Wednesday, October 1st, 2014

গ্যাসের দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত কতটুকু যৌক্তিক?

আবারও গ্যাসের দাম বাড়ানোর তৎপরতা চালাচ্ছে সরকার। গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবর অনুসারে, প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদিত দাম বাড়ানোর প্রস্তাব ইতিমধ্যে জ্বালানি মন্ত্রণালয় পেট্রোবাংলায় পাঠিয়েছে। এখন তারা ওই প্রস্তাব এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনে জমা দেবে। ঈদের পর বিইআরসি গণশুনানি করে এ বিষয়ে চূড়ান্ত দেবে।এই প্রস্তাব অনুসারে সবচেয়ে বেশি বাড়বে আবাসিক খাতের গ্যাসের দাম। আবাসিক খাতে দুই চুলার ক্ষেত্রে দাম বাড়বে সর্বোচ্চ ১২২ দশমিক ২২ শতাংশ পর্যন্ত।

টেবিল-১:গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধির প্রস্তাব

আগে সিদ্ধান্ত নিয়ে পরে বিইআরসি’র মাধ্যমে লোক দেখানো গণশুনানি করে তেল, গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর এই প্রকৃয়া নতুন নয়।এর আগে ২০০৯ সালের আগষ্ট মাসে এভাবে গ্যাসের দাম বাড়ানো হয়। প্রশ্ন হলো, জ্বালানি তেল বা বিদ্যুৎ এর দাম বাড়ানোর সময় পিডিবি বা বিপিসির লসের কথা বলা হয়, কিন্তু তিতাস গ্যাস বা অন্যকোন গ্যাস সর্বরাহ কোম্পানি তো লসে নেই, বরং প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ অর্থ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দিয়ে আসছে। পেট্রোবাংলার এমআইএস রিপোর্ট অনুসারে ২০১৩-১৪ অর্থবছরে বাপেক্স ৩০৪ কোটি টাকা, বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ড কোং ২ হাজার ৩০৪ কোটি টাকা, সিলেট গ্যাস ফিল্ড কোং ১ হাজার ৮৬ কোটি টাকা, বাখরাবাদ গ্যাস সিস্টেমস লিমিটেড ৬৮ কোটি টাকা, কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশান কোম্পানি ২১২ কোটি টাকা, তিতাস গ্যাস ৬১০ কোটি টাকা, জালালাবাদ গ্যাস ৬৫ কোটি টাকা, পেট্রোবাংলা ৩২৮ কোটি টাকা রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দিয়েছে।তাহলে গ্যাসের দাম বাড়ানো হচ্ছে কোন অযুহাতে?

 

গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধির এই পায়তারা কি একান্ত বাধ্যগত ঔপনিবেশিক দাসের মতো আইএমএফ এর শর্ত পালন করতে নাকি দেশের ব্যাংক ও অর্থ ব্যাবস্থা লুটপাট করে ফোপড়া করে ফেলার পর বাড়তি অর্থ জোগাড় করতে? নাকি আইএমএফ এর শর্ত ও লুটপাটের ঘাটতি মেটানো- উভয় কারণেই? ২৭ লক্ষ আবাসিক গ্রাহকের প্রত্যেককে যে গড়ে ৫০০ টাকা করে বাড়তি দিতে হবে, তাতে সরকারের বাড়তি আয় হবে ১৩৫ কোটি টাকা।মাত্র ১৩৫ কোটি টাকার জন্য ২৭ লক্ষ পরিবারের কোটি মানুষকে এমন দুর্ভোগে ফেলার কি অর্থ হয়! নাকি লুটপাট করে দেশের অর্থনীতির এতই বারোটা বাজানো হইছে যে ১৩৫ কোটি টাকার জন্য কোটি মানুষকে দুর্ভোগে ফেলতে হবে!

অনেকেরই হয়তো ধারণা বাসা-বাড়িতে যেহেতু গ্যাসের চুলায় গ্যাস অপচয় করা হয়, তাই গ্যাসের দাম বাড়ানোয় তাদের ‘উচিত শিক্ষা’ হবে! অনেকে আবার মনে করেন- সারা দেশের সব বাসা বাড়িতে যেহেতু গ্যাস সংযোগ নাই, যেহেতু কিছু ‘সুবিধাভোগী’ মানুষ গ্যাস সংযোগ ‘ভোগ’ করে, তাই আবাসিক খাতে গ্যাসের দাম বাড়ালে কিছু যায় আসে না ইত্যাদি।

