Friday, August 3rd, 2012

ফুলবাড়ী দিবস উপলক্ষে জাতীয় কমিটির আহবান

রক্তে লেখা ফুলবাড়ী চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়ন, বড়পুকুরিয়ায় উন্মুক্ত পদ্ধতিতে খনির চক্রান্ত বন্ধ ও ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদের ক্ষতিপূরণ প্রদান, কনকো ফিলিপসের সঙ্গে সাগরের গ্যাসসম্পদ উজাড় করা চুক্তি বাতিল, দফায় দফায় বিদ্যুতের দামবৃদ্ধি ও বিদ্যুৎ খাতে দুর্বত্ত তৎপরতা বন্ধ, জাতীয়  সম্পদের উপর শতভাগ মালিকানা নিশ্চিত, উন্মুক্ত খনন ও খনিজসম্পদ রপ্তানী নিষিদ্ধকরণ এবং জাতীয় সক্ষমতার বিকাশসহ জাতীয় কমিটির ৭ দফা দাবি বাস্তবায়নের দাবি নিয়ে দেশব্যাপী ‘ফুলবাড়ী দিবস’ ২০১২ পালন করুন

 

আগামী ২৬ আগষ্ট ফুলবাড়ী দিবস। ফুলবাড়ী গণঅভ্যুত্থানের ষষ্ঠ বার্ষিকী। ২০০৬ সালের এই দিনে ফুলবাড়ীসহ ৬ থানার বাঙালি আদিবাসী নারী পুরুষ শিশু বৃদ্ধসহ প্রায় লক্ষাধিক মানুষ বিদেশি কোম্পানী এশিয়া এনার্জির (বর্তমান নাম গ্লোবাল কোল ম্যানেজমেন্ট বা জিসিএম) উন্মুক্ত খনন পদ্ধতির ফুলবাড়ী কয়লা প্রকল্পের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে জমায়েত হয়েছিলেন।  লক্ষ মানুষের শান্তিপূর্ণ সমাবেশ সমাপ্তি ঘোষণার পরও কোম্পানির লেলিয়ে দেয়া সরকারি বাহিনী সমবেত জনতার উদ্দেশ্যে পাইকারি গুলিবর্ষণ শুরু করে। শহীদ হন তিনজন তরুণ: আমিনুল, সালেকিন ও তরিকুল। গুলিবিদ্ধ হন ২০ জন, আহত হন দুইশতাধিক। স্থায়ীভাবে পঙ্গু হয়েছেন বাবলু রায়, এইকালের যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা । এরপর অঞ্চলে ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের অসাধারণ পর্বে শরীক হন সারাদেশের মানুষ। ৩০ আগষ্ট ‘ফুলবাড়ী চুক্তি’ স্বাক্ষরের মধ্য দিয়ে জনগণের প্রাথমিক বিজয় সূচিত হয়।  কিন্তু চক্রান্ত থামেনি। সরকার বদলায় কিন্তু দেশি বিদেশি লুটেরাদের স্বার্থে সরকারি ভ’মিকার কোন পার্থক্য দেখা যায় না।

 

কেন লক্ষ মানুষ ২৬ আগষ্ট ২০০৬ ফুলবাড়ীতে সমবেত হয়েছিলেন?

