেট্রোবাংলার প্রয়োজন পড়ত তখন গড়ে ৩৩ কোটি টাকা; বহুজাতিক কোম্পানির প্রয়োজন পড়ত শুরুতে একশ’রও বেশি কোটি টাকা। অচিরেই তা কয়েকশ’ কোটিতে পৌছে।) দেশে গ্যাস সরবরাহ এবং ক্রমোন্নতির কাজটি করে আসছিল। আজকে দায়সারাভাবে এর কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে এবং বহুক্ষেত্রে নিজের দেশে বিদেশি কোম্পানির সাবকন্ট্রাক্টর হিসেবে ‘সফলভাবে’ দায়িত্ব পালন করছে; অথচ এই প্রতিষ্ঠানটির কৃৎকৌশলগত ও বিশেষায়িত জ্ঞানে সামর্থ্য ছিল নিজের দেশ ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক স্তরে কাজ করার। শুধু তাই নয়, উৎপাদিত গ্যাসের সিংহভাগ উৎপাদন খরচ হিসেবে বহুজাতিক কোম্পানিকে দেওয়া হয়। বাংলাদেশ কোনো গ্যাসক্ষেত্রেই বলার মতো কোনো লাভের ভাগ পায়নি। সাঙ্গুর মতো বিরাট গ্যাসক্ষেত্রে উৎপাদন খরচ শেষ হওয়ার আগেই কূপটির প্রায় মৃত্যু ঘটেছে। টেংরাটিলা আর মাগুরছড়ার দুর্ঘটনায় বিপুল গ্যাস অপচয় হয়েছে বহুজাতিক কোম্পানির অদক্ষতা আর খরচ বাঁচিয়ে লাভ বাড়ানোর চেষ্টার কারণে। এই কর্মকাণ্ডের ধারাবাহিকতাতেই আজকে গ্যাস বাবদ যা আদায় হয়, তার একটা বড় অংশ আদৌ সরকার পায় না। তা চলে যায় আমাদের সরকারগুলোর দেশবিরোধী নীতির ধারাবাহিকতার কারণে বিদেশি কোম্পানিরগুলোর পকেটে। এমনকি তাদের দেয় নানা করও পরিশোধ করা হয় পেট্রোবাংলার তহবিল থেকে। একদিকে এই বাড়তি দামের ফলে দেশের শিল্পোদ্যোগ ক্ষতিগ্রস্ত হবে, পরিবহন ব্যয় বাড়বে- জনগণের দিক থেকে এই আশঙ্কা তাই খুবই স্বাভাবিক যে, বাড়তি অর্থও জনগণের উন্নয়নে ব্যয়িত না হয়ে তা দেশীয় ও আন্তর্জাতিক স্তরের নানা ফিকিরেই লোপাট হবে।

* লেখাটি ১৭ অক্টোবর,২০১৪ তারিখ দৈনিক সমকালে প্রকাশিত হয়
http://www.samakal.net/2014/10/17/92404