Thursday, August 28th, 2014

ফুলবাড়ী চুক্তি’র পূর্ণ বাস্তবায়ন ও বড়পুকুরিয়ায় উন্মুক্ত কয়লা খননের তৎপরতা বাতিলের দাবীতে পালিত হলো ফুলবাড়ী দিবস-২০১৪

‘শহীদের খুনে রাঙা পথে দালাল বেঈমানের ঠাঁই নাই’- শ্লোগানকে সামনে রেখে গত ২৬ আগষ্ট ২০১৪ সারাদেশে পালিত হয় ফুলবাড়ী গণঅভ্যুত্থানের অষ্টম বার্ষিকী। শোক র‌্যালি, কালো ব্যাজ ধারণ, কালো পতাকা উত্তোলণ, সমাবেশ ও প্রতিবাদী সাংস্কৃতিক কর্মসূচীর মধ্যে দিয়ে দিনব্যাপী কেন্দ্রীয় কর্মসূচী পালিত হয় ফুলবাড়ীতে ।

ফুলবাড়ী শহীদদের প্রতি শদ্ধা জানিয়ে সকাল ৭টায় কালো ব্যাজ ধারণের মধ্যে দিয়ে দিনের কর্মসূচীর সূচনা হয়। শহীদদের প্রতি শোক ও শ্রদ্ধায় এদিন ফুলবাড়ীর দোকান পাট ও ব্যাবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখা হয়, স্থানে স্থানে উড়তে থাকে কালো পতাকা। সকাল থেকেই স্থানীয় বিভিন্ন সামাজিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও পেশাজীবি সংগঠন খন্ড খন্ড মিছিল বের করে। জাতীয় কমিটির কেন্দ্রীয় কর্মসূচী হিসেবে সকাল সাড়ে দশটায় অনুষ্ঠিত হয় শোক র‌্যালী , র‌্যালী শেষে আমিন-তরিকুল-সালেকীনের স্মৃতির উদ্দেশ্যে শহীদ মিনারে পুস্পমাল্য অর্পন ও এক মিনিট নিরবতা পালন করা হয়। এরপর নিমতলী মোড়ে অনুষ্ঠিত জাতীয় কমিটির সমাবেশ থেকে ফুলবাড়ি চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়ন, এশিয়া এনার্জিকে উচ্ছেদ ও বড়পুকুরিয়ায় উন্মুক্ত কয়লা খননের সা¤প্রতিক অপতৎপরতা বন্ধের দাবী জানানো হয়।

ছবি: ফুলবাড়ী দিবস ২০১৪

সমাবেশে সূচনা বক্তৃতা রাখেন জাতীয় কমিটির সদস্য সচিব অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ, কর্মসূচী ঘোষণা করেন জাতীয় কমিটির আহবায়ক প্রকৌশলী শেখ মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, সভাপতিত্ব করে জাতীয় কমিটির ফুলবাড়ী শাখার আহবায়ক সাইফুল ইসলাম জুয়েল। সমাবেশে বক্তব্য রাখেন জাতীয় গণফ্রন্ট, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি), বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল-বাসদ, বাংলাদেশ ওয়ার্কার্স পার্টি, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি, বাসদ কনভেনশন প্রস্তুতি কমিটি, গণতান্ত্রিক বিপ্লবী পার্টি, গণসংহতি আন্দোলন, ইউনাইটেড কমিউনিস্ট লীগ সহ বিভিন্ন বামগণতান্ত্রিক রাজনৈতিক সংগঠনের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ, জাতীয় কমিটি ফুলবাড়ী শাখার নেতৃবৃন্দ, স্থানীয় ও আঞ্চলিক বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ, ফুলবাড়ী আন্দোলনে পঙ্গুত্ববরণ করা বাবলু রায় সহ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক গবেষক প্রকৌশলী।