বাংলাদেশের কয়লা সম্পদের একটি সমৃদ্ধ খনি ফুলবাড়ী সহ কয়েক থানা জুড়ে বিস্তৃত। মাত্র ৬ ভাগ রয়্যালটির বিনিময়ে এই খনির শতভাগ মালিকানা তুলে দেয়া হয়েছিল এশিয়া এনার্জি নামে একটি নবগঠিত অনভিজ্ঞ কোম্পানির হাতে। অতিদ্রুত কয়লা সম্পদ লুন্ঠন ও পাচারের জন্য তারা উন্মুক্ত খনির মাধ্যমে কয়লা উত্তোলনের প্রস্তুতি নেয়। শতকরা ৮০ ভাগ কয়লা রফতানির জন্য রেললাইনের উন্নয়নের খরচও ৬ ভাগ রয়ালটি থেকে বহন করবার ব্যবস্থা হয়। জনগণ ক্রমে বুঝতে পারেন যে, ক্ষতিপূরণ, পুনর্বাসন আর উন্নয়নের গল্প সব বানানো, প্রতারণা। আবাদী জমি, মাটির ওপরের ও নীচের পানি সম্পদ, বসতভিটা সবকিছু ধ্বংস করে লক্ষ লক্ষ মানুষকে উদ্বাস্তু করে, উত্তরবঙ্গকে অনুর্বর বিরানভ’মিতে পরিণত করে,  দেশের কয়লা সম্পদ দ্রুত বিদেশে পাচারের আয়োজন চলছে। ফুলবাড়ী রক্ষার আন্দোলন ক্রমে ছড়িয়ে পড়ে এবং দেশ ও দেশের সম্পদ রক্ষার আন্দোলনে পরিণত হয়। প্রাথমিক বিজয় অর্জিত হলেও আন্দোলন এখনও অব্যাহত আছে। জনগণের শক্তি ও প্রতিরোধের গণপ্রাচীর এখনও মোকাবিলা করে যাচ্ছে কয়লাসহ জাতীয় সম্পদ লুন্ঠনের চক্রান্তে লিপ্ত দুর্বত্ত বিশ্বজোটকে।

 

জনশত্রুরা এখনও সক্রিয়

২০০৬ সালের ৩০ আগষ্ট যে ঐতিহাসিক ফুলবাড়ী চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, তার প্রতি পূর্ণ সংহতি জানিয়েছিলেন তৎকালীন বিরোধী দলীয় নেত্রী ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি চুক্তি স্বাক্ষরের এক সপ্তাহের মধ্যে ফুলবাড়ীসহ ৬ থানার মানুষদের অভিনন্দন জানিয়ে তৎকালীন ৪ দলীয় জোট সরকারের উদ্দেশ্যে অবিলম্বে চুক্তি বাস্তবায়নের দাবি জানিয়েছিলেন। তিনি সরকারের উদ্দেশ্যে আরও যেকথা বলেছিলেন তা তাঁকে আবারো স্মরণ করিয়ে দিতে চাই, তা হল, ‘এই চুক্তি বাস্তবায়ন না করার পরিণতি হবে ভয়াবহ।’ জনগণের কাছে নিজের এই অবস্থান প্রকাশ করবার পর শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতায় আছে সাড়ে তিন বছর। কিন্তু এখনও সেই চুক্তির এখনও পূর্ণ বাস্তবায়ন হয়নি। উল্টো সেই চুক্তি লঙ্ঘন করে দেশের জন্য সর্বনাশা উন্মুক্ত খনির পক্ষে সরকারের ভেতর থেকেই নানা আয়োজন চলছে। কয়লানীতি প্রণয়নে এমন কমিটি গঠন করা হয়েছে যেখানে এশিয়া এনার্জির স্থানীয় প্রচারককে সদস্য রাখা হয়েছে। এই সদস্য সম্প্রতি এশিয়া এনার্জির কর্মকর্তাকে নিয়ে উন্মুক্ত খনির পক্ষে সেমিনার করেছে। ভারত থেকে ভাড়া করে বিশেষজ্ঞ নামের প্রচারক আনা হয়েছে। তার প্রচারণামূলক বক্তব্য প্রচারের জন্য আয়োজন করা হয়েছে। আমরা জানতে পেরেছি, একটি বিজ্ঞাপনী সংস্থা ও একটি পাক্ষিক পত্রিকা দেশের সর্বনাশ করে বিদেশি কোম্পানির স্বার্থ রক্ষায় জনসংযোগ ও প্রচারণার এসব কাজে নিয়োজিত আছে।

 