কিন্তু মুশকিল হলো, বেশির ভাগ বাসা বাড়িতে মিটার সংযোগ না থাকায় গ্যাসের দাম বাড়ালে তো অপচয় বন্ধ হবে না! বরং অপচয় আরো বাড়তে পারে এই ভেবে যে, গ্যাসের চুলা জ্বালানো হোক আর না হোক, যেহেতু গ্যাসের দাম আগের চেয়ে দ্বিগুনের বেশি দিতে হবে, তাহলে জ্বলুক চুলা যত খুশী।

আর গ্যাস সংযোগ যে কেবল উচ্চবিত্তের বাড়িতেই আছে তাও কিন্তু ঠিক না।সারা দেশে আবাসিক গ্রাহক সংখ্যা মোটামুটি ২৭ লক্ষ যার বেশীর ভাগই নিম্নবিত্ত-মধ্যবিত্ত। প্রতিটি পরিবারের সদস্য সংখ্যা যদি ৫ ধরা হয়, তাহলে গ্যাসের উপর নির্ভরশীল মানুষের সংখ্যা ১ কোটি ৩৫ লক্ষ।অনেক ক্ষেত্রেই সংযোগ প্রতি নির্ভরশীল মানুষের সংখ্যা ১০/১৫ জনও হয়। যেমন ঢাকা শহরে আশুলিয়া সাভার অঞ্চলের গার্মেন্টস শ্র্রমিকরা যেখানে থাকেন সেখানে একটা কমন চুলা ব্যাবহার করে বহু শ্রমিকের রান্না হয়।হঠাৎ করে গ্যাসের দাম দ্বিগুনেরও বেশি বাড়ানোর ফলে এসব স্বল্প আয়ের শ্রমিক ও নিম্ন বিত্ত মানুষদের উপর তো ভীষণ চাপ পড়বে।গ্যাসের দাম বাড়ানোর সাথে সাথে বাড়ি ভাড়ায় যে বাড়তি খরচ এসব মানুষদেরকে বহন করতে হবে তার জন্য সরকার কি তাদের মজুরী/বেতন বাড়ানোর দ্বায়িত্ব নেবে?

২০১৩-১৪ সনের হিসেব অনুসারে সারা দেশের গ্যাস সরবরাহের মাত্র ১১.২৪ শতাংশ যায় আবাসিক গ্রাহকদের কাছে।এই ১১.২৪ শতাংশ গ্রাহকের সবাই অপচয় করে এটাও ঠিক না। কিন্তু বাকি ৮৮.৭৬ শতাংশ গ্যাস যে বিদ্যুৎ-শিল্প-সিএনজি খাতে যায় তার অংশই অপচয় হয় নষ্ট ও পুরাতন যন্ত্রপাতি ব্যবহার করার কারণে, ইনইফিশিয়ান্ট ক্যাপটিভ পাওয়ারে ব্যবহারের কারণে, ব্যাক্তিগত গাড়ির জ্বালানি হিসেবে পোড়ার কারণে। দেশে মোট উৎপাদিত ২২৫ কোটিইউনিট(১ ইউনিট = ১ এমএসসিএফ = ১ হাজার ঘনফুট) গ্যাসের মধ্যে আবাসিক গ্রাহকরা ব্যবহার করে ২৫.২৯ কোটি ইউনিট, দুই চুলা, এক চুলা, মিটার ভিত্তিক ব্যবহার ও অপচয় সব সহই এই হিসাব। অথচ এর চেয়ে অনেক বেশি পরিমাণ গ্যাস অন্যান্য খাতে অপচয় হয়। পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদ অনুসারে, ২২৫ কোটি ইউনিট গ্যাসের মধ্যে সরাসরি অপচয় হয় ৪০ কোটি ইউনিট গ্যাস। যেমন একটি রিপোর্টে বলা হয়েছে: “দেশে এখন প্রতিদিন গ্যাস উ ৎপাদন হচ্ছে গড়ে ২২৫ কোটি ঘনফুট। এর মধ্যে প্রায় ৪০ কোটি ঘনফুটই অপচয় হচ্ছে। অথচ চাহিদার তুলনায় গ্যাসের ঘাটতি চলেছে।অপচয়ের মূল জায়গাগুলো হলো বিদ্যু ৎকেন্দ্র, সার কারখানা ও শিল্পপ্রতিষ্ঠান।“