সমাবেশে নেতৃবৃন্দ বলেন, ২০০৬ সালের এইদিনে পানিসম্পদ, আবাদী জমি ও মানুষ বিনাশী ফুলবাড়ী উন্মুক্ত কয়লা খনন প্রকল্পের বিরুদ্ধে বাঙালি আদিবাসী নারী পুরুষ শিশু বৃদ্ধসহ লক্ষ মানুষের সমাবেশে সরকারি বাহিনী টিয়ার গ্যাস ছোড়ে, গুলি চালায়। শহীদ হন আমিন-তরিকুল-সালেকীন, গুলিবিদ্ধসহ আহত হন দুই শতাধিক। এরপর পুরো অঞ্চলের নারীপুরুষেরা গণঅভ্যুত্থানের এক অসাধারণ পর্ব তৈরি করেন, সারাদেশে তা ছড়িয়ে পড়ে।এরই এক পর্যায়ে ৩০ আগষ্ট ২০০৬ চারদলীয় জোট সরকার জনগণের সাথে চুক্তি স্বাক্ষর করতে বাধ্য হয়। সারাদেশে উন্মুক্ত খনি নিষিদ্ধ ও এশিয়া এনার্জি বহিষ্কারের ধারাসহ এই ‘ফুলবাড়ী চুক্তি’র প্রতি পূর্ণ সংহতি জানিয়ে ক্ষমতায় গেলে এই চুক্তি  বাস্তবায়ন করার অঙ্গীকার করেন ৪ঠা সেপ্টেম্বর তৎকালীন বিরোধী দলীয় নেত্রী ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

কিন্তু শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের দুই মেয়াদে ছয় বছর পার হলেও এখনও সেই চুক্তির মূলধারাগুলোর বাস্তবায়ন হয়নি। কোন বৈধ অনুমোদন না পেলেও ফুলবাড়ীর কয়লা খনির ওপর লন্ডনে এখনও বেআইনীভাবে শেয়ার ব্যবসা করছে এশিয়া এনার্জি। শেয়ার ব্যবসার মুনাফার একাংশ ছড়িয়ে দেশে দালাল মন্ত্রী, এমপি, সাংবাদিক, বিজ্ঞাপনী সংস্থা, কনসালট্যান্ট সৃষ্টি করা হয়েছে। ধারাবাহিক ভাবে চলছে  উন্মুক্ত খননের সপক্ষে মিথ্যাচার ও অপ্রচারণা। বড়পুকুরিয়ার উত্তরাংশে উন্মুক্ত খননের সা¤প্রতিক অপতৎপরতা এরই অংশ।

নেতৃবৃন্দ সরকারের উদ্দেশ্যে হুশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, বড়পুকুরিয়া কিংবা ফুলবাড়ীতে উন্মুক্ত খননের চেষ্টা করা হলে তার পরিণত হবে ভয়াবহ। সমাবেশ থেকে আগামী ৩০ নভেম্বরের মধ্যে ফুলবড়ী চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়ন, বড়পুকুরিয়ায় উন্মুক্ত কয়লা খননের চক্রান্ত ও দালালদের তৎপরতা বন্ধ এবং এশিয়া এনার্জির অবশেষ উচ্ছেদের আল্টিমেটাম ঘোষণা করা হয়। নইলে আগামী ১ ডিসেম্বর ফুলবাড়ীতে ৬ থানার জনগণকে নিয়ে মহাসমাবেশের মাধ্যমে পরবর্তী কঠোর কর্মসূচী ঘোষণা করা হবে। এই সময়কালের মধ্যে জাতীয় স্বার্থ বিরোধী কোন সিদ্ধান্ত নেয়া হলে জাতীয় কমিটির পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কর্মসূচী ঘোষণা করা হবে বলে সমাবেশ থেকে জানানো হয়।

দিনব্যাপি কর্মসূচীর অংশ হিসেবে বিকেল থেকে চলে প্রতিবাদী গান সহ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। গণসঙ্গীত পরিবেশন করে বিবর্তন সাংস্কৃতিক গোষ্ঠী। সন্ধ্যায় প্রদর্শীত হয় কয়লা খনি নিয়ে স্থানীয় জনগণের মতামত নিয়ে নির্মিত প্রামাণ্য চিত্র “হারা কয়লা খনি চাইনা”, ফুলবাড়ি গণঅভ্যুত্থানের উপর নির্মিত প্রামাণ্য চিত্র “ফুলবাড়ীর রক্ত পতাকা” এবং ভারতে উন্মুক্ত কয়লা খননের প্রতক্ষ অভিজ্ঞাতার উপর ভিত্তি করে নির্মিত প্রামাণ্য চিত্র “ফুলবাড়ী দেবোনা”।