অন্যদিকে, ফুলবাড়ীর কয়লা খনির ওপর লন্ডনে এখনও শেয়ার ব্যবসা করছে এশিয়া এনার্জি (জিসিএম)। মাদক ব্যবসা, ফটকাবাজারী ও সন্ত্রাসীদের সাথে যুক্ত নানা তহবিল সংস্থা এর অংশীদার। আমরা এযাবতকালের সকল সরকারকে অবৈধ জালিয়াতিপূর্ণ বাংলাদেশবিরোধী এই অপতৎপরতা বন্ধ করবার দাবি জানিয়েছি। কিন্ত তার বদলে সব সরকারই জনগণ বিতাড়িত কোম্পানিকে পুনর্বাসন করবার অপচেষ্টায় লিপ্ত থেকেছে। শেয়ার ব্যবসার মুনাফার একাংশ ছড়িয়ে দেশে দালাল লুম্পেনদের তৎপরতা বাড়ানো হয়েছে। মুখচেনা কতিপয় কনসালট্যান্ট, মিডিয়া মালিক, বিজ্ঞাপনী সংস্থা, মন্ত্রী , আমলা এখন দেশের সর্বনাশ করে কোম্পানির স্বার্থরক্ষায় সর্বশক্তি নিয়োগ করেছে। এদের উদ্দেশ্যে বলি, আপনারা অবিলম্বে নিজেদের অপতৎপরতা বন্ধ করুন। নইলে ইতিহাসে আপনারা রাজাকারদের মতোই জনশত্রু হিসেবে ঘৃণিত হবেন, প্রয়োজনে আপনাদের বিরুদ্ধে গণআদালত গঠন করা হবে।

 

এই জনশত্রুরা উত্তরবঙ্গ উন্নয়নের কথা বলে উত্তরবঙ্গে ধ্বংসযজ্ঞ করবারই চক্রান্তে শরীক হয়েছে। এরাই উত্তরবঙ্গে গ্যাস না দিয়ে বাংলাদেশ থেকে গ্যাস ভারতে রফতানির জন্য ওঠে পড়ে লেগেছিল। এরাই বঙ্গোপসাগরের গ্যাস সম্পদ মাকিনী  কোম্পানির হাতে তুলে দিতে প্রচারণার কাজ করেছে। উন্মুক্ত খনি করতে গিয়ে দেশের অমূল্য আবাদি জমি, পানি সম্পদ, মানুষের জীবন জীবিকা ধ্বংস হোক, উত্তরবঙ্গ মরুভূমি হোক, ধ্বংসযজ্ঞ করে কয়লা বিদেশে পাচার হোক তাতে তাদের কিছু আসে যায না। মুনাফা আর কমিশনই এদের লক্ষ্য; প্রতারণা, মিথ্যাচার ও জালিয়াতিই তাদের প্রধান অবলম্বন। ২০০৬ সালে এই দুর্বত্তদের হটিয়ে দিতে ফুলবাড়ীতে মানুষ জীবন দিয়েছেন। রক্তে লেখা ফুলবাড়ী চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। গণরায় হয়েছে: এই দেশের সম্পদের প্রতিটি কণা দেশের মানুষের, তাদের কাজেই লাগাতে হবে; কোন বিদেশি কোম্পানি ও তার দেশি লুটেরাদের জন্য দেশের বর্তমান ও ভবিষ্যতের সবনাশ আমরা হতে দেবো না। প্রথমে ফুলবাড়ি চুক্তি বাস্তবায়ন হবে, এশিয়া এনার্জিকে দেশ থেকে বিতাড়ন করতে হবে এরপর কয়লা সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহারের সুরক্ষিত উপায় নিয়ে আলোচনা হতে পারে, তার আগে নয়। ৪ দলীয় জোট চুক্তি স্বাক্ষরের মাধ্যমে এবং আওয়ামী লীগ প্রকাশ্য অঙ্গীকারের মাধ্যমে এই চুক্তি বাস্তবায়নে দায়বদ্ধ। এর অন্যথা করলে তা জনগণ ক্ষমা করবে না।

 

বিদ্যুৎ উৎপাদনের নামেই লুটেরা বিশ্বজোটের কাছে কয়লাখনিগুলো তুলে দেবার চক্রান্ত চলছে। বিদ্যুৎ উৎপাদনে যে কয়লা দরকার তার লুন্ঠন ও পাচারের বিরুদ্ধেই মানুষ জীবন দিয়েছিলেন, ফুলবাড়ী থেকে সারাদেশে গণজাগরণ তৈরি হয়েছে। আমরা সবসময়ই বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছি জ্বালানী সম্পদের ওপর শতভাগ মালিকানা, রফতানি নিষিদ্ধ ও জাতীয় সক্ষমতা বিকাশের মাধ্যমে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা নিয়ে তার বাস্তবায়নেই স্বল্প দামে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ যোগান ও জ্বালানী নিরাপত্তা সম্ভব। দেশি বিদেশি লুটেরাদের রাহুগ্রাসে বিদ্যুৎখাত থাকলে এই কাজ কখনোই সম্ভব নয়।