সূত্র: http://www.prothom-alo.com/detail/date/2013-07-05/news/365333

[নোট: পত্রিকার রিপোর্টে ২২৫ কোটি ঘনফুট কথাটি ব্যবহার করা হলেও সঠিক হবে ২২৫ কোটি এমএসসিএফ বা ২২৫ কোটি ইউনিট, একই ভাবে ৪০ কোটি ঘনফুটের জায়গায় পড়তে হবে ৪০ কোটি ইউনিট, ১ ইউনিট গ্যাস= ১০০০ ঘনফুট]

 

গ্যাস খাতে অপচয় যদি বন্ধ করতে হয়, তাহলে দাম বাড়ানো নয়, এইসব অপচয়ের খাত বন্ধ করতে হবে:

* দেশের মোট গ্যাসের ১৭ শতাংশ বেসরকারি শিল্প মালিকদের ক্যাপটিভ পাওয়ারের জন্য সর্বরাহ করা হয়। ছোট ছোট জেনারেটর দিয়ে এভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন ভীষণ ইনইফিশিয়ান্ট।ছোট ছোট ক্যাপটিভ পাওয়ারে এভাবে গ্যাস সর্বরাহ বন্ধ করে এই পরিমাণ গ্যাস দিয়ে বড় বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করলে আরো কম গ্যাস লাগবে।

* সিএনজি আকারে ব্যাক্তিগত গাড়িতে গ্যাস পোড়ানো বন্ধ করতে হবে, সিএনজি বড়জোর গণপরিবহনে ব্যাবহ্রত হতে পারে।মোট উৎপাদিত গ্যাসের ৫% সিএনজি আকারে পোড়ানো হয়।

* রাষ্ট্রীয় পুরাতন বৃহৎ বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর কার্যক্ষমতা ২০-২৫%। এগুলোর আধুনিকায়ন করলে ইফিশিয়ান্সি ৫৫% পর্যন্ত বাড়ানো সম্ভব, যার ফলে প্রায় অর্ধেক জ্বালানি ব্যবহার করে একই পরিমাণ বিদ্যুৎ পাওয়া সম্ভব। এতে বিপুল পরিমাণ গ্যাসের অপচয় বন্ধ হবে, গ্যাসের সংকটও কমবে।

* রাষ্ট্রীয় সারকারখানা সহ অন্যান্য শিল্পকারখানার যন্ত্রপাতি আধুনিকায়ন করলে বিপুল পরিমাণ গ্যাসের অপচয় বন্ধ হবে। এক মেট্রিক টন ইউরিয়া উ ৎপাদন করতে যেখানে গ্যাস প্রয়োজন হয় ২৪ হাজার ঘনফুট, সেখানে যমুনা সার কারখানায় এক টন ইউরিয়া উ ৎপাদনে গ্যাস ব্যবহ্রত হচ্ছে ৩২ হাজার ঘনফুট, চিটাগাং সার কারখানায় ৪২ হাজার; ঘোড়াশালের জিয়া ও পলাশ সার কারখানায় ব্যবহ্রত হচ্ছে যথাক্রমে ৪৩ ও ৪৯ হাজার ঘনফুট, আশুগঞ্জের সার কারখানায় ব্যবহ্রত হচ্ছে ৭৩ হাজার ঘনফুট আর ফেঞ্চুগঞ্জ সার কারখানায় এক মেট্রিক টন ইউরিয়া উৎপাদন করতে গ্যাস লাগে ৮২ হাজার ঘনফুট। প্রতিদিন হাজার হাজার মেট্রিক টন সার উ ৎপাদনে এভাবে গ্যাসের অপচয় হচ্ছে।

* বাসাবাড়িতে যতটুকু গ্যাসের অপচয় হয় তা বন্ধ করার জন্য মিটার স্থাপন করতে হবে।

সবচেয়ে বড় কথা, গ্যাসের দাম শুধু আবাসিক খাতে বাড়ানো হচ্ছে না, সকল খাতেই বাড়নো হচ্ছে।সকল খাতে গ্যাসের দাম বাড়ানো হচ্ছে কাকে ‘উচিত শিক্ষা’ দিতে? আর আবাসিক খাতে যে বিপুল সংখ্যক মানুষ গ্যাস সংযোগ থেকে বঞ্চিত, তাদের জ্বালানির ব্যবস্থা করতে হলে, তাদের জন্য সুলভে এলপি/সিলিন্ডার গ্যাসের ব্যবস্থা করতে হলে আবাসিক গ্রাহকদের গ্যাস দাম বাড়িয়েই কেন করতে হবে? জনগণ যে ভ্যাট দেয়, ট্যাক্স দেয় তা থেকেই তার ব্যবস্থা করা সম্ভব যদি লুন্ঠন না হয়।