 

এই বছরের ফুলবাড়ী দিবসে তাই আমাদের দাবী:

(১)    সমগ্র বাংলাদেশে উন্মুক্ত পদ্ধতি নিষিদ্ধ ও এশিয়া এনার্জি (জিসিএম) বহিষ্কারসহ রক্তে লেখা ‘ফুলবাড়ী চুক্তি’ অবিলম্বে পূর্ণ বাস্তবায়ন করতে হবে। ফুলবাড়ী অঞ্চলে তালাবন্ধ করে রাখা এশিয়া এনার্জির অফিস চক্রান্তের আখড়া বানানোর অপচেষ্টা চলছে। অবিলম্বে এটি সরাতে হবে।

(২)    দীর্ঘমেয়াদে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্পায়নসহ জাতীয় প্রয়োজনে, মাটি পানি ও মানুষের সর্বনাশ না করে, কয়লা সম্পদের শতভাগ ও সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করবার জন্য কার্যকর জাতীয় সংস্থা গঠন এবং জাতীয় সক্ষমতার বিকাশ ঘটাতে হবে।

(৩)    বড়পুকুরিয়ায়  পুনর্বাসনের নামে জনগণকে অন্যত্র সরিয়ে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে খনি করার চক্রান্ত বন্ধ করতে হবে, ক্ষতিগ্রস্ত সকল মানুষকে যথেষ্ট ক্ষতিপূরণ দিতে হবে, নিরাপত্তা বালু ভরাট ইত্যাদি নিশ্চিত করে জাতীয় সংস্থার মাধ্যমে নিরাপদে কয়লা উত্তোলনের উদ্যোগ নিতে হবে।

(৪)    বড়পুকুরিয়া এলাকার পানি সংকট দূর করতে হবে। কৃষকদের বিরুদ্ধে ভ’য়া মামলা প্রত্যাহার করতে হবে।

(৫)    কনোকো ফিলিপসএর সাথে চুক্তি বাতিল ও ‘খনিজসম্পদ রফতানি নিষিদ্ধ আইন’ প্রণয়ন করতে হবে।

(৬)    রেন্টাল ও কৃইক রেন্টালের পথ বন্ধ করে টেকসই পথ নিতে হবে। দেশি বিদেশি লুটেরাদের স্বার্থে প্রকল্প গ্রহণ এবং গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম বাড়ানো চলবে না।

(৭)    গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট সমাধানে শতভাগ মালিকানায় শতভাগ গ্যাস ও কয়লা দেশের স্বার্থে ব্যবহারের জন্য জাতীয় কমিটির ৭ দফা দাবী বাস্তবায়ন করতে হবে।

 

জনগণের সম্পদ নানাকায়দায় লুটেরাদের দখল আর উন্নয়নের নামে তাদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার বিরুদ্ধে ফুলবাড়ী আমাদের দিশা দেয়। আর তাই দেশ ও দেশের সম্পদের ওপর জনগণের মালিকানা ও কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার লড়াই এগিয়ে নেবার  অংশ হিসেবে দেশব্যাপী ‘ফুলবাড়ী দিবস’ পালনের জন্য সকলের প্রতি আহবান জানাই।

 

২৬ আগষ্ট ২০১২ রোববার

কেন্দ্রীয় কর্মসূচী: র‌্যালী ও শ্রদ্ধানিবেদন, ফুলবাড়ী শহীদ স্মৃতি স্থম্ভ, সকাল ৯টা; সমাবেশ নিমতলী মোড় বেলা ১১টা

ঢাকা সহ সারা দেশে শহীদ মিনারে শ্রদ্ধাঞ্জলী, আলোচনা ও র‌্যালী

 

তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটি

৩ আগষ্ট ২০